(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: -)
الوحي المحمدي القسم: كتب عامة
الكتاب: الوحي المحمدي
المؤلف: محمد رشيد بن علي رضا بن محمد شمس الدين بن محمد بهاء الدين بن منلا علي خليفة القلموني الحسيني (ت 1354هـ)
الناشر: دار الكتب العلمية - بيروت
الطبعة: الأولى، 1426 هـ - 2005 م
عدد الصفحات: 268
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 12 محرم 1433
আল-ওয়াহি আল-মুহাম্মাদী বিভাগ: সাধারণ গ্রন্থসমূহ
গ্রন্থ: আল-ওয়াহি আল-মুহাম্মাদী
লেখক: মুহাম্মদ রশিদ বিন আলী রিদা বিন মুহাম্মদ শামসউদ্দিন বিন মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন বিন মানলা আলী খলিফা আল-কালামুনি আল-হুসাইনি (মৃত্যু ১৩৫৪ হিজরি)
প্রকাশক: দার আল-কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ - বৈরুত
সংস্করণ: প্রথম، ১৪২৬ হিজরি - ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৬৮
[গ্রন্থের পৃষ্ঠা নম্বর মুদ্রণ কপির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ]
শামিলাতে প্রকাশের তারিখ: ১২ মুহররম ১৪৩৩
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৩)
على سبيل التقديمبسم الله الرحمن الرحيم
صاحب هذا الكتاب (الوحى المحمدى) الشيخ الجليل/ محمد رشيد رضا؛ واحد من الرموز الشوامخ الذين دافعوا عن الإسلام وتبنّوا قضايا أمتنا المسلمة في زمن كان فيه الزحف الاستعمارى لا يكتفى باستيطان أرض المسلمين وإنما كان يعمل بقواه كلّها على استيطان الأفئدة والعقول من خلال «الغزو الثقافى» لصرف أعين الأمة عن التطلع إلى الخلاص من غزاتها والقدرة على الشفاء من علتها وأدوائها وعلى رأسها الأمية الطاغية والظلمة المطبقة على الأفكار والعقول.
ومن ثم كان دور هذه الصفوة المجاهدة التى كانت تمثلها مدرسة المصلحين العظيمين جمال الدين الأفغانى والإمام محمد عبده، ومن تتلمذ عليهما من أمثال صاحب الكتاب كان دور هذه الصفوة عظيم الأثر فى إيقاظ وعى الأمة بما تحمله دينها من أسباب الخلاص وعوامل النهوض، ثم بما ينبغى أن تكون عليه مسلكها في مواجهة مكايد الغازين من الخارج ومضار المتخلّفين والجاهلين بحقيقة التدين من فقراء الفكر ومحدودى الرؤية ممن ينسبون إلى العلم فى الداخل.
وكان القيام بهذه المهام الكبار بحاجة إلى رجال أولى عزم وقوة، وذوى ثقافة جامعة وبصر مستنير يتيح لهم الرؤى النفاذ إلى حقائق الأحداث والأمور.
ومن هنا كان للتكوين الثقافى الشامل والمتجدد لصاحب هذا الكتاب «الشيخ محمد رشيد رضا» عاملا مؤثرّا فى تحديد الموقع الذى قام عليه في خدمة المسلمين والإسلام.
ولد الشيخ فى: «القلمون» من أعمال طرابلس الشام فى عام 1282 هـ 1865 م.
وفيها وفى طرابلس أخذ يدرس ويتعلم.
ثم رحل إلى مصر فى العقد الثالث من عمره (1315 هـ) حيث تتلمذ ولازم أستاذه الإمام محمد عبده وكانا قد التقيا قبل ذلك في «بيروت».
উপস্থাপনা স্বরূপপরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
এই গ্রন্থ (আল-ওয়াহয়ুল মুহাম্মদী)-এর রচয়িতা মহান শায়খ মুহাম্মাদ রশিদ রিদা; তিনি ছিলেন সেই সব সমুন্নত ব্যক্তিত্বদের একজন যারা ইসলামের প্রতিরক্ষা করেছিলেন এবং মুসলিম উম্মাহর সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক আগ্রাসন কেবল মুসলিম ভূখণ্ড দখলেই ক্ষান্ত ছিল না, বরং তাদের সর্বশক্তি দিয়ে 'সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের' মাধ্যমে মানুষের হৃদয় ও মন দখল করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল উম্মাহর দৃষ্টিকে আক্রমণকারীদের কবল থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের রোগ-ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের সক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া; যার শীর্ষে ছিল চরম নিরক্ষরতা এবং চিন্তা ও মস্তিষ্কের ওপর চেপে বসা ঘনীভূত অন্ধকার।
ফলস্বরূপ, এই মুজাহিদ অভিজাত শ্রেণীর ভূমিকা—যাদের প্রতিনিধিত্ব করতেন দুই মহান সংস্কারক জামাল উদ্দিন আফগানি এবং ইমাম মুহাম্মাদ আবদুহুর ধারা এবং এই গ্রন্থের লেখকের ন্যায় যারা তাঁদের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন—উম্মাহর চেতনা জাগ্রত করতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিল। এই চেতনা ছিল তাদের দ্বীনের মধ্যে নিহিত মুক্তির উপায় ও উত্থানের উপকরণসমূহ সম্পর্কে এবং বাহ্যিক আক্রমণকারীদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তাদের কর্মপন্থা কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যারা জ্ঞানের দাবিদার কিন্তু চিন্তায় দরিদ্র ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকীর্ণ, সেই সব সত্য দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ ও পশ্চাৎপদ ব্যক্তিদের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
আর এই বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন ছিল দৃঢ় সংকল্প ও শক্তির অধিকারী এবং এমন এক সমন্বিত সংস্কৃতি ও আলোকিত অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের, যা তাঁদের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের গূঢ় রহস্য অনুধাবন করার গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে।
এ কারণেই এই গ্রন্থের রচয়িতা ‘শায়খ মুহাম্মাদ রশিদ রিদা’-র সর্বজনীন ও আধুনিক সাংস্কৃতিক গঠন ইসলাম ও মুসলিমদের সেবায় তাঁর অবস্থান নির্ধারণে একটি প্রভাবশালী কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
শায়খ ১২৮২ হিজরি (১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ) সালে সিরিয়ার ত্রিপোলির অন্তর্গত 'কালামুন'-এ জন্মগ্রহণ করেন।
সেখানে এবং ত্রিপোলিতেই তিনি পড়ালেখা ও জ্ঞানার্জন শুরু করেন।
অতঃপর তাঁর বয়সের তৃতীয় দশকে (১৩১৫ হিজরি) তিনি মিশরে পাড়ি জমান, যেখানে তিনি তাঁর উস্তাদ ইমাম মুহাম্মাদ আবদুহুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে থাকেন। এর পূর্বে 'বৈরুত'-এ তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৪)
وهنا كان إصداره لمجلة «المنار» ذات المكانة والتأثير الثقافى الرفيع فى كلّ مكان عرفت فيه فى ديار الإسلام. حيث ضمّها آراءه الإصلاحية التى كانت ثمرة ناضجة لعلاقته بالأستاذ الإمام، ولاهتماماته الواسعة لقضايا المسلمين والإسلام، ولا سيما اهتماماته بالإصلاح الدينى الذى كان أستاذه الشيخ محمد عبده هو الرائد له فيها، وكان إطارها العام هو تخليص مناهج التعليم الأزهرى من الحشود من الحواشى والتقارير وغيرها مما يعطل ملكات الطلاب ويقف بهم عند مجرد الاستظهار والحفظ.
وظل الرجل يتدخل بين ديار الإسلام وغيرها العربية حتى استقر به المطاف فى وطنه الثانى مصر حتى لقى ربه.
أما عن هذا الكتاب فهو رسالة إلى الأمة المسلمة يشرح فيها المؤلف أسباب عجز المسلمين عن إبلاغ روعة الإسلام إلى العالم على الوجه الذى يحقق اقتناع غير المسلمين بالإسلام، ثم يؤدى إلى دخولهم فيه.
والقضية فعلا كانت وستبقى محل الاهتمام والتساؤل لأنها هى القضية المحورية للدعوة والدعاة .. وسبب التساؤل هو أنه على الرغم من كثرة وتعدد المؤسسات والهيئات التى تعمل فى حقل الدعوة الإسلامية إلّا أنّ القوى المعادية للإسلام لا تزال ممتلكة للتفوق فى إحداث التأثير المعاكس فى الإساءة إلى الإسلام وفى تنفير غير المسلمين منه وهنا تكون التساؤلات:
هل السبب فى ذلك وفرة الإمكانات المادية والتقنية التى تعطيهم من مساحة بث دعاواهم واتهاماتهم للإسلام ما لا تجده المؤسسات الإسلامية؟
وربما كان هذا- فعلا- أحد الأسباب لكنه ليس كلّ الأسباب ولا أهمها، لأنّ الأسباب الحقيقية هى فينا نحن المسلمين فهى أسباب داخلية أكثر منها خارجية.
ففي الجانب العقيدى البحت- جانب التعريف بالإسلام عقيدة وشريعة- تطفو الخلافات الفقهية المتصلة بفروع الشريعة .. وتطفو لتتخذها بعض الهيئات والمؤسسات لتعرضها وتركز عليها وكأنها هى أصل الإسلام الأمر الذى يفقد الدعوة ركنها الأهم الذى ينبغى أن يقدم إلى الناس ويتم التعريف به.
এখানেই তিনি তাঁর ‘আল-মানার’ সাময়িকী প্রকাশ করেন, যা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এক সুউচ্চ মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের অধিকারী ছিল। এতে তিনি তাঁর সেই সংস্কারমূলক চিন্তাধারা সন্নিবেশিত করেছিলেন, যা ছিল উস্তাদুল ইমামের সাথে তাঁর সম্পর্কের এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি তাঁর সুগভীর ও ব্যাপক অনুরাগের এক পরিপক্ক ফসল। বিশেষ করে ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি তাঁর যে আগ্রহ ছিল—যার পথপ্রদর্শক ছিলেন তাঁর শিক্ষক শেখ মুহাম্মদ আবদুহু—তার সাধারণ কাঠামো ছিল আল-আজহারের শিক্ষা পদ্ধতিকে সেই সমস্ত টীকা-ভাষ্য ও অনুষঙ্গের ভার থেকে মুক্ত করা, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং তাদের কেবল স্মৃতিস্থ ও মুখস্থকরণের (حفظ) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে।
এই মনীষী মুসলিম ভূখণ্ড এবং অন্যান্য আরব দেশগুলোর সংস্কার ও উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে থাকেন, অবশেষে তাঁর দ্বিতীয় আবাসভূমি মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানেই মহান রবের সান্নিধ্যে গমন করেন।
বর্তমান গ্রন্থটি মূলত মুসলিম উম্মাহর প্রতি একটি পত্র বিশেষ, যেখানে লেখক ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য বিশ্বের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দিতে মুসলমানদের অক্ষমতার কারণসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন, যা অমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আস্থাশীল করবে এবং পরবর্তীতে তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পথে পরিচালিত করবে।
বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে গুরুত্ব ও জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এবং থাকবে; কারণ এটি দাওয়াত ও দাঈদের জন্য একটি মৌলিক ও কেন্দ্রীয় বিষয়। এই জিজ্ঞাসার কারণ হলো, ইসলামি দাওয়াতের ময়দানে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মতৎপরতা থাকা সত্ত্বেও ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো ইসলামের অপপ্রচার চালাতে এবং অমুসলিমদের ইসলাম থেকে বিতশ্রদ্ধ করতে আজও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। আর এখানেই প্রশ্নগুলো উঠে আসে:
এর কারণ কি বস্তুগত এবং কারিগরি সক্ষমতার প্রাচুর্য, যা তাদের ইসলামের বিরুদ্ধে অপবাদ ও অভিযোগসমূহ প্রচার করার জন্য এমন প্রশস্ত সুযোগ করে দেয় যা ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো পায় না?
সম্ভবত এটিই প্রকৃতপক্ষে অন্যতম একটি কারণ, কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও নয়। কারণ প্রকৃত কারণ আমাদের মুসলমানদের নিজেদের মধ্যেই বিদ্যমান; যা বাহ্যিক কারণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবেই বেশি প্রবল।
বিশুদ্ধ আকিদাগত দিকটিতে—অর্থাৎ আকিদা ও শরিয়ত হিসেবে ইসলামের পরিচিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে—শরিয়তের শাখা-প্রশাখা সংশ্লিষ্ট ফিকহি মতভেদগুলো সামনে চলে আসে। কিছু সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এগুলোকেই এমনভাবে উপস্থাপন ও এর ওপর গুরুত্বারোপ করে যেন মনে হয় এগুলোই ইসলামের মূল ভিত্তি। এর ফলে দাওয়াতের সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি হারিয়ে যায় যা মানুষের সামনে পেশ করা এবং যার মাধ্যমে পরিচিতি প্রদান করা সমীচীন ছিল।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৫)
ليس هذا فحسب بل إنه يتحرك له أثرا سلبيا بالغ الإساءة إلى الإسلام والمسلمين بالصورة التى يتركها لدى غير المسلم من أنهم عاجزون عن الاتفاق على موقف واحد وصورة موحدة لعقيدتهم وتشريعاتهم .. ومن ناحية أخرى فإن أخطر وأهم أسباب تصورنا وعدم استجابة الآخرين لمعطيات شريعتنا هو أوضاعنا الداخلية فى أنحاء العالم الإسلامى الذى عانى من التمزق والعجز والتخلف، بينما جوهر الإسلام وصريح القرآن يدعوان إلى الوحدة، وإلى القوة وإلى التقدم، وهى المبادئ التى قامت عليها الدولة فى عصر النبوة والراشدين، وعصور ازدهار الدولة المسلمة التى شرّقت وغرّبت فيما وراء ما بين المحيط والخليج وصولا إلى آسيا الوسطى وبلاد ما وراء النهر وتحت حكم دام قرونا فى الأندلس حتى جنوب فرنسا.
وهى الفترة التاريخية التى ازدهرت فيها حضارة الإسلام وأفرزت الشوامخ الكبار من علماء المسلمين فى كل فروع المعرفة والذين كان عطاؤهم هو المحرك والمؤثّر الأكبر فى النهضة الأوروبية فى العصور الوسطى.
ومما هو جدير بالتسجيل أن يكون هذا هو ما قال به حكيم الشرق، وباعث النهضة السيد جمال الدين الأفغانى، والأستاذ الإمام الشيخ محمد عبده. وما سجّله الشيخ رشيد رضا فى مقدمة الطبعة الأولى لهذا الكتاب.
الأمر الذى يؤكد حقيقة بالغة الأهمية فى كيفية استعادة دور ومكانة الإسلام فى العلم، ليس اعتمادا على مجرد التبليغ بل أهم منه هو أن تكون حال المسلمين فى الداخل صورة صحيحة وصادقة عن الإسلام حتى يصدق المدعون ما ندعوهم إليه.
وهنا نصل إلى الباعث الدافع للشيخ رشيد رضا على تأليف هذا الكتاب. وهو الإسهام فى تصفية وتوضيح حقيقة الإسلام التى ينبغى أن يلتقى حولها المسلمون- كل
المسلمين- على اختلاف مشاربهم فى كل مكان من العالم.
وبعد فإن ذلك العصر الذى ازدان بهؤلاء الشوامخ من المصلحين وكبار المفكرين كان وسيبقى رجاله وأعلامه نعم القدوة والأسوة لأبناء الأمة فى هذا الزمن الذى تزحف فيه القوى
শুধু তাই নয়, বরং এটি ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি অত্যন্ত নেতিবাচক এবং অবমাননাকর প্রভাব ফেলে, যা অমুসলিমদের মধ্যে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে যে তারা তাদের আকিদা (عقيدة) এবং শরিয়াহগত (تشريع) বিধিবিধানের বিষয়ে একটি একক অবস্থান বা অভিন্ন রূপরেখায় একমত হতে অক্ষম। অন্যদিকে, আমাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়া এবং অন্যদের পক্ষ থেকে আমাদের শরিয়াহর (شريعة) বিধানাবলির প্রতি সাড়া না দেওয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি; যা অনৈক্য, অক্ষমতা ও অনগ্রসরতায় জর্জরিত। অথচ ইসলামের সারমর্ম এবং কুরআনের সুস্পষ্ট বাণী ঐক্য, শক্তি ও প্রগতির দিকে আহ্বান জানায়। আর এই নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই নবুওয়াত ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের স্বর্ণযুগে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা মহাসাগর থেকে উপসাগর পর্যন্ত এবং এর বাইরে মধ্য এশিয়া ও মা-ওয়ারা-উন-নাহর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল এবং আন্দালুসে কয়েক শতাব্দী থেকে শুরু করে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত শাসন পরিচালনা করেছিল।
এটি সেই ঐতিহাসিক সময় যখন ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল এবং জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম উলামাদের মধ্য থেকে এমন মহান ব্যক্তিত্বদের জন্ম দিয়েছিল, যাদের অবদান ছিল মধ্যযুগের ইউরোপীয় রেনেসাঁ বা জাগরণের প্রধান চালিকাশক্তি ও প্রভাবক।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রাচ্যের বিজ্ঞ পণ্ডিত এবং জাগরণের পথিকৃৎ সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি এবং উস্তাদ আল-ইমাম শায়খ মুহাম্মদ আবদুহ এই একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শায়খ রশিদ রিদাও এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় এটিই লিপিবদ্ধ করেছেন।
বিষয়টি জ্ঞানের জগতে ইসলামের ভূমিকা ও অবস্থান পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে নিশ্চিত করে; যা কেবল প্রচারের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা যেন ইসলামের একটি সঠিক ও সত্যনিষ্ঠ চিত্র হয়ে ওঠে, যাতে আমরা যাদের দাওয়াত দিচ্ছি তারা আমাদের আহ্বানকে সত্য বলে গ্রহণ করতে পারে।
এখান থেকেই আমরা শায়খ রশিদ রিদাকে এই গ্রন্থটি রচনায় উদ্বুদ্ধকারী মূল কারণটি খুঁজে পাই। আর তা হলো— ইসলামের প্রকৃত রূপটিকে পরিশোধন (تصفية) ও স্পষ্টীকরণে অবদান রাখা, যার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সমস্ত মুসলিমের—তাদের মতাদর্শিক ভিন্নতা নির্বিশেষে—একত্রিত হওয়া উচিত।
পরিশেষে, সংস্কারক ও মহান চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে যে যুগটি সুশোভিত হয়েছিল, সেই যুগের মহান ব্যক্তিত্ব ও মনীষীগণ এই উম্মাহর সন্তানদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ (قدوة) ও অনুকরণীয় (أسوة) হিসেবে থাকবেন—বিশেষ করে এই বর্তমান সময়ে, যখন বিভিন্ন অপশক্তি ধেয়ে আসছে।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৬)
المعادية للإسلام على أرضنا وأهلينا، وتزحف فيه قبل ذلك وبعده على العقول والقلوب بهذا القدر الهائل من الغزو الفكرىّ.
الأمر الذى يوجب على الجميع رعاة ورعايا أن يكونوا على مستوى المسئولية فى مواجهة المخاطر، والله من وراء القصد وهو دائما حسبى.
نائب رئيس المجلس «أ. د/ عبد الصبور مرزوق»
আমাদের ভূখণ্ড ও জনপদের ওপর ইসলাম-বিদ্বেষী শক্তিসমূহ এবং যা এর আগে ও পরে মেধা ও হৃদয়ের ওপর এই বিশাল মাত্রার বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করছে।
এই পরিস্থিতি শাসক ও শাসিত নির্বিশেষে সকলের জন্যই উদ্ভূত ঝুঁকি মোকাবিলায় দায়িত্বশীল হওয়ার বিষয়টিকে অপরিহার্য করে তুলেছে। আর আল্লাহই সকল সৎ উদ্দেশ্যের সহায় এবং তিনিই সর্বদা আমার জন্য যথেষ্ট।
পরিষদের সহ-সভাপতি ‘প্রফেসর ডক্টর আব্দুল সবুর মারজুক’
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৭)
مقدمة الطبعة الأولىبسم الله الرحمن الرحيم
قال الله تعالى: شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لا إِلهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قائِماً بِالْقِسْطِ لا إِلهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (18) إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلامُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتابَ إِلَّا مِنْ بَعْدِ ما جاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْياً بَيْنَهُمْ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآياتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسابِ (19) فَإِنْ حَاجُّوكَ فَقُلْ أَسْلَمْتُ وَجْهِيَ لِلَّهِ وَمَنِ اتَّبَعَنِ وَقُلْ لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتابَ وَالْأُمِّيِّينَ أَأَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّما عَلَيْكَ الْبَلاغُ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبادِ (20) [آل عمران: 18 - 20].
ارتقاء البشر المادى، وهبوطهم الأدبى، وحاجتهم إلى الدين:إن من المعلوم اليقينى الثابت بالحواس أن علوم الكون المادية تثب فى هذا العصر وثوبا يشبه الطفور، وتؤتى من الثمار اليانعة بتسخير قوى الطبيعة للإنسان ما صارت به الدنيا كلها كأنها مدينة واحدة، وكأنّ أقطارها بيوت لهذه المدينة، وكأنّ شعوبها عشائر وفصائل لأمة واحدة فى هذه البيوت (الأقطار) يمكنهم أن يعيشوا فيها إخوانا متعاونين، سعداء متحابين، لو اهتدوا بالدين.
وإنّ من المعلوم اليقينى أيضا أن البشر يرجعون القهقرى فى الآداب والفضائل على نسبة عكسية مطّردة لارتقائهم فى العلوم المادية واستمتاعهم بثمراتها، فهم يزدادون إسرافا فى الرذائل، وجرأة على اقتراف الجرائم، وافتنانا فى الشهوات البهيمية، ونقض ميثاق الزوجية، وقطيعة وشائج الأرحام، وعقوق الوالدين، ونبذ هداية الأديان، حتى كادوا يفضّلون الإباحة المطلقة على كل ما يقيد الشهوات من دين وأدب وعرف وعقل بل رجع بعضهم إلى عيشة العرى فى أرقى ممالك أوروبا وأمريكا علما وحضارة، كما يعيش بعض بقايا الهمج السذج فى غابات إفريقية وبعض جزائر البحار النائية عن العمران.
