القسم: علوم أخرى
الكتاب: الجماهر في معرفة الجواهر
المؤلف: أبو الريحان محمد بن أحمد البيروني الخوارزمي (ت 440هـ)
[الكتاب مرقم آليا غير موافق للمطبوع]
عدد الصفحات: 113
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: অন্যান্য বিজ্ঞান
গ্রন্থ: মণি-মাণিক্য পরিচিতি বিষয়ক আকর গ্রন্থ
লেখক: আবু রায়হান মুহাম্মদ বিন আহমদ আল-বিরুনি আল-খোয়ারিজমি (মৃত্যু ৪৪০ হিজরি)
[বইটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যায়িত, যা মুদ্রিত কপির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়]
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১৩
শামিলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
কোনো স্বাধীন ব্যক্তির যদি নেয়ামত চলে যায় তবে তাতে কোনো লজ্জা নেই... কিন্তু লজ্জা হলো যদি তার সৌন্দর্য ও আত্মমর্যাদা বিলীন হয়ে যায়।
প্রথম অংশ দ্বারা তিনি বীরত্ব ও উদারতা উদ্দেশ্য করেছেন, কারণ এটি কেবল হাতের সচ্ছলতা ও সম্পদের প্রশস্ততা ছাড়া পূর্ণতা পায় না। অনেক সময় তা অর্জনের প্রচেষ্টায় সমতা থাকলেও সফলতা আসে না, আর ভাগ্য যার লক্ষ্য অর্জনে সহায় হয়নি তার ওপর কোনো তিরস্কার নেই। আর দ্বিতীয় অংশ দ্বারা তিনি মনুষ্যত্ব বুঝিয়েছেন। কারণ স্বাধীন ব্যক্তিদের অন্তরের তিক্ততা ভেঙে পড়াকে অস্বীকার করে এবং তুচ্ছতা থেকে আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। ফলে সে সাধ্যমতো সচ্ছলতা প্রকাশ করে এবং অভাব গোপন রাখে, এমনকি তাদের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি তাদের আত্মসংযমের কারণে তাদের ধনী মনে করে। কারণ সে তাদের খরচের প্রশস্ততা, দেহের পরিচ্ছন্নতা এবং তার আশপাশের পোশাক-পরিচ্ছদের শুভ্রতা দেখতে পায়। আর আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তাতে সে অন্যকে অংশীদার করে এবং কোনো খোঁটা না দিয়ে বা তাকে তুচ্ছ না করে তা দান করে। যেমন আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন এবং শিষ্টাচার শিখিয়েছেন তাঁর এই বাণীর মাধ্যমে: (তোমরা খোঁটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বাতিল করো না)। এবং তিনি আমাদের সেই ব্যক্তির দান নিষ্ফল হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন যে নিন্দনীয় উদ্দেশ্যে লোকদেখানোর জন্য ব্যয় করে, অথচ তার মধ্যে কোনো মহানুভবতা কাজ করে না বা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার মাধ্যমে সওয়াব পাওয়ার আশাও থাকে না।
একটি মনোরম বিরতি
জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল স্থায়ী আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোতেই আনন্দ পান। আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর প্রকৃত অবস্থা এবং সেগুলোর ক্ষণস্থায়ী আনন্দ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যমীনের সেই সব সাজসজ্জার ওপর যা নানা অলঙ্কারে সজ্জিত এবং সেই সব চাকচিক্য দ্বারা আবৃত যা বাকশক্তিহীন পশুদের আনন্দ দেয়। ফলে সে তাতে মগ্ন হয়, তার কোমলতায় গড়াগড়ি খায় এবং তার সুগন্ধে উল্লসিত হয়—এমনকি বিবেকসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে। তবে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল তখনই এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক আনন্দ লাভ করেন যখন তিনি একে দূরদর্শিতা ও শিক্ষা গ্রহণের দৃষ্টিতে দেখেন; যেভাবে একজন অসচেতন ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা মদ্যপান এবং মদ্যপায়ীদের মাঝে পড়ে থেকে কেবল শারীরিক আনন্দ লাভ করে। যেহেতু তার এবং তার সমগোত্রীয়দের জন্য কেবল সামান্য সময় অবশিষ্ট আছে, যার পর চিরস্থায়ী ধ্বংস অনিবার্য, এমনকি সজীবতা শেষ হওয়ার পর তা পচে যায়, সবুজের পর হলুদ বর্ণ ধারণ করে, সতেজতা ঝরে পড়ে এবং শুষ্ক খড়কুটোয় পরিণত হয় যা ধূলি উড়িয়ে নেওয়া বায়ু বিক্ষিপ্ত করে দেয়, প্রবল বাতাস যাকে ধূলিকণা বানিয়ে দেয় এবং স্রোত যাকে আবর্জনার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়; ফলে এর পরিবর্তে যা ছিল তা সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে হারিয়ে যায়। এগুলো তো কেবল ক্ষণস্থায়ী স্মারক যা তাদের মনে রয়ে গিয়েছিল; যেমন রাঙা গাল যা জাফরানি ফুলের মতো রক্তিম, স্বচ্ছ আঁখি যা নার্গিস ফুলের মতো সুন্দর, ডালিম ফুলের মতো রাঙা অধর এবং বৃষ্টির পর শুভ্র দাঁতের হাসি ও গোঁফের রেখা যা যেন বনফশা ফুলের বাগান। কিন্তু এই সব স্মারক যখন নির্দিষ্ট আয়ুর অধিকারী ব্যক্তিদের ওপর আপতিত ক্ষণস্থায়ী গুণাবলী মাত্র, যা দিবা-রাত্রির বিবর্তনে জীর্ণ হয়ে যায়, তখন তা জান্নাতের চিরস্থায়ী বালকদের মতো শাশ্বত হয় না, যারা তাদের প্রতিশ্রুত গুণাবলীতে স্থির থাকে; যা কেউ কেউ ভুলবশত চিরস্থায়ী মনে করেছিল। তাই তার পরিবর্তে মাটির নিচে সঞ্চিত মণি-মুক্তা এবং উত্তাল সমুদ্রের অতল গভীরে সংরক্ষিত রত্নরাজি প্রদান করা হয়েছে, যা অনাগত শতাব্দী ও যুগের পর যুগ স্থায়ী হয়। এটি তাদের প্রতি আল্লাহর একটি অনুগ্রহ ছিল, যেমনটি তিনি বলেছেন: (উভয় সমুদ্র থেকে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল। সুতরাং তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?) এবং তাঁর বাণী: (এবং তোমরা সমুদ্র থেকে পরিধানযোগ্য অলঙ্কার আহরণ করো)। তিনি জান্নাতবাসিনীদের এগুলোর সাথে তুলনা করে বলেছেন: (তারা যেন পদ্মরাগ মণি ও প্রবাল)। যদি এগুলোতে সৌন্দর্য না থাকত, তবে তা সোনা ও রূপা থেকে পৃথক হতো না। কারণ বিপদের সময় অভাব দূর করার ক্ষেত্রে সোনা-রূপা ও রত্নরাজির ভূমিকা একই, বরং প্রয়োজন মেটানোর মূল্যায়নে এগুলো সোনা-রূপার থেকেও বেশি মূল্যবান। কখনও কখনও এগুলো অভাব দূরীকরণের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এগুলো মূলত শারীরিক রত্ন যার মূল্য নির্ধারিত হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্যের মাধ্যমে, এবং যতক্ষণ এই সৌন্দর্য বজায় থাকে ততক্ষণ এর প্রশংসা করা হয়। কিন্তু যখন এগুলো আধ্যাত্মিক রত্নের সাথে তুলিত হয়, তখন তা তুচ্ছ হয়ে পড়ে এবং যা আগে প্রশংসিত ছিল তা নিন্দিত হয়; যেমনটি আবু বকর আল-খাওয়ারিজমি এক ব্যক্তির বর্ণনায় বলেছিলেন: সে হলো ঝিনুকের মুক্তাসমূহের মধ্যে একটি অনন্য মুক্তা এবং স্বাধীনচেতা মানুষদের মাঝে এক শ্রেষ্ঠ রত্ন, পাথরের তৈরি রত্ন নয়।
