القسم: شروح الحديث
الكتاب: مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح
المؤلف: علي بن (سلطان) محمد، أبو الحسن نور الدين الملا الهروي القاري (ت 1014هـ)
الناشر: دار الفكر، بيروت - لبنان
الطبعة: الأولى، 1422هـ - 2002م
عدد الأجزاء: 9
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহ
গ্রন্থ: মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ
লেখক: আলী বিন (সুলতান) মুহাম্মদ، আবুল হাসান নূরুদ্দীন মোল্লা আল-হারাবী আল-কারী (মৃত্যু ১০১৪ হি.)
প্রকাশক: দারুল ফিকর، বৈরুত - লেবানন
সংস্করণ: প্রথম، ১৪২২ হি. - ২০০২ খ্রি.
খণ্ড সংখ্যা: ৯
[গ্রন্থের পৃষ্ঠা নম্বর মুদ্রণ কপির অনুরূপ]
শামিলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
"যে ব্যক্তি ইস্তিখারা (আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা) করে সে নিরাশ হয় না, যে পরামর্শ করে সে লজ্জিত হয় না এবং যে মিতব্যয়ী হয় সে অভাবগ্রস্ত হয় না।" আর যেহেতু বান্দা তার ভাল-মন্দ সম্পর্কে অবগত নয়, তাই আল্লাহ তাআলা বলেন: {হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তো তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।} [আল-বাকারা: ২১৬] আর আমাদের স্রষ্টা যা নির্বাচন করেন, তার মধ্যেই সকল কল্যাণ নিহিত থাকে। (আমি তাঁর কাছে তাওফিক প্রার্থনা করেছি): অধিকাংশ সংশোধিত পাণ্ডুলিপিতে 'ক্বাফ'-এর আগে 'ফা' এসেছে। অর্থাৎ: আমি আল্লাহর কাছে তাওফিক (সাফল্য) এবং সত্য ও নির্ভরযোগ্য পথের ওপর অবিচলতা প্রার্থনা করেছি। কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে এর বিপরীত (অর্থাৎ 'ক্বাফ' আগে) এসেছে, যার অর্থ: আমি অসৎ কাজকে প্রত্যাখ্যান করা এবং সৎ কাজ চেনার ওপর স্থিতি প্রার্থনা করেছি। অন্য একটি সংস্করণে 'সা' এবং 'ক্বাফ' সহযোগে এসেছে, যার অর্থ: আমি বর্জনীয় ও প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রার্থনা করেছি। ইবনে হাজার বলেন: অর্থাৎ, আমি 'মাসাবীহ' থেকে সেই বিষয়গুলো গ্রহণ করেছি যা মূলত নির্ভরযোগ্য দলিল। আর তা হলো সেই হাদিসগুলো, যেগুলোকে সহিহ বা হাসান হিসেবে পৃথক কোনো চিহ্ন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়নি। (অতঃপর আমি এর প্রতিটি হাদিস গচ্ছিত রেখেছি) অর্থাৎ: মাসাবীহ-এর (তার নিজ নিজ স্থানে): কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে এই বাক্যটি রয়েছে। এর অর্থ: আমি কিতাবের প্রতিটি হাদিসকে মূল কিতাব ও অধ্যায়ের যে স্থানে সেটি মূলত ছিল, সেখানেই কোনো রূপ অগ্র-পশ্চাৎ, বৃদ্ধি-হ্রাস বা পরিবর্তন ছাড়াই স্থাপন করেছি। (অতঃপর আমি অবগত করেছি) অর্থাৎ: আমি স্পষ্ট করেছি যা (উপেক্ষিত ছিল) অর্থাৎ: যা ইচ্ছাকৃতভাবে সনদ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল; যেমন প্রতিটি হাদিসের শুরুতে সাহাবীর নাম উল্লেখ করা এবং শেষে হাদিস বর্ণনাকারীর (ইমামের) পরিচয় প্রদান করা, যা আমি আবশ্যিকভাবে পালন করেছি। (যেমনটি ইমামগণ বর্ণনা করেছেন): এটি 'ইমাম'-এর বহুবচন। এর মূল রূপ 'আইম্মাতুন', যা 'আফ-ইলা' ওজনে এসেছে, অতঃপর এতে তালীল ও ইদগাম করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় হামজাটি স্পষ্ট উচ্চারণ করা, সহজ করা বা পরিবর্তন করা—সবই জায়েয। এখানে উদ্দেশ্য হলো হাদিসের সেই ইমামগণ, প্রাচীন ও আধুনিক সর্বকালে যাদের অনুসরণ করা হয়। (পারদর্শীগণ) অর্থাৎ: যারা তাদের বর্ণিত হাদিসসমূহের ব্যাপারে অত্যন্ত সুসংহত, মুখস্থকারী এবং দক্ষ। এটি 'আতক্বানা' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ কোনো বিষয়কে মজবুত করা। এ থেকেই মহান আল্লাহর বাণী: {আল্লাহর কারুকার্য, যিনি সবকিছুকে সুনিপুণ করেছেন।} [আন-নামল: ৮৮]। (এবং নির্ভরযোগ্যগণ): এটি 'সিক্বাহ' শব্দের বহুবচন। তারা হলেন ন্যায়পরায়ণ ও সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ব। (সুপ্রতিষ্ঠিতগণ) অর্থাৎ: যারা এই মহান ইলম সংরক্ষণে অবিচল এবং এই সুউচ্চ বিষয়ের তরীকা বা পথসমূহ পালনে সচেষ্ট। (যেমন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইসমাইল): ইবনে হাজার বলেন: তাঁর পিতা আমলকারী আলেমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি হাম্মাদ বিন যায়েদ ও মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনুল মুবারকের সাহচর্য লাভ করেছেন। ইরাকিরা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছিলেন: আমার সমস্ত সম্পদের মধ্যে একটি দিরহামও সন্দেহযুক্ত আছে বলে আমি জানি না। (আল-বুখারী): বুখারা-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত, যা মা-ওয়ারাউন নাহর অঞ্চলের একটি বড় শহর। সেখানে তাঁর জন্ম হওয়ার কারণে এই নামটি তাঁর এবং তাঁর কিতাবের পরিচায়ক হয়ে গেছে। সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন মুহাদ্দিস বলেন: তাঁকে হাদিসের ক্ষেত্রে আমিরুল মুমিনীন, নববী হাদিসের সাহায্যকারী এবং মুহাম্মদী মীরাসের