وإنّ من المعلوم اليقينى أيضا أنّ الدول الكبرى لشعوب هذه الحضارة أشدّ جناية عليهم وعلى الإنسانية من جنايتهم على أنفسهم- بإغرائها أضغان التنافس بينهم، وباستعمالها جميع ثمرات العلوم ومنافع الفنون فى الاستعداد للحرب العالمة التى تدمر فى أشهر أو أيام معدودة صروح العمران التى شيّدتها العصور الكثيرة، وتفنى الملايين فيها من غير المحاربين
প্রথম সংস্করণের ভূমিকাপরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
মহান আল্লাহ বলেন: আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দিয়েছেন), তিনি ন্যায়বিচারে সুপ্রতিষ্ঠিত; তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় (১৮)। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দ্বীন হলো ইসলাম; আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে জ্ঞান আসার পর কেবল পরস্পর বিদ্বেষবশতই তারা মতভেদ করেছিল। আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী (১৯)। অতঃপর তারা যদি তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তবে বলো: ‘আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও।’ আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদেরকে এবং নিরক্ষরদেরকে বলো: ‘তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ অতঃপর তারা যদি আত্মসমর্পণ করে, তবে তারা নিশ্চয়ই হেদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমার দায়িত্ব তো কেবল পৌঁছে দেওয়া; আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা (২০)। [আলে ইমরান: ১৮-২০]
মানবজাতির বস্তুগত উন্নতি, তাদের নৈতিক অধঃপতন এবং ধর্মের প্রয়োজনীয়তা:ইন্দ্রিয়লব্ধ নিশ্চিত প্রমাণের মাধ্যমে এটি সুনিশ্চিত যে, এই যুগে মহাজাগতিক বস্তুগত বিজ্ঞানগুলো উলম্ফনের ন্যায় দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। প্রকৃতির শক্তিকে মানুষের বশীভূত করার মাধ্যমে তা এমন পরিপক্ব ফল দান করছে, যার ফলে সমগ্র বিশ্ব আজ যেন একটি শহরে পরিণত হয়েছে। এর বিভিন্ন প্রান্ত যেন এই শহরেরই একেকটি কক্ষ, আর এর বিভিন্ন জাতি যেন এই ঘরগুলোতে (প্রান্তগুলোতে) বসবাসকারী একই উম্মতের বিভিন্ন শাখা ও গোত্র। তারা এখানে পরস্পর সহযোগী ভাই হিসেবে সুখী ও প্রেমময় জীবন যাপন করতে পারত, যদি তারা ধর্মের মাধ্যমে হেদায়েত প্রাপ্ত হতো।
এটিও সুনিশ্চিতভাবে জানা যে, মানুষ তাদের বস্তুগত বিজ্ঞানের উন্নতি এবং এর সুফল ভোগের ঠিক বিপরীত অনুপাতে নৈতিকতা ও গুণাবলির ক্ষেত্রে ক্রমাগত পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ছে। তারা পাপাচারের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন, অপরাধ সংঘটনে দুঃসাহস, পাশবিক কামলিপ্সার বিচিত্র প্রকাশ, বৈবাহিক অঙ্গীকার ভঙ্গ, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি তারা ধর্মের দিকনির্দেশনা বর্জন করছে, যা প্রায় সব ধরনের ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও যৌক্তিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাচারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি জ্ঞান ও সভ্যতায় অত্যন্ত উন্নত ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু রাষ্ট্রে কিছু মানুষ পুনরায় নগ্ন জীবন যাপনে ফিরে গেছে, যেমনটি আফ্রিকার জঙ্গলে বা লোকালয় থেকে দূরে সমুদ্রের নির্জন দ্বীপে বসবাসকারী আদিম অসভ্য মানুষরা জীবন যাপন করে।
এটিও সুনিশ্চিতভাবে জানা যে, এই সভ্যতার জাতিগুলোর বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহ তাদের নিজেদের এবং মানবতার প্রতি যে অপরাধ করছে, তা সাধারণ মানুষের নিজেদের প্রতি করা অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ। তারা পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে এবং বিজ্ঞানের সকল অর্জন ও শিল্পের সকল সুফলকে এমন এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যবহার করছে, যা দীর্ঘ যুগ ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার সুউচ্চ প্রাসাদগুলোকে মাত্র কয়েক মাস বা কয়েক দিনে ধূলিসাৎ করে দেবে এবং এতে যুদ্ধরত সৈন্য ছাড়াও লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৮)
كالنساء والأطفال والشيوخ، وبصرفها معظم ثروات شعوبها فى هذه السبل، وفى سبيل ظلمهم للشعوب الضعيفة التى ابتليت بسلطانها، وسلبها لثروتهم وحريتهم فى دينهم ودنياهم. فالعالم البشرىّ كلّه فى شقاء من سياسة هذه الدول الباغية الخبيثة الطويّة. وكل ما عقد من المؤتمرات لدرء أخطارها لم يزد نارها إلا استعارا، ولو حسنت نياتها وأنفقت هذه الملايين التى تسلبها من مكاسب شعوبها وغيرهم فى سبيل الإصلاح الإنسانى العام لبلغ البشر بها أعلى درجات الثراء والرخاء.
كل ما ذكر معلوم باليقين، فهو حق واقع ما له من دافع.
وإن من المعلوم من استقراء تاريخ هذه الحضارة المادية أن هذه الشرور كانت لازمة لها، ونمت بنمائها، فكان هذا برهانا على أنّ الفنون والعلوم البشرية المحضة غير كافية لجعل البشر سعداء فى حياتهم الدنيا، فضلا عن سعادتهم فى الحياة الآخرة، وإنما تتم السعادة لهم بهداية الدين، فالإنسان مدنّى الطبع، ومتديّن بالطبع، أو بالفطرة كما يقول الإسلام.
من أجل ذلك فكّر بعض عقلاء أوروبا وغيرهم فى اللجوء إلى هداية الدين وأنه هو العلاج لأدواء هذه الحضارة المادية والترياق لسمومها، وتمنوا لو يبعث فى الغرب أو فى الشرق نبىّ جديد بدين جديد يصلح الله بهدايته فسادها، لأنّ الأديان المعروفة لهم لا تصلح لهذا العصر وقد فسر حال جميع أهلها «1»، وكان من يسمون دينهم دين المحبة، مصداقا لقول الله تعالى: فَأَغْرَيْنا بَيْنَهُمُ الْعَداوَةَ وَالْبَغْضاءَ إِلى يَوْمِ الْقِيامَةِ [المائدة: 14].
بيد أنّ هؤلاء المفكرين لا يعرفون حقيقة دين القرآن، وهو الدين الإلهى العام، والمانع لهم من معرفته ثلاثة حجب تحول دون النظر الصحيح فيه، وعدم فهمهم للقرآن كما يجب أن يفهم، فأما الحجب دونه فهذا بيانها بالإيجاز.
الحجب الثلاثة بين حقيقة الإسلام وشعوب الإفرنج:(الحجاب الأول): الكنيسة؛ أو الكنائس التى عادته منذ بلغتها دعوته، وطفقت تصوره بصور مشوهة باطلة، بدعاية عامة فيها من افتراء الكذب وأقوال الزور والبهتان ما لم يعهد مثله فى أهل ملة من البشر فى زمن من الأزمان، وألفت فى ذلك من الكتب والرسائل، والأغانى والأناشيد والقصائد، ما يعرف بطلانه كل مؤرخ مطلع على الحقائق، ثم إنها جعلت تشويهه ووجوب معاداته ركنا من أركان التربية والتعليم فى جميع مدارسها والمدارس
--------------------------------------------
যেমন নারী, শিশু ও বৃদ্ধগণ; এবং তাদের জনগণের অধিকাংশ সম্পদ এই পথগুলোতে এবং সেই দুর্বল জাতিগুলোর ওপর জুলুম করার পথে ব্যয় করার মাধ্যমে যারা তাদের কর্তৃত্বের শিকারে পরিণত হয়েছে এবং তাদের সম্পদ ও তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। অতএব সমগ্র মানবজাতি এই জালিম ও অশুভ অভিসন্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতির কারণে চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। তাদের বিপদ প্রতিরোধের জন্য যত সম্মেলনই অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা তাদের অগ্নিকে কেবল আরও প্রজ্জ্বলিতই করেছে। যদি তাদের নিয়ত সৎ হতো এবং তারা তাদের জনগণের উপার্জিত এই লক্ষ লক্ষ মুদ্রা—যা তারা অন্যদের থেকে ছিনিয়ে নেয়—তা যদি সাধারণ মানবীয় সংস্কারের পথে ব্যয় করত, তবে মানুষ এর মাধ্যমে সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার উচ্চতর সোপানে পৌঁছাতে পারত।
যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে (باليقين) পরিজ্ঞাত; সুতরাং এটি এক ধ্রুব সত্য, যার কোনো খণ্ডন নেই।
এবং এই জড়বাদী সভ্যতার ইতিহাসের পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি সুবিদিত যে, এই অনিষ্টসমূহ এর জন্য অপরিহার্য ছিল এবং এর প্রবৃদ্ধির সাথেই তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি এই বিষয়ের একটি অকাট্য প্রমাণ যে, বিশুদ্ধ মানবীয় কলা ও বিজ্ঞান মানুষকে তাদের পার্থিব জীবনে সুখী করার জন্য যথেষ্ট নয়, তাদের পরকালীন জীবনের সৌভাগ্যের কথা তো বলাই বাহুল্য। বরং মানুষের জন্য সুখ কেবল দ্বীনের হিদায়াতের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়। কেননা মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক এবং স্বভাবগতভাবেই ধর্মপরায়ণ, অথবা স্বভাবজাত প্রকৃতি (فطرة) অনুযায়ী, যেমনটি ইসলাম বলে থাকে।
এই কারণেই ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের কিছু প্রাজ্ঞ ব্যক্তি দ্বীনের হিদায়াতের আশ্রয় নেওয়ার কথা চিন্তা করেছেন এবং মনে করেছেন যে, এটিই এই জড়বাদী সভ্যতার ব্যাধিগুলোর প্রতিকার ও বিষের মহৌষধ। তারা কামনা করতেন যদি পশ্চিমে বা পূর্বে কোনো নতুন হিদায়াতসহ নতুন কোনো নবীর আবির্ভাব হতো, যার হিদায়াতের মাধ্যমে আল্লাহ এর বিপর্যয় সংশোধন করে দিতেন। কারণ তাদের পরিচিত ধর্মসমূহ এই যুগের জন্য উপযুক্ত নয় এবং তাদের সকল অনুসারীদের অবস্থা এর ব্যাখ্যা প্রদান করেছে, যারা তাদের ধর্মকে ভালোবাসার ধর্ম বলে অভিহিত করত, তারা মহান আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবদৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে: "আমি তাদের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত শত্রুতা ও ঘৃণা প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছি" [আল-মায়িদাহ: ১৪]।
কিন্তু এই চিন্তাবিদগণ কুরআনের দ্বীনের প্রকৃত স্বরূপ জানেন না, যা হলো একটি সর্বজনীন ঐশী দ্বীন। এটি সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান লাভের পথে তিনটি পর্দা অন্তরায় হয়ে আছে যা সঠিক পর্যালোচনায় বাধা প্রদান করে এবং কুরআনের মর্ম যথাযথ অনুধাবনে বিঘ্ন ঘটায়। সেই পর্দাগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো।
ইসলামের প্রকৃত রূপ ও ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যবর্তী তিনটি পর্দা:(প্রথম পর্দা): চার্চ; অথবা সেই গির্জাগুলো যারা ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর সময় থেকেই এর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আসছে এবং একে বিকৃত ও ভিত্তিহীন রূপে চিত্রিত করতে শুরু করেছে। তারা এমন সাধারণ অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়েছে যাতে এমন সব ডাহা মিথ্যা ও অপবাদের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে যার নজির কোনো যুগে কোনো ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দেখা যায়নি। তারা এ বিষয়ে এমন সব কিতাব, পুস্তিকা, গান, সংগীত ও কবিতা রচনা করেছে যার অসারতা সত্য সম্পর্কে অবগত প্রত্যেক ঐতিহাসিকের কাছে স্পষ্ট। অতঃপর তারা এই বিকৃতি সাধন ও এর আবশ্যিক শত্রুতাকে তাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও দীক্ষার একটি অন্যতম স্তম্ভে পরিণত করেছে।
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৯)
التى يتولى خريجوها تعليم الناس فيها؛ فما من أحد يتعلم فيها من أتباعها إلا وهو يعتقد أن جميع المسلمين أعداء للمسيح والمسيحيين كافة. فيجب عليه عداوتهم ما استطاع.
والحق الواقع أن الإسلام هو صديق المسيحية المتمم لهدايتها، وأن محمدا صلى الله عليه وسلم هو الفارقليط روح الحق الذى بشر به المسيح عليه السلام «1».
(الحجاب الثانى): رجال السياسة الأوروبية؛ فإنهم ورثوا عداوة الإسلام من الكنيسة وتلقوا مفترياتها فى الطعن عليه بالقبول، وضاعف هذه العداوة له والضراوة بحرية طمعهم فى استعباد شعوبه واستعمار ممالكهم.
وإذا كان رجال الدين قد ملئوا الدنيا كذبا وافتراء على الإسلام- ومن أسس الدين الصدق وقول الحق والحب والرحمة والعدل والإيثار- فأى شىء يكثر فعله على رجال السياسة وأساس بنائها الكذب، وأقوى أركانها الجور والظلم والعدوان، والقسوة والإثرة والخداع؟ وهو ما نراه بأعيننا ونسمع أخباره بآذاننا كلّ يوم فى المستعمرات الأوروبية بل نحن نعلم أنّ سبب افتراء رجال الدين على الإسلام هو السياسة لا الدين نفسه، وأن قاعدتهم المشهورة (الغاية تبرّر الوسيلة) سياسية لا إنجيلية، فما كان لدين أن يبيح الجرائم والرذائل باتخاذها وسيلة لمنفعة أهله وإن كانت دينية.
(الحجاب الثالث): سوء حال المسلمين فى هذه القرون الأخيرة؛ فقد فسدت حكوماتهم وشعوبهم، واستحوذ عليهم الجهل بحقيقة دينهم ومصالح دنياهم، حتى صاروا حجة لأعدائهم فيهما على أنه لا خير فيهم ولا فى دينهم، وأمكن هؤلاء الأعداء أن يفتنوا بهذه الحجة الداحضة أكثر من يتخرج فى مدارسهم السياسية الإلحادية، والدينية التنصيرية، من أبناء ملتهم أو جلدتهم ومن غيرهم، حتى نابت المسلمين أنفسهم أيضا، وهم يختارون من هذه النابتة الأفراد التى تتولى أعمال الحكومة والتعاليم فى مدارسها فى كل قطر خاضع لنفوذ دولهم الفعلى بأى اسم من أسمائه. من فتح وامتلاك وحماية واحتلال وانتداب أو لنفوذهم السياسى والتعليمى، كما فعلوا فى بلاد الترك وإيران، لتساعدهم على هدم كل شىء إسلامى فيها من اعتقاد وأدب وتشريع.
وقد كان السيد جمال الدين الأفغانى- حكيم الإسلام وموقظ الشرق- يرى أن هذا الحجاب أكثف الحجب الحائلة بين شعوب أوروبا الحرة والإسلام، ونقل لى الثقة عنه أنه
--------------------------------------------
যার স্নাতকরা মানুষের মাঝে শিক্ষা প্রচার করে; এর অনুসারীদের মধ্যে এমন কেউ সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করে না যে বিশ্বাস করে না যে সকল মুসলিমই মসীহ এবং সকল খ্রিস্টানদের শত্রু। তাই তার ওপর আবশ্যিক হয়ে পড়ে সাধ্যানুযায়ী তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা।
আর প্রকৃত সত্য হলো ইসলাম খ্রিস্টধর্মের বন্ধু এবং এর হেদায়েতের পূর্ণতাদানকারী। আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হলেন সেই 'পারাক্লীত' বা সত্যের আত্মা, যার সুসংবাদ মসীহ (আলাইহিস সালাম) প্রদান করেছিলেন (১)।
(দ্বিতীয় অন্তরায়): ইউরোপীয় রাজনীতিবিদরা; তারা গির্জা থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছে এবং ইসলামের ওপর অপবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে গির্জার মিথ্যাচারগুলো সানন্দে গ্রহণ করেছে। আর তাদের এই শত্রুতা ও হিংস্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে মুসলিম জাতিগুলোকে দাস বানানোর এবং তাদের দেশগুলো উপনিবেশ করার সীমাহীন লোভ।
যদি ধর্মীয় নেতারা ইসলাম সম্পর্কে মিথ্যা এবং অপবাদে পৃথিবী পূর্ণ করে ফেলে থাকেন—অথচ ধর্মের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো সততা, সত্যবাদিতা, ভালোবাসা, দয়া, ন্যায়বিচার এবং ত্যাগ—তবে রাজনীতিবিদদের পক্ষে এ ধরনের কাজ করা তো আরও স্বাভাবিক, যাদের রাজনীতির ভিত্তিই হলো মিথ্যা, আর যার শক্তিশালী স্তম্ভগুলো হলো অবিচার, জুলুম, সীমালঙ্ঘন, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা ও প্রতারণা। যা আমরা আমাদের চোখে দেখছি এবং প্রতিদিন ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতে আমাদের কানে খবর শুনছি। বরং আমরা জানি যে ইসলাম সম্পর্কে ধর্মীয় নেতাদের অপবাদের কারণ হলো রাজনীতি, ধর্ম নিজে নয়। আর তাদের সুপরিচিত নীতি (উদ্দেশ্য উপায়কে বৈধ করে) এটি রাজনৈতিক নীতি, ইঞ্জিলের নীতি নয়। কারণ কোনো ধর্মই অপরাধ ও মন্দ কাজকে তার অনুসারীদের উপকারের মাধ্যম হিসেবে বৈধ করতে পারে না, এমনকি তা ধর্মীয় স্বার্থে হলেও।
(তৃতীয় অন্তরায়): সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা; তাদের সরকার ও জনগণ কলুষিত হয়ে পড়েছে এবং তাদের ওপর নিজেদের ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ ও পার্থিব স্বার্থ সম্পর্কে অজ্ঞতা জেঁকে বসেছে। এমনকি তারা তাদের শত্রুদের জন্য একটি প্রমাণে পরিণত হয়েছে যে, তাদের মধ্যে বা তাদের ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই। শত্রুরা এই অসার যুক্তির মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক নাস্তিক্যবাদী এবং ধর্মীয় মিশনারি বিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক হওয়া নিজ জাতির বা অন্য জাতির সন্তানদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশকেও তারা প্রভাবিত করেছে। তারা এই নতুন প্রজন্ম থেকে এমন ব্যক্তিদের বেছে নেয় যারা তাদের প্রকৃত প্রভাবাধীন প্রতিটি অঞ্চলে সরকারি কাজ ও শিক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে—তা বিজিত এলাকা, মালিকানাভুক্ত, সংরক্ষিত অঞ্চল, দখলকৃত বা ম্যান্ডেটভুক্ত যে নামেই হোক না কেন। অথবা তাদের রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত প্রভাবের মাধ্যমে এটি করে, যেমনটি তারা তুরস্ক ও ইরানে করেছে, যাতে তারা আকিদা, আদব ও শরিয়তসহ প্রতিটি ইসলামী বিষয় ধ্বংস করতে তাদের সাহায্য করে।
সায়্যিদ জামালুদ্দিন আফগানি—ইসলামের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এবং প্রাচ্যের জাগরণকারী—মনে করতেন যে, এই অন্তরায়টিই ইউরোপের মুক্তিকামী জাতি এবং ইসলামের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা। আর একজন নির্ভরযোগ্য (ثقة) ব্যক্তি তাঁর থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি...
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১০)
قال: «إذا أردنا أن ندعو أحرار أوروبا إلى ديننا فيجب علينا أن نقنعهم أولا أننا لسنا مسلمين، فإنهم ينظرون إلينا من خلال القرآن هكذا- ورفع كفيه وفرج بين أصابعهما- فيرون وراءه أقواما فشا فيهم الجهل والتخايل والتواكل
… فيقولون لو كان هذا الكتاب حقّا مصلحا لما كان أتباعه كما نرى».
لا ننكر أن بعض أحرار الإفرنج قد عرفوا من تاريخ الإسلام ما لم يعرفه أكثر المسلمين، فانصفوا فيما كتبوا عنه من تواريخ خاصة، ومن مباحث عامة فى العلم والحضارة والدين، وأن منهم من اهتدى به عن بصيرة وبينة؛ ولكن ما كتبه هؤلاء كلهم لم يكن مبينا لحقيقته كلها، ولم يطلع عليه إلا القليل من شعوبهم، وكان جل تأثيره فى أنفس من اطلعوا عليه أن بعض الناس أخطئوا فى بيان تاريخ المسلمين فانتقد عليهم آخرون، فهو لم يهتك الحجب الثلاثة المضروبة بينهم وبين حقيقة الإسلام.
وأما عدم فهمهم للقرآن كما يجب- وأعنى به الفهم الذى تعرف به حقيقة إعجازه وتشريعه وأدبه وإصلاحه، وكونه هو دين الله الأخير الكامل الذى لا يحتاج البشر معه إلى كتاب آخر ولا إلى نبى آخر- فلعله أربعة أسباب خاصة، وراء تلك الحجب العامة وهى:
الأسباب العائقة عن فهم الأجانب للقرآن:
(أولها): جهل بلاغة القرآنجهل بلاغة اللغة العربية التى بلغ القرآن فيها ذروة الإعجاز فى أسلوبه ونظمه وتأثيره فى أنفس المؤمنين والكافرين به جميعا، فأحدث بذلك ما أحدث من الثورة الفكرية والاجتماعية فى العرب، والانقلاب العام فى البشر- كما شرحناه فى هذا الكتاب- وقد كان من إكبار الناس لهذه البلاغة أن جعلها أكثر علماء المسلمين موضوع تحدّى البشر بالقرآن دون غيرها من وجوه إعجازه، وجعلوا عجز العربى الخالص عن معارضته بها، ثم عجز المولدين الذين جمعوا بين ملكة العربية العملية وملكة فلسفتها من فنون النحو والبيان، هو الحجة الكبرى على نبوة محمد صلى الله عليه وسلم، وقد فقد العرب الملكتين منذ قرون كثيرة إلا أفرادا متفرقين منهم، فما القول فى غيرهم؟ فعلماء المسلمين فى هذه القرون يحتجّون بعجز أولئك ولا يدّعون أنهم يدركون سرّ هذا الإعجاز أو يذوقون طعمه؛ بل قال بعض علماء النظر المتقدمين منهم: إن الإعجاز واقع غير معقول السبب، فما هو إلا أن الله تعالى صرف النّاس عن معارضته بقدرته. والصواب أن منهم من حاول المعارضة فعجزوا، إذ ظنوا أن إعجازه بفواصل الآيات التى تشبه السجع فقلدوها فافتضحوا، ومن متأخرى هؤلاء
তিনি বলেছেন: «আমরা যদি ইউরোপের মুক্তমনা মানুষদের আমাদের দ্বীনের প্রতি আহ্বান করতে চাই, তবে আমাদের প্রথমে তাদের এই বিষয়ে আশ্বস্ত করতে হবে যে আমরা (প্রকৃত) মুসলিম নই। কেননা তারা আমাদের বিচার করে কুরআনের চশমা দিয়ে এভাবে—তিনি তাঁর দুই হাতের তালু তুলে ধরলেন এবং আঙুলগুলোর মাঝে ফাঁক করলেন—অতঃপর তারা এর আড়ালে এমন সব জনগোষ্ঠীকে দেখতে পায় যাদের মধ্যে অজ্ঞতা, দম্ভ এবং পরনির্ভরশীলতা ছড়িয়ে পড়েছে
… তখন তারা বলে, যদি এই কিতাবটি সত্যিই সত্য ও সংস্কারক হতো, তবে এর অনুসারীদের অবস্থা এমন হতো না যেমনটা আমরা দেখছি।»
আমরা অস্বীকার করি না যে, ইউরোপের কিছু মুক্তমনা মানুষ ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে এমন অনেক কিছু জেনেছেন যা অধিকাংশ মুসলিমও জানে না। ফলে তারা ইসলামের বিশেষ ইতিহাস এবং বিজ্ঞান, সভ্যতা ও ধর্ম বিষয়ক সাধারণ গবেষণাগুলোতে ইনসাফ প্রদর্শন করেছেন। এমনকি তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যারা এর মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি ও সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে হেদায়েত লাভ করেছেন। কিন্তু তাদের এই লেখাগুলোর কোনোটিই ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সত্যকে উন্মোচিত করতে পারেনি এবং তাদের জাতির খুব সামান্য অংশই তা পড়ার সুযোগ পেয়েছে। যারা তা পড়েছেন তাদের ওপর এর মূল প্রভাব ছিল এই যে, কিছু লোক মুসলিমদের ইতিহাস বর্ণনায় ভুল করেছেন এবং অন্যরা তাদের সেই ভুলের সমালোচনা করেছেন। অর্থাৎ এটি তাদের এবং ইসলামের প্রকৃত সত্যের মাঝে ঝুলে থাকা তিনটি পর্দার অন্তরায়কে ছিন্ন করতে পারেনি।
আর তাদের পক্ষ থেকে কুরআনকে যথাযথভাবে বুঝতে না পারা—যদ্দ্বারা আমি সেই উপলব্ধিকে বোঝাচ্ছি যার মাধ্যমে এর অলৌকিকত্ব, বিধান, শিষ্টাচার ও সংস্কারের প্রকৃত রূপ অনুধাবন করা যায়, এবং এটি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীন যার উপস্থিতিতে মানবজাতির আর কোনো কিতাব বা নবীর প্রয়োজন নেই—তার মূলে সম্ভবত সেই সাধারণ প্রতিবন্ধকতাগুলোর বাইরে চারটি বিশেষ কারণ রয়েছে, যেগুলো হলো:
বিদেশিদের কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে অন্তরায়সমূহ:
(প্রথমত): কুরআনের অলঙ্কারশাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাআরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞতা, যাতে কুরআন তার রচনাশৈলী, বিন্যাস এবং মুমিন ও কাফির সকলের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে অলৌকিকত্বের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছে। এর মাধ্যমেই আরবে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিপ্লব এবং মানবজাতির মাঝে সেই আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল—যেমনটি আমরা এই কিতাবে ব্যাখ্যা করেছি। এই অলঙ্কারশাস্ত্রের মাহাত্ম্যের কারণেই অধিকাংশ মুসলিম আলিম কুরআনের অলৌকিকত্বের অন্যান্য দিকের তুলনায় একেই মানবজাতির প্রতি কুরআনের চ্যালেঞ্জের মূল বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তারা বিশুদ্ধ আরবদের এর মোকাবিলায় অক্ষমতাকে এবং পরবর্তীতে যারা আরবি ভাষার ব্যবহারিক দক্ষতা ও এর ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রের দর্শনের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, সেই সব অনারব বংশোদ্ভূত আরবিভাষী পণ্ডিতদের অপারগতাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়তের প্রধান দলিল হিসেবে গণ্য করেছেন। আরবরা বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই উভয় দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে, কেবল গুটিকয়েক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ছাড়া। সুতরাং অন্যদের অবস্থা কী হতে পারে? এই শতাব্দীর মুসলিম আলিমগণ সেই পূর্ববর্তীদের অক্ষমতাকেই দলিল হিসেবে পেশ করেন, কিন্তু তারা নিজেরা এই অলৌকিকত্বের রহস্য অনুধাবন বা এর স্বাদ আস্বাদনের দাবি করেন না। বরং পূর্ববর্তী কিছু তাত্ত্বিক আলিম বলেছেন: এই অলৌকিকত্ব এমন এক বাস্তবতা যার কারণ বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়; মূলত আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে মানুষকে এর মোকাবিলা করা থেকে বিরত রেখেছেন। তবে সঠিক কথা হলো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এর মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে; কারণ তারা মনে করেছিল যে এর অলৌকিকত্ব মূলত আয়াতগুলোর অন্ত্যমিলের মাঝে নিহিত যা অনেকটা ছন্দোবদ্ধ গদ্যের মতো। ফলে তারা তার অনুকরণ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে। আর এদের মধ্যে যারা পরবর্তী যুগের...