একটি মনোরম বিরতিসকল মানুষ এক পিতার সন্তান এবং আকৃতিতে পরস্পর সদৃশ। তাদের প্রবৃত্তিগত স্বভাব, মেজাজ ও প্রকৃতির ভিন্নতার কারণে তাদের মাঝে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও হিংসা বিদ্যমান। আদম (আ.)-এর সেই দুই পুত্রের যুগ থেকেই এটি চলে আসছে, যাদের একজনের কোরবানি কবুল হয়েছিল এবং অন্যজনেরটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। মহান আল্লাহর ভয় অথবা সুলতানের তাৎক্ষণিক শাসন যদি বাধা না দিত [তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো]। সুলতান যদি শক্তিশালী, আদেশ পালনে কঠোর এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সত্যবাদী না হন, তবে তার প্রজাদের ওপর শাসন ব্যবস্থা সুসংহত হয় না। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে তার সমকক্ষ মনে করে এবং মনে করে যে তার (সুলতানের) সম্পদ ও রাজত্বের ওপর তারই অধিক অধিকার রয়েছে। এই কারণেই রাজত্বকে একটি বিশেষ গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে যাতে অন্যান্য গোত্রের হাত তা থেকে সংকুচিত থাকে। অতঃপর সেই গোত্রের এক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির ওপর, তারপর তার বংশধর ও উত্তরাধিকারীর ওপর তা ন্যস্ত করা হয়েছে; ফলে রাজত্ব তাদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হয়েছে। এরপর এর সাথে এক অলৌকিক অবস্থা যুক্ত হয়েছে যা তাকে চরম শক্তিশালী করে তুলেছে—আর তা হলো আসমানি সাহায্য এবং ঐশী আদেশ, যা একটি নির্দিষ্ট বংশধারার জন্য নির্ধারিত, যা কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না। যেমনটি পারস্যে কায়সারদের মধ্যে ছিল এবং ইসলামে কুরাইশদের জন্য ইমামতের সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে ছিল এবং যাদের জন্য আত্মীয়তার কারণে ভালোবাসা ওয়াজিব করা হয়েছে। তিব্বতবাসীরা তাদের প্রথম খাকানের ব্যাপারে যেমন বিশ্বাস করত যে, সে সূর্যের পুত্র এবং বর্ম পরিহিত অবস্থায় আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। জাহেলিয়াত যুগে কাবুলের অধিবাসীরা তাদের প্রথম তুর্কি রাজা 'বরহমেগীন' সম্পর্কে বিশ্বাস করত যে, সে সেখানে 'গাবরা' নামক একটি গুহায় সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখান থেকে শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় বের হয়ে এসেছে। জাতিসমূহের মাঝে প্রচলিত এই জাতীয় উপকথাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আনুগত্যে ঐক্যবদ্ধ করা এবং প্রত্যেকের মনে রাজত্ব লাভের যে লালসা থাকে, তা সমূলে উৎপাটন করা। রাজাগণ যেমন এই সকল বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে অন্যদের থেকে নিজেদের পৃথক করেছেন, তেমনি সুউচ্চ দালান নির্মাণ, রাজপ্রাসাদ প্রশস্তকরণ, চত্বর ও ময়দান বিস্তৃতকরণ এবং সিংহাসন উঁচু করার মাধ্যমেও সেই স্বাতন্ত্র্যকে পূর্ণতা দান করেছেন। এসব কিছুর উদ্দেশ্য ছিল উচ্চতা থেকে সাধারণ ও বিশেষ সর্বস্তরের মানুষের ওপর নজরদারি করা। কবি বুহতুবি এই প্রসঙ্গে বলেছেন—