প্রচারকারী বলা হয়। বলা হয়: হাদিস মুখস্থ রাখা, পারদর্শিতা, আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহর মর্ম অনুধাবন, মেধার প্রখরতা, সূক্ষ্ম দৃষ্টি, গভীর ফিকহী জ্ঞান, পূর্ণাঙ্গ দুনিয়াবিমুখতা, চরম তাকওয়া, হাদিসের বিভিন্ন পথ ও ত্রুটি সম্পর্কে ব্যাপক অবগতি এবং ইজতিহাদ ও মাসআলা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তাঁর যুগে তাঁর মতো আর কাউকে দেখা যায়নি। তাঁর মা ছিলেন এমন এক নারী যার দোয়া কবুল হতো। শৈশবেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন এবং তিনি তাঁর মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। এরপর তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসায় অক্ষম হয়ে পড়েন। তখন তাঁর মা স্বপ্নে ইব্রাহিম খলিল আলাইহিস সালামকে দেখলেন, তিনি তাঁকে বলছেন: তোমার প্রচুর দোয়ার বরকতে আল্লাহ তোমার ছেলের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সকালে দেখা গেল আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি ইলমের কোলে লালিত-পালিত হন এবং শ্রেষ্ঠত্বের সুধা পান করে বেড়ে ওঠেন। মক্তব থেকে বের হওয়ার পর দশ বছর বয়সেই তাঁর হৃদয়ে হাদিস অন্বেষণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়। যখন তাঁর বয়স এগারো বছর, তখন তিনি বুখারার জনৈক উস্তাদের সনদের ভুল সংশোধন করে দেন, এমনকি উস্তাদ তাঁর কিতাব বুখারীর হিফজ থেকে সংশোধন করে নেন। এর বিবরণ হলো: তাঁর জনৈক উস্তাদ এক মজলিসে হাদিস বর্ণনার সময় সনদে বলেন: 'আমাদের কাছে সুফিয়ান বর্ণনা করেছেন আবু যুহাইর থেকে, তিনি ইব্রাহিম থেকে'। তখন বুখারী বললেন: আবু যুহাইর-এর ইব্রাহিম থেকে কোনো বর্ণনা নেই। উস্তাদ তাঁকে ধমক দিলেন। তখন বুখারী বললেন: আপনার কাছে মূল পাণ্ডুলিপি থাকলে তা দেখুন। উস্তাদ মজলিস থেকে উঠে ঘরে গেলেন এবং মূল পাণ্ডুলিপিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। এরপর মজলিসে ফিরে এসে বুখারীকে জিজ্ঞেস করলেন: তাহলে সঠিক বর্ণনাটি কী? তিনি বললেন: এটি 'হা' দিয়ে 'আবু যুহাইর' নয়, বরং 'বা' দিয়ে 'যুবাইর', আর তিনি হলেন যুবাইর বিন আদি। উস্তাদ বললেন: তুমি ঠিক বলেছ। অতঃপর তিনি কলম নিয়ে তাঁর কিতাব সংশোধন করলেন। যখন তাঁর বয়স ষোলো বছর হলো, তিনি ইবনুল মুবারক ও ওয়াকীর কিতাবসমূহ মুখস্থ করেন এবং ইমাম আবু হানিফার অনুসারীদের মতামত সম্পর্কে অবগত হন। এরপর তিনি তাঁর মা ও ভাই আহমদ বিন ইসমাইলের সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরবর্তীতে তাঁর ভাই ফিরে এলেও তিনি হাদিস অন্বেষণের জন্য সেখানে অবস্থান করেন। যখন তাঁর বয়স আঠারো বছর হলো, তখন তিনি সাহাবী ও তাবেয়ীদের ফয়সালা ও তাঁদের বক্তব্যসমূহ সংকলন করেন। তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় রাসুলুল্লাহর পবিত্র রওজার পাশে বসে এই সংকলন করেন।
তাঁদের দশজন ব্যক্তির প্রত্যেকে দশটি করে হাদিস নির্ধারণ করলেন যাতে জনাকীর্ণ মজলিসে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে সেগুলো তাঁর সামনে পেশ করা যায়। তাঁদের একজন দাঁড়িয়ে সেই দশটি হাদিসের একটি সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন: "আমি এটি জানি না।" এরপর তিনি দ্বিতীয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তদ্রূপ উত্তর দিলেন। এভাবে দশম হাদিস পর্যন্ত চলল। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি দাঁড়ালেন এবং প্রথম ব্যক্তির ন্যায় করলেন। এরপর তৃতীয় ব্যক্তি, এভাবে তাঁরা শেষ করলেন। যেসকল আলেম বিষয়টি এবং তাঁর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাঁরা বললেন: "ব্যক্তিটি বিষয়টি ধরে ফেলেছেন।" আর যারা বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না, তারা তাঁর অক্ষমতা কল্পনা করলেন এবং একে তাঁর মুখস্থশক্তির দুর্বলতা ও ত্রুটি হিসেবে গণ্য করলেন। অতঃপর তিনি প্রথম ব্যক্তির দিকে ফিরে বললেন: "আপনার প্রথম হাদিসটি ওই সনদে ভুল ছিল, আর সঠিকটি হলো এই এবং এই।" এভাবে তিনি একশত হাদিস পূর্ণ করা পর্যন্ত বলে চললেন। ফলে মানুষ বিস্ময়াভিভূত হলো এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি নতি স্বীকার করল। কেননা পরীক্ষার মাধ্যমেই মানুষের সম্মান বা লাঞ্ছনা স্পষ্ট হয়। এই শিল্পের বিশেষজ্ঞদের কাছে তাঁদের ভুলকে সঠিক করে দেওয়াটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না; কারণ তিনি তো সনদসহ হাদিসসমূহের হাফেজ ছিলেন। বরং তাঁদের কাছে আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, তিনি মাত্র একবার শুনেই তাঁদের ভুল সনদগুলো মুখস্থ করে ফেলেছেন এবং তা সুবিন্যস্তভাবে পুনরায় পাঠ করেছেন। এটি প্রায় অলৌকিক ঘটনার (কারামত) পর্যায়ের ছিল, যা খোদায়ী ইলহাম এবং রাহমানি করুণা ব্যতীত কল্পনা করা যায় না। যখন তিনি বসরায় এলেন, তখন এক ঘোষণাকারী তাঁর আগমনের সংবাদ প্রচার করল। ফলে মানুষ তাঁকে পরিবেষ্টন করল এবং তাঁদের জন্য