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১১)
من ادعى النبوة كمسيح الهند القاديانى الدجال، ومن ادعى الألوهية (كالبهاء) وقد أخفى أتباع هذا كتابه الملقب بالأقدس؛ لئلا يفتضحوا به بين الناس وأضعف منه وأسخف بيان أستاذه الباب.
(ثانيها): قصور ترجمات القرآن وضعفهاأنّ ترجمات القرآن التى يعتمد عليها علماء الإفرنج فى فهم القرآن كلها قاصرة على أداء معانيه التى تؤديها عباراته العليا وأسلوبه المعجز للبشر، وهى إنما تؤدى بعض ما يفهمه المترجم له منهم إن كان يريد بيان ما يفهمه، وإنه لمن الثابت عندنا أن بعضهم تعمّدوا تحريف كلمه عن مواضعه، على أنه قلما يكون فهمهم تاما صحيحا، ويكثر هذا فيمن لم يكن به مؤمنا، بل يجتمع لكل منهم القصوران كلاهما: قصور فهمه، وقصور لغته، وقد اعترف لى ولغيرى بهذا مستر (محمد) مارماديوك بكتل الذى ترجمه بالإنكليزية وجاء مصر منذ ثلاث سنوات «1» فعرض على بعض علماء العربية المتقدمين للغة الإنكليزية ما رأى أنه عجز عن أداء معناه منه، وصحح بمساعدتهم ماذا كرههم فيه «2».
واعترف بذلك قبله الدكتور (ماردريس) المستشرق الفرنسى الذى كلفته وزارتا الخارجية والمعارف الفرنسيتان لدولته ترجمة 62 سورة من السور الطوال والمئين والمفصل التى لا تكرار فيها ففعل، فقد قال فى مقدمة ترجمته التى صدرت سنة 1926 ما معناه بالعربية:
«أمّا أسلوب القرآن فإنه أسلوب الخالق جلّ وعلا، فإنّ الأسلوب الذى ينطوى على كنه الكائن الذى صدر عنه هذا الأسلوب لا يكون إلا إلهيا، والحق الواقع أن أكثر الكتّاب ارتيابا وشكّا قد خضعوا لسلطان تأثيره (فى الأصل- لتأثير سحره- يعنى تأثيره الذى يشبه السحر فى كونه لا يعرف له سبب عادى) وأن سلطانه على ثلاث مائة مليون من المسلمين المنتشرين على سطح المعمورة لبالغ الحد الذى جعل أجانب «المبشرين» يعترفون بالإجماع بعدم إمكان إثبات حادثة واحدة محققة ارتد فيها أحد المسلمين عن دينه إلى الآن «3».
ذلك أن هذا الأسلوب الذى طرق فى أول عهده آذان البدو «4» كان نثرا جد طريف،
--------------------------------------------
যারা নবুওয়াতের দাবি করেছে যেমন ভারতের মসিহ কাদিয়ানী দাজ্জাল (الدجال), এবং যারা খোদায়িত্বের দাবি করেছে (যেমন বাহাউল্লাহ)। তার অনুসারীরা তার 'আল-আকদাস' নামক কিতাবটি গোপন করে রেখেছে যাতে তারা মানুষের সামনে অপদস্থ না হয়। আর তার চেয়েও অধিকতর দুর্বল (أضعف) এবং হাস্যকর হলো তার উস্তাদ বাবের 'বয়ান' (বিবৃতি)।
(দ্বিতীয়টি): কুরআনের অনুবাদসমূহের ত্রুটি ও সেগুলোর দুর্বলতা (ضعف)কুরআনের যেসব অনুবাদের ওপর ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ কুরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে নির্ভর করেন, সেগুলো কুরআনের সুউচ্চ শব্দাবলি এবং মানবজাতির জন্য অলৌকিক শৈলী যে অর্থ প্রকাশ করে তা ফুটিয়ে তুলতে পুরোপুরি অক্ষম। সেগুলো বড়জোর অনুবাদক তার থেকে যা বোঝেন তারই কিছু অংশ প্রকাশ করে—যদি তিনি তার উপলব্ধিকে ব্যক্ত করতে চান। আমাদের কাছে এটি সুনিশ্চিত যে, তাদের কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আল্লাহর কালামকে তার সঠিক স্থান থেকে বিকৃত করেছে। এছাড়া তাদের উপলব্ধি খুব কমই পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা এর প্রতি বিশ্বাসী নয় তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে। বরং তাদের মধ্যে উভয় ধরনের সীমাবদ্ধতাই লক্ষ্য করা যায়: বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতা। আমার কাছে এবং অন্যদের কাছে মিস্টার (মুহাম্মদ) মারমাডিউক পিকথল এটি স্বীকার করেছেন, যিনি কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এবং তিন বছর আগে মিশরে এসেছিলেন। তিনি ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী প্রাচীন আরবি ভাষাবিদদের কাছে এমন কিছু বিষয় উপস্থাপন করেন যা প্রকাশ করতে তিনি নিজেকে অক্ষম মনে করেছিলেন এবং তাদের সহযোগিতায় যেগুলোতে তিনি ভুল করেছিলেন সেগুলো সংশোধন করেছিলেন।
তার আগে ফরাসি প্রাচ্যবিদ ডক্টর (মারড্রিস) এটি স্বীকার করেছিলেন, যাকে তার দেশের পররাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কুরআনের পুনরাবৃত্তিহীন দীর্ঘ সূরাসমূহ, শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ (المئين) এবং মুফাসসাল (المفصل) সূরাসমূহ থেকে ৬২টি সূরা অনুবাদের দায়িত্ব প্রদান করেছিল এবং তিনি তা সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তার অনুবাদের ভূমিকায় তিনি যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হলো:
«কুরআনের শৈলী মূলত মহান স্রষ্টারই শৈলী। কারণ যে শৈলী সেই সত্তার সারসত্তা ধারণ করে যেখান থেকে তা নিঃসৃত হয়েছে, তা কেবল খোদায়ী হতে পারে। বাস্তবতা হলো, সর্বাধিক সংশয়বাদী ও সন্দেহপ্রবণ লেখকরাও এর প্রভাবের (মূল পাঠে রয়েছে—জাদুকরী প্রভাব—অর্থাৎ এমন প্রভাব যার কোনো সাধারণ জাগতিক কারণ জানা যায় না) কর্তৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করেছে। পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা ত্রিশ কোটি মুসলমানের ওপর এর প্রভাব এতই গভীর যে, বিদেশি 'মিশনারিরা' একযোগে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত এমন একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি যেখানে কোনো মুসলমান তার ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে (ارتد) বা মুরতাদ হয়েছে।
এর কারণ হলো এই শৈলীটি যখন তার সূচনালগ্নে মরুবাসীদের কানে পৌঁছেছিল, তখন তা ছিল অত্যন্ত চমৎকার এক গদ্য...
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১২)
يفيض جزالة فى اتساق نسق، متجانسا مسجعا، لفعله أثرا عميقا فى نفس كلّ سامع يفقه العربيّة. لذلك كان من الجهد الضائع غير المثمر أن يحاول الإنسان أداء تأثير هذا النثر البديع «الذى لم يسمع بمثله» بلغة أخرى، وخاصة اللغة الفرنسية الضيقة (التى لا سعة فيها للتعبير عن الشعور) المرثة «1» «التى لا تتنازل عن حقوقها» والقاسية. وزد على ذلك أن اللغة الفرنسية ومثلها جميع اللغات العصرية ليست لغة دينية، وما استعملت قط للتعبير عن الألوهية» أهـ.
ثم تكلم عن عنايته هو مدة تسع سنوات متتالية بمحاولة نقل شىء من القرآن إلى اللغة الفرنسية على شرط المحافظة على بلاغة الأصل، وتساءل هل أمكنه التغلب على هذه الصعوبة أم لا؟ يعنى أنه يشك فى ذلك.
(ثالثها): أسلوب القرآن المخالف لجميع أساليب الكلامإن أسلوب القرآن الغريب المخالف لجميع أساليب الكلام العربى وغيره، وطريقته فى مزج العقائد والمواعظ والحكم والأحكام والآداب بعضها ببعض فى الآيات المتفرقة فى الصور- وهو ما بينّا سببه وحكمته فى هذا الكتاب- وقد كان حائلا دون جمع كبار علماء المسلمين من المفسرين وغيرهم لكلّ نوع من أنواع علومه ومقاصده فى باب خاص به. كما فعلوا به فى آيات الأحكام العملية من العبادات والمعاملات. دون القواعد والأصوب الاجتماعية والسياسية والمالية التى يرى القارئ نموذجها فى هذا الكتاب. إذ لم يكونوا يشعرون بالحاجة إليها كما نشعر فى هذا العصر.
وقد عنى بعض الإفرنج «2» بوضع كتاب باللغة الفرنسية جمع فيه آيات القرآن بحسب معانيها، ووضع كلا منها فى باب أو أبواب خاصة بقدر فهمه، ولكنه أخطأ فى كثير من هذه المعانى وقصر فى بعض مما علمه، وما جهله منها عظيم، ذلك بأن أخذ القواعد والأصول العامة «3» من هذه الآيات يتوقف على العلم بسيرة النبى صلى الله عليه وسلم وسنته فى بيان القرآن وتنفيذه لشرعه، وآثار خلفائه وعلماء أصحابه من بعده، كما يعلم من يراجع فى ذلك الكتاب الآيات الدالة على ما بيناه فى كتابنا هذا من مقاصد القرآن بالاختصار، وما فصلناه منها فى تفسير المنار.
--------------------------------------------
এটি সুশৃঙ্খল বিন্যাসে গাম্ভীর্যে ভরপুর, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ছন্দময়, যা আরবি ভাষা বোঝেন এমন প্রত্যেক শ্রোতার অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। এই কারণে, এই অপূর্ব গদ্যের প্রভাব—যা "এর আগে আর কখনও শোনা যায়নি"—অন্য ভাষায় রূপান্তর করার চেষ্টা করা একটি নিরর্থক ও নিষ্ফল শ্রম। বিশেষত সংকীর্ণ ফরাসি ভাষায় (যাতে অনুভূতি প্রকাশের প্রশস্ততা নেই), যা অত্যন্ত কঠোর এবং স্বীয় অধিকার থেকে বিচ্যুত হয় না। তদুপরি, ফরাসি ভাষা এবং অনুরূপ সকল আধুনিক ভাষাই ধর্মীয় ভাষা নয়, এবং এগুলো কখনোই ঈশ্বরত্ব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়নি।
অতঃপর তিনি টানা নয় বছর ধরে মূলের অলঙ্কারশাস্ত্রীয় মান বজায় রাখার শর্তে কুরআনের কিছু অংশ ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করার বিষয়ে তার নিজের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, তিনি এই অসুবিধা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন কি না? অর্থাৎ, তিনি এ বিষয়ে সন্দিহান।
(তৃতীয়ত): কুরআনের রচনাশৈলী যা বাকরীতির সকল পদ্ধতির বিপরীতকুরআনের এই অনন্য রচনাশৈলী, যা আরবি এবং অন্যান্য সকল বাকরীতির পরিপন্থী, এবং বিভিন্ন সূরার ছড়িয়ে থাকা আয়াতগুলোতে আকিদা (عقيدة), উপদেশ, প্রজ্ঞা, বিধান ও শিষ্টাচারকে একে অপরের সাথে সংমিশ্রণ করার পদ্ধতি—যার কারণ ও রহস্য আমরা এই কিতাবে বর্ণনা করেছি—তা তাফসিরবিদ ও অন্যান্য বড় বড় মুসলিম আলেমদের জন্য কুরআনের প্রতিটি জ্ঞান ও উদ্দেশ্যকে আলাদা আলাদা বিশেষ অধ্যায়ে সংকলন করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমনটি তারা ইবাদত ও মুয়ামালাতের ব্যবহারিক বিধান সম্বলিত আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে করেছেন। তবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালা এবং মূলনীতিগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটি করেননি, যার নমুনা পাঠক এই কিতাবে দেখতে পাবেন। কারণ তারা সে সময়ে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা তেমন অনুভব করেননি, যেমনটি আমরা বর্তমান যুগে করছি।
কিছু ইউরোপীয় পণ্ডিত ফরাসি ভাষায় একটি কিতাব রচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি কুরআনের আয়াতগুলোকে তাদের অর্থ অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন এবং তার বোধগম্যতা অনুযায়ী সেগুলোকে এক বা একাধিক বিশেষ অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি এসব অর্থের অনেক ক্ষেত্রেই ভুল করেছেন এবং যা জানতেন তাতেও ত্রুটি করেছেন, আর যা তিনি জানেন না তা তো বিশাল। কারণ, এই আয়াতগুলো থেকে সাধারণ নীতিমালা ও মূলনীতিসমূহ গ্রহণ করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত এবং কুরআনের ব্যাখ্যা ও শরয়ি বিধান বাস্তবায়নে তাঁর সুন্নাহ (سنة) এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাগণ ও সাহাবি আলেমদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। যারা এই কিতাবটি দেখবেন তারা কুরআনের উদ্দেশ্যসমূহ সম্পর্কে আমাদের বর্ণিত আয়াতগুলো থেকে তা সংক্ষেপে জানতে পারবেন, যা আমরা আল-মানার তাফসিরে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৩)
(رابعها): الإسلام ليس له دولة ولا جماعاتأن الإسلام ليس له دولة تقيم القرآن وسنة رسوله صلى الله عليه وسلم بالحكم وتتولّى نشره بالعلم، ولا جماعات دينية تتولى بحمايتها الدعوة إليه بالحجة، وليس لأهله مجمع دينى علمى يرجع إليه فى بيان معانى القرآن وهدايته فى سياسة البشر ومصالحهم العامة التى تتجدد لهم بتجدد الحوادث ومخترعات العلوم والفنون وفيما
يتعارض بين العلوم ونصوص الدين، فيرجع إليها علماء الإفرنج فى استبانة ما خفى عليهم من نصوصهما.
وأعجب من هذا وأغرب أنّ المسلمين أنفسهم قد تركوا من بعد خير القرون الأولى أخذ دينهم من القرآن المنزل ومن بيان الرسول صلى الله عليه وسلم له كما أمره الله تعالى فيه بقوله: وَأَنْزَلْنا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ ما نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ [النحل: 44]، وما زالوا يهجرون الاهتداء بهما حتى استغنوا عنهما استغناءا تامّا بأخذ عقائدهم من كتب المتكلّمين، وأخذ أحكام عباداتهم ومعاملاتهم عن كتب علماء المذاهب غير المجتهدين، وهذه الكتب لا تقوم بها حجة الله تعالى على البشر، ولا سيما أهل هذا العصر الذى ارتقت فيه جميع العلوم العقلية والتشريعية، حتى صار المسلمون منا، يأخذون عنهم العلم كما كان أجدادهم يأخذون عنّا، بل فيها من آراء المتكلمين والفقهاء، وروايات الكذابين والضعفاء ما قد يعدّ حجة على الإسلام وأهله، كما أنّ سوء حال المسلمين فى فشو الجهل فى شعوبهم، والفساد والانحلال فى حكوماتهم، قد اتخذ حجة على دينهم، فصاروا فتنة للذين كفروا به «1».
وإذا كان هذا حال المسلمين فى فهم القرآن وهدايته، فكيف يكون حال الشعوب التى نشأت على أديان أخرى ألفتها، ولها رؤساء يربونهم عليها ويصدونهم عن غيرها؟ ودول حربية قد عادت الإسلام منذ بضع قرون، بما لو وجهوه إلى جبال لاندكت وزالت من الوجود، ولكنه دين الله الحىّ القيوم، فهو باق ما دام البشر فى الأرض لا يزول أو يزولون أجمعون.
هذه أظهر الأسباب لخفاء حقيقة الإسلام الكاملة على علماء الحضارة العصرية من الأجانب والمسلمين أيضا وتمنيهم لو يبعث نبىّ جديد بهداية إلهية عامة كافية لإصلاحهم.
--------------------------------------------
(চতুর্থত): ইসলামের কোনো রাষ্ট্র বা দল নেইবিষয়টি হলো এই যে, ইসলামের এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যা শাসনের মাধ্যমে কুরআন এবং তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে এর প্রসারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। নেই কোনো ধর্মীয় দল যারা অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে ইসলামের দিকে দাওয়াতের সুরক্ষা প্রদান করবে। আর এর অনুসারীদের জন্য নেই কোনো ধর্মীয়-বিদ্বৎ পরিষদ, যার কাছে কুরআনের অর্থের ব্যাখ্যা এবং মানবীয় রাজনীতি ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট হিদায়াতের বিষয়ে প্রত্যাবর্তন করা যাবে—যে জনস্বার্থ নতুন নতুন ঘটনা এবং বিজ্ঞান ও কলার উদ্ভাবনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। এমনকি বিজ্ঞান ও ধর্মীয় ভাষ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ সেই পরিষদের শরণাপন্ন হতে পারতেন, যেন তাদের কাছে এই দুইয়ের অস্পষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায়।
এর চেয়েও বিস্ময়কর ও আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, মুসলমানরা স্বয়ং প্রথম তিন শ্রেষ্ঠ যুগের পরে নাযিলকৃত কুরআন এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাখ্যা হতে তাদের দ্বীন গ্রহণ করা বর্জন করেছে; অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন: "আর আমি আপনার প্রতি যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি মানুষের জন্য তা স্পষ্ট করে দেন যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে।" [নাহল: ৪৪]। তারা এই দুই উৎস থেকে হিদায়াত লাভ করা পরিহার করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মুতাকাল্লিমদের কিতাব থেকে নিজেদের আকিদা গ্রহণ এবং অ-মুজতাহিদ মাযহাবের আলেমদের কিতাব থেকে ইবাদত ও মুয়ামালাতের বিধান গ্রহণের মাধ্যমে এই দুই উৎস থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী হয়ে গেছে। অথচ এই কিতাবগুলোর মাধ্যমে মানুষের ওপর আল্লাহ তাআলার কোনো দলিল প্রতিষ্ঠিত হয় না; বিশেষ করে এই যুগের মানুষের কাছে, যেখানে সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ও আইনি বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এমনকি এখন আমাদের মধ্য থেকে মুসলমানরা তাদের (পাশ্চাত্যের) কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করছে, যেমন তাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের কাছ থেকে গ্রহণ করত। অধিকন্তু, ঐসব কিতাবে মুতাকাল্লিম ও ফকিহদের এমন সব অভিমত এবং মিথ্যুক (كذابين) ও দুর্বল (ضعفاء) বর্ণনাকারীদের এমন সব বর্ণনা রয়েছে যা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। একইভাবে, মুসলিম জাতিগুলোর মধ্যে মূর্খতার বিস্তার এবং তাদের সরকারগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের কারণে মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা তাদের দ্বীনের বিরুদ্ধে এক যুক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে তারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য ফিতনা বা পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুরআনের উপলব্ধি ও হিদায়াতের ক্ষেত্রে যদি মুসলমানদের অবস্থাই এমন হয়, তবে সেই জাতিগুলোর অবস্থা কেমন হবে যারা অন্য ধর্মে বেড়ে উঠেছে যার সাথে তারা অভ্যস্ত এবং যাদের এমন সব নেতা রয়েছে যারা তাদের সেই ধর্মের ওপর গড়ে তোলে এবং অন্য ধর্ম থেকে বিমুখ করে রাখে? এছাড়া এমন সব যুদ্ধংদেহী রাষ্ট্র যারা কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামের বিরুদ্ধে এমন শত্রুতা পোষণ করে আসছে যে, তারা যদি পাহাড়ের দিকেও সেই শত্রুতা চালিত করত তবে তাও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে যেত। কিন্তু এটি হলো চিরঞ্জীব ও বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহর দ্বীন; তাই পৃথিবীতে যতক্ষণ মানুষ থাকবে, ততক্ষণ এটি টিকে থাকবে—হয় এটি বিলীন হবে না, না হয় সব মানুষই বিলীন হয়ে যাবে।
আধুনিক সভ্যতার বিদেশী পণ্ডিতদের কাছে এমনকি মুসলমানদের কাছেও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রকৃত রূপ আড়ালে থাকার এগুলোই প্রধান কারণ। আর এ কারণেই তারা কামনা করে যে, যদি তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত ও সার্বজনীন ঐশী হিদায়াতসহ নতুন কোনো নবীর আগমন ঘটত!
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৪)
ولما كان الإسلام هو دين الإنسانية العام الدائم الجامع لكلّ ما تحتاج إليه جميع الشعوب من الهداية الدينية والدنيوية، وجب على العقلاء الأحرار، والعلماء المستقلين الذين يتألمون من المفاسد المادية التى تفاقم شرها فى هذا العهد أن يعنوا بهتك تلك الحجب التى تحجبهم عن النظر فيه، وإزالة الموانع التى تعوقهم عن فهم حقيقته، وأن يدعوا جميع الشعوب إلى أخوته، وتكميل الحضارة الإنسانية بهدايته.
نتيجة هذه المقدمات:
بيان هذا الكتاب لحقيقة الإسلام بما تقوم به الحجة على جميع الأنامأما بعد فإنّنى أقدم لهم هذا الكتاب الذى صنفته فى إثبات (الوحى المحمدى) وكون القرآن كلام الله عز وجل، وكونه مشتملا على جميع ما يحتاج إليه البشر من الإصلاح الدينى والاجتماعى والسياسى والمالى والحربى، وقد أطلت فى بيان هذه المقاصد الأساسية بعض الإطالة؛ لأنها مثار جميع الفتن والمفاسد التى يشكو منها عقلاء هذا العصر، وأما توفية هذا الموضوع حقّه فلا يكون إلا فى سفر كبير أو أسفار يجمع فيها مقاصد القرآن كلها مع بيان حاجة البشر إليها فى أمور معاشهم ومعادهم، وهو ما أبينه فى تفسير المنار بإجمال قواعد كل سورة وأصولها فى آخر تفسيرها، بعد بيانها بالتفصيل فى شرح آياتها.
على أننى لم أكتب هذا البحث أول وهلة لهذا الغرض، وإنما بدأت منه بفصل استطرادى لتفسير آية: أَكانَ لِلنَّاسِ عَجَباً أَنْ أَوْحَيْنا إِلى رَجُلٍ مِنْهُمْ [يونس: 2] إلخ، من أول سورة يونس بينت به الدلائل القطعية على أنّ القرآن وحى من الله تعالى كان محمد صلى الله عليه وسلم يعجز كغيره من مثله بعلمه ولغته وتأثيره، وأنه ليس وحيا نفسيا نابعا من نفسه كما يزعم بعض الباحثين من الإفرنج وغيرهم، وأنه أعمّ وأكمل وأثبت من كلّ وحى كان قبله، وأن حجّته قائمة على المؤمنين بالوحى التشريعى وعلى غيرهم.
ثم بدا لى فى أثناء كتابته أن أجرّده فى كتاب خاص أدعو به شعوب الحضارة المادية من الإفرنج واليابان إلى الإسلام بتوجيهه أولا إلى علمائهم الأحرار. حتى إذا اهتدوا به تولوا دعوة شعوبهم ودولهم إليه بلغاتهم، ولهذا زدت فيه على ما كتبته فى التفسير، ووضعت له الخاتمة التى صرحت فيها بالدعوة وجعلتها هى المقصودة بالذات منه.