পূর্ণিমার চাঁদের কাছে কিছুই নেই কেবল তা ছাড়া যা আপনাকে দান করা হয়েছে … তার কাজ শুধু আলো দেওয়া এবং তার মঞ্জিলগুলো সুউচ্চ হওয়া।শারীরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির যেহেতু কোনো উপায় ছিল না, তাই তারা মুকুট ও শিরস্ত্রাণের আশ্রয় নিলেন। তারা হাত লম্বা করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতেন, এমনকি তা নক্ষত্ররাজি পর্যন্ত পৌঁছানোর বিবরণও দেওয়া হতো। যেমন হিন্দুদের এক রাজাকে তারা 'মহাবাহু' অর্থাৎ দীর্ঘ বাহুবিশিষ্ট বলত। পারস্যের রাজা বহমন আর্দাশিরকেও 'রাওয়ান্দ দস্ত' অর্থাৎ দীর্ঘ হাতওয়ালা বলা হতো। এসবই ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার হাত প্রসারিত করার নিদর্শন। এরপর তারা নানাবিধ মূল্যবান অলংকারে নিজেদের সজ্জিত করলেন যাতে মানুষের দৃষ্টিতে সম্পদের মাহাত্ম্য ফুটে ওঠে এবং তাদের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিবদ্ধ হয়। তারা এমন সব অভিনব ও সুন্দর কৌশল অবলম্বন করলেন যার মাধ্যমে তারা তাদের ঘনিষ্ঠ পারিষদদের গোপন বিষয় এবং সাধারণ প্রজাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন। দূরবর্তী দেশগুলোর সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য তারা দ্রুতগামী সংবাদবাহক, সুশৃঙ্খল ডাকব্যবস্থা, দ্রুতগামী জাহাজ এবং পথচেনা পায়রার সাহায্য নিতেন, যা দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে স্বল্প সময়ে আদেশ ও নির্দেশাবলি পৌঁছে দিত। ফলে গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় মানুষ তাদের ভয় করতে শুরু করল এবং বিশ্বাসঘাতকতা পরিহার করল। নৃপতি ও প্রতাপশালী রাজাদের ইতিহাসে এ জাতীয় অনেক খবর পাওয়া যায়।বিরতিরাজাগণই অর্থ সম্পদ সঞ্চয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী, কারণ এর মাধ্যমেই তারা ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখেন এবং শাসনকার্য পরিচালনা করেন। খলিফা মনসুর তার দ্বাররক্ষী রবী'কে বলেছিলেন—হে রবী', আমি অর্থ সঞ্চয় করি কারণ মানুষ আমাকে কৃপণ মনে করে; অথচ আল্লাহ আমাকে এই নিন্দনীয় স্বভাব থেকে মুক্ত রেখেছেন। কিন্তু আমি যখন দেখলাম তারা দিনার ও দিরহামের দাস, তখন আমি এর মাধ্যমেই তাদের অনুগত করতে চেয়েছি যাতে প্রয়োজনের সময় তারা আমার মুখাপেক্ষী হয়। বস্তুত এই অর্থ সঞ্চয় কোনো ধনভাণ্ডার বা প্রকৃত গুপ্তধন হিসেবে ছিল না, বরং তা অভাবীদের মাঝে বণ্টনের জন্যই ছিল। কারণ তাদের দানের ভাণ্ডারের দিকে অসংখ্য হা করা মুখ এবং যাঞ্চাকারী হাত প্রসারিত থাকে। তাদের রিজিক ও বেতনের আশায় মানুষের চোখ লোলুপ হয়ে থাকে। তাই তারা সম্পদ কমে যাওয়ার ভয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকেন। যা কিছু জমা হয় তা অবশ্যই একদিন খরচ হয়ে যায় এবং খরচ হতে হতে নিঃশেষ হয়ে যায়। পরলোকগত আমীর ইয়ামীনুদ্দৌলা মাহমুদ (রহ.)-এর কথা আমার মনে পড়ে। তার স্বভাব সম্পর্কে আমরা যা উল্লেখ করেছি তা অত্যন্ত দৃঢ় ও সুপ্রতিষ্ঠিত; তিনি একটি শিকার বা লক্ষ্য হাসিল করার সাথে সাথেই পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেন। আমি তাকে বলেছিলাম—আপনার রবের শুকরিয়া আদায় করুন এবং তাঁর কাছে এই রাজত্ব ও সৌভাগ্যের সুরক্ষা প্রার্থনা করুন। কারণ এই বিশাল ধনভাণ্ডার কেবল এরই বদৌলতে অর্জিত হয়েছে। একদিন যদি শৃঙ্খলা নষ্ট হয় তবে এই সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। শহীদ আমীর মাসউদের (আল্লাহ শাহাদাতের মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন) অবস্থা বিবেচনা করলে আমার কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। বিশৃঙ্খলার সময় তার অর্জিত ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদ একদিনেই ধোঁয়ার মতো ও ধূলিকণার মতো উড়ে গিয়েছিল। আল্লাহর আদেশ সুনির্ধারিত।