হাদিস শ্রবণের মজলিস আয়োজনের অনুরোধ করল। তিনি তাঁদের আহবানে সাড়া দিলেন। পরদিন কয়েক হাজার মুহাদ্দিস ও ফকিহ সমবেত হলেন। মজলিসে বসেই তিনি বললেন: "হে বসরার অধিবাসীগণ! আমি একজন যুবক, আপনারা আমার কাছে হাদিস শুনতে চেয়েছেন। আমি আপনাদের কাছে আপনাদেরই শহরের বর্ণনাকারীদের এমন কিছু হাদিস বর্ণনা করব যা থেকে আপনারা উপকৃত হবেন।" অর্থাৎ যা আপনাদের কাছে নেই। অতঃপর তিনি তাঁদের কাছে তাঁদেরই শহরের এমন কিছু হাদিস পাঠ করলেন যা তাঁদের নিকট ছিল না, যা তাঁদেরকে অভিভূত করে দিল। এখান থেকেই ইমামদের পক্ষ থেকে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা শুরু হয়, এমনকি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন: "খুরাসান তাঁর মতো দ্বিতীয় কাউকে জন্ম দেয়নি।" একাধিক ব্যক্তি বলেছেন: "তিনি এই উম্মতের ফকিহ।" ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ বলেছেন: "হে হাদিস অন্বেষী দল! এই যুবকের দিকে তাকাও এবং তাঁর থেকে লিখে নাও; কেননা তিনি যদি হাসান বসরীর যুগে থাকতেন তবে তাঁর হাদিস ও ফিকহ বিষয়ের জ্ঞানের কারণে হাসান বসরীও তাঁর মুখাপেক্ষী হতেন।" কেউ কেউ ফিকহ ও হাদিসে তাঁকে আহমাদ ও ইসহাকের ওপরও প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনে খুজাইমা বলেছেন: "আসমানের নিচে তাঁর চেয়ে বড় হাদিস বিশেষজ্ঞ আর কেউ নেই।" তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রচুর ধন-সম্পদ পেয়েছিলেন, যা তিনি সদকা করে দিতেন। তিনি আহারে অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন। বলা হয় যে, তিনি প্রতিদিন মাত্র দুটি বা তিনটি কাঠবাদাম খেয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন। আরও বলা হয় যে, তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর কোনো তরকারি খাননি। কথিত আছে যে, তাঁর ভূসম্পত্তি থেকে প্রতি মাসে পাঁচশ দিরহাম আয় হতো, যা তিনি অভাবী ও ইলম অন্বেষণকারীদের জন্য ব্যয় করতেন। তিনি তাঁদেরকে হাদিস অর্জনে উৎসাহিত করতেন। ছাত্রদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদয় ও সীমাহীন দানশীল। তাঁর একটি পণ্যের লভ্যাংশ বাবদ পাঁচ হাজার দিরহামের প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা দিতে বিলম্ব করলেন। পরে অন্য কেউ তাঁকে দশ হাজার দিরহামের প্রস্তাব দিলে তিনি বললেন: "আমি পণ্যটি প্রথম দলের কাছে বিক্রির নিয়ত করেছি, আর আমি আমার নিয়ত পরিবর্তন করতে পছন্দ করি না।" একবার তাঁর সামনে তাঁর এক দাসী দোয়াতের সাথে ধাক্কা খেল। তিনি তাকে বললেন: "তুমি কিভাবে হাঁটছ?!" সে উত্তর দিল: "পথ না থাকলে আমি কিভাবে হাঁটব?!" তখন তিনি বললেন: "যাও, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত।" তাঁকে বলা হলো: "হে আবু আব্দুল্লাহ! সে আপনাকে রাগান্বিত করল আর আপনি তাকে মুক্ত করে দিলেন?" তিনি বললেন: "আমি যা করেছি তার মাধ্যমে নিজের নফসকে সন্তুষ্ট করেছি।" যখন তিনি বুখারার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে একটি রিবাত নির্মাণ করলেন, তখন অসংখ্য মানুষ তা নির্মাণে সমবেত হলো। তিনি তাঁদের সাথে ইট বহন করছিলেন। তাঁকে বলা হলো: "আপনার কষ্ট করার প্রয়োজন নেই।" তিনি বললেন: "এটাই আমার উপকারে আসবে।" যখন তিনি বুখারায় ফিরে এলেন, শহর থেকে এক ফারসাখ দূরে তাঁর সম্মানে তাবু স্থাপন করা হলো এবং সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাল। তাঁর ওপর দিরহাম ও দিনার ছিটানো হলো। কিছুদিন তিনি তাঁদেরকে হাদিস শোনালেন। শহরের আমির খালিদ ইবনে মুহাম্মাদ আদ-দুহলী, যিনি আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর কাছে বিনীতভাবে লোক পাঠিয়ে অনুরোধ করলেন যেন তিনি তাঁর প্রাসাদে এসে তাঁকে সহিহ (বুখারী) শুনিয়ে যান। তিনি তা অস্বীকার করলেন এবং দূতকে বললেন: "তাঁকে গিয়ে বলো, আমি ইলমকে অপমান করব না এবং একে সুলতানদের দ্বারে বয়ে নিয়ে যাব না। যার এর প্রয়োজন সে যেন আমার মসজিদে বা বাড়িতে উপস্থিত হয়। যদি আপনার এটি পছন্দ না হয়, তবে আপনি শাসক; আপনি আমাকে মজলিস করতে নিষেধ করে দিন যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে আমার ওজর থাকে যে, আমি জ্ঞান গোপন করিনি।" বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছিলেন: "জ্ঞানের কাছে আসতে হয়, জ্ঞান কারো কাছে যায় না।" অতঃপর আমির প্রস্তাব পাঠালেন যেন কেবল তাঁর সন্তানদের জন্য একটি মজলিস করা হয় যেখানে অন্য কেউ উপস্থিত থাকবে না। তিনি এটিও প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন: "আমি বিশেষ একদল মানুষকে শুনাব আর অন্যদের বঞ্চিত করব—এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।" বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছিলেন: "ইলম বা জ্ঞানকে কারো থেকে বাধা দেওয়া বৈধ নয়।" ফলে তাঁদের উভয়ের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হলো। আমির বুখারার আলেমদের সাহায্য নিলেন