যেহেতু ইসলাম হলো মানবতার এক সাধারণ, চিরন্তন ও শাশ্বত ধর্ম, যা সকল জাতির জন্য প্রয়োজনীয় দ্বীনি ও পার্থিব হেদায়েতের সমাহার, তাই সেই সব স্বাধীনচেতা বিবেকবান ব্যক্তি এবং স্বতন্ত্র আলেমদের জন্য—যারা বর্তমান যুগে চরম আকার ধারণ করা বস্তুগত অনাচারের কারণে ব্যথিত—অপরিহার্য হলো সেই সব পর্দা উন্মোচনে সচেষ্ট হওয়া যা তাদেরকে ইসলামের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে বাধা দিচ্ছে। ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবনের অন্তরায়সমূহ দূর করা এবং সকল জাতিকে এর ভ্রাতৃত্বের দিকে আহ্বান করা এবং এর হেদায়েতের মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে পূর্ণতা দান করাও তাদের কর্তব্য।
এই ভূমিকাগুলোর ফলাফল:
সকল সৃষ্টির নিকট অকাট্য দলিল (حجة) হিসেবে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ বর্ণনায় এই কিতাবঅতঃপর, আমি তাদের নিকট এই কিতাবটি পেশ করছি যা আমি 'ওহীয়ে মুহাম্মাদী' প্রমাণে এবং কুরআন যে মহান আল্লাহর বাণী—সেই লক্ষ্যে রচনা করেছি। এতে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মানুষের যা কিছু প্রয়োজন, কুরআন তার সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করে। আমি এই মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণনায় কিছুটা দীর্ঘ আলোচনা করেছি; কারণ এই যুগের সচেতন মানুষ যেসব ফেতনা ও অনাচারের অভিযোগ করে থাকেন, এগুলোই হলো তার মূল উৎস। তবে এই বিষয়ের পূর্ণ হক আদায় করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন এক বা একাধিক বৃহৎ গ্রন্থে কুরআনের যাবতীয় উদ্দেশ্যসমূহকে মানবজীবনের ইহকাল ও পরকালের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে একত্রিত করা হবে। আর এটিই আমি তাফসীরুল মানার-এ প্রতিটি সূরার শেষে এর মূলনীতি ও ভিত্তিগুলো সংক্ষেপে বর্ণনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করছি, যার বিস্তারিত আলোচনা সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীরে ইতিপূর্বেই করা হয়েছে।
অবশ্য আমি প্রাথমিকভাবে এই উদ্দেশ্যে এই গবেষণাটি লিখিনি। বরং আমি সূরা ইউনুসের প্রথম দিকের আয়াত: "মানুষের জন্য কি এটি বিস্ময়কর যে, আমি তাদেরই মধ্য থেকে একজনের নিকট ওহী (وحي) পাঠিয়েছি?" [ইউনুস: ২] ইত্যাদির তাফসীরে একটি প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদ হিসেবে এটি শুরু করেছিলাম। যার মাধ্যমে আমি অকাট্য (قطعي) প্রমাণাদি দ্বারা ব্যাখ্যা করেছি যে, কুরআন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহী (وحي); মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জ্ঞান, ভাষা ও প্রভাবের দিক থেকে তাঁর সমকক্ষ অন্যদের মতোই এটি নিজে থেকে তৈরি করতে অক্ষম ছিলেন। এটি কোনো মনস্তাত্ত্বিক ওহী (وحي) নয় যা তাঁর নিজের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়েছিল—যেমনটি কিছু ইউরোপীয় গবেষক ও অন্যরা দাবি করে থাকেন। বরং এটি পূর্ববর্তী সকল ওহী (وحي) অপেক্ষা ব্যাপকতর, পূর্ণাঙ্গ এবং সুদৃঢ়। আর এর অকাট্য দলিল (حجة) বিধান সংবলিত ওহীতে (وحي) বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী—উভয় পক্ষের জন্যই প্রতিষ্ঠিত।
অতঃপর এটি লেখার মাঝপথে আমার কাছে মনে হলো যে, একে একটি স্বতন্ত্র কিতাব হিসেবে প্রকাশ করি, যার মাধ্যমে আমি বস্তুগত সভ্যতার জাতিসমূহ অর্থাৎ ইউরোপীয় ও জাপানিদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেব; আর প্রাথমিকভাবে আমি এটি তাদের মুক্তমনা পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। যাতে তারা এর মাধ্যমে হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ে নিজ নিজ ভাষায় তাদের জাতি ও রাষ্ট্রকে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। এই উদ্দেশ্যেই আমি তাফসীরে যা লিখেছিলাম তার সাথে এখানে আরও কিছু যোগ করেছি এবং এর জন্য একটি উপসংহার লিখেছি যেখানে আমি স্পষ্টভাবে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছি এবং একেই কিতাবটির মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছি।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৫)
ولو أنّنى قصدت هذا منذ بدأت بالكتابة لوضعت له ترتيبا آخر يغنينى عن بعض ما فيه من الاستطراد والتكرار بتحقيق كل مسألة فى موضعها، على أن بعض التكرار متعمد فيها، ولكننى كتبته فى أوقات متفرقة، وحالات بؤس وعسرة، لا أراجع عند موضوع منه ما قبله، ولا أعتمد إلا على ما أتذكره من القرآن نفسه على صعوبة استحضار المعانى المتفرقة فى سوره، وإلا بعض الأحاديث فى مواضعها من كتبها لتخريجها والثقة بصحتها، وإنى أحيل القارئ له فى كل إجمال على مراجعة تفسير المنار فى تفصيله، وفى كل إشكال على مراجعة محرره.
محمد رشيد رضا منشئ مجلة المنار وحررت هذه المقدمة فى ليلة ذكرى المولد المحمدى من شهر ربيع الأول سنة 1352 هـ (وهى على الأرجح عند المحدثين التاسع من هذا الشهر- ونشر الكتاب فى اليوم 12 منه- وهو يوم المولد النبوى المشهور).
***
আমি যদি লেখা শুরুর সময় থেকেই এটি লক্ষ্য করতাম, তবে আমি একে এমন এক ভিন্ন বিন্যাসে সাজাতাম যা আমাকে এতে বিদ্যমান কিছু অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা ও পুনরাবৃত্তি থেকে রেহাই দিত এবং প্রতিটি বিষয়কে তার স্ব স্ব স্থানে যথাযথভাবে যাচাই-বিশ্লেষণ করার সুযোগ করে দিত; যদিও এতে বিদ্যমান কিছু পুনরাবৃত্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে। তবে আমি এটি বিভিন্ন সময়ে এবং চরম দুর্দশা ও সংকটের মুহূর্তে লিখেছি, ফলে কোনো বিষয় লেখার সময় আমি তার পূর্ববর্তী অংশগুলো পুনরায় দেখার সুযোগ পাইনি। এই কাজে আমি পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ থেকে যা আমার স্মরণে ছিল তার বাইরে অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করিনি, যদিও কুরআনের বিভিন্ন সূরায় ছড়িয়ে থাকা অর্থসমূহকে একত্রে স্মরণে আনা বেশ কঠিন। তবে কিছু হাদিসের মূল উৎস নির্ধারণ (تخريج) এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা (صحة) নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি হাদিস গ্রন্থসমূহের নির্দিষ্ট স্থানগুলো দেখে নিয়েছি। আমি পাঠককে প্রতিটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনার বিস্তারিত আলোচনার জন্য ‘তাফসীর আল-মানার’ দেখার এবং প্রতিটি জটিল বিষয়ে এর সম্পাদকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
মুহাম্মাদ রাশিদ রিদা, আল-মানার সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা। এই ভূমিকাটি ১৩৫২ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসের মিলাদুন্নবী (সা.) এর রাতে লিখিত হয়েছে (মুহাদ্দিসগণের (محدثين) মতে যা সম্ভবত এই মাসের নয় তারিখ—এবং বইটি প্রকাশিত হয়েছে বারো তারিখে—যা নবীজীর জন্মের প্রসিদ্ধ দিন হিসেবে পরিচিত)।
***
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৭)
فاتحة الطبعة الثانية
دعوة الناس إلى الإسلام عامة وأهل الكتاب خاصةبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ إِنَّا أَوْحَيْنا إِلَيْكَ كَما أَوْحَيْنا إِلى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنا إِلى إِبْراهِيمَ وَإِسْماعِيلَ وَإِسْحاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْباطِ وَعِيسى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهارُونَ وَسُلَيْمانَ وَآتَيْنا داوُدَ زَبُوراً (163) وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْناهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسى تَكْلِيماً (164) رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكانَ اللَّهُ عَزِيزاً حَكِيماً (165) لكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِما أَنْزَلَ إِلَيْكَ أَنْزَلَهُ بِعِلْمِهِ وَالْمَلائِكَةُ يَشْهَدُونَ وَكَفى بِاللَّهِ شَهِيداً (166) إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ قَدْ ضَلُّوا ضَلالًا بَعِيداً (167) إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقاً (168) إِلَّا طَرِيقَ جَهَنَّمَ خالِدِينَ فِيها أَبَداً وَكانَ ذلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيراً (169) يا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جاءَكُمُ الرَّسُولُ بِالْحَقِّ مِنْ رَبِّكُمْ فَآمِنُوا خَيْراً لَكُمْ وَإِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ لِلَّهِ ما فِي السَّماواتِ وَالْأَرْضِ وَكانَ اللَّهُ عَلِيماً حَكِيماً (170) يا أَهْلَ الْكِتابِ لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقاها إِلى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلا تَقُولُوا ثَلاثَةٌ انْتَهُوا خَيْراً لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلهٌ واحِدٌ سُبْحانَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ ما فِي السَّماواتِ وَما فِي الْأَرْضِ وَكَفى بِاللَّهِ وَكِيلًا (171) لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْداً لِلَّهِ وَلَا الْمَلائِكَةُ الْمُقَرَّبُونَ وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعاً (172) فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ فَيُوَفِّيهِمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدُهُمْ مِنْ فَضْلِهِ وَأَمَّا الَّذِينَ اسْتَنْكَفُوا وَاسْتَكْبَرُوا فَيُعَذِّبُهُمْ عَذاباً أَلِيماً وَلا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلا نَصِيراً (173) يا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جاءَكُمْ بُرْهانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ نُوراً مُبِيناً (174) فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِراطاً مُسْتَقِيماً [النساء: 163 - 175]
দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাসাধারণভাবে মানুষের প্রতি এবং বিশেষভাবে আহলে কিতাবদের প্রতি ইসলামের দাওয়াতপরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি ওহী (وحي) প্রেরণ করেছি, যেমন ওহী (وحي) প্রেরণ করেছিলাম নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের প্রতি; এবং আমি ওহী (وحي) প্রেরণ করেছিলাম ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণের প্রতি, এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের প্রতি। আর আমি দাউদকে যাবুর দান করেছি। (১৬৩) এবং আমি এমন অনেক রসূল পাঠিয়েছি যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনার নিকট ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি এবং এমন অনেক রসূল পাঠিয়েছি যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনার নিকট বর্ণনা করিনি। আর আল্লাহ মূসার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। (১৬৪) আমি রসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি, যাতে রসূলগণের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো দলিল (حجة) অবশিষ্ট না থাকে। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (১৬৫) কিন্তু আল্লাহ যা আপনার প্রতি নাযিল করেছেন সে বিষয়ে তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি তা নিজ জ্ঞানেই নাযিল করেছেন; এবং ফেরেশতাগণও সাক্ষ্য প্রদান করছে। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (১৬৬) নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করেছে, তারা সুদূর বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়েছে। (১৬৭) নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে এবং জুলুম করেছে, আল্লাহ তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না এবং তাদের কোনো পথও দেখাবেন না। (১৬৮) জাহান্নামের পথ ব্যতীত, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। আর এটি আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ। (১৬৯) হে মানুষ! রসূল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে তোমাদের নিকট এসেছেন, অতএব তোমরা ঈমান আনো, এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি তোমরা কুফরি করো, তবে আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (১৭০) হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং আল্লাহর শানে সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ তো কেবল আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে এক রূহ মাত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আনো এবং বলো না যে, ‘তিন’। এটি থেকে নিবৃত্ত হও, তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো কেবল এক ইলাহ; তাঁর সন্তান হওয়া থেকে তিনি পবিত্র। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (১৭১) মসীহ আল্লাহর বান্দা হতে কখনো অবজ্ঞা বা কুণ্ঠা বোধ করেন না এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও না। আর যারা তাঁর ইবাদতকে অবজ্ঞা করবে এবং অহংকার করবে, তিনি অচিরেই তাদের সকলকে তাঁর নিকট সমবেত করবেন। (১৭২) অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তিনি তাদের পুরস্কার পুরোপুরি দান করবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বাড়িয়ে দেবেন। আর যারা অবজ্ঞা করেছে ও অহংকার করেছে, তিনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তারা নিজেদের জন্য আল্লাহ ব্যতীত কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। (১৭৩) হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট অকাট্য দলিল (برهان) এসে গেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নূর নাযিল করেছি। (১৭৪) অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তিনি অচিরেই তাদের তাঁর রহমত ও অনুগ্রহের মধ্যে দাখিল করবেন এবং তাদের তাঁর দিকে পৌঁছানোর সরল পথ দেখাবেন। [আন-নিসা: ১৬৩ - ১৭৫]
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৮)
ذكر (الوحى المحمدى) فى آيات متفرقة من السور المكية التى كانت تتلى على منكرى وحى النبوة من العرب الذين كانوا أقوى البشر استعدادا لهداية هذا الوحى إذا عقلوه وآمنوا به، لأنه لم يكن عندهم من التقاليد الدينية المسيطرة على القلوب والإرادات، ولا من أمشاج الفلسفة البشرية الشاغلة للعقول والأفكار، ولا من الاستبداد السياسى والاستعباد الروحانى السالبين لاستقلال الأفراد والجماعات ما يصرفهم عن فقهه وتدبره والاهتداء به، أو يأفكهم عن الدعوة إليه وحمايته، والجهاد بالأموال والأنفس فى سبيل إقامته.
دعوة الوحى المحمدى فى هذه الآيات:ثم ذكر فى هذه الآيات من هذه السورة المدنية [النساء] بما لم يذكر بمثلها فى تفصيله وعموم الخطاب وخصوصه، فخاطب فى أولها محمدا رسول الله وخاتم النبيين صلى الله عليه وسلم ثم وجه الخطاب فى بعضها إلى الناس كافة، وفى بعض آخر إلى أهل الكتاب خاصة. فبدأ خطاب النّاس كافة بأنه قد جاءهم (الرسول) الكامل الذى بشر به الأنبياء والرسل، والنبى الأعظم الذى كانت تنتظره الأقوام والأمم، ولذلك ذكر معرفا بأداة التعريف «1» وأنه جاءهم بالحق من ربهم، وهو الحق المحض الذى جهله المشركون، واختلف فيه الكتابيون، فضلوا فى هداية أنبيائهم ورسلهم، وكفّر بعضهم بعضا، ولعن بعضهم بعضا، وكتب الفريقين واحدة، وقد بين لهم ذلك فى الآيات التى قبل هذه الآيات مباشرة، وأهمها الخلاف فى رسولهم النبى الروحانى المصلح المسيح عيسى ابن مريم عليه السلام، ثم أعاد ذكره ونهاهم عن الغلو فيه فى هذه الآيات، وهى مشتملة على المسائل العشر الآتية:
(الأولى) أن الله تعالى أوحى إلى محمد صلى الله عليه وسلم كما أوحى إلى نوح أول رسول أرسله إلى الأمم وقص عليه خبره فى السور المكية وإلى النبيين من بعده، فوحيه إليه كوحيه إليهم، أى مثله فى جنسه وموضوعه والغرض منه، فهو ليس بدعا من الرسل ولا أولهم، ولكنه خاتم الرسل المكمل لهدايتهم، وخص بالذكر منهم أشهر أنبياء بنى إسرائيل المعروفين عند أهل الكتاب المجاورين له فى الحجاز وما حوله، وقد كانت دعوته صلى الله عليه وسلم بلغت اليهود والنصارى جميعا فيها، والمراد بالأسباط الأنبياء من سلالة أبناء يعقوب، عمم ثم خصص.
--------------------------------------------
মুহাম্মদী ওহি (الوحى المحمدى)-এর কথা মক্কী সূরাগুলোর বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আরবের সেই নবুওয়াতের ওহি (وحى النبوة) অস্বীকারকারীদের সামনে পাঠ করা হতো, যারা এই ওহির হেদায়েত গ্রহণের জন্য মানুষের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী যোগ্যতাসম্পন্ন ছিল—যদি তারা তা অনুধাবন করত এবং তাতে ঈমান আনত। কারণ তাদের মধ্যে হৃদয় ও ইচ্ছাশক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী এমন কোনো ধর্মীয় প্রথা ছিল না, না ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাজগতকে আচ্ছন্নকারী মানবীয় দর্শনের কোনো সংমিশ্রণ, আর না ছিল রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র ও আধ্যাত্মিক দাসত্ব—যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বাধীনতা হরণ করে—যা তাদের এর সম্যক উপলব্ধি, গভীর চিন্তা ও হেদায়েত লাভ থেকে বিমুখ করত, অথবা তাদের এর দাওয়াত ও সুরক্ষা এবং এটি প্রতিষ্ঠার পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা থেকে ফিরিয়ে রাখত।
এই আয়াতসমূহে মুহাম্মদী ওহির আহ্বান:অতঃপর এই মাদানি সূরা [নিসা]-এর এই আয়াতগুলোতে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যার সমতুল্য বিস্তারিত বিবরণ এবং সম্বোধনের ব্যাপকতা ও বিশেষত্বের ক্ষেত্রে অন্য কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। এর শুরুতে আল্লাহর রাসূল এবং নবীদের মোহর (خاتم النبيين) মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সম্বোধন করা হয়েছে, অতঃপর কোনো কোনো অংশে সমস্ত মানুষকে এবং কোনো কোনো অংশে বিশেষভাবে আহলে কিতাবদের সম্বোধন করা হয়েছে। তিনি সমস্ত মানুষকে সম্বোধনের মাধ্যমে শুরু করেছেন যে, তাদের কাছে সেই পূর্ণাঙ্গ রাসূল (الرسول) এসেছেন যাঁর সুসংবাদ নবী (الأنبياء) ও রাসূলগণ (الرسل) দিয়েছিলেন, এবং সেই মহান নবী (النبى الأعظم) যাঁর প্রতীক্ষায় জাতি ও উম্মতসমূহ ছিল। এই কারণেই তাঁকে নির্দিষ্টকারী অব্যয় দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তিনি তাদের কাছে তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন—যা নিছক সত্য এবং যে সম্পর্কে মুশরিকরা অজ্ঞ ছিল এবং কিতাবধারীরা মতভেদ করেছিল। ফলে তারা তাদের নবী (أنبيائهم) ও রাসূলদের (رسلهم) হেদায়েতের বিষয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছিল এবং একে অপরকে কাফির বলেছিল ও লানত করেছিল, অথচ উভয় পক্ষের কিতাব ছিল এক। এই আয়াতগুলোর ঠিক পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে তিনি তাদের কাছে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের রাসূল, আধ্যাত্মিক নবী ও সংস্কারক মসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর ব্যাপারে মতভেদ। অতঃপর তিনি পুনরায় তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন এবং এই আয়াতগুলোতে তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। এই আয়াতসমূহ নিম্নলিখিত দশটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:
(প্রথমত) আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওহি (أوحى) অবতীর্ণ করেছেন যেভাবে তিনি নূহ (আ.)-এর প্রতি ওহি অবতীর্ণ করেছিলেন—যিনি ছিলেন উম্মতদের প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল (رسول) এবং যাঁর সংবাদ মক্কী সূরাগুলোতে বর্ণনা করেছেন—এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণের (النبيين) প্রতিও। সুতরাং তাঁর প্রতি তাঁর ওহি (وحيه) ঠিক তেমনই ছিল যেমন ছিল তাঁদের প্রতি তাঁর ওহি; অর্থাৎ ওহির ধরণ, বিষয়বস্তু এবং উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে এটি একই রকম। তিনি রাসূলদের (الرسل) মধ্যে অভিনব কেউ নন এবং তাঁদের মধ্যে প্রথমও নন, বরং তিনি হলেন শেষ রাসূল (خاتم الرسل) যিনি তাঁদের হেদায়েতকে পূর্ণতা দানকারী। হিজাজ ও তার আশপাশের কিতাবধারীদের কাছে সুপরিচিত বনী ইসরায়েলের সবচেয়ে বিখ্যাত নবীদের কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দাওয়াত সেখানকার সমস্ত ইহুদি ও নাসারাদের কাছে পৌঁছেছিল। এখানে 'আসবাত' (الأسباط) দ্বারা ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধর নবীদের (الأنبياء) বোঝানো হয়েছে; এখানে প্রথমে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে এবং পরে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ১৯)
(الثانية) أن لله تعالى رسلا آخرين منهم من قصّ عليه خبرهم فى السور المكية إجمالا كقوله فى سورة الأنعام بعد قصة إبراهيم مع أبيه وقومه: وَوَهَبْنا لَهُ إِسْحاقَ وَيَعْقُوبَ كُلًّا هَدَيْنا وَنُوحاً هَدَيْنا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ داوُدَ وَسُلَيْمانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسى وَهارُونَ وَكَذلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (84) وَزَكَرِيَّا وَيَحْيى وَعِيسى وَإِلْياسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ (85) وَإِسْماعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطاً وَكلًّا فَضَّلْنا عَلَى الْعالَمِينَ (86) وَمِنْ آبائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوانِهِمْ وَاجْتَبَيْناهُمْ وَهَدَيْناهُمْ إِلى صِراطٍ مُسْتَقِيمٍ (87) ذلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشاءُ مِنْ عِبادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ ما كانُوا يَعْمَلُونَ (88) أُولئِكَ الَّذِينَ آتَيْناهُمُ الْكِتابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ فَإِنْ يَكْفُرْ بِها هؤُلاءِ فَقَدْ وَكَّلْنا بِها قَوْماً لَيْسُوا بِها بِكافِرِينَ (89) أُولئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُداهُمُ اقْتَدِهْ قُلْ لا أَسْئَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْراً إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرى لِلْعالَمِينَ (90) [الأنعام: 84 - 90]، وتفصيلا فى سور الأعراف وهود ويوسف وطه والطواسين (الشعراء والنمل والقصص) وما دونهن، ومنهم من لم يقص عليه خبرهم من أنبياء سائر الأمم لعدم العبرة لقومه ولجيرانهم بقصصهم، وعدم ظهور إقامة الحجة بها عليهم، وربما كان ذكر بعضها فتنة لبعضهم يدعون أنها أسماء مخترعة، وقد جاء فى بعض السور أنّه تعالى أرسل فى كل أمة رسولا.
وترى هذا فى موضع آخر من هذا الكتاب بشواهده، وهو حجة على أهل الكتاب الذين يحصرون فضل الله على البشر بالنبوة فيهم.
(الثالثة) أنّ وظيفة جميع الرسل تعليم النّاس ما به يصلح حالهم، ويستعدون لمآلهم بطريق التبشير لمن آمن وأصلح عملا بحسن الثواب، وإنذار من كفر وأفسد عملا بالعقاب وحكمة ذلك أن لا يكون للناس على الله حجة بجهلهم ما يجب عليهم من أصول الإيمان، وما تصلح به الأنفس وتتزكّى من صالح الأعمال، فتستعد لسعادة الدنيا
بقدرها، وسعادة الآخرة من بعدها. وقد فصلنا فى هذا الكتاب وجه الحاجة إلى هدايتهم، وعجز البشر عن الاستقلال بمعرفتها بعقولهم.