বিরতিযখন রাজাগণ তাদের ঐচ্ছিক এবং অনৈচ্ছিক চলাফেরা ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এমন সম্পদশালীদের প্রয়োজন অনুভব করলেন যাদের মাধ্যমে তাদের সেবকদের খরচ নির্বাহ হবে এবং যাদের মাধ্যমে তাদের ব্যয়ভার ও আপদকালীন প্রয়োজন মিটবে, এবং যখন রূপা (ওয়্যারাক) ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল্যের তুলনায় বহনে হালকা ছিল, তখন তারা এর ওপর স্বর্ণের (আইন) শ্রেষ্ঠত্বের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। তারা দেখলেন যে, দিয়াত (রক্তপণ) ও জাকাতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রাচীন মূলনীতি অনুযায়ী স্বর্ণের মাধ্যমে অর্জিত মূল্য রূপার মাধ্যমে অর্জিত মূল্যের দশগুণ। যদিও পরবর্তীতে দুষ্প্রাপ্যতা বা মুদ্রার বিকৃতির কারণে কখনও কখনও এই মূল্যের পরিবর্তন ঘটে থাকে। আর প্রতিটি জগতের মূল সৃষ্টিগত স্বভাব হলো এই যে, রৌপ্যের চেয়ে স্বর্ণ পাওয়া অধিক কঠিন এবং তামার চেয়ে রৌপ্য পাওয়া অধিক দুষ্কর। এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলো এর ক্ষুদ্র বা বৃহৎ আয়তন এবং ওজনের আধিক্য বা স্বল্পতা। এরপর বিস্ময়ের বিষয় হলো জুরভিয়ান খনিতে বিদ্যমান একটি খনিজ পদার্থ, যা এই তিন জাতীয় রত্ন বা ধাতু এই অনুপাতের কাছাকাছি প্রদান করে। তা হলো, সেখান থেকে প্রাপ্ত এক বোঝা বা ভারের মধ্যে স্বর্ণ থাকে দশ দিরহাম ওজন, রৌপ্য থাকে পঞ্চাশ দিরহাম ওজন এবং তামা থাকে পনের মান। এই কারণেই ভ্রমণের সময় তারা রূপার চেয়ে স্বর্ণকে প্রাধান্য দিতেন এবং তাদের কাছে এর ভার বহন করা সহজ ছিল। যখন তারা আকস্মিক বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ ছিলেন না—আর এটি জানাই আছে যে, বিপদে মুক্তি মেলে স্বল্পতা ও হালকাতায়—তখন তারা মণি-মাণিক্যের দিকে ঝুঁকলেন। কারণ স্বর্ণের আয়তনের তুলনায় মণি-মাণিক্যের আয়তন অনেক ক্ষুদ্র, যেমন রৌপ্যের আয়তনের তুলনায় স্বর্ণের আয়তন ক্ষুদ্র। আবার রৌপ্যের আয়তন সেই প্রয়োজনের তুলনায় ক্ষুদ্র যা এর দ্বারা কেনা যায়। ফলে তারা মণি-মাণিক্য সাথে রাখতেন এবং নিজেদের সাথে যুক্ত রাখতেন। কিন্তু যখন সেই দুর্ঘটনাগুলো ছদ্মবেশ ধারণ করতে বাধ্য করত, তখন সম্ভবত এগুলোই তাদের ধরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়াত। যেমন গুহাবাসী যুবকদের ক্ষেত্রে রৌপ্য মুদ্রার প্রাচীন ছাপ তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিল, এমনকি প্রাচীন গুপ্তধন পাওয়ার সন্দেহে তাদের প্রতি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। আর তা এই কারণে যে, মণি-মাণিক্য বিশেষভাবে রাজকীয় সরঞ্জাম। যখন এটি অন্য কারও কাছে পাওয়া যায় যার অবস্থার সাথে তা মানানসই নয়, তখন তার ব্যাপারে নানাবিধ সন্দেহের উদ্রেক হয়; হয় এটি চুরি করা—আর চোর সর্বদা অন্বেষিত—অথবা এটি কোনো উচ্চপদস্থ ছদ্মবেশীর প্রকৃত মালিকানা, আর তেমন ব্যক্তি সর্বদা নজরদারিতে থাকে। শ্রেষ্ঠ রাজাগণ সম্পদসমূহ মসজিদের বায়তুল মালে জমা করতেন এবং তা যথাযথ পন্থায় সংগ্রহ করতেন। অতঃপর তারা সেই সম্পদ তাদের পরিবারের রক্ষকদের নিকট এবং যারা শত্রুর আক্রমণ থেকে সীমান্ত রক্ষা করে তাদের নিকট বণ্টনের মাধ্যমে গচ্ছিত রাখতেন। কারণ তাদের প্রথম চিন্তাই ছিল তাদের শেষ কর্ম। তারা ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীন এবং যারা তাদের অনুসরণে তাদের সদৃশ হয়েছিলেন, যেমন উমর ইবনে আব্দুল আজীজ এবং মারওয়ান বংশীয় অনেক শাসক ও আব্বাসী বংশীয় অল্প কিছু শাসক। কারণ তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে একটি ভারী বোঝা হিসেবে দেখতেন যা তারা বহন করছেন এবং একে একটি পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করতেন যাতে তারা নিপতিত হয়েছেন। তারা এর কঠোরতা লাঘব করার চেষ্টা করতেন এবং এর পাপের ভারে নিমজ্জিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকতেন। মাগরেবের সুদূর অঞ্চলের কোনো এক জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, সেখানে নেতৃত্ব তাদের গণ্যমান্য ও স্থায়ী ব্যক্তিদের মধ্যে আবর্তিত হতো। যারা দায়িত্ব পেতেন তারা তিন মাস মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতেন। মেয়াদ শেষ হলে তিনি নিজে থেকেই পদত্যাগ করতেন এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দান-সদকা করতেন। এরপর তিনি প্রসন্ন চিত্তে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতেন যেন তিনি বন্ধনমুক্ত হয়েছেন এবং নিজের কাজে মনোনিবেশ করতেন। এর কারণ হলো, প্রকৃত অর্থে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব হলো প্রজাসাধারণের আরামের জন্য নিজের আরাম বর্জন করা, তাদের ওপর জুলুম প্রতিরোধ করা, তাদের পরিবার, সম্পদ ও রক্ত রক্ষার জন্য নিজে পরিশ্রম করা এবং তাদের পক্ষ হয়ে লড়াই ও জনসমষ্টির প্রতিরক্ষার জন্য কৌশল নির্ধারণে নিজেকে নিয়োজিত করা। তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয় তা যেন কোনো এলাকার প্রহরীর নির্ধারিত পারিশ্রমিকের মতো, যেমনটি কাফেলার পথপ্রদর্শক তার কাজ ও পদমর্যাদা অনুযায়ী সংগ্রহ করে থাকে। আর সেই সময় তার অবসানের সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেছে। প্রত্যেক সময়ের কিছু রীতি থাকে যা সে সময়ের মানুষের ক্ষেত্রে রক্ষা করা আবশ্যক, নতুবা সামঞ্জস্য ও ঐক্যের পর ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে।
বিরতিস্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানি পান করা হারাম করা হয়েছে মূলত পূর্বোল্লিখিত কারণে যে, এর দ্বারা জনকল্যাণ ব্যাহত হয় এবং শয়তানের এই প্ররোচনার দিকে ধাবিত করে: "আমি অবশ্যই তাদের আদেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে।" এছাড়া এতে আরও একটি সূক্ষ্ম রহস্য রয়েছে যা সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিল। তা হলো এই পাত্রগুলো রাজাদের জন্যই শোভা পায়, সাধারণ মানুষের জন্য নয়। আর মানুষের জন্য সময়ের বিবর্তনে স্বচ্ছলতা ও সংকীর্ণতার পালাবদল ঘটে। ফলে স্বচ্ছলতার দিনে অধিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে যদি সেই সম্পদ যা প্রজাদের মধ্যে বণ্টন করা উচিত ছিল, তা এই পাত্র তৈরিতে ব্যয় করা হয়, অতঃপর সময়ের পরিবর্তন ঘটে এবং এর বিপরীত অবস্থা (সংকট) আসে, তখন এগুলো গলিয়ে দিরহাম ও দিনার