এবং তারা তাঁর আকিদার ব্যাপারে সমালোচনা করলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে শহর থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তখন তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে এই বলে বদদোয়া করলেন: "হে আল্লাহ! তারা আমার সাথে যে ব্যবহারের সংকল্প করেছে, তা আপনি তাঁদের নিজেদের ওপর, তাঁদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনের ওপর প্রকাশ করে দিন।" তিনি মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ ছিলেন। ফলে এক মাসও পার হয়নি, খিলাফতের নির্দেশ এল যে আমিরের ওপর জনসম্মুখে ঘোষণা দিতে হবে; তাঁকে গাধার পিঠে চড়িয়ে লাঞ্ছিত করে ঘোষণা দেওয়া হলো এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁকে বন্দি রাখা হলো। আর যারা তাঁকে সহযোগিতা করেছিল তাঁদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কঠিন বিপর্যয়ে পতিত হলো। যখন তিনি বুখারা থেকে বের হলেন, তখন সমরখন্দবাসী তাঁকে তাঁদের শহরে আসার জন্য পত্র লিখল। তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে তিনি 'খারতাঙ্ক' নামক স্থানে পৌঁছালেন—প্রসিদ্ধ মতে শব্দটি 'খ' বর্ণের ওপর জবর অথবা যের, এরপর 'র' সাকিন, এরপর 'ত' বর্ণের ওপর জবর, এরপর 'নুন' সাকিন এবং শেষে 'কাফ' যোগে গঠিত—এটি সমরখন্দের নিকটবর্তী দুই ফারসাখ দূরত্বের একটি স্থান।
আর বলা হয় যে, প্রায় তিন দিন পর তাঁর কাছে সংবাদ পৌঁছাল যে, তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি হয়েছে; একদল লোক তাঁর প্রবেশ চাচ্ছিল এবং অন্যদল তা অপছন্দ করছিল। সেখানে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ছিল, তাই বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করলেন। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অবশেষে সমরকন্দবাসীদের পক্ষ থেকে এক দূত তাঁর কাছে এসে তাঁদের কাছে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি তাতে সাড়া দিলেন এবং সওয়ার হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন, মোজা পরলেন এবং পাগড়ি বাঁধলেন। যখন তিনি সওয়ার হওয়ার জন্য বাহনের দিকে প্রায় বিশ কদম হাঁটলেন, তখন বললেন: "আমাকে ছেড়ে দাও, আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি।" এরপর তাঁরা তাঁকে ছেড়ে দিলে তিনি কিছু দুআ করলেন। তারপর তিনি শুয়ে পড়লেন এবং ইন্তেকাল করলেন। তাঁর দেহ থেকে অবর্ণনীয় প্রচুর ঘাম নির্গত হতে লাগল। কাফনের কাপড় পরানো পর্যন্ত সেই ঘাম থামেনি। আর বলা হয় যে, এক রাতে তিনি ব্যথিত হয়ে তাহাজ্জুদ সালাত শেষে দুআ করলেন: "হে আল্লাহ! এই প্রশস্ত পৃথিবী আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে, সুতরাং আপনি আমাকে আপনার কাছে তুলে নিন।" তিনি কোনো পুত্রসন্তান না রেখেই ২৫৬ হিজরী সনের ঈদুল ফিতরের রাতে বাষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৪ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে জুমআর দিন আসর সালাতের পর। যখন তাঁর জানাজা সম্পন্ন হলো এবং তাঁকে কবরে রাখা হলো, তখন তাঁর কবরের মাটি থেকে মেস্কের মতো সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর কবরে যাতায়াত করতে লাগল এবং কবরের মাটি সংগ্রহ করতে থাকল। তাঁরা এই বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ বলেন: "আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একদল সাহাবীসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনি সালামের উত্তর দিলেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? তিনি বললেন: আমি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইলের অপেক্ষা করছি।" বর্ণনাকারী বলেন: "কয়েক দিন পর যখন তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আমার কাছে পৌঁছাল, তখন আমি হিসাব করে দেখলাম যে, তিনি ঠিক সেই মুহূর্তেই ইন্তেকাল করেছেন যে সময়ে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছিলাম।" তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর সমরকন্দবাসী বারবার বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করল কিন্তু বৃষ্টি হলো না। তখন জনৈক নেককার ব্যক্তি সেখানকার বিচারককে বললেন: "আমি মনে করি আপনার উচিত মানুষকে নিয়ে বুখারীর কবরের কাছে যাওয়া এবং সেখানে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা; হতে পারে আল্লাহ আমাদের বৃষ্টি দেবেন।" তিনি তাই করলেন। মানুষ কবরের পাশে কান্নাকাটি করল এবং কবরের বাসিন্দার উসিলায় সুপারিশ পেশ করল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁদের ওপর আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। বৃষ্টির আধিক্যের কারণে মানুষ প্রায় সাত দিন সেখানে অবস্থান করল, বৃষ্টির প্রাবল্যে কেউ সমরকন্দে পৌঁছাতে পারছিল না।