(الرابعة) شهادة الله تعالى وشهادة ملائكته بصحة هذا الوحى له صلى الله عليه وسلم، وأورد هذه الشهادة مفتتحة بقوله لكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ وهو استدراك على إنكار معلوم من قرينة حال الكفار به صلى الله عليه وسلم من المشركين وأهل الكتاب ومما حكاه من قبل عن المشركين من الإنكار والمطالبة بالآية أو الآيات، كما تراه فى سورتى الأنعام ويونس وغيرهما ثم ما حكاه قريبا فى هذه السورة [النساء] عن اليهود بقوله: يَسْئَلُكَ أَهْلُ الْكِتابِ أَنْ تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ كِتاباً مِنَ
(দ্বিতীয়ত) মহান আল্লাহর আরও অনেক রাসূল ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সংবাদ (خبر) তিনি মক্কী সূরাগুলোতে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন, যেমনটি তিনি সূরা আল-আনআম-এ ইবরাহীমের সাথে তার পিতা ও কওমের ঘটনার পর বলেছেন: "আর আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকূব; আমি প্রত্যেককেই পথ প্রদর্শন করেছি। ইতিপূর্বে আমি নূহকে পথ প্রদর্শন করেছিলাম এবং তার বংশধরদের মধ্য থেকে দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি (৮৪)। আর যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা ও ইলইয়াসকেও; তারা সকলেই সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত (৮৫)। আর ইসমাঈল, আল-ইয়াসা, ইউনুস ও লূতকেও; আমি তাদের প্রত্যেককেই বিশ্বজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি (৮৬)। আর তাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর ও ভ্রাতৃবর্গের মধ্যে থেকেও; আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল পথে পরিচালিত করেছি (৮৭)। এটিই আল্লাহর হেদায়েত, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর মাধ্যমে পথ প্রদর্শন করেন। আর তারা যদি শিরক করত, তবে তারা যা করত তা অবশ্যই নিষ্ফল হয়ে যেত (৮৮)। এরাই তারা যাদেরকে আমি কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করেছি। সুতরাং যদি তারা তা অস্বীকার করে, তবে আমি এর জন্য এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়োজিত করেছি যারা তা অস্বীকারকারী নয় (৮৯)। এরাই তারা যাদেরকে আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছেন, সুতরাং আপনি তাদের পথ অনুসরণ করুন। বলুন, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এটি তো বিশ্বজগতের জন্য কেবল উপদেশ (৯০) [আল-আনআম: ৮৪-৯০]।" আর সূরা আল-আরাফ, হুদ, ইউসুফ, ত্বহা এবং ত্বাওয়াসীন (আশ-শুআরা, আন-নামল ও আল-কাসাস) ও তৎসংলগ্ন অন্যান্য সূরাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার তাদের মধ্যে এমনও অনেকে রয়েছেন যাদের সংবাদ (خبر) অন্যান্য উম্মতের নবীদের মধ্য থেকে তাকে শোনানো হয়নি, কারণ তার কওম এবং তাদের প্রতিবেশীদের জন্য তাদের কাহিনীগুলোতে কোনো শিক্ষণীয় বিষয় ছিল না এবং সেগুলোর মাধ্যমে তাদের ওপর দলিল (حجة) কায়েম হওয়া স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি। সম্ভবত এগুলোর কয়েকটির উল্লেখ কারো কারো জন্য ফিতনার কারণ হতো এই দাবিতে যে, এগুলো সব মনগড়া নাম। আর কিছু সূরায় এসেছে যে, তিনি প্রত্যেক উম্মতের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।
আপনি এই কিতাবের অন্য স্থানে এর সপ্রমাণ (شواهد) আলোচনা দেখতে পাবেন। আর এটি আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে একটি দলিল (حجة), যারা মানুষের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বা নবুওয়াতকে কেবল তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করে।
(তৃতীয়ত) সকল রাসূলের দায়িত্ব হলো মানুষকে তা শিক্ষা দেওয়া যার মাধ্যমে তাদের অবস্থা সংশোধিত হয় এবং মুমিন ও সৎকর্মশীলদের জন্য উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দান এবং কাফের ও অসৎকর্মশীলদের শাস্তির সতর্কবাণীর মাধ্যমে তারা তাদের পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এর হিকমত হলো এই যে, যাতে ঈমানের মূলনীতি এবং মানুষের সংশোধন ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য যা আবশ্যক সেই সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো দলিল (حجة) না থাকে। ফলে তারা দুনিয়ার সুখ-শান্তি
এবং তৎপরবর্তী আখেরাতের সৌভাগ্যের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। আমরা এই কিতাবে তাদের হেদায়েতের প্রয়োজনীয়তা এবং মানুষের বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে তা জানার অক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
(চতুর্থত) মহান আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাদের সাক্ষ্য যে, এই ওহী (وحي) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া সত্য। আল্লাহ এই সাক্ষ্যটি "কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দেন" বাক্য দিয়ে শুরু করেছেন। এটি মুশরিক ও আহলে কিতাবদের পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত অস্বীকার করার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সংশোধনীমূলক বক্তব্য। এর আগে মুশরিকদের অস্বীকার এবং নিদর্শন তলবের যে কাহিনী সূরা আল-আনআম ও ইউনুস এবং অন্যান্য সূরায় বর্ণিত হয়েছে, এবং সম্প্রতি এই সূরা আন-নিসায় ইহুদিদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে: "আহলে কিতাবরা আপনার কাছে দাবি করে যে, আপনি তাদের ওপর আসমান থেকে একটি কিতাব অবতীর্ণ করবেন..."
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২০)
السَّماءِ فَقَدْ سَأَلُوا مُوسى أَكْبَرَ مِنْ ذلِكَ فَقالُوا أَرِنَا اللَّهَ جَهْرَةً [النساء: 153] إلخ، فهو تعالى يقول له: إن أولئك المشركين ينكرون وحى الله إليك وإلى غيرك، وإنّ هؤلاء الجاحدين يكتمون الشهادة بنبوتك وبشارة أنبيائهم بها لكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِما أَنْزَلَ إِلَيْكَ [النساء: 166] إلخ.
فأما شهادته تعالى فقد بينها بيانا مستأنفا لوقوعها جوابا لسؤال مقدر، وهو قوله: (أنزله بعلمه) أى أنزل هذا القرآن الذى أوحاه إليك متلبسا بعلمه الخاص الذى لا تعلمه أنت ولا قومك من تشريع وحكم وآداب وعبر وأخبار غيب سابقة وحاضرة وآتية، بأسلوب معجز للبشر. وهو ما يفصله هذا الكتاب بالشواهد من السور العديدة، وأما شهادة الملائكة له فما أخبر به تعالى من نزول الروح الأمين جبريل عليه السلام بهذا القرآن، وما أيده به يوم الفرقان يوم التقى الجمعان فى غزوة بدر، وكذا غزوتا الأحزاب وحنين، وفى أحوال أخرى.
هذه الشهادة من الله بهذا القرآن الذى لا يمكن أن يكون إلّا من الله حقّ لا ريب فيه، وهى أظهر من شهادة يوحنا (يحيى) للمسيح- عليهما السلام إذا روى يوحنا أنه قال: (5:
13 إن كنت أشهد لنفسى فليست شهادتى حقا 32 الذى يشهد لى هو آخر وأنا أعلم أن شهادته التى يشهدها لى هى حق 33 أنتم أرسلتم إلى يوحنا فشهد للحق)، وكذلك هى أظهر وأقوى من شهادة المسيح لنفسه فيما رواه يوحنا أيضا، إذ دعا اليهود إلى اتباع النور الذى جاء به (8: 13). فقال له الفرّيسيون: أنت تشهد لنفسك شهادتك ليست حقّا 14 فأجاب يسوع وقال لهم: (وإن كنت أشهد لنفسى فشهادتى حق)، وقد صدق عليه السلام فى أن شهادته لنفسه حق، ولكن لا تقوم بها الحجة على الخصم، وأما شهادة الله تعالى لنبيه فى القرآن فهى حجّة على كلّ أحد يعجز عن الإتيان بمثله، فهى إذن حجة على كل أحد.
(الخامسة) الإخبار فى الآيات 167 - 169 بحال الكفار الذين يتعدى ضررهم إلى غيرهم من الناس، بصدّهم النّاس عن سبيل الله وهى الإسلام، وبظلمهم لأنفسهم وللناس، وكون جزاؤهم بحسب سنة الله فى أنفس البشر ونظام الاجتماع أن يظلوا سائرين على طريق الباطل والشر والموصلة إلى عذاب جهنّم. إذ لا يغفر الله تعالى لهم إلا بتزكية أنفسهم بالإيمان والعمل الصالح الذى يهدى إليه الوحى، وقد صاروا بضلالهم فى أشد البعد عنه خلافا لما يقوله الكفار من نيل المغفرة بجاه الشفعاء الشخصى مع بقاء الأنفس على
আসমান থেকে (কিতাব অবতীর্ণ করার বিষয়ে), তারা তো মুসার কাছে এর চেয়েও বড় দাবি করেছিল; তারা বলেছিল, 'আমাদেরকে প্রকাশ্যে আল্লাহকে দেখাও' [আন-নিসা: ১৫৩] ইত্যাদি। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁকে (রাসূলকে) বলছেন: নিশ্চয়ই ঐসব মুশরিকরা তোমার প্রতি এবং অন্যদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহি (وحي)-কে অস্বীকার করে। আর এই অস্বীকারকারীরা তোমার নবুওয়াতের সাক্ষ্য এবং তাদের নবীদের দেওয়া তোমার আগমনের সুসংবাদকে গোপন করে, 'কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যা তিনি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন' [আন-নিসা: ১৬৬] ইত্যাদি।
আর মহান আল্লাহর সাক্ষ্যের বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, যা একটি উহ্য প্রশ্নের উত্তর হিসেবে এসেছে। আর তা হলো তাঁর বাণী: '(তিনি) তা স্বীয় ইলম বা জ্ঞানসহ অবতীর্ণ করেছেন'। অর্থাৎ, তিনি এই কুরআন যা তোমার প্রতি ওহি (وحي) করেছেন, তা তাঁর বিশেষ জ্ঞানসহ অবতীর্ণ করেছেন, যা তুমি বা তোমার কওম জানত না—যেমন শরিয়ত প্রণয়ন, বিধান, আদব, শিক্ষা এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অদৃশ্যের সংবাদ (أخبار غيب), যা মানুষের জন্য এক অলৌকিক (معجز) শৈলীতে রচিত। এটিই সেই বিষয় যা এই কিতাবটি বিভিন্ন সূরার নিদর্শনের মাধ্যমে বিস্তারিত বর্ণনা করে। আর তাঁর জন্য ফেরেশতাদের সাক্ষ্য হলো সেই সংবাদ যা মহান আল্লাহ দিয়েছেন—অর্থাৎ রুহুল আমিন জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর এই কুরআন নিয়ে অবতরণ, এবং ফুরকানের দিন (বদর যুদ্ধে) যখন দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল তখন তাঁকে যে সাহায্য করা হয়েছিল, অনুরূপভাবে আহযাব ও হুনাইন যুদ্ধ এবং অন্যান্য অবস্থায়।
কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর এই সাক্ষ্য—যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হওয়া অসম্ভব—তা সত্য এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর পক্ষে ইউহান্না (ইয়াহইয়া)-এর সাক্ষ্যের চেয়েও অধিকতর স্পষ্ট। যেমনটি ইউহান্না বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছিলেন: (৫: ৩১—যদি আমি নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেই, তবে আমার সাক্ষ্য সত্য নয়। ৩২—যিনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তিনি অন্য কেউ, আর আমি জানি যে তিনি আমার সম্পর্কে যে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তা সত্য। ৩৩—তোমরা ইউহান্নার নিকট লোক পাঠিয়েছিলে আর সে সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল)। অনুরূপভাবে, এটি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিজের পক্ষে দেওয়া সাক্ষ্যের চেয়েও অধিকতর স্পষ্ট ও শক্তিশালী যা ইউহান্না বর্ণনা করেছেন, যখন তিনি ইহুদিদেরকে তাঁর আনীত নূরের অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন (৮: ১৩)। তখন ফরীশীরা তাঁকে বলেছিল: 'তুমি নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছ, তোমার সাক্ষ্য সত্য নয়'। ১৪—অতঃপর যিশু (ঈসা) উত্তর দিলেন এবং তাদের বললেন: 'যদিও আমি নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেই, তবুও আমার সাক্ষ্য সত্য'। তিনি (আলাইহিস সালাম) সত্যই বলেছেন যে তাঁর নিজের পক্ষে দেওয়া সাক্ষ্য সত্য, কিন্তু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তা দলিল (حجة) হিসেবে গণ্য হয় না। পক্ষান্তরে, কুরআনের মাধ্যমে তাঁর নবীর পক্ষে মহান আল্লাহর সাক্ষ্য এমন এক দলিল (حجة) যা তাদৃশ কিছু আনতে অক্ষম প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই কার্যকর। সুতরাং এটি সবার জন্যই অকাট্য দলিল (حجة)।
(পঞ্চম বিষয়) ১৬৭-১৬৯ নম্বর আয়াতসমূহে সেইসব কাফির (كفار)-দের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে যাদের ক্ষতি অন্য মানুষের ওপরও বর্তায়—আল্লাহর পথ তথা ইসলাম থেকে মানুষকে বাধা প্রদানের মাধ্যমে এবং নিজেদের ও মানুষের ওপর জুলুম করার মাধ্যমে। মানুষের স্বভাব ও সামাজিক রীতিনীতি সংক্রান্ত আল্লাহর চিরন্তন নীতি বা সুন্নাহ (سنة) অনুযায়ী তাদের প্রতিদান এই যে, তারা বাতিল ও মন্দের পথেই চলতে থাকবে যা তাদের জাহান্নামের আজাবের দিকে নিয়ে যাবে। যেহেতু মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না তারা ওহি (وحي) নির্দেশিত ইমান ও নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের নফসের পরিশুদ্ধি ঘটায়। অথচ তারা তাদের গোমরাহির কারণে তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে—কাফির (كفار)-দের সেই দাবির বিপরীতে যে, নফসের সংশোধন ছাড়াই কেবল সুপারিশকারীদের (شفعاء) ব্যক্তিগত মর্যাদার উসিলায় ক্ষমা লাভ করা যাবে।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২১)
فسادها، وظلمات ظلمها وجهلها، وهو ما سرى إلى أهل الكتاب من المشركين، إلا أن بعض النصارى خصّوه بالمسيح وبعضهم جعلوه عاما لجميع القديسين.
(السادسة) مخاطبة جميع الناس (فى الآية 170) بأن هذا الرسول محمدا صلى الله عليه وسلم قد جاءهم بالحق من ربهم حقّا محضا غير مشوب بالآراء والأهواء البشرية، ولا بالتقاليد الكهنوتية «1» التى زادها رؤساء الأديان على ما جاءهم به الرسل الأولون فلم يعد يعرف أحد ما هو من الله تعالى وما هو منهم، فإن يؤمنوا بما جاءهم به هذا الرسول يكن خيرا لهم، وإن يكفروا فالله غنى عنهم.
(السابعة) نداؤه أهل الكتاب (فى الآية 171) بالنهى عن الغلو فى الدين، وعن قول غير الحق على الله تعالى، وبيانه لهم حقيقة المسيح الذى غالى اليهود منهم فى الكفر به وتكذيبه، والطعن فى صيانة أمه الطاهرة، وغالى النصارى فيه فجعلوه ربا وإلها، وأنه قد جاءهم بالحق فيه، وهو أنه بشر روحانى خلق بكلمة الله التكوينية وهى إِنَّما أَمْرُهُ إِذا أَرادَ شَيْئاً أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ [يس: 82]، وبنفخ روح القدس فى أمه الطاهرة، وبتأييد هذا الروح له فى سائر أحوال نبوته، وأن روحه عليه السلام قدّيسه من الله تعالى لا حظّ للشيطان فيها، والنصارى يقررون أن الأرواح قسمان: طاهرة قديسة، ونجسة شيطانية، والتمييز بينهما مزية تحدث بها زعيمهم بولس فى رسالته الأولى إلى أهل كورنثيوس.
(الثامنة) أمره تعالى أهل الكتاب بعد ما ذكر من حقيقة أمر المسيح أن يؤمنوا بما جاء به خاتم النبيين من الإيمان الصحيح بالله، وتوحيده والإيمان برسله، ونهيهم عن التثليث الوثنى الهندى، وعن اتخاذ الولد لله عز وجل، وع لله بأنه المالك لكلّ ما فى السموات والأرض، أى كل العالم، ولو كان له ولد لكان ولده مثله لا ملكه، ولكان محتاجا كاحتياج الإنسان إلى ولده سبحانه هو الغنى عن كل ما سواه كما هو مبين فى الآيات الكثيرة الواردة فى هذا المعنى «2».
(التاسعة) إنباؤهم فى الآية (172) بأنّ المسيح لن يستنكف، أى لن يأبى أنفة واستكبارا عن أن يكون عبدا لله، ولا الملائكة المقربون- وهم أفضل الملائكة وأعلاهم منزلة عنده تعالى- أن يكونوا عبيدا له، فإنه ما تم فى الوجود إلا رب واحد كل من عداه عبيد له،
--------------------------------------------
...এর কলুষতা, এর জুলুম ও অজ্ঞতার অন্ধকার, যা মুশরিকদের থেকে আহলে কিতাবদের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে। তবে কিছু খ্রিস্টান একে কেবল মসিহ (আ.)-এর সাথে নির্দিষ্ট করেছে এবং কেউ কেউ একে সকল সাধু-সন্ন্যাসীর জন্য সাধারণ করেছে।
(ষষ্ঠত) সকল মানুষকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে (আয়াত ১৭০-এ) যে, এই রসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের নিকট তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন; এটি একটি বিশুদ্ধ সত্য যা মানুষের খেয়ালখুশি বা মতামতের মিশ্রণমুক্ত। এতে পুরোহিততান্ত্রিক কোনো প্রথাও নেই যা ধর্মের নেতারা পূর্ববর্তী রসূলগণের আনীত দ্বীনের সাথে সংযোজন করেছিল। ফলে মানুষ আর বুঝতে পারত না কোনটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আর কোনটি তাদের পক্ষ থেকে। সুতরাং তারা যদি এই রসূলের আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে তা তাদের জন্যই কল্যাণকর হবে। আর যদি তারা কুফরি করে, তবে আল্লাহ তাদের থেকে অমুখাপেক্ষী।
(সপ্তম) আহলে কিতাবদেরকে সম্বোধন করে (আয়াত ১৭১-এ) দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি (غلو) করতে এবং মহান আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে তাদের নিকট মসিহ (আ.)-এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁকে নিয়ে তাদের মধ্যকার ইহুদিরা তাঁকে অস্বীকার ও মিথ্যারোপ করার মাধ্যমে এবং তাঁর পবিত্র মাতার সতীত্ব নিয়ে কটাক্ষ করার মাধ্যমে চরম বাড়াবাড়ি (غلو) করেছিল। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা তাঁর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি (غلو) করেছিল যে, তাঁকে তারা প্রভু ও ইলাহ বানিয়ে ফেলেছিল। অথচ তিনি (রাসূল) তাদের কাছে তাঁর সম্পর্কে সত্য নিয়ে এসেছেন। তা হলো—তিনি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ যাকে আল্লাহর সৃষ্টিগত নির্দেশের (কালিমা) মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা হলো: "তাঁর নির্দেশ তো কেবল এই যে, যখন তিনি কোনো কিছু করতে চান, তখন তাকে বলেন: 'হও', অমনি তা হয়ে যায়" [সূরা ইয়াসিন: ৮২]। আর তাঁর পবিত্র মাতার মধ্যে রূহুল কুদুসের ফুৎকারের মাধ্যমে এবং তাঁর নবুওয়াতের সকল অবস্থায় এই রূহের সমর্থনের মাধ্যমে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর (আলাইহিস সালাম) রূহটি ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পবিত্র রূহ, যাতে শয়তানের কোনো অংশ ছিল না। খ্রিস্টানরা এটি স্বীকার করে যে রূহ দুই প্রকার: পবিত্র ও বিশুদ্ধ রূহ এবং অপবিত্র ও শয়তানি রূহ। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা এমন একটি বিশেষ গুণ যা তাদের নেতা পল করিন্থীয়দের প্রতি তাঁর প্রথম পত্রে উল্লেখ করেছেন।
(অষ্টম) মসিহ (আ.)-এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনার পর মহান আল্লাহ আহলে কিতাবদেরকে আদেশ করেছেন যেন তারা খাতামুন নাবিয়্যীন (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আনীত সঠিক ঈমানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, যা হলো আল্লাহর প্রতি সঠিক বিশ্বাস, তাঁর একত্ববাদ এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান। তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজকসুলভ ভারতীয় ত্রিত্ববাদ এবং মহান আল্লাহর জন্য সন্তান গ্রহণের ধারণা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আসমান ও জমিনে তথা সমগ্র বিশ্বে যা কিছু আছে সবকিছুর মালিক কেবল আল্লাহ। তাঁর যদি সন্তান থাকত, তবে সেই সন্তান তাঁর মালিকানাধীন না হয়ে তাঁর মতোই হতো। সেক্ষেত্রে মানুষ যেমন তার সন্তানের মুখাপেক্ষী হয়, তিনিও তেমনি মুখাপেক্ষী হতেন। অথচ তিনি সকল কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী পবিত্র সত্তা, যা এই মর্মের অনেক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
(নবম) তাদেরকে আয়াত (১৭২)-এ সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, মসিহ (আ.) কখনও আল্লাহর বান্দা হতে অবজ্ঞা বা অহংকারবশত অস্বীকৃতি জানাবেন না এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারাও নয়—যারা ফেরেশতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং মহান আল্লাহর নিকট উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কেননা মহাবিশ্বে কেবল একজনই রব রয়েছেন এবং তিনি ব্যতীত অন্য সকলে তাঁর বান্দা।
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২২)
فالمؤمنون الذين يؤمنون بربوبيته ويعملون الصالحات تعبدا له يوفيهم أجورهم، ويزيدهم عليها ثوابا ونعيما، فضلا منه وإحسانا، والذين يستنكفون ويستكبرون
عنها يعذبهم عذابا أليما، ولا يجدون لهم من دونه- أى غيره- وليّا يتولى أمورهم ويغفر لهم، ولا نصيرا ينصرهم بشفاعة ولا فدية ولا غيرها، فلا يغرنهم ما يدعيه الرؤساء الذين استعبدوهم من أنّ خلاصهم وسعادتهم يكونان من غير أنفسهم.
(العاشرة) نداؤه للناس كافة فى الآيتين (174، 175) مبشرا لهم بأنه قد جاءهم البرهان العلمى العقلى من ربهم، وأنزل عليهم النور الساطع، وهو القرآن المبين لجميع الحقائق، فلا ينبغى لأحد منهم أن يصغى بعدها إلى تقليد الرؤساء والكهنة الذين استعبدوهم لرئاستهم وأهوائهم، وأثبت لهم أن الإيمان به، والاعتصام بحبله المتين، والدخول فى النور المبين، هو الذى يخرجهم من شقاء الدنيا ويدخلهم فى رحمة خاصة، وفضل عظيم، يمتازون بهما على غيرهم من البشر، ويهديهم بإرشاده وفيض نوره صراطا مستقيما من العلم والعمل، والحق والعدل والفضل، يكونون به سعداء الدنيا والآخرة.
هذا مضمون الوحى الإلهى المنزل على محمد رسول الله وخاتم النبيين المبين فى هذه الآيات، ظهر نوره فاهتدت به العرب، وحملته إلى شعوب العجم بالتبليغ له بالعلم والعمل، فاهتدى به السواد الأعظم ممن بلغتهم دعوته من المليين الكتابيين، والمجوس والوثنيين، والهمج المعطلين، لأنه دين البشر أجمعين. وقاومته الدول الدينية من نصرانية ومجوسية ووثنية، فنصره الله عليهم كلهم كما وعدهم حتى أظهره على الدين كله، ولا يزال ينصره وينشره بعد ترك دوله لدعوته، وإعراضهم عن هدايته. وما نزل بهم من عقوبته لهم كما أوعدهم، ولو ثبتوا على إقامته لعم نوره العالم، ولاستراح البشر من هذه العداوات الجنسية والوطنية والسياسية، ولو لقى غيره من الأديان مثل ما لقى من البغى والعدوان حوار مع الأستاذ بن لأصبح فى خبر كان.
ثم إن حاجة الأمم قد اشتدت فى عصرنا هذا إلى هدايته، حتى أشدها إمعانا فى عداوته، ولجاجا فى نكايته، وجهلا بحقيقته، فأخرجت هذا الكتاب من هداية القرآن، لتجديد دعوته بما يناسب ضرورة هذا الزمان، ولو أننى حين شرعت فى كتابة مباحثه فى المرة الأولى، أردت أن يكون كتابا مستقلا فى تجديد الدعوة إلى الإسلام، لافتتحته بهذه الآيات، وإن سبق لى تفسيرها المفصل فى آخر سورة النساء، ثم لنشرت بعض ما طويت من وجوه إعجازه، ولفصلت ما أجملت من مقاصد إصلاحه، ولبسطت ما قبضت من
সুতরাং মুমিনগণ, যারা তাঁর রুবুবিয়াতে (প্রভুত্বে) বিশ্বাস করে এবং তাঁর ইবাদতস্বরূপ সৎকর্ম সম্পাদন করে, তিনি তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও ইহসান হিসেবে তাদের প্রতি সওয়াব ও নিয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেবেন। আর যারা তাঁর ইবাদতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অহংকার করে
তা থেকে, তিনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন। তারা নিজেদের জন্য আল্লাহ ব্যতীত—অর্থাৎ তিনি ছাড়া—এমন কোনো অভিভাবক পাবে না যে তাদের বিষয়ের দায়িত্ব নেবে এবং তাদের ক্ষমা করবে, আর এমন কোনো সাহায্যকারীও পাবে না যে সুপারিশ, মুক্তিপণ বা অন্য কিছুর মাধ্যমে তাদের সাহায্য করবে। সুতরাং সেই নেতাদের দাবি যেন তাদের প্রতারিত না করে যারা তাদের দাসে পরিণত করেছে যে, তাদের মুক্তি ও সৌভাগ্য নিজেদের ব্যতীত অন্য কারো মাধ্যমে অর্জিত হবে।
(দশম) ১৭৪ ও ১৭৫ নম্বর আয়াতে সকল মানুষের প্রতি তাঁর আহ্বান, যেখানে তাদের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের কাছে জ্ঞানভিত্তিক ও যৌক্তিক প্রমাণ পৌঁছেছে এবং তিনি তাদের প্রতি এক উজ্জ্বল আলো অবতীর্ণ করেছেন, যা হলো সকল সত্য স্পষ্টকারী কুরআন। অতএব এরপর তাদের কারো পক্ষেই আর সেই নেতা ও পুরোহিতদের অন্ধ অনুকরণের দিকে কর্ণপাত করা উচিত হবে না, যারা নিজেদের নেতৃত্ব ও খেয়ালখুশির জন্য তাদের দাসে পরিণত করে রেখেছে। আর তিনি তাদের জন্য এটি সাব্যস্ত করেছেন যে, তাঁর প্রতি ঈমান, তাঁর মজবুত রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা এবং এই সুস্পষ্ট আলোতে প্রবেশ করাই হলো এমন বিষয় যা তাদের দুনিয়ার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করবে এবং এক বিশেষ রহমত ও মহান অনুগ্রহে দাখিল করবে, যার মাধ্যমে তারা অন্য সকল মানুষের ওপর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হবে। আর তিনি তাঁর নির্দেশিকা ও নূরের প্রাচুর্যের মাধ্যমে তাদের ইলম ও আমল, সত্য, ন্যায় ও অনুগ্রহের এমন এক সরল পথ দেখাবেন, যার মাধ্যমে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যবান হবে।
এটি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ এবং সর্বশেষ নবীর ওপর অবতীর্ণ এবং এই আয়াতসমূহে বর্ণিত ঐশী ওহীর সারমর্ম। এর আলো প্রকাশিত হয়েছে যার দ্বারা আরবরা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে এবং ইলম ও আমলের সাথে প্রচারের মাধ্যমে তারা তা অনারব জাতিসমূহের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ফলে যাদের কাছে তাঁর দাওয়াত পৌঁছেছে তাদের মধ্যে আহলে কিতাব ধর্মাবলম্বী, অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক এবং লক্ষ্যহীন অসভ্য নাস্তিকদের এক বিশাল অংশ হিদায়াত লাভ করেছে; কারণ এটি সকল মানুষের দ্বীন। খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক ও মূর্তিপূজক ধর্মীয় রাষ্ট্রগুলো এর প্রতিরোধ করেছিল, কিন্তু আল্লাহ তাদের সবার ওপর ইসলামকে বিজয় দান করেছেন যেমনটি তিনি ওয়াদা করেছিলেন, এমনকি তিনি একে সমস্ত দ্বীনের ওপর জয়ী করেছেন। রাষ্ট্রসমূহ তাঁর দাওয়াত বর্জন করার এবং তাঁর হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরেও তিনি একে সাহায্য ও প্রসারিত করে চলেছেন। আর তাদের ওপর তাঁর সেই শাস্তিই নেমে এসেছে যে বিষয়ে তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন। যদি তারা এই দ্বীন প্রতিষ্ঠার ওপর অটল থাকত, তবে এর আলো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ত এবং মানবজাতি এই জাতিগত, জাতীয় ও রাজনৈতিক শত্রুতা থেকে মুক্তি পেত। আর ইসলামের ওপর যে পরিমাণ অন্যায় ও আক্রমণ চালানো হয়েছে—উস্তাদ বিন-এর সাথে সংলাপ—অন্য কোনো ধর্ম যদি তার সম্মুখীন হতো তবে তা ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে যেত।
অতঃপর বর্তমান যুগে জাতিসমূহের জন্য এই হিদায়াতের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে, এমনকি তাদের মধ্যেও যারা এর শত্রুতায় চরমপন্থা অবলম্বন করে, এর ক্ষতিসাধনে লিপ্ত থাকে এবং এর প্রকৃত রূপ সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই আমি কুরআনের হিদায়াত থেকে এই কিতাবটি সংকলন করেছি যাতে এই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর দাওয়াতকে নতুন করে উপস্থাপন করা যায়। আমি যদি প্রথমবার এর গবেষণামূলক বিষয়গুলো লিখতে শুরু করার সময় ইসলামি দাওয়াত পুনর্জাগরণের জন্য এটিকে একটি স্বতন্ত্র কিতাব হিসেবে তৈরি করার ইচ্ছা করতাম, তবে আমি এই আয়াতগুলো দিয়েই তা শুরু করতাম, যদিও সূরা নিসার শেষে এগুলোর বিস্তারিত তাফসীর করার সুযোগ আমার আগে হয়েছে। এরপর আমি এর মুজিযার প্রচ্ছন্ন দিকগুলো থেকে কিছু অংশ প্রকাশ করতাম, এর সংস্কারমূলক লক্ষ্যগুলোর সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতাম এবং যা আমি সংক্ষেপ করেছি তা বিশদভাবে বর্ণনা করতাম...
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৩)
دلائله. ولاجتنبت فيه الإحالة فى بسط ما طوى وتفصيل ما أجمل، على أجزاء تفسير المنار المطول، التى اختصرت جل المقاصد وشواهدها منها، لأنها مما يشغل القارئين للكتاب، وربما كان أكثرهم لا يقتنون تلك الأجزاء، ولذلك انتقد هذه الإحالة وبعض الاختصار فيه بعض من قرأه قولا وكتابة بحق، وكنت أسبقهم إلى ذلك.
رواج الكتاب وترجمته ببعض لغات:لقد راج هذا الكتاب أضعاف ما رجونا، ونال من ثناء رجال العلوم الدينية ورجال المعارف المدنية العصرية فوق ما قدرنا، حتى قال كاتب مدنى شهير إنه لم ير كتابا عربيّا نشر فى هذا العصر وكان له من حسن القبول عند جميع أصناف القراء- حتى الذين لا يعنون بأمر الدين- مثل ما كان لهذا الكتاب (الوحى)، وقد صدق قوله، فإنه لم يمر على بدء نشره ثلاثة أشهر إلا وقد كادت تنفذ نسخه، حتى قللنا من بيعه لتجار الكتب بالجملة، لئلا تنفذ قبل التمكن من إعادة طبعه منقحا، مبسوطا مفصلا.
وقد استأذننى بعض المستنيرين ومحبى الإصلاح الإسلامى من الشعوب الإسلامية بترجمته باللغات الغربية والشرقية المختلفة، فأذنت لإمام جامع وكنج ومحرر مجلة الإسلام (ريفيو إسلاميك) فى لندن وداعية الإسلام فيها بترجمته باللغة الانكليزية ونشره فى أوروبا وأمريكا مترجما «1»، وأذنت أيضا بترجمته باللغات الأوردية والتركية والفارسية والصينية، وسأذكر ما يكون من أمر هذه الترجمات فى المقال الذى أجعله تصديرا لهذه الطبعة (الثانية).
ولقد كنت على ما أسمع وما أقرأ من تقريظه وإطرائه أحرص على العلم بما يراه أولو العلم والرأى من انتقاده، وسألت كثيرا عن هذا ولم اسألهم عن ذاك، وبعد هذا كله شرعت فى إعداده لهذه الطبعة الثانية له.
…--------------------------------------------
এর প্রমাণাদি। আর আমি এতে সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনা এবং সংক্ষিপ্ত (مجمل) বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে বিস্তারিত তাফসীর আল-মানার-এর খণ্ডগুলোর দিকে উদ্ধৃতি (إحالة) প্রদান করা পরিহার করতাম, যেখান থেকে অধিকাংশ উদ্দেশ্য ও তার সাক্ষ্যপ্রমাণ (شواهد) সংক্ষেপ করা হয়েছে; কারণ এটি পাঠকদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে এবং সম্ভবত তাদের অধিকাংশের নিকট সেই খণ্ডগুলো নেই। এই কারণে, যারা এটি পাঠ করেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে এই উদ্ধৃতি (إحالة) এবং এর কিছু সংক্ষিপ্তকরণের যথার্থ সমালোচনা করেছেন এবং আমি নিজেই তাদের পূর্বে এই বিষয়ে সচেতন ছিলাম।
গ্রন্থটির প্রসার এবং বিভিন্ন ভাষায় এর অনুবাদ:এই গ্রন্থটি আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রসার লাভ করেছে এবং ধর্মীয় শাস্ত্রের পণ্ডিত ও আধুনিক সমকালীন বিজ্ঞানের পণ্ডিতদের নিকট থেকে আমাদের অনুমানের চেয়েও বেশি প্রশংসা অর্জন করেছে। এমনকি একজন প্রখ্যাত আধুনিক লেখক বলেছেন যে, তিনি এই যুগে প্রকাশিত এমন কোনো আরবি গ্রন্থ দেখেননি যা সকল শ্রেণির পাঠকদের নিকট—এমনকি যারা ধর্মের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেন না তাদের নিকটও—এই গ্রন্থের (আল-ওহী) মতো এতোটা সমাদৃত হয়েছে। তার কথা সত্য ছিল, কারণ এটি প্রকাশের তিন মাস অতিবাহিত হতে না হতেই এর কপিগুলো প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি আমরা বই বিক্রেতাদের কাছে পাইকারি বিক্রি কমিয়ে দিয়েছিলাম যাতে পরিমার্জিত, বিস্তৃত ও বিস্তারিতভাবে এটি পুনরায় মুদ্রণ করার সক্ষমতা অর্জনের আগেই কপিগুলো শেষ না হয়ে যায়।
মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু আলোকপ্রাপ্ত ও ইসলামী সংস্কারের অনুরাগী ব্যক্তি বিভিন্ন পশ্চিমা ও প্রাচ্যের ভাষায় এটি অনুবাদ করার জন্য আমার কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন। তাই আমি লন্ডনের ওকিং মসজিদের ইমাম, 'ইসলামিক রিভিউ' পত্রিকার সম্পাদক এবং সেখানকার ইসলাম প্রচারককে এটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করার এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় অনূদিত «১» আকারে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছি। এছাড়াও আমি এটি উর্দু, তুর্কি, ফারসি এবং চীনা ভাষায় অনুবাদ করার অনুমতি দিয়েছি। এই অনুবাদগুলোর অবস্থা সম্পর্কে আমি সেই প্রবন্ধে আলোচনা করব যা এই (দ্বিতীয়) সংস্করণের ভূমিকা হিসেবে নির্ধারণ করেছি।
আমি এর প্রশংসা ও গুণকীর্তন সম্পর্কে যা শুনেছি বা পড়েছি তার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম বিদগ্ধ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এর যে সমালোচনা করেছেন তা জানার জন্য। আমি এই বিষয়ে অনেক জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু ঐ (প্রশংসা) সম্পর্কে তাঁদের জিজ্ঞাসা করিনি। এই সবকিছুর পর আমি এর দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরির কাজ শুরু করেছি।
…--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৫)
الفصل الأول فى تحقيق معنى الوحى والنبوة والرسالة وحاجة البشر إليها وأصولها وعدم إغناء العقل والعلم الكسبى عنها «1»
تعريف الوحى لغة وشرعا:قال فى الأساس: أوحى إليه وأو رمى إليه بمعنى، ووحيت إليه وأوحيت إذا كلمته بما تخفيه عن غيره؛ وأوحى الله إلى أنبيائه: وَأَوْحى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ [النحل: 68].
وقال الراغب: أصل الوحى الإشارة السريعة، ولتضمن السرعة قيل «أمر وحى». وذلك يكون بالكلام على سبيل الرمز والتعريض، وقد يكون بصوت مجرد عن التركيب، وبإشارة ببعض الجوارح وبالكتابة. وقد حمل على ذلك قوله تعالى عن زكريا: فَخَرَجَ عَلى قَوْمِهِ مِنَ الْمِحْرابِ فَأَوْحى إِلَيْهِمْ أَنْ سَبِّحُوا بُكْرَةً وَعَشِيًّا [مريم: 11] إلخ، أى: أشار إليهم ولم يتكلم. والوحى بتشديد الياء السريع، ومن وحى الإيماء بالجوارح قول الشاعر:
نظرت إليها نظرة فتحيرت
… دقائق فكرى فى بديع صفاتها
فأوحى إليها الطرف أنى أحبها
… فأثر ذاك الوحى فى وجناتها
فالقول الجامع فى معنى الوحى اللغوى: أنه الإعلام الخفى السريع الخاص بمن يوجه إليه بحيث يخفى على غيره. ومنه الإلهام الغريزى كالوحى إلى النحل، وإلهام الخواطر بما يلقيه الله فى روع الإنسان السليم الفطرة الطاهر الروح كالوحى إلى أم موسى، ومنه ضده وهو وسوسة الشيطان، قال تعالى: وَإِنَّ الشَّياطِينَ لَيُوحُونَ إِلى أَوْلِيائِهِمْ
لِيُجادِلُوكُمْ
[الأنعام:
121]، وقال: وَكَذلِكَ جَعَلْنا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَياطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوراً [الأنعام: 112]، ووحى الله تعالى إلى أنبيائه قد روعى فيه المعنيان الأصليان لهذه المادة، وهما: الخفاء والسرعة. فهذا معنى المصدر، ويطلق على متعلقه وهو ما وقع به الوحى، أى: اسم المفعول، وهو ما أنزله تعالى على أنبيائه وعرفهم به من أنباء الغيب والشرائع والحكم، ومنهم من أعطاه كتابا، أى: تشريعا يكتب ومنهم من لم يعطه.
--------------------------------------------
প্রথম পরিচ্ছেদ: ওহি (وحي), নবুয়ত ও রিসালাতের মর্মার্থ বিশ্লেষণ, এগুলোর প্রতি মানবজাতির প্রয়োজনীয়তা ও এর মূলনীতিসমূহ এবং এ ক্ষেত্রে বুদ্ধি ও অর্জিত জ্ঞান যথেষ্ট না হওয়া প্রসঙ্গে। «১»
শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে ওহির (وحي) সংজ্ঞা:‘আল-আসাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘আওহা ইলাইহি’ (أوحى إليه) এবং ‘আওমা ইলাইহি’ (أومى إليه) একই অর্থ বহন করে। আর যখন আপনি অন্যের অগোচরে তার সাথে কথা বলেন, তখন বলা হয় ‘ওয়াহাইতু ইলাইহি’ (وحيت إليه) বা ‘আওহাইতু’ (أوحيت)। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের প্রতি ওহি (وحي) প্রেরণ করেছেন; (যেমন কুরআনে এসেছে:) “আর আপনার পালনকর্তা মৌমাছির প্রতি ওহি (أوحى) প্রেরণ করেছেন।” [আন-নাহল: ৬৮]।
ইমাম রাগের আল-ইসফাহানি বলেন: ওহির (الوحى) মূল অর্থ হলো দ্রুত ইঙ্গিত করা। দ্রুততার অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকায় একে ‘দ্রুত নির্দেশ’ (أمر وحى) বলা হয়। এটি ইশারা ও রূপকের মাধ্যমে হতে পারে, কখনো শব্দবিন্যাসহীন নিছক আওয়াজের মাধ্যমে হতে পারে, আবার কখনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারা বা লিপি বা লেখার মাধ্যমেও হতে পারে। হযরত জাকারিয়া (আ.) সম্পর্কে মহান আল্লাহর এই বাণীকে সেই অর্থেই গ্রহণ করা হয়েছে: “অতঃপর তিনি মেহরাব থেকে বের হয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আসলেন এবং তাদের প্রতি ওহি (فأوحى) অর্থাৎ ইঙ্গিত করলেন যে, তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো।” [মারইয়াম: ১১] ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনি তাদের প্রতি ইশারা করেছিলেন, কথা বলেননি। আর ‘আল-ওয়াহিয়্যু’ (الوحى) যার ‘ইয়া’ বর্ণে তাশদিদ রয়েছে, তার অর্থ হলো দ্রুতগামী। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারার মাধ্যমে ওহি (الوحى) তথা ইঙ্গিত বুঝাতে কবি বলেন:
আমি তার দিকে একপলক তাকালাম, অমনি আমার সূক্ষ্ম চিন্তাগুলো
… তার চমৎকার রূপমাধুর্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।
অতঃপর আমার দৃষ্টি তাকে ওহি (أوحى) অর্থাৎ ইশারায় জানালো যে আমি তাকে ভালোবাসি
… আর সেই ওহির (الوحى) প্রভাব তার কপোলে ফুটে উঠল।
সুতরাং ওহির (الوحى) শাব্দিক অর্থের সারসংক্ষেপ হলো: এটি এমন এক গোপন ও দ্রুত সংবাদ প্রদান যা নির্দিষ্টভাবে কেবল সম্বোধিত ব্যক্তির জন্যই হয়ে থাকে, যাতে অন্যরা তা জানতে না পারে। সহজাত প্রবৃত্তিগত ইলহামও (إلهام) এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন মৌমাছির প্রতি ওহি (الوحى)। আবার পবিত্র আত্মা ও সুস্থ স্বভাবের মানুষের অন্তরে আল্লাহ যে চিন্তার উদ্রেক করেন সেটিও এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন মুসা (আ.)-এর মায়ের প্রতি ওহি (الوحى)। এর বিপরীতটিও এর অন্তর্ভুক্ত, আর তা হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা। মহান আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদের প্রতি ওহি (ليوحون) তথা কুমন্ত্রণা পাঠায়
যাতে তারা তোমাদের সাথে বিতর্ক করতে পারে”
[আল-আনআম:
১২১]। তিনি আরও বলেন: “এভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদের শত্রু বানিয়েছি; তারা ধোঁকা দেওয়ার জন্য একে অপরের নিকট চাকচিক্যময় কথাবার্তা ওহি (يوحي) তথা গোপনে পৌঁছে দেয়।” [আল-আনআম: ১১২]। মহান আল্লাহ তাঁর নবীদের প্রতি যে ওহি (وحي) পাঠান, তাতে এই শব্দের দুটি মূল অর্থই অর্থাৎ ‘গোপনীয়তা’ ও ‘দ্রুততা’র প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এটি হলো এর মাসদার (مصدر) বা মূল ধাতুগত অর্থ। তবে এটি তার ‘মুতাআল্লাক’ অর্থাৎ ওহির মাধ্যমে যা নাযিল হয়েছে সেই বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়, যা মূলত ইসমে মাফউল (اسم المفعول)-এর অর্থ প্রদান করে। আর তা হলো সেই সব গায়েবি সংবাদ, শরিয়ত ও প্রজ্ঞা যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁদের জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কাউকে তিনি কিতাব অর্থাৎ লিখিত শরিয়ত দান করেছেন, আবার কাউকে তা দেননি।
--------------------------------------------
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৬)
والله تعالى يوحى إلى ملائكته ما يأمرهم بفعله كقوله: إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا [الأنفال: 12]، ويوحى إلى ملك الوحى ما يوحيه الملك إلى الرسول كقوله: فَأَوْحى إِلى عَبْدِهِ ما أَوْحى [النجم: 10]، أى: أوحى إلى عبده جبريل عليه السلام ما أوحى جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم.
وقال شيخنا الأستاذ الإمام فى رسالة التوحيد بعد تعريف الوحى لغة: «وقد عرفوه شرعا أنه إعلام الله تعالى لنبى من أنبيائه بحكم شرعى ونحوه»، أما نحن فنعرفه على شرطنا بأنه: عرفان يجده الشخص من نفسه مع اليقين بأنه من قبل الله بواسطة أو بغير واسطة، والأول بصوت يتمثل لسمعه أو بغير صوت. ويفرق بينه وبين الإلهام بأن الإلهام: وجدان تستيقنه النفس وتنساق إلى ما يطلب من غير شعور منها من أين أتى. وهو أشبه بوجدان الجوع والعطش والحزن والسرور.
هذا التعريف يشمل أنواع الوحى الثلاثة الواردة فى قول الله عز وجل: وَما كانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْياً أَوْ مِنْ وَراءِ حِجابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ ما يَشاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ [الشورى: 51] فالوحى هنا: إلقاء المعنى فى القلب، وقد يعبر عنه بالنفث فى الرّوع- وهو بالضم: القلب والخلد والخاطر، والكلام من وراء حجاب: هو أن يسمع كلام الله من حيث لا يراه كما سمع موسى عليه السلام النداء من وراء الشجرة، وأما الثالث: فهو ما يلقيه ملك الوحى المرسل من الله إلى رسول الله فيراه متمثلا بصورة رجل، أو غير متمثل، ويسمعه منه أو يعيه بقلبه.
وتعبيره يشمل- قبل التفرقة بينه وبين الإلهام- ما يسميه بعضهم بالوحى النفسى وهو الإلهام الفائض من استعداد النفس العالية، وقد أثبته بعض علماء الإفرنج لنبينا صلى الله عليه وسلم كغيره، فقالوا: إن محمدا يستحيل أن يكون كاذبا فيما دعا إليه من الدين القويم والشرع العادل والأدب السامى، وصوره من لا يؤمنون بعالم الغيب منهم أو باتصال عالم الشهادة به بأن معلوماته وأفكاره وآماله ولدت له إلهاما فاض من عقله الباطن أو نفسه الخفية الروحانية العالية على مخيلته السامية، وانعكس اعتقاده على بصره فرأى الملك ماثلا له، وعلى سمعه فوعى ما حدثه الملك به.