তৈরির প্রয়োজন পড়ে। ফলে সেই সম্পদ হস্তগত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, দারিদ্র্য প্রকাশ পায় এবং মানুষের মাঝে দুর্বলতা ও দেউলিয়া হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে শত্রুরা লোলুপ দৃষ্টি দেয়। কারণ মানুষ লোভের দাস এবং তারা সুযোগ পেলে পাওনা অধিকার আদায়ে বাধা দেয়। ধারণা করা হয় যে, এই বিষয়টিই এই হারামের নির্দেশের অন্তরালে নিহিত রয়েছে। কেননা শরীয়ত কোনো না কোনো ইহকালীন বা পরকালীন সাধারণ বা বিশেষ কল্যাণ থেকে মুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা সকলকে চিন্তাভাবনা করার এবং অতীতের আলোকে ভবিষ্যৎ থেকে শিক্ষা নেওয়ার তৌফিক দান করুন। তিনি তাদের অল্পে তুষ্টির মাধ্যমে পাপের বোঝা থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর করুণা ও দয়ায় প্রতারক ও দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে নিরাপত্তা দান করুন।
পরিচ্ছেদসম্ভবত তারা খনি থেকে এগুলো আহরণ করে, ফলে মণিটি পাথর লেগে থাকা অবস্থায় বেরিয়ে আসে, এরপর তা থেকে পাথর ভেঙে আলাদা করা হয়। এর আহরণ পদ্ধতির বর্ণনার সাথে মিল রয়েছে যে, ভারত ভূখণ্ডের চাল, ডাল এবং বিভিন্ন প্রকার কলাইয়ের মতো ভক্ষণযোগ্য শস্যের মধ্যে 'কুলত' নামক একটি শস্য রয়েছে। এটি ধূসর বর্ণের, ছাই রঙের ন্যায়; দেখতে অনেকটা 'কিরসানাহ' বা 'জাব্বানাহ'র মতো যা দুই আঙুলে চাপ দিলে প্রশস্ত হয়ে যায় এবং মসুর ডালের আকৃতি ধারণ করে, তবে আকৃতিগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে এটি তার চেয়েও চওড়া। মূত্রথলির পাথর চূর্ণ করার ক্ষেত্রে এর বিশেষ গুণ ও কার্যকরী ক্ষমতা রয়েছে যা কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তারা ধারণা করে যে, এর কার্যকারিতা কেবল এই পাথর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাহাড়ের শিলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এমনকি বিষয়টি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইয়াকুত আহরণকারীরা যখন খনির এমন কোনো শক্ত স্থানে পৌঁছায় যা খনন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তারা সেখানে কুলতের ক্বাথ (সিদ্ধ নির্যাস) ঢেলে দেয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রেখে দেয়। ফলে তাদের জন্য তা ভাঙা ও চূর্ণ করা সহজ হয়ে যায়, যেভাবে সোনা ও রূপার খনিতে কাঠ এবং তেল জ্বালিয়ে একই কাজ করা হয়। ইয়াকুত তার কঠোরতার কারণে নিজের চেয়ে নিম্নমানের পাথরগুলোর ওপর জয়ী হয় (অর্থাৎ সেগুলোকে কাটতে পারে), এরপর হীরা তার ওপর জয়ী হয়; ফলে হীরা ছাড়া অন্য কিছু একে কাটতে বা আঁচড় কাটতে পারে না, তবে তা ভাঙা যায় না। আল-কিন্দি বলেন: ইয়াকুত অন্যান্য পাথরের মতো আর্দ্র 'ওশার' কাঠ দিয়ে পালিশ করা হয় না, বরং এটি একটি তামার পাতের ওপর পানি দিয়ে পালিশ করা হয়। সেখানে ইয়ামানি আকিকের চুন (যা কলিচুনের মতো পোড়ানো হয়েছে) দিয়ে ঘষা হয়। এটি শিরীষ পাথর (সানবাজাজ) দিয়ে সীসার পাতের ওপর সমতল করার পর করা হয়। কখনও কখনও সেই ঘর্ষণের নির্যাস পাতের নিচের পানিতে গিয়ে পড়ে। যদি ইয়াকুতের গভীর অংশ পালিশ করার প্রয়োজন হয়, তবে তামার পাতের পরিবর্তে 'শাহর' নামক যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। তিনি আরও বলেন, এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্যুতি; স্বচ্ছতা ও মসৃণতার দিক থেকে এটি অনন্য, কারণ এটি সবচাইতে বেশি উজ্জ্বল। একারণেই একে 'গাদা' বৃক্ষের অঙ্গারের সাথে তুলনা করা হয়, কারণ এর আলো অত্যন্ত স্বচ্ছ, লাল বর্ণ অত্যন্ত গাঢ় এবং এটি দীর্ঘক্ষণ ছাই না হয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকে। আল-রাঈ বলেন—