এরপর জেনে রাখুন যে, সাহাবী ও বড় তাবেয়ীদের যুগে হাদীসসমূহ সংকলিত ছিল না; কারণ নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম হাদীস লিখে রাখতে সাহাবীদের নিষেধ করেছিলেন যেন তা প্রাচীন কালামের (কুরআন) সাথে মিশে না যায়। এছাড়া তাঁর সাহচর্য এবং সময়ের নৈকট্যের বরকতে তাঁদের মুখস্থ রাখার ক্ষমতাও ছিল অত্যন্ত প্রখর। আবার তাঁদের অনেকেই লিখনশিল্পে পারদর্শী ছিলেন না। তাবেয়ীদের যুগের শেষের দিকে হাদীস ও সংবাদ সংকলন এবং সুন্নাহ ও আসার শ্রেণিবিন্যাস করার কাজ শুরু হয়। যুহরী, রাবী ইবনে সুবাইহ, সাঈদ ইবনে আবি আরুবাহ এবং তাঁদের মতো অন্যান্যেরা এই মহান কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁদের নিয়ম ছিল প্রতিটি অধ্যায় পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা। এভাবে তৃতীয় স্তরের শ্রেষ্ঠ আলেমদের যুগ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাঁরা ফিকহী অধ্যায়ের ক্রম অনুসারে হাদীস সংকলন করেন। মদীনার আলেমদের অগ্রজ ইমাম মালিক তাঁর 'মুয়াত্তা' সংকলন করেন। এতে তিনি হিজাযবাসীদের সেইসব হাদীস সংগ্রহ করেন যা তাঁর কাছে সাব্যস্ত ও বিশুদ্ধ ছিল এবং এতে সাহাবীদের বাণী ও তাবেয়ীদের ফতোয়া এবং তাঁদের পরবর্তী যুগের ফতোয়াও অন্তর্ভুক্ত করেন। মক্কাবাসীদের মধ্যে আবু হামিদ আব্দুল মালিক ইবনে আব্দুল আজিজ ইবনে জুরাইজ সংকলন করেন। শামবাসীদের মধ্যে আবু আমর আব্দুর রহমান ইবনে আমর আল-আওযাঈ, কূফাবাসীদের মধ্যে সুফিয়ান সাওরী এবং বসরার আলেমদের মধ্যে আবু সালামাহ হাম্মাদ ইবনে সালামাহ সংকলন করেন। তাঁদের পরে বিশিষ্ট মুজতাহিদ আলেমদের প্রত্যেকেই কিতাব রচনা করেন। আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, উসমান ইবনে আবি শায়বা এবং অন্যান্য বড় মুহাদ্দিসগণ তাঁদের 'মুসনাদ' গ্রন্থসমূহ রচনা করেন। কেউ কেউ ফিকহী অধ্যায়ের ক্রম অনুসারেও লিখেছেন। কিন্তু উল্লিখিত কিতাবসমূহে সহীহ এবং যয়ীফ (দুর্বল) আলাদা করা হয়নি। যখন ইমাম বুখারী তাঁদের রচনাবলি সম্পর্কে অবগত হলেন, তখন তাঁর মনে এমন একটি কিতাব রচনার সুদৃঢ় সংকল্প জাগ্রত হলো যার সমস্ত হাদীস সহীহ হবে। তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: "একদিন আমি আমার উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ-এর কাছে ছিলাম, তিনি বললেন: তোমরা যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহীহ সুন্নাহর ওপর একটি সংক্ষিপ্ত কিতাব সংকলন করতে! তখনই এই বিষয়ে একটি কিতাব রচনার কথা আমার অন্তরে গেঁথে গেল।" তাঁর স্বপ্নের বিষয়টি তো আগেই বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর তিনি তা শুরু করলেন। যখন এটি সম্পন্ন করলেন, তখন তিনি তাঁর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, আলী ইবনুল মাদীনী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন এবং অন্যান্যদের নিকট তা পেশ করলেন। তাঁরা এর ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং কিতাবটির বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিলেন। তাঁরা আরও সাক্ষ্য দিলেন যে, এই বিষয়ে এর কোনো নজির নেই। তবে তাঁরা চারটি হাদীসকে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।এবং তারা এর বিশুদ্ধতার বিষয়ে থমকে গিয়েছিলেন। আল-উকাইলি বলেন: এই ক্ষেত্রেও সত্য বুখারীর পক্ষেই রয়েছে, কেননা তা বিশুদ্ধ। অতঃপর হাদীস বিশারদগণ এবং বুখারীর ব্যাখ্যাকারগণ এর হাদীস সংখ্যার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তিসহ এবং পুনরাবৃত্তি বাদে মতভেদ করেছেন। হাফিজ ইবনে হাজার বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থে (ফাতহুল বারী) যা সুনিশ্চিত করেছেন তা হলো, তালীক (ঝুলন্ত বর্ণনা), মুতাবাআত (সমর্থক বর্ণনা), শাওয়াহিদ (সাক্ষ্য বর্ণনা) এবং পুনরাবৃত্তিসহ এর মোট হাদীস সংখ্যা নয় হাজার বিরাশিটি। আর পুনরাবৃত্তি ছাড়া এর মারফূ হাদীস সংখ্যা দুই হাজার ছয়শ তেইশটি। তাঁর হাদীসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সনদ এবং তাঁর থেকে নবী (তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক) পর্যন্ত নিকটতম সনদ হলো যেগুলোর মাঝে মধ্যস্থতাকারী তিনজন; তাঁর সহীহ গ্রন্থে পুনরাবৃত্তিসহ এই ধরণের বাইশটি এবং পুনরাবৃত্তি ছাড়া ষোলটি হাদীস পাওয়া যায়। কোনো কোনো আলেম একে পৃথকভাবে সংকলন করেছেন। অতঃপর আলেম সমাজ উভয় সহীহ গ্রন্থকে কবুল করে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন এবং একমত হয়েছেন যে এই দুটি সংকলিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ। অতঃপর জুমহুর (অধিকাংশ) আলেম এই মত পোষণ করেন যে, সহীহ আল-বুখারী এই দুটির মধ্যে অধিক অগ্রগণ্য এবং অধিক বিশুদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, কারো পক্ষ থেকে এর বিপরীত কোনো স্পষ্ট উক্তি পাওয়া যায়নি; কারণ আবু আলী আন-নিসাবুরীর উক্তি—'আকাশের নিচে মুসলিমের কিতাবের চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ আর কোনো কিতাব নেই'—এর মধ্যে