فصار الخلاف بيننا وبين هؤلاء فى كون الوحى الشرعى من خارج نفس النبى نازل عليها من السماء كما نعتقد، لا من داخلها فائضا منها كما يظنون، وفى وجود ملك روحانى مستقل نزل من عند الله عليه صلى الله عليه وسلم كما قال عز وجل: وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعالَمِينَ (192) نَزَلَ
মহান আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি সেই বিষয় প্রত্যাদেশ করেন যা তিনি তাদের করার নির্দেশ দেন, যেমন তাঁর বাণী: "স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী (وحي) পাঠান যে, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি, সুতরাং তোমরা মুমিনদের অবিচলিত রাখো" [আল-আনফাল: ১২]। এবং তিনি ওহীর ফেরেশতাকে সেই ওহী (وحي) প্রদান করেন যা ফেরেশতা রাসুলের নিকট পৌঁছে দেন, যেমন তাঁর বাণী: "অতঃপর তিনি তাঁর দাসের প্রতি যা ওহী (وحي) করার তা ওহী (وحي) করলেন" [আন-নাজম: ১০]। অর্থাৎ: তিনি তাঁর দাস জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি তা ওহী (وحي) করলেন যা জিবরাঈল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট ওহী (وحي) করেছেন।
আমাদের শায়খ উস্তাদ ইমাম তাঁর 'রিসালাতুত তাওহীদ' গ্রন্থে ওহীর আভিধানিক সংজ্ঞার পর বলেছেন: «শরিয়তের পরিভাষায় ওহীকে তারা এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যে, এটি কোনো শরয়ী বিধান বা অনুরূপ বিষয়ে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কোনো নবীকে অবহিত করা।» আর আমরা আমাদের শর্তানুযায়ী একে এভাবে সংজ্ঞায়িত করি যে: ওহী (وحي) হলো এমন এক বিশেষ জ্ঞান যা ব্যক্তি নিজের ভেতর থেকে লাভ করেন এবং সাথে এই দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেন যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মাধ্যম দ্বারা বা মাধ্যম ব্যতীত অর্জিত হয়েছে। প্রথম প্রকারটি কোনো ধ্বনির মাধ্যমে যা তার শ্রবণে মূর্ত হয়, অথবা ধ্বনিহীনভাবে। ওহী (وحي) ও অনুপ্রেরণা (إلهام)-এর মধ্যে পার্থক্য হলো—অনুপ্রেরণা (إلهام) হলো এমন এক অনুভূতি যা আত্মা নিশ্চিতভাবে অনুভব করে এবং যা চাওয়া হয়েছে তার দিকে ধাবিত হয়, অথচ তা কোথা থেকে এসেছে সে সম্পর্কে তার কোনো চেতনা থাকে না। এটি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুঃখ এবং আনন্দের অনুভূতির সাথে অধিক সদৃশ।
এই সংজ্ঞাটি মহান আল্লাহর বাণীতে বর্ণিত তিন প্রকারের ওহীকেই (وحي) অন্তর্ভুক্ত করে: "কোনো মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহী (وحي) মাধ্যম ব্যতীত, অথবা পর্দার আড়াল হতে অথবা তিনি কোনো দূত পাঠান, অতঃপর তিনি তাঁর অনুমতিক্রমে যা চান তা ওহী (وحي) করেন; নিশ্চয়ই তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাবান" [আশ-শুরা: ৫১]। এখানে ওহী (وحي) বলতে বুঝানো হয়েছে: অন্তরে অর্থ বা মর্ম নিহিত করা, যাকে কখনো অন্তরে ফুঁকে দেওয়া (النفث في الروع) দ্বারাও ব্যক্ত করা হয়— আর 'রু' (الروع) পেশ যোগে অর্থ হলো: অন্তর, মন ও অন্তঃকরণ। পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা বলতে বুঝায়: আল্লাহর কালাম শ্রবণ করা এমনভাবে যে তাঁকে দেখা যায় না, যেমনটি মুসা (আলাইহিস সালাম) গাছের আড়াল থেকে আহ্বান শুনেছিলেন। আর তৃতীয় প্রকারটি হলো: আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত ওহীর ফেরেশতা যা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে আসেন, যা তিনি কোনো ব্যক্তির আকৃতিতে মূর্ত দেখেন অথবা মূর্ত হওয়া ছাড়াও দেখেন, এবং তাঁর থেকে শোনেন অথবা নিজ হৃদয়ে তা গেঁথে নেন।
তাঁর এই বর্ণনা—অনুপ্রেরণা (إلهام)-এর সাথে পার্থক্য করার পূর্বে—সেটিকেও অন্তর্ভুক্ত করে যাকে কেউ কেউ 'মানসিক ওহী' বলে অভিহিত করেন। এটি হলো উচ্চতর আত্মার যোগ্যতা থেকে উৎসারিত অনুপ্রেরণা (إلهام)। ইউরোপীয় কিছু পণ্ডিত আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষেত্রে অন্যান্যদের মতো এটি সাব্যস্ত করেছেন। তারা বলেছেন: মুহাম্মদ যে সঠিক দ্বীন, ইনসাফপূর্ণ শরিয়ত এবং সুউচ্চ শিষ্টাচারের দিকে আহ্বান করেছেন, তাতে তাঁর মিথ্যাবাদী হওয়া অসম্ভব। তাদের মধ্যে যারা অদৃশ্যের জগত (عالم الغيب) বা তার সাথে দৃশ্যমান জগতের (عالم الشهادة) সংযোগে বিশ্বাস করেন না, তারা বিষয়টিকে এভাবে চিত্রায়িত করেছেন যে—তাঁর তথ্যসমূহ, চিন্তাধারা এবং আকাঙ্ক্ষাসমূহ তাঁর অবচেতন মন অথবা তাঁর সুউচ্চ আধ্যাত্মিক গোপন সত্তা থেকে তাঁর উন্নত কল্পনা শক্তিতে অনুপ্রেরণা (إلهام) হিসেবে জন্ম নিয়েছে। আর তাঁর এই বিশ্বাস তাঁর দৃষ্টিশক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে যার ফলে তিনি ফেরেশতাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান দেখেছেন, এবং শ্রবণশক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে যার ফলে ফেরেশতা তাঁর সাথে যা বলেছেন তা তিনি উপলব্ধি করেছেন।
সুতরাং আমাদের এবং তাদের মধ্যকার বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো—শরয়ী ওহী (وحي) নবীর আত্মার বাইরের জগত থেকে আকাশ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়, যেমনটি আমরা বিশ্বাস করি; তাদের ধারণা অনুযায়ী এটি তাঁর ভেতর থেকে উৎসারিত কোনো বিষয় নয়। এছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওপর অবতীর্ণ একজন স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক ফেরেশতার অস্তিত্বের বিষয়েও মতভেদ রয়েছে, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: "আর নিশ্চয়ই এটি বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ (১৯২), এটি নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে..."
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৭)
بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) عَلى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ (194) بِلِسانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ [الشعراء: 192 - 195] وفى تخيل الملك بزعمهم.
وسنشرح هذا الزعم ونبسط شبهاته ونبطلها، ونثبت أنّ هذا القرآن وحى من الله تعالى ينزل من فوق السموات العلى، لا يمكن أن يكون فائضا فى هذه الأرض من نفس محمد صلى الله عليه وسلم وهو موضوع كتابنا هذا.
وأعلم أيها القارئ أن تقسيم المتكلمين كلام الله تعالى إلى نفسى قديم قائم بذاته سبحانه ليس بحرف ولا صوت ولا ترتيب ولا لغة، وكلام لفظى هو المنزل على الأنبياء عليهم السلام، ومنه الكتب الأربعة، وخلافهم فى كونه مخلوقا أو غير مخلوق هو اصطلاح كله فلسفة وآراء نظرية مبتدعة، لم يرد به كتاب ولا سنة وهو تعرض للبحث التحليلى لذات الله تعالى وصفاته، ومثار للوسواس الشيطانى فيه فاجتنبه، واستعذ بالله منه، وحسبك أن تؤمن بأن الكلام صفة كمال تتعلق بكل ما يتعلق به العلم، إلا أن تعلق العلم عبارة عن انكشاف المعلومات للعالم، وتعلّق الكلام عبارة عن كشف العالم ما شاء من علمه لمن شاء، وأن الله تعالى متصف بكمال العلم والتعليم، وكمال الكلام والتكليم، وأن هذا وغيره مما وصف به نفسه فى كتابه لا ينافى كمال تنزيهه تعالى عما لا يليق به من نقائص عباده ولا يقتضى مماثلته لهم فيما وهبهم من كمال، فإن الاشتراك فى الأسماء لا يقتضى الاشتراك فى المسميات، وأسماء الأجناس المقولة بالتشكيك فى الممكنات تختلف من وجوه كثيرة منها النقص والكمال، فكيف بها إذا كانت مشتركة بين الخالق والمخلوقات؟ فذاته تعالى أكمل من ذواتهم، ووجوده أعلى من وجودهم، وصفاته أسمى من صفاتهم، وهو أعلم، ورسوله أعلم منهم بصفاته وأفعاله، فعليك أن تؤمن بما صح عنهما من إثبات ونفى، ومن غير زيادة ولا نقص، بلا تعطيل ولا تمثيل ولا تأويل، وليس عليك ولا لك أن تحكم رأيك وعقلك فى كنه ذاته ولا صفاته، ولا فى كيفية مناداته وتكليمه لرسله، ولا فى كنه ما هو قائم به، وما يصدر عنه، وعلى هذا كان أصحاب الرسول وعلماء التابعين، وأئمة الحديث والفقه، قبل ظهور بدعة المتكلمين.
তা নিয়ে বিশ্বস্ত আত্মা অবতীর্ণ হয়েছেন (১৯৩) আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন (১৯৪) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়। [আশ-শুআরা: ১৯২-১৯৫] এবং তাদের ধারণা অনুযায়ী ফেরেশতার কল্পনার মাধ্যমে।
আমরা অচিরেই এই ধারণার ব্যাখ্যা প্রদান করব এবং এর সংশয়গুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে তা খণ্ডন করব। আমরা প্রমাণ করব যে, এই কুরআন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহি, যা সুউচ্চ আসমানসমূহের ওপর থেকে অবতীর্ণ হয়। এটি কোনোভাবেই এই জমিনে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নফস থেকে উদ্ভূত হওয়া সম্ভব নয়; আর এটিই আমাদের এই কিতাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
হে পাঠক! জেনে রাখুন যে, মুতাকাল্লিমীনদের (ধর্মতত্ত্ববিদদের) আল্লাহর কালামকে ‘কালামে নাফসি’ (সত্তাভিত্তিক কালাম) — যা অনাদি এবং তাঁর সত্তার সাথে বিদ্যমান, যা কোনো অক্ষর, শব্দ, বিন্যাস বা ভাষা নয় — এবং ‘কালামে লাফযি’ (বাচনিক কালাম) — যা নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং চার কিতাব যার অন্তর্ভুক্ত — এই দুই ভাগে বিভক্ত করা; এবং তা সৃষ্টি কি না এ বিষয়ে তাদের মতভেদ মূলত সম্পূর্ণ দর্শননির্ভর পরিভাষা এবং নব-উদ্ভাবিত তাত্ত্বিক মতবাদ বা বিদআত (بدعة)। কিতাব কিংবা সুন্নাহয় এ সম্পর্কে কোনো বর্ণনা আসেনি। এটি মহান আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্মক গবেষণার একটি ক্ষেত্র এবং শয়তানি কুমন্ত্রণার উৎস; সুতরাং এটি বর্জন করুন এবং তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। আপনার জন্য এতটুকু বিশ্বাস করাই যথেষ্ট যে, কালাম (কথা বলা) আল্লাহর একটি পূর্ণাঙ্গ গুণ, যা ইলমের (জ্ঞান) সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের সাথেই সম্পৃক্ত। তবে ইলমের সম্পৃক্ততা হলো জ্ঞানীর কাছে জ্ঞাত বিষয়গুলো উন্মোচিত হওয়া, আর কালামের সম্পৃক্ততা হলো জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর জ্ঞান থেকে যা ইচ্ছা তা যার কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করা। মহান আল্লাহ পূর্ণ জ্ঞান ও শিক্ষাদান এবং পূর্ণ বাক ও কথোপকথনের গুণে গুণান্বিত। তিনি তাঁর কিতাবে নিজের যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, তা সৃষ্টির অপূর্ণতা থেকে তাঁর সুমহান পবিত্রতার পরিপন্থী নয় এবং এটি সৃষ্টির সাথে তাঁর সাদৃশ্যও দাবি করে না। কেননা, নামে মিল থাকলেই মূল সত্তায় মিল থাকা আবশ্যক নয়। সম্ভবপর বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে শ্রেণিগত নামসমূহ নানা দিক থেকে ভিন্ন হয়, যার মধ্যে পূর্ণতা ও অপূর্ণতাও রয়েছে। তাহলে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে যখন নামের মিল থাকে, তখন পার্থক্য কতটা প্রবল হবে? তাঁর সত্তা তাদের সত্তার চেয়ে অধিকতর পূর্ণ, তাঁর অস্তিত্ব তাদের অস্তিত্বের চেয়ে উচ্চতর এবং তাঁর গুণাবলি তাদের গুণাবলির চেয়েও মহিমান্বিত। তিনি এবং তাঁর রসূল তাঁর গুণাবলি ও কার্যাবলি সম্পর্কে তাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। সুতরাং আপনার কর্তব্য হলো, তাঁদের পক্ষ থেকে যা ইতিবাচকভাবে সাব্যস্ত বা নেতিবাচকভাবে অস্বীকৃত হয়েছে বলে সহিহ (صحيح) ভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তার ওপর কোনো প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়া এবং কোনো প্রকার অস্বীকার, সাদৃশ্য প্রদান কিংবা অপব্যাখ্যা ছাড়াই ঈমান আনা। আল্লাহর সত্তা বা গুণাবলির স্বরূপ নির্ধারণে, কিংবা তাঁর আহ্বান ও রসূলদের সাথে কথোপকথনের ধরন এবং তাঁর সত্তার স্বরূপ বা তাঁর থেকে যা প্রকাশিত হয় সে বিষয়ে নিজের যুক্তি বা বুদ্ধি প্রয়োগ করার কোনো অধিকার আপনার নেই। মুতাকাল্লিমীনদের বিদআত (بدعة) প্রকাশ পাওয়ার আগে রসূলের সাহাবীগণ, তাবেয়ীন উলামাবৃন্দ এবং হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের ইমামগণ এই আদর্শের ওপরই অটল ছিলেন।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৮)
النبى معناه لغة وشرعا والفرق بين الرسول وغيرهالنبيء فى اللغة العربية: وصف من النبأ، وهو الخبر المفيد لما له شأن مهم، ويصح فيه معنى الفاعل والمفعول، لأنه منبئ عن الله ومنبأ منه، والنبى بالتشديد أكثر استعمالا، أبدلت الهمزة فيه ياء، أو هو: من النبوة وهى الرفعة والشرف. ويطلق عند أهل الكتاب على الملهم الذى يخبر بشيء من أمور الغيب المستقبلة. وقيل إن معنى أصل مادته فى
العبرانية القديمة: المتكلم بصوت جهورى مطلقا، أو فى الأمور التشريعية، وهو عندنا: من أوحى الله إليه وحيا، فإن أمره بتبليغه كان رسولا، فكل رسول نبى، وما كان نبى رسولا، فقوله تعالى: ما كانَ مُحَمَّدٌ أَبا أَحَدٍ مِنْ رِجالِكُمْ وَلكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخاتَمَ النَّبِيِّينَ [الأحزاب:
40] يدل على انقطاع النبوة والرسالة معا بعد محمد صلى الله عليه وسلم، فكل من ادعى أو يدعى الوحى الشرعى من الله تعالى بعده فهو كاذب مضل، وقد ادعى النّبوة كثيرون فظهر كذبهم، ولم يأت أحد ادعى النبوة بعد محمد صلى الله عليه وسلم بشيء من الإصلاح الدينى الذى يحتاج إليه البشر، بل رأينا كتبهم وأقوالهم طافحة بمدح أنفسهم واللغو فى إطرائها ودعاويها الباطلة، التى يراد بها إخضاع العوام لهم واستعبادهم إياهم، كالذى نعهد فى الدجالين من مدعى الولاية ومعرفة الغيب والتصرف الروحانى فى نفع الناس وضرهم. ويدحض هذا وأمثاله ما بينه الله فى كتابه الحق من وظائف الرسل كافة، وخاتم النبيين خاصة، كما نراه فى موضعه من هذا الكتاب، وكذا ما علم بالتواتر من شمائله وأخلاقه صلى الله عليه وسلم من التواضع وكراهة الدعوى والإطراء والنهى عنه.
ويرى قارئ هذا الكتاب فيه أن ما جاء به صلى الله عليه وسلم من كتاب الله وما بينه به من سننه كاف شامل لكل ما يحتاج إليه البشر من هداية الدين لا يحتاجون إلى غيره.
নবী: এর আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ এবং রাসূল ও অন্যদের মধ্যে পার্থক্যআরবি ভাষায় 'নবী' শব্দটি 'নাবা' থেকে উদ্ভূত একটি বিশেষণ, যার অর্থ গুরুত্ববহ সংবাদ। এতে 'কর্তা' এবং 'কর্ম' উভয় অর্থই সঠিক হতে পারে; কারণ তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদানকারী এবং তাঁর পক্ষ থেকে সংবাদপ্রাপ্ত। 'তাশদীদ' যোগে 'নবী' শব্দটির ব্যবহারই অধিক প্রচলিত, যেখানে 'হামযা' বর্ণটিকে 'ইয়া' দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। অথবা এটি 'নুবুওয়াত' থেকে এসেছে, যার অর্থ উচ্চমর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব। আহলে কিতাবদের নিকট এটি এমন এক অনুপ্রাণিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যিনি ভবিষ্যতের অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে সংবাদ দেন। কেউ কেউ বলেছেন, প্রাচীন হিব্রু ভাষায় এর মূল উপাদানের অর্থ হলো:
সাধারণভাবে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা, অথবা শরয়ি বিধান সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলা। আর আমাদের নিকট নবী হলেন: যার প্রতি আল্লাহ তাআলা ওহি নাজিল করেছেন। অতঃপর যদি তাকে তা প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে তিনি একজন রাসূল। সুতরাং প্রত্যেক রাসূলই একজন নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। অতএব, মহান আল্লাহর বাণী: "মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।" [আল-আহযাব:
৪০] - এই আয়াতটি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে নবুওয়াত ও রিসালাত উভয়ই সমাপ্ত হওয়ার ওপর প্রমাণ পেশ করে। সুতরাং তাঁর পরে যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে শরয়ি ওহি-এর দাবি করেছে বা করবে, সে একজন মিথ্যাবাদী (كاذب) ও পথভ্রষ্টকারী। ইতঃপূর্বে অনেকেই নবুওয়াতের দাবি করেছে এবং তাদের মিথ্যাচার প্রকাশ পেয়েছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে নবুওয়াতের দাবিদার কেউই মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো দ্বীনি সংস্কার আনতে পারেনি। বরং আমরা দেখেছি যে, তাদের কিতাব ও বক্তব্যগুলো আত্মপ্রশংসা এবং অসার দম্ভ ও বাতিল দাবিতে পরিপূর্ণ; যার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে তাদের অনুগত করা ও দাসে পরিণত করা। যেমনটি আমরা তথাকথিত অলিত্বের দাবিদার, অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী এবং মানুষের উপকার ও অপকার করার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার দাবিদার দাজ্জাল বা প্রতারকদের মধ্যে দেখতে পাই। আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্য কিতাবে সমস্ত রাসূলদের এবং বিশেষ করে শেষ নবীর যে দায়িত্বসমূহ বর্ণনা করেছেন, তা এই জাতীয় সমস্ত দাবিকে খণ্ডন করে; যেমনটি আমরা এই কিতাবের সংশ্লিষ্ট স্থানে দেখতে পাব। অনুরূপভাবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিনয়, আত্মপ্রচার ও অতিপ্রশংসার প্রতি ঘৃণা এবং তা থেকে নিষেধ করার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো যা অবিচ্ছিন্ন জনশ্রুতি (متواتر) দ্বারা প্রমাণিত, তাও এসব দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
এই কিতাবের পাঠক দেখতে পাবেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কিতাব থেকে যা নিয়ে এসেছেন এবং তাঁর সুন্নাহর মাধ্যমে যা বর্ণনা করেছেন, তা মানবজাতির প্রয়োজনীয় দ্বীনি হিদায়াতের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা অন্য কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নয়।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ২৯)
حاجة البشر إلى الرسالة وأصول أديان الرسل الأساسيةوجه حاجة البشر إلى هداية الأنبياء عليهم السلام فى الجملة أن موضوع رسالتهم المقصود بالذات أو بقصد الأول ثلاثة أمور لا تستقل معارفهم المكتسبة بحواسهم وعقولهم بها، ولا يذعنون فيها إلا لأمر ربهم وخالقهم.
(أحدها) الإيمان بالغيب، ورأسه توحيد الله وصفاته وآياته الدالة على كماله وتنزهه عن النقص، وما يجب من عبادته وشكره وذكره الذى هو على ما تتزكى به النفس، وتتطهر من أدران مساويها، وتصل إلى الكمال المستعدة له بفطرتها. ويليه الإيمان بملائكته وما يناط بهم من الوحى، والنظام فى الخلق والأمر، ويجب الوقوف فى ذلك عند ما ورد به النص.
ومما أخبر به الأنبياء من أمر عالم الغيب (الجن والشياطين) وأن ما يجده الناس فى أنفسهم من خواطر السوء، وتقوية دواعى الشر والباطل فهو من وسواس الشياطين، وحكمة إعلامهم بذلك إرشادهم إلى محاسبة أنفسهم على خواطرها، والتمييز بين حقها وباطلها، وخيرها وشرها، فهو أكبر معين لهم على تربيتها وتزكيتها- وقد وضحناه بالدلائل فى تفسيرنا- وضربنا له المثل بعوالم الجنّة المادية التى تسمى بالميكروبات، وكون تأثيرها فى الأجسام كتأثير الشياطين فى الأرواح، وقد مر على البشر الألوف الكثيرة من السنين وهم يجهلونها على ما لها من التأثير العظيم فى صحتهم وأمراضهم، وطعامهم وشرابهم، حتى كشفوها فى هذا العصر، ولو حاسب الناس أنفسهم على خواطرهم السوأى اتقاء لوسوسة الشياطين كما يتقون ميكروبات الأمراض لحفظ أبدانهم لكان تأثير هذه التقوى لحفظ الأنفس من الشر والفساد أعظم من تأثير تلك الوقاية فى حفظ الأجساد من الأمراض.
وقد كشف بعض الماديين فى القرن الثامن عشر أن للبشر أرواحا مستقلة كما أخبرهم الأنبياء، ووجدوا وسيلة لإدراك بعض الجنة غير المادية، وهو ما يعتقدون أنه من أرواح الموتى والراجح عندنا أن أكثرها من أرواح شياطينهم، ولا يتسع هذا الفصل لبيان الحق فى هذه المسألة التى لا تزال موضع الخلاف بين الناس، وإنما المراد هنا تعريف موضوع الرسالة بالإجمال.
ঐশী বার্তার প্রতি মানবজাতির প্রয়োজনীয়তা এবং রাসূলগণের ধর্মের মৌলিক নীতিমালাসাধারণভাবে নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) হেদায়েতের প্রতি মানবজাতির প্রয়োজনীয়তার দিকটি হলো এই যে, তাঁদের রিসালাতের মূল লক্ষ্য বা প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো এমন তিনটি বিষয়, যা মানুষ তাদের ইন্দ্রিয়জাত বা বুদ্ধিভিত্তিক অর্জিত জ্ঞান দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম নয় এবং এ ক্ষেত্রে তারা তাদের রব ও সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি আত্মসমর্পণ করে না।
(প্রথমত) অদৃশ্য (الغيب) বিষয়ের ওপর ঈমান আনা, যার মূল হলো আল্লাহর একত্ববাদ (توحيد), তাঁর গুণাবলি এবং তাঁর পূর্ণতা ও সকল ত্রুটি থেকে পবিত্রতার প্রমাণ বহনকারী নিদর্শনসমূহ। আর সেই সাথে তাঁর ইবাদত, শোকর ও জিকিরের আবশ্যকতা, যার মাধ্যমে নফস বা আত্মা পরিশুদ্ধ (تزكية) হয়, স্বীয় কলুষতা থেকে পবিত্র হয় এবং আপন ফিতরাত বা স্বভাবজাত যোগ্যতার ভিত্তিতে পূর্ণতায় আসীন হয়। এরই সাথে ফেরেশতাদের ওপর ঈমান এবং ওহি (الوحي) ও সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা এবং নির্দেশনার ক্ষেত্রে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। এক্ষেত্রে নস (النص) বা অকাট্য দলিলে যা বর্ণিত হয়েছে, তার ওপরই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক।
নবীরা অদৃশ্যের জগত (عالم الغيب) সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো জিন (الجن) ও শয়তান (الشياطين)। মানুষ তাদের অন্তরে যে মন্দ চিন্তার উদ্রেক এবং মন্দ ও বাতিলের প্রতি আগ্রহের প্রাবল্য অনুভব করে, তা মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণা (وسوسة)। মানুষকে এই বিষয়ে অবহিত করার হিকমত বা প্রজ্ঞা হলো, যেন তারা তাদের অন্তরের কুচিন্তা সম্পর্কে আত্ম-সমালোচনা বা হিসাব গ্রহণে (محاسبة) অভ্যস্ত হয় এবং সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। এটি নফসের তরবিয়ত বা লালন এবং পরিশুদ্ধির (تزكية) ক্ষেত্রে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক—যা আমরা আমাদের তাফসিরে দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছি। আমরা এর জন্য জড় জগতের জিনের (الجن) উদাহরণ দিয়েছি যা 'মাইক্রোব' বা অণুজীব নামে পরিচিত। শরীরে এদের প্রভাব ঠিক তেমন, যেমন আত্মায় শয়তানের প্রভাব। মানবজাতি হাজার হাজার বছর অতিক্রম করেছে অথচ তারা এই অণুজীবগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, যদিও তাদের স্বাস্থ্য, রোগবালাই এবং পানাহারের ওপর এগুলোর ব্যাপক প্রভাব ছিল; এমনকি এই যুগে এসে তারা তা আবিষ্কার করেছে। মানুষ যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা (وسوسة) থেকে বাঁচতে নিজেদের কুচিন্তার হিসাব নিত, যেমনটা তারা নিজেদের শরীর রক্ষার্থে রোগজীবাণু থেকে বেঁচে থাকে, তবে মন্দ ও ফাসাদ থেকে নফসকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই তাকওয়া বা পরহেজগারির প্রভাব রোগব্যাধি থেকে শরীর রক্ষার প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতো।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে কিছু বস্তুবাদী আবিষ্কার করেছেন যে, নবীদের সংবাদ অনুযায়ী মানুষের স্বতন্ত্র রুহ বা আত্মা রয়েছে। তারা অভৌত বা অশরীরী জিনদের (الجن) অনুধাবনের এক মাধ্যম খুঁজে পেয়েছেন, যাকে তারা মৃত ব্যক্তিদের আত্মা বলে বিশ্বাস করেন। তবে আমাদের নিকট অধিকতর সঠিক মত হলো, এগুলোর অধিকাংশই তাদের শয়তানদের (الشياطين) আত্মা। মানুষের মধ্যে এখনও মতভেদ বিদ্যমান থাকা এই বিষয়ের প্রকৃত রূপ ব্যাখ্যার জন্য এই পরিচ্ছেদটি যথেষ্ট নয়; বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো রিসালাতের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেওয়া।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৩০)
المشهور: أن أرقى البشر عقلا ورأيا فى شئون العالم رجال السياسة الدولية فى الغرب، وإنك لتجد غاية سياستهم أن يسخروا ثروة شعوبهم ونتائج علومها وفنونها لعداوة بعضهم لبعض، وإعدادها للتقتيل والتدمير. أليست هذه السياسة الشيطانية مصداقا لقول الله تعالى فيهم: تَاللَّهِ لَقَدْ أَرْسَلْنا إِلى أُمَمٍ مِنْ قَبْلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطانُ أَعْمالَهُمْ فَهُوَ وَلِيُّهُمُ الْيَوْمَ وَلَهُمْ عَذابٌ أَلِيمٌ (63) وَما أَنْزَلْنا عَلَيْكَ الْكِتابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ وَهُدىً وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ [النحل: 63، 64].
(ثانيها) ما يجب اعتقاده من البعث بعد الموت والحساب، والجزاء على الإيمان والأعمال، وهو أكبر البواعث- بعد الإيمان بالله ومعرفته- على اتباع ما شرعه من اتباع الحق، وإقامة العدل، وأعمال البر والخير، والصدود عن أضدادها.
(ثالثها) وضع حدود وأصول للأعمال التشريعية المشار إليها لا مجال للآراء والأهواء فيها، لتكون جامعة للكلمة، مانعة من التفرقة، متبعة فى السر والعلانية.
وجملة القول: أن تهذيب البشر بالدين مبنى على الإيمان بالغيب والوقوف فيه عند خبر الأنبياء عليهم السلام، ولا يمكن تهذيبهم بالعلوم المادية الكسبية وحدها وهو ما نكرر بيانه فى هذا الكتاب.
সুপ্রসিদ্ধ যে, জাগতিক বিষয়াবলীতে প্রজ্ঞা ও মতামতের দিক থেকে মানবজাতির মধ্যে সর্বোন্নত স্তরের ব্যক্তিরা হলেন পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকরা; অথচ আপনি দেখতে পাবেন যে, তাদের রাজনীতির পরম লক্ষ্য হলো তাদের জাতিসমূহের সম্পদ এবং তাদের বিজ্ঞান ও শিল্পের উৎকর্ষকে একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ এবং একে অপরকে হত্যা ও ধ্বংস করার প্রস্তুতিতে নিয়োজিত করা। এই শয়তানি রাজনীতি কি তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহর এই বাণীর সত্যতা নিশ্চিত করে না: "আল্লাহর কসম, অবশ্যই আমি তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছিলাম, অতঃপর শয়তান তাদের নিকট তাদের কর্মসমূহকে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল; ফলে আজ সে-ই তাদের অভিভাবক এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আমি তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি কেবল এ জন্য যে, তারা যে বিষয়ে মতভেদ করছে তা তুমি তাদের নিকট সুস্পষ্ট করে দেবে এবং এটি মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও রহমত।" [নাহল: ৬৩, ৬৪]।
(দ্বিতীয়ত) মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং ঈমান ও আমলের প্রতিদান সম্পর্কে যা বিশ্বাস করা অপরিহার্য; আর এটিই—আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর পরিচয় লাভের পর—তাঁর প্রবর্তিত সত্যের অনুসরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, পুণ্য ও কল্যাণকর কাজ সম্পাদন এবং এগুলোর বিপরীত বিষয়সমূহ থেকে বিমুখ থাকার ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ অনুপ্রেরণা।
(তৃতীয়ত) উল্লেখিত বিধানগত কার্যাবলীর জন্য এমন কিছু সীমারেখা ও মূলনীতি (أصول) নির্ধারণ করা, যেখানে ব্যক্তিগত মতামত ও খেয়াল-খুশির কোনো স্থান নেই; যেন তা ঐক্যের সংহতি দানকারী ও বিভেদের প্রতিবন্ধক হয় এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে অনুসরণীয় হয়।
সারকথা হলো: দ্বীনের মাধ্যমে মানুষের চরিত্র সংশোধন অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস এবং এ ক্ষেত্রে নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) সংবাদের (خبر) ওপর সীমাবদ্ধ থাকার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কেবল অর্জিত জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সংস্কার করা সম্ভব নয়—যা আমরা এই কিতাবে বারবার ব্যাখ্যা করছি।
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৩১)
عصمة الأنبياءإذا كان إرسال الأنبياء إلى البشر لأجل هدايتهم إلى تزكية أنفسهم بما تصلح به أحوالهم فى دنياهم، ويستعدون به الحياة أعلى من هذه الحياة الدنيا فى نشأة أخرى، فلا يتم هذا الغرض ولا تتحقق هذه الحكمة إلا إذا كان هؤلاء الأنبياء أهلا لأن يقتدى بهم فى أعمالهم وسيرتهم، والتزام الشرائع والآداب التى يبلغونها عن ربهم، ومن ثم قال علماؤنا بوجوب عصمة الأنبياء من المعاصى والرذائل، وبالغ بعضهم فيها حتى قالوا بعصمتهم من الذنوب الصغائر كالكبائر قبل النبوة وبعدها، وخصّ بعضهم العصمة من الصغائر بما كان باعثه الخسة والدناءة.
وأهل الكتاب لا يقولون بهذه العصمة، وكتبهم المقدسة ترمى بعض كبار الأنبياء بكبار الفواحش المنافية لحسن الأسوة، بل المجرئة على الشرور والمفاسد.
والنصارى منهم يجعلون معاصى الأنبياء دليلا على عقيدتهم وهى أن المسيح هو المعصوم وحده لأنه رب وإله، ولأنه هو المخلص للناس من العقاب على الخطيئة اللازبة اللازمة لكل ذرية آدم بالوراثة له، وأنه لا شفيع ولا مخلص لهم غيره؛ لأن المخطئ لا يخلص المخطئين وهو منهم، وهذه العقيدة وثنية مخالفة لدين الأنبياء وكتبهم وللعقل، ومطابقة للأديان الوثنية الهندية وغيرها.
بيد أنّ كتب العهدين القديم والجديد المقدسة عندهم المحرفة فى اعتقادنا لا تشهد لهم برمى جميع أنبيائها بالذنوب فضلا عن المعاصى التى هى أشد من الذنوب، فإن يوحنا المعمدان (هو يحيى بن زكريا عليهما السلام لم يوصم بخطيئة قط. بل شهدت له أناجيلهم بما يدل على أنه كان أعظم من المسيح فى عصمته، ففي إنجيل لوقا (1: 65 إنه يكون عظيما أمام الرب، وخمرا ومسكرا لا يشرب، ومن بطن أمه يمتلئ بروح القدس) وفيه «كانت يد الرب معه»، وقال المسيح فيه: «متى 11: 11 الحق أقول لكم إنه لم يقم بين المولدين من النساء أعظم من يوحنا المعمدان»، ثم قال فيه: «18 جاء يوحنا لا يأكل ولا يشرب فيقولون فيه شيطان 19 وجاء ابن الإنسان يأكل ويشرب فيقولون: هو ذا إنسان أكول، وشريب خمر، محب للعشارين والخطاة».
নবীদের নিষ্পাপতাযদি মানবজাতির নিকট নবীগণের প্রেরণের উদ্দেশ্য হয় তাঁদেরকে এমন আত্মশুদ্ধির দিকে পরিচালিত করা যার মাধ্যমে তাঁদের পার্থিব জীবন সংশোধিত হয় এবং তাঁরা পরকালীন জীবনের এক উচ্চতর স্তরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন, তবে এই উদ্দেশ্য ও প্রজ্ঞা ততক্ষণ সফল হবে না এবং বাস্তবায়িত হবে না, যতক্ষণ না এই নবীগণ তাঁদের কর্ম ও সচ্চরিত্রের ক্ষেত্রে অনুসরণের যোগ্য আদর্শ হিসেবে গণ্য হন এবং তাঁদের রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত শরিয়ত ও শিষ্টাচার পালনে দায়বদ্ধ থাকেন। এই কারণেই আমাদের উলামায়ে কেরাম পাপাচার ও চারিত্রিক স্খলন থেকে নবীদের নিষ্পাপ হওয়া ওয়াজিব বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এ বিষয়ে এতটা গুরুত্বারোপ করেছেন যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে বড় গুনাহের ন্যায় ছোট গুনাহ থেকেও তাঁদের নিষ্পাপ থাকার কথা বলেছেন। আবার কেউ কেউ ছোট গুনাহ থেকে নিষ্পাপ থাকার বিষয়টিকে সেই সব কার্যের সাথে সুনির্দিষ্ট করেছেন যার মূলে রয়েছে হীনতা ও নীচতা।
আহলে কিতাবগণ এই নিষ্পাপতায় বিশ্বাস করে না; বরং তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ মহান নবীদের ওপর এমন সব জঘন্য পাপাচারের অপবাদ আরোপ করে যা সর্বোত্তম আদর্শের পরিপন্থী, এমনকি তা মানুষকে মন্দ কাজ ও ফাসাদের দিকে প্ররোচিত করে।
তাদের অন্তর্ভুক্ত খ্রিস্টান সম্প্রদায় নবীদের এই পাপাচারসমূহকে তাদের আকিদার দলিল হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের সেই আকিদা হলো—কেবল মসীহ-ই একমাত্র নিষ্পাপ, কারণ তিনি প্রভু ও ঈশ্বর। আর তিনিই মানুষকে সেই আদি পাপ থেকে মুক্তিদাতা, যা উত্তরাধিকার সূত্রে আদমের প্রতিটি সন্তানের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে। তাদের মতে, তিনি ছাড়া আর কোনো সুপারিশকারী বা মুক্তিদাতা নেই; কারণ একজন অপরাধী অন্য অপরাধীদের মুক্ত করতে পারে না যেহেতু সে নিজেও তাদের অন্তর্ভুক্ত। এই আকিদাটি একটি পৌত্তলিক বিশ্বাস যা নবীদের দ্বীন, তাঁদের কিতাব এবং বিচারবুদ্ধির পরিপন্থী; বরং এটি ভারতীয় ও অন্যান্য পৌত্তলিক ধর্মের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
তবে তাদের নিকট পবিত্র হিসেবে গণ্য ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্ট (যা আমাদের বিশ্বাস মতে বিকৃত) তাদের সকল নবীর প্রতি গুনাহের অভিযোগ উত্থাপনের সাক্ষ্য দেয় না; পাপাচারের তো প্রশ্নই আসে না যা সাধারণ গুনাহের চেয়েও গুরুতর। কেননা ইউহান্না আল-মামাদান (তিনি হলেন ইয়াহইয়া ইবনে জাকারিয়া আলাইহিমাস সালাম) কখনোই কোনো পাপে কলঙ্কিত হননি। বরং তাদের ইঞ্জিলসমূহ তাঁর সম্পর্কে এমন সাক্ষ্য প্রদান করে যা তাঁর নিষ্পাপতার ক্ষেত্রে তাঁকে মসীহ-এর চেয়েও মহান হিসেবে সাব্যস্ত করে। লুক লিখিত সুসমাচারে (১: ১৫) বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি প্রভুর সম্মুখে মহান হবেন, দ্রাক্ষারস ও মদিরা পান করবেন না এবং মাতৃগর্ভ থেকেই পবিত্র আত্মায় পূর্ণ হবেন। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ‘প্রভুর হাত তাঁর সঙ্গে ছিল’। মসীহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: ‘মথি ১১: ১১—আমি তোমাদের সত্য বলছি, যারা নারী থেকে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে বাপ্তিস্মদাতা ইউহান্নার চেয়ে মহান কেউ আবির্ভূত হয়নি’। পুনরায় তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘১৮—ইউহান্না আসলেন, তিনি আহার বা পান করতেন না, তাই তারা বলে তাঁর ওপর শয়তান ভর করেছে। ১৯—আর মানবপুত্র আসলেন, তিনি আহার ও পান করেন, তাই তারা বলে: দেখো, এক পেটুক ও মদ্যপ ব্যক্তি, করগ্রাহক ও পাপীদের বন্ধু।’
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৩২)
بل شهدت الأناجيل أن المسيح عليه السلام أهان أمه وإخوته ولم يسمح لهم بلقائه، وقد استأذنوا عليه ليكلموه، وعلل ذلك بأنهم مخالفون لمشيئة أبيه كما تراه فى آخر الفصل الثانى عشر من إنجيل متى وآخر الثالث من مرقس بالمعنى. وعبارة لوقا (8: 20 فأخبروه قائلين: أمك وإخوتك واقفون خارجا يريدون أن يروك 21 فأجاب وقال لهم أمى وإخوتى هم الذين يسمعون كلمة الله ويعملون بها)، نعم إن إخوته لم يكونوا يؤمنون به كما هو مصرح به فى موضع آخر، ولكن هل كانت أمه كذلك؟ وهل يجازيها هذا الجزاء؟ والله تعالى يوصى بالإحسان بالوالدين حتى المشركين ويفضل أمّ السيد المسيح على نساء العالمين.
وإهانة الأم ذنب فى جميع الشرائع والآداب، كما أن المبالغة فى شرب الخمر ذنب حتى فى الشرائع التى لم تحرمها مطلقا، وجاء فى هذه الأناجيل أن الشيطان استولى عليه أربعين يوما يجربه ويدعوه إلى عبادته، كما تراه فى أول الفصل الرابع من إنجيل متى. وكذا فى غيره من الأناجيل. ونحن نبرئه من كل ذلك.
وشهدت الأناجيل أيضا بأنّ يوحنا كان يعمد الناس للتوبة ومغفرة الخطايا وأنه عمد المسيح نفسه، وبأن أباه زكريا وأمه اليصابات «وكان كلاهما بارين أمام الله سالكين فى جميع وصايا الرب وأحكامه بلا لوم» (لوقا 1: 6) وهذه شهادة بالعصمة التامة.
وهنالك أنبياء آخرون شهدت لهم نبوات العهد القديم بالبر ولم ينسب إلى أحد منهم أدنى خطيئة، وآدم عند ما ارتكب الخطيئة لم يكن نبيا مرسلا إلى أحد ولا كان معه قوم يسيئون الاقتداء به. وكان قد نسى النهى عن الأكل من الشجرة، وإنما كانت مثلا لاستعداد جنس البشر للمعصية كالطاعة، نسيانا أو عمدا، ولكون المعصية تعالج بالتوبة فيغفرها الله تعالى، وقد كان ابناه قابيل وهابيل مثلا لكل من الاستعدادين، وشهد الكتاب عندهم لهابيل بأنه كان بارا لم يرتكب خطيئة، وهو لم يكن نبيا.
جاء القرآن وهو المهيمن على جميع الكتب الإلهية بما لخصناه من الحق فى مسألة آدم وشهد لمن قص علينا خبرهم من أنبياء الله ورسله أنهم كانوا من الصالحين الذين يقتدى بهم فى البرّ والتقوى، كقوله فى سورتهم: وَجَعَلْناهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنا وَأَوْحَيْنا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْراتِ وَإِقامَ الصَّلاةِ وَإِيتاءَ الزَّكاةِ وَكانُوا لَنا عابِدِينَ [الأنبياء: 73]، وقال فيهم بعد ذكر أشهرهم: أُولئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُداهُمُ اقْتَدِهْ [الأنعام: 90].
وأما قوله لخاتمهم ومكمل هدايتهم: إِنَّا فَتَحْنا لَكَ فَتْحاً مُبِيناً (1) لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ ما تَقَدَّمَ
বরং ইঞ্জিলসমূহ সাক্ষ্য দেয় যে, মসীহ আলাইহিস সালাম তাঁর মাতা ও ভাইদের অবজ্ঞা করেছেন এবং তাঁদের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দেননি, অথচ তাঁরা তাঁর সাথে কথা বলার জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। তিনি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা তাঁর পিতার ইচ্ছার পরিপন্থী; যেমনটি মথি লিখিত ইঞ্জিলের দ্বাদশ অধ্যায়ের শেষে এবং মার্ক লিখিত ইঞ্জিলের তৃতীয় অধ্যায়ের শেষে মর্মগতভাবে দেখা যায়। লূক লিখিত ইঞ্জিলের বর্ণনা (৮:২০-২১) হলো: "তাঁকে জানানো হলো, আপনার মাতা ও ভাইয়েরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন এবং আপনার সাথে দেখা করতে চান। তিনি উত্তরে তাঁদের বললেন, আমার মা ও ভাইয়েরা তাঁরাই, যাঁরা আল্লাহর বাণী শোনেন ও তা পালন করেন।" হ্যাঁ, তাঁর ভাইয়েরা তাঁর ওপর ঈমান আনেনি যেমনটি অন্য স্থানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাঁর মা-ও কি তেমন ছিলেন? আর তিনি কি তাঁর মাতাকে এই প্রতিদান দেবেন? অথচ আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি তাঁরা মুশরিক হলেও; আর তিনি মসীহ আলাইহিস সালামের মাতাকে বিশ্বজগতের নারীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
মাতার অবমাননা করা সকল শরিয়ত ও শিষ্টাচারেই পাপ হিসেবে গণ্য, যেমনটি মদ্যপানে বাড়াবাড়ি করাও পাপ, এমনকি সেই সকল শরিয়তেও যা একে পুরোপুরি হারাম করেনি। এই ইঞ্জিলসমূহে এসেছে যে, শয়তান তাঁর ওপর চল্লিশ দিন কর্তৃত্ব করেছিল, তাঁকে প্ররোচিত করেছিল এবং তাকে উপাসনা করার আহ্বান জানিয়েছিল; যেমনটি মথি লিখিত ইঞ্জিলের চতুর্থ অধ্যায়ের শুরুতে এবং অন্যান্য ইঞ্জিলেও দেখা যায়। আমরা তাঁকে এসকল বিষয় থেকে মুক্ত মনে করি।
ইঞ্জিলসমূহ আরও সাক্ষ্য দেয় যে, যোহন (ইয়াহইয়া) মানুষকে তওবা এবং পাপমুক্তির জন্য বাপ্তিস্ম দিতেন এবং তিনি স্বয়ং মসীহকেও বাপ্তিস্ম দিয়েছিলেন। আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর পিতা জাকারিয়া ও মাতা ইলিশাবেত (এলিজাবেথ) "উভয়ই আল্লাহর সম্মুখে ধার্মিক ছিলেন এবং প্রভুর সমস্ত আজ্ঞা ও বিধিপালনে নির্দোষভাবে চলতেন" (লূক ১:৬)। এটি পূর্ণ নিষ্পাপতা (عصمة)-এর সাক্ষ্য।
সেখানে আরও অনেক নবী রয়েছেন যাদের ব্যাপারে পুরাতন নিয়মের ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ পুণ্যবত্তার সাক্ষ্য দিয়েছে এবং তাঁদের কারোর প্রতি সামান্যতম পাপও আরোপ করা হয়নি। আদম আলাইহিস সালাম যখন পাপে লিপ্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি কারও নিকট প্রেরিত নবী (نبي مرسل) ছিলেন না এবং তাঁর সাথে এমন কোনো কওম ছিল না যারা তাঁর মন্দ অনুসরণ করতে পারত। তিনি মূলত গাছ থেকে ফল খাওয়ার নিষেধাজ্ঞাটি ভুলে গিয়েছিলেন। মূলত এটি ছিল আনুগত্যের ন্যায় অবাধ্যতার প্রতিও মানবজাতির স্বাভাবিক প্রবণতার একটি দৃষ্টান্ত, তা ভুলবশত হোক বা ইচ্ছাকৃত; এবং এই শিক্ষা দেওয়া যে অবাধ্যতা তওবার মাধ্যমে সংশোধন করা যায় এবং আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেন। তাঁর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিল এই দুই প্রবণতারই উদাহরণ ছিলেন। তাঁদের কিতাব হাবিলের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয় যে তিনি পুণ্যবান ছিলেন এবং কোনো পাপ করেননি, অথচ তিনি নবী ছিলেন না।
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে যা সমস্ত আসমানি কিতাবের ওপর রক্ষণাবেক্ষণকারী ও মানদণ্ড (المهيمن)। আদম আলাইহিস সালামের বিষয়ে আমরা যা সারসংক্ষেপ করেছি, এটি সেই সত্য নিয়ে এসেছে এবং আল্লাহর সেই সকল নবী ও রাসুলদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে যাঁদের সংবাদ আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাঁরা সৎকর্মশীল (صالحين) ছিলেন, যাঁদের পুণ্য (بر) ও তাকওয়া (تقوى)-এর ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়। যেমন তাঁদের সম্পর্কে তাঁদের সংশ্লিষ্ট সুরায় বলা হয়েছে: "এবং আমি তাঁদেরকে নেতা (أئمة) করেছিলাম, যাঁরা আমার নির্দেশানুসারে পথপ্রদর্শন করতেন; আমি তাঁদেরকে সৎকাজ করার, নামাজ কায়েম (إقام الصلاة) করার ও জাকাত প্রদান (إيتاء الزكاة) করার ওহি (أوحينا) পাঠিয়েছিলাম এবং তাঁরা আমারই ইবাদতকারী ছিলেন" [আল-আম্বিয়া: ৭৩]। তাঁদের মধ্যকার প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের আলোচনার পর আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেন: "তাঁদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন, সুতরাং আপনি তাঁদের হিদায়াত বা পথ অনুসরণ (اقتدِه) করুন" [আল-আনআম: ৯০]।
আর তাঁদের মোহর (خاتم) এবং হিদায়াতের পূর্ণতাদানকারীর প্রতি তাঁর বাণী: "নিশ্চয় আমি আপনার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যাতে আল্লাহ আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যা কিছু..."
(খণ্ড: ১)
আল-ওয়াহিউল মুহাম্মদী
(পৃষ্ঠা: ৩৩)
مِنْ ذَنْبِكَ وَما تَأَخَّرَ [الفتح: 1، 2] إلخ، وقوله: وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِناتِ [محمد: 19]، فالذنب فيه جاء على أصل معناه اللغوى المشتق من ذنب الدابة، وهو كل عمل له عاقبة ضارة أو منافية للمصلحة، أو لما هو أولى وأنفع، ويدخل فيه الاجتهاد فى الرأى المباح شرعا كإذن النبى صلى الله عليه وسلم لمن استأذنه من المنافقين فى التخلف عن غزوة تبوك وعاتبه الله عليه بقوله: عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكاذِبِينَ «1» [التوبة: 43]، وإنما المعصية للأنبياء من معصية الله بمخالفة وحيه إليهم، إذ لو عصوه لكان أتباعهم مأمورين من الله بالمعصية لأنه أمرهم باتباعهم، وقال تعالى فى نبينا صلى الله عليه وسلم: لَقَدْ كانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيراً [الأحزاب: 21].
--------------------------------------------
...আপনার বিগত এবং অনাগত ত্রুটিসমূহ [আল-ফাতহ: ১, ২] ইত্যাদি, এবং মহান আল্লাহর বাণী: "এবং ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য" [মুহাম্মদ: ১৯]। এখানে ‘ত্রুটি’ (ذنب) শব্দটি তার মূল ভাষাতাত্ত্বিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যা পশুর লেজ (ذنب) শব্দ থেকে উদ্ভূত; আর তা হলো এমন প্রতিটি কাজ যার পরিণতি ক্ষতিকর অথবা যা জনস্বার্থের পরিপন্থী, কিংবা যা অধিকতর উত্তম ও উপকারী বিষয়ের বিপরীত। এর অন্তর্ভুক্ত হলো শরিয়তসম্মত বৈধ (مباح) মতামতের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ (اجتهاد) করা, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার জন্য মুনাফিকদের মধ্য থেকে যারা অনুমতি চেয়েছিল তাদের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে তাঁকে অনুযোগ করে বলেছিলেন: "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন; কেন আপনি তাদের অনুমতি দিলেন, যে পর্যন্ত না আপনার কাছে সত্যবাদীরা স্পষ্ট হতো এবং আপনি মিথ্যাবাদীদের জেনে নিতেন" (১) [আত-তাওবাহ: ৪৩]। মূলত নবীদের ক্ষেত্রে অবাধ্যতা (معصية) বলতে আল্লাহর ওহির (وحي) বিরোধিতার মাধ্যমে তাঁর অবাধ্য হওয়াকে বোঝায়। কেননা তাঁরা যদি আল্লাহর অবাধ্য হতেন, তবে তাঁদের অনুসারীরাও আল্লাহর পক্ষ থেকে অবাধ্য হওয়ার নির্দেশপ্রাপ্ত হতো, যেহেতু তিনি তাঁদের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ" [আল-আহজাব: ২১]।
--------------------------------------------