বুখারীর কিতাবের চেয়ে মুসলিমের কিতাব অধিক বিশুদ্ধ হওয়ার কোনো স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই; কেননা অধিক বিশুদ্ধতাকে অস্বীকার করা সমপর্যায়ভুক্ত হওয়াকে অস্বীকার করে না। আর পশ্চিমী (মাগরিবী) আলেমদের কারো কারো সহীহ মুসলিমকে প্রাধান্য দেওয়াটা উত্তম বর্ণনাভঙ্গি, বিন্যাস এবং সাজসজ্জার সৌন্দর্যের ওপর নির্ভরশীল; কেননা তাদের কেউই এই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি যে এই প্রাধান্য বিশুদ্ধতার কারণে। যদি তারা তা স্পষ্টভাবে বলতেনও, তবে বাস্তব সত্য দ্বারা তা প্রত্যাখ্যাত হতো। কারণ সহীহ মুসলিমের রাবীদের মধ্যে যেসব গুণাবলির কারণে হাদীস বিশুদ্ধ হয়, তা সহীহ আল-বুখারীতে আরও পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহতভাবে বিদ্যমান। কারণ এতে (বুখারীতে) শর্তসমূহ অধিক শক্তিশালী ও কঠোর। আর সনদ নিরবচ্ছিন্ন হওয়ার দিক থেকে এর প্রাধান্য এই কারণে যে, বুখারী শর্তারোপ করেছেন যে বর্ণনাকারীর সাথে তাঁর উস্তাদের অন্তত একবার সাক্ষাৎ প্রমাণিত হতে হবে, আর ইমাম মুসলিম সাক্ষাতের সম্ভাবনা থাকলেই কেবল সমসাময়িক হওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। আর বর্ণনাকারীদের ন্যায়পরায়ণতা এবং স্মৃতিশক্তির প্রখরতার দিক থেকে প্রাধান্য এই কারণে যে, ইমাম মুসলিমের যেসকল বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে সমালোচনা করা হয়েছে তাদের সংখ্যা ইমাম বুখারীর সমালোচিত বর্ণনাকারীদের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ বুখারী তাদের থেকে খুব বেশি হাদীস বর্ণনা করেননি, বরং তাদের অধিকাংশ তাঁর সেসব উস্তাদ যাদের থেকে তিনি হাদীস গ্রহণ করেছেন এবং তাদের হাদীস নিয়ে দীর্ঘ চর্চা করেছেন, ফলে তিনি তাদের উত্তম হাদীসগুলোকে অন্যদের থেকে পৃথক করতে পেরেছেন। ইমাম মুসলিমের বিষয়টি এর বিপরীত; কারণ তিনি যেসকল সমালোচিত বর্ণনাকারীর হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন, তাদের অধিকাংশ পূর্ববর্তী যুগের তাবিঈ এবং তাবি-তাবিঈ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, একজন মুহাদ্দিস তাঁর উস্তাদদের হাদীস সম্পর্কে পূর্ববর্তীদের হাদীসের তুলনায় অধিক অবগত থাকেন। আর অসংগতি (শুজুজ) এবং সূক্ষ্ম দোষ (ইল্লাত) মুক্ত হওয়ার দিক থেকে এর প্রাধান্য এই কারণে যে, বুখারীর যেসব হাদীসের ওপর সমালোচনা করা হয়েছে তার সংখ্যা মুসলিমের ওপর করা সমালোচিত হাদীসের তুলনায় কম। আর তাদের উভয়ের এমন ব্যক্তিদের থেকে হাদীস বর্ণনা করা যাদের সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে, তা কিতাব দুটির বিশুদ্ধতাকে ক্ষুণ্ণ করে না; কারণ সহীহ গ্রন্থের সংকলক কোনো বর্ণনাকারীর হাদীস বর্ণনা করা মানেই হলো তাঁর নিকট সেই বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ, প্রখর স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন এবং অসতর্কতা মুক্ত—যদি তিনি তাঁর থেকে মূল হাদীস বর্ণনা করেন। আর যদি তিনি মুতাবাআত, শাওয়াহিদ এবং তালীক হিসেবে বর্ণনা করেন, তবে স্মৃতিশক্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা কাছাকাছি হতে পারে, তবে তাদের সত্যবাদী হওয়ার গুণটি বিদ্যমান থাকে। সুতরাং তাদের কোনো একজন যার হাদীস বর্ণনা করেছেন তার ওপর করা সমালোচনা মূলত তাদের করা নির্ভরযোগ্যতা প্রদানের বিপরীতে পড়ে; ফলে সেই সমালোচনা ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ না তা স্পষ্টভাবে সেই বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা কিংবা সামগ্রিক স্মৃতিশক্তি অথবা নির্দিষ্ট কোনো হাদীসের স্মৃতিশক্তির ত্রুটি ব্যাখ্যা করে। কারণ ইমামদের সমালোচনার পেছনে থাকা কারণগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে; যার কিছু ত্রুটি হিসেবে গণ্য হয় না আবার কিছু গণ্য হয়। আবু হাসান আল-মাকদিসী বলতেন, যাদের হাদীস তাঁদের কোনো একজন সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, সে পুল পার হয়ে গেছে (অর্থাৎ নিরাপদ); অর্থাৎ তার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তাতে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না; কারণ তাঁরা দুজনেই সহীহ হাদীস এবং হাদীসের সূক্ষ্ম ত্রুটি নির্ণয়ে সমসাময়িক এবং পরবর্তী ইমামদের চেয়ে অগ্রগণ্য। সুতরাং মহান আল্লাহর কিতাবের পর এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ। একে সমর্থন করে হাকেম আবু আহমদ (যিনি হাকেম আবু আব্দুল্লাহ আন-নিসাবুরীর উস্তাদ) থেকে বর্ণিত উক্তি যে, বুখারী হলেন মুহাদ্দিসদের ইমাম; তাঁর পরে যে কেউ হাদীসের কিতাব সংকলন করেছেন এবং তা পৃথক করেছেন, তারা বাস্তবে তা তাঁর থেকেই গ্রহণ করেছেন। সুতরাং শ্রেষ্ঠত্ব পূর্ববর্তীদের জন্যই; এমনকি ইমাম মুসলিমও তাঁর কিতাবে বুখারীর হাদীসগুলো ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নিয়ে এসেছেন এবং এক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃঢ়তা দেখিয়েছেন যেখানে তিনি সেগুলো বুখারীর দিকে সম্বন্ধ করেননি। আদ-দারা কুতনী বলেন: যদি বুখারী না থাকতেন, তবে মুসলিম আসতেনও না, যেতেনও না। তিনি বুখারীর কিতাব থেকে গ্রহণ করেছেন এবং তাতে অধ্যায় বৃদ্ধি করেছেন। ইমাম বুখারীর সহীহ ছাড়াও অন্যান্য সংকলন রয়েছে: যেমন আল-আদাবুল মুফরাদ, নামাযে দুই হাত তোলা, ইমামের পেছনে কিরাত পড়া, পিতা-মাতার সেবা, আত-তারীখুল কবীর, আল-আওসাত এবং আস-সাগীর, বান্দাদের কর্মের সৃষ্টি, দুর্বল বর্ণনাকারীদের কিতাব, আল-জামিউল কবীর, আল-মুসনাদুল কবীর, আত-তাফসীরুল কবীর, পানীয় বিষয়ক কিতাব, দান বিষয়ক কিতাব, সাহাবীগণের নাম, কিতাবুল বিজদান, কিতাবুল ইলাল, কিতাবুল কুনা, কিতাবুল মাবসূত এবং কিতাবুল ফাওয়াইদ। তাঁর থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন: আমি এক হাজার আটশ মুহাদ্দিস থেকে হাদীস বর্ণনা করেছি। তাঁর থেকে অগণিত মানুষ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যেমন ইমাম মুসলিম (তাঁর সহীহ ছাড়া অন্য কিতাবে), তিরমিযী, ইবনে খুযাইমা, আবু যুরআ, আবু হাতিম এবং অন্যদের মতে নাসাঈও। মোটকথা, বলা হয়ে থাকে যে এক লক্ষ মুহাদ্দিস তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনে জাফর ইবনে আয়ান আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণিত যে তিনি বলতেন: আমি যদি পারতাম নিজের আয়ু থেকে বুখারীর আয়ু বাড়িয়ে দিতাম তবে আমি তা-ই করতাম; কারণ আমার মৃত্যু সাধারণ একজন মানুষের মৃত্যু, কিন্তু বুখারীর মৃত্যু হলো ইলম চলে যাওয়া এবং একজন আলেমের মৃত্যু। আর কি-ই না চমৎকার কথা বলা হয়েছে:
যখনই কোনো ইলম ও ফতোয়ার অধিকারী ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন … তখনই ইসলামের একটি ফাটল তৈরি হয়।কেননা তিনি আমাকে মিথ্যার সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আমি যদি মিথ্যাবাদী হই তবে আমি (বিচারের জন্য) যোগ্য নই, আর যদি সত্যবর্তী হই তবে তো আমি আগেই সংবাদ দিয়েছি যে আমি যোগ্য নই। অতঃপর তিনি তাঁকে পুনরায় কারাগারে ফেরত পাঠালেন। রাবী ইবনে ইউনুস বলেন: আমি আল-মানসুরকে বিচারক নিয়োগের বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতে দেখেছি, আর তিনি (আবু হানিফা) বলছিলেন: আল্লাহকে ভয় করুন, এবং আপনার আমানতদারিতে আল্লাহকে ভয় করে এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে শরিক করবেন না। আল্লাহর কসম, আমি সন্তুষ্টির অবস্থাতেই নিরাপদ নই, তবে রাগের অবস্থায় কীভাবে নিরাপদ থাকব?! তাই আমি এর জন্য যোগ্য নই। তখন তিনি (মানসুর) তাঁকে বললেন: আপনি মিথ্যা বলেছেন, আপনি যোগ্য। তখন তিনি বললেন: আপনি তো নিজের বিরুদ্ধেই ফয়সালা দিলেন; আপনার আমানতের ওপর এমন একজনকে বিচারক নিয়োগ করা কীভাবে বৈধ হবে যাকে আপনি মিথ্যাবাদী বলছেন? ইবনুল মুবারকের নিকট আবু হানিফার কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন: তোমরা কি এমন এক ব্যক্তির কথা বলছ যার সামনে সমগ্র দুনিয়া তার সমস্ত ঐশ্বর্যসহ পেশ করা হয়েছিল, অথচ তিনি তা থেকে পলায়ন করেছেন? তিনি সুন্দর চেহারার অধিকারী, সুরুচিপূর্ণ পোশাক পরিধানকারী এবং সুগন্ধি প্রিয় ছিলেন। তিনি যখন আসতেন তখন সুগন্ধি দ্বারা তাঁকে চেনা যেত। তিনি অত্যন্ত দানশীল, ভাইদের প্রতি সদাচারী, মধ্যম গড়নের এবং মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর বাচনভঙ্গি ও মিষ্টি কণ্ঠস্বরের অধিকারী ছিলেন। তিনি বললেন: আমি বসরায় আসলাম এবং ধারণা করলাম যে আমাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করা হবে আমি তার উত্তর দিতে পারব। কিন্তু তারা আমাকে এমন কিছু বিষয় জিজ্ঞাসা করল যার কোনো উত্তর আমার নিকট ছিল না। তখন আমি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিলাম যে, হাম্মাদ মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত আমি তাঁর সান্নিধ্য ত্যাগ করব না। অতঃপর আমি আঠারো বছর তাঁর সাহচর্যে ছিলাম। অতঃপর তাঁর ইন্তেকালের পর থেকে আমি এমন কোনো সালাত আদায় করিনি যেখানে আমার পিতা-মাতার আগে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিনি—অথবা তিনি বলেছেন: পিতা-মাতার সাথে তাঁর জন্য। আর আমি অবশ্যই তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি যার থেকে আমি ইলম শিখেছি অথবা যে আমার থেকে ইলম শিখেছে। তিনি বললেন: আমি মানসুরের দরবারে প্রবেশ করলাম, তিনি বললেন: আপনি কার নিকট থেকে ইলম হাসিল করেছেন? আমি বললাম: হাম্মাদ থেকে, তিনি ইব্রাহিম নাখয়ি থেকে, তিনি উমর, আলী, ইবনে মাসউদ এবং ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে। তখন মানসুর বললেন: চমৎকার! চমৎকার! হে আবু হানিফা, আপনি পূর্ণতা লাভ করেছেন। আবু হানিফা স্বপ্নে দেখলেন যেন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর খনন করছেন। অতঃপর তিনি একজনকে পাঠালেন মুহাম্মদ ইবনে সিরীনকে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তিনি (ইবনে সিরীন) বললেন: এই স্বপ্নের অধিকারী কে? কিন্তু তিনি এর উত্তর দিলেন না। পুনরায় দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি একই কথা বললেন। তৃতীয়বার জিজ্ঞাসার পর তিনি বললেন: এই স্বপ্নের অধিকারী ব্যক্তি এমন ইলম প্রকাশ করবেন যা তাঁর পূর্ববর্তী কেউ কখনও করেনি। ইবনুল মুবারক বলেন: আবু হানিফা ছিলেন একটি নিদর্শন। তাঁকে বলা হলো: কল্যাণের ক্ষেত্রে না অকল্যাণের ক্ষেত্রে? তিনি বললেন: হে ব্যক্তি, চুপ করো! কেননা বলা হয়ে থাকে: তিনি কল্যাণের ক্ষেত্রে এক নিদর্শন এবং অনিষ্টের জন্য এক চরম সীমা। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: ‘আর আমি মারয়্যামের পুত্র ও তাঁর মাতাকে এক নিদর্শন বানিয়েছি’ [আল-মুমিনুন: ৫০]। তিনি বলেন: একদিন তিনি জামে মসজিদে ছিলেন, তখন একটি সাপ তাঁর কোলে এসে পড়ল। মানুষজন ভয়ে পালিয়ে গেল, কিন্তু তিনি সেটি ঝেড়ে ফেলা ছাড়া আর কিছুই করলেন না এবং নিজ স্থানেই বসে থাকলেন। তিনি রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন, রেশম বিক্রি করতেন এবং আমর ইবনে হুরাইসের বাড়িতে তাঁর দোকান সুপরিচিত ছিল। সুফিয়ান সাওরির ভাই ইন্তেকাল করলে মানুষ তাঁর কাছে শোক প্রকাশের জন্য সমবেত হলো। তখন আবু হানিফা আসলেন এবং সুফিয়ান তাঁর দিকে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁকে সম্মান জানালেন এবং নিজের জায়গায় বসালেন ও নিজে তাঁর সামনে বসলেন। যখন মানুষ চলে গেল, সুফিয়ানের সাথীরা বলল: আমরা আপনাকে এক আশ্চর্যজনক কাজ করতে দেখলাম! তিনি বললেন: এই ব্যক্তি ইলমের একটি সুউচ্চ মাকামে রয়েছেন। যদি আমি তাঁর ইলমের জন্য না দাঁড়াতাম তবে তাঁর বয়সের কারণে দাঁড়াতাম, যদি বয়সের কারণে না দাঁড়াতাম তবে তাঁর ফিকহের জন্য দাঁড়াতাম, আর যদি ফিকহের জন্য না দাঁড়াতাম তবে তাঁর পরহেজগারির জন্য দাঁড়াতাম। নজর ইবনে শুমাইল বলেন: মানুষ ফিকহ থেকে গাফেল ছিল যতক্ষণ না আবু হানিফা তাঁর চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের জাগ্রত করেছেন। ইমাম শাফিয়ী বলেন: ফিকহের ক্ষেত্রে মানুষ আবু হানিফার মুখাপেক্ষী। অন্য বর্ণনায় রয়েছে: যে ব্যক্তি ফিকহে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চায় সে যেন আবু হানিফা ও তাঁর সাথীদের আবশ্যক করে নেয়। জাফর ইবনুর রাবী বলেন: আমি পাঁচ বছর আবু হানিফার সাথে অবস্থান করেছি, তাঁর চেয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালনকারী আর কাউকে দেখিনি। কিন্তু যখন ফিকহের কোনো বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হতো, তখন তিনি প্রবাহমান ঝরনার মতো উত্তর দিতেন। ইবনে উইয়াইনা বলেন: আমাদের সময়ে মক্কায় তাঁর চেয়ে বেশি সালাত আদায়কারী কোনো ব্যক্তি আসেননি। ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব আল-জাহিদ বলেন: আবু হানিফা রাতে ঘুমাতেন না। আবু আসিম বলেন: অত্যাধিক সালাত আদায়ের কারণে তাঁকে 'খুঁটি' বলা হতো। যুফার বলেন: তিনি এক রাকাতে পুরো রাত জেগে ইবাদত করতেন যাতে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আসাদ ইবনে আমর বলেন: আবু হানিফা চল্লিশ বছর এশার অজু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেছেন। তিনি রাতের অধিকাংশ সময় এক রাকাতেই কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং তাঁর কান্নার আওয়াজ শোনা যেত, এমনকি তাঁর প্রতিবেশীরা তাঁর প্রতি দয়া পরবশ হতো। এটি সংরক্ষিত আছে যে, তিনি যে স্থানে ইন্তেকাল করেছেন সেখানে সাত হাজার বার কুরআন খতম করেছেন। যখন হুসাইন ইবনে উমারা তাঁকে গোসল করাচ্ছিলেন, তখন তিনি বললেন: আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! আপনি ত্রিশ বছর যাবত রোজা ছাড়েননি এবং চল্লিশ বছর যাবত রাতে আপনার ডান হাতকে বালিশ বানাননি। আপনি আপনার পরবর্তীদের ক্লান্ত করে দিয়েছেন। ইবনুল মুবারক বলেন: তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর এক অজু দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেছেন এবং তিনি দুই রাকাতেই কুরআন খতম করতেন। জায়িদা বলেন: আমি তাঁর মসজিদে তাঁর সাথে এশার সালাত আদায় করলাম। মানুষ চলে গেল, কিন্তু তিনি জানতেন না যে আমি মসজিদে আছি। আমি তাঁকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে সালাত শুরু করলেন এবং তিলাওয়াত করতে করতে যখন এই আয়াতে পৌঁছালেন: ‘অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আগুনের আজাব থেকে আমাদের রক্ষা করেছেন’ [আত-তূর: ২৭], তখন মুয়াজ্জিন ফজরের আজান দেওয়া পর্যন্ত তিনি এটিই বারবার পাঠ করতে থাকলেন আর আমি তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম। কাসিম ইবনে মা’ন বলেন: আবু হানিফা এক রাত এই আয়াতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেন: ‘বরং কিয়ামত তাদের প্রতিশ্রুত সময়, আর সেই কিয়ামত হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও তিক্ত’ [আল-কামার: ৪৬]