মুক্তা ও ইয়াকুত, যার পাথরগুলো যেন... গাদা বৃক্ষের প্রজ্বলিত আগুন, যা বক্ষদেশের অলঙ্কারসমূহকে শোভিত করেছে।
আমাদের বর্তমান সময়ের একজন জহুরি বলেন: ইয়াকুতের মধ্যে যা উৎকৃষ্ট ডালিম সদৃশ (রুম্মানি) পাওয়া যায়, সারানদ্বীপের (শ্রীলঙ্কার) শাসক তা নিজের জন্য রেখে দেন এবং তা বিশেষভাবে তারই মালিকানায় থাকে। আর এর চেয়ে নিম্নমানেরগুলো ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের জন্য রাখা হয়। এ কারণেই বর্তমানে আমাদের দেশে রুম্মানি ইয়াকুত কোনো কিছুই আনা হয় না, আর যা পাওয়া যায় তা অনেক প্রাচীন। টলেমি তার 'জিওগ্রাফি' গ্রন্থে ইয়াকুত দ্বীপকে বেষ্টনকারী একটি লাল পাহাড়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা মূল ভূখণ্ড থেকে শুরু হয়ে দ্বীপের চারপাশ ঘিরে রেখেছে। এর অভ্যন্তরে বিভিন্ন শহর, ঝরনা ও নদী রয়েছে। এর দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশ সম্পর্কে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা জনবসতিপূর্ণ পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের শেষ সীমানায় এবং বিষুবরেখা (খাত্তুল ইসতিওয়া) বা তার নিকটবর্তী স্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি এমন কিছু উল্লেখ করেননি যার মাধ্যমে জানা যায় যে এটি ইয়াকুতের খনি, অথবা এর লাল বর্ণের কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে কি না। এমনকি এমন কাউকে পাওয়া যায় না যার কাছে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য রয়েছে। কখনও কখনও কোনো স্থানের এমন নামকরণ করা হয় যার বাস্তবতা সেখানে নেই। যেমন 'সবুজ সাগর'-এ দিবেজাত ও জাবিজের সীমানায় দিউ ও জাভা দ্বীপপুঞ্জের দিকে একটি দ্বীপ আছে যা 'ইয়াকুত দ্বীপ' নামে পরিচিত, অথচ সেখানে ইয়াকুতের কোনো চিহ্ন নেই। এর নামকরণ কেবল সেখানকার নারীদের সৌন্দর্যের কারণে করা হয়েছে; যেমনটি বলা হয়েছে 'গাব্বুল কামার'-এর নারীদের সম্পর্কে। এর নামকরণ চাঁদের দিকে সম্বন্ধিত করা হয়েছে এর গোলাকার আকৃতি এবং জোয়ার-ভাঁটার প্রভাবে সেখানে পানির আবর্তনের কারণে। 'গাব্ব' হলো এমন একটি স্থান যেখানে সমুদ্র স্থলের ভেতরে প্রবেশ করে, যা জাহাজগুলো এড়িয়ে চলে কারণ এটি অগভীর। আর 'জাযর' হলো সমুদ্রে প্রবহমান পানির মোহনা যখন তার প্রবেশ মুখ প্রশস্ত হয়। কেউ কেউ একে গাব্ব-এর বিপরীত মনে করে বলেছেন যে, এটি স্থলের এমন একটি অংশ যা সমুদ্রের ভেতরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়।
খলিফাদের ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, আল-মুতাওয়াক্কিল নওরোজের উপহার গ্রহণের জন্য বসেছিলেন। তার নিকট প্রতিটি মূল্যবান অলঙ্কার ও প্রতিটি চমৎকার রাজকীয় বস্তু পেশ করা হলো। তখন তার চিকিৎসক জিবরীল ইবনে বখতিশু সেখানে প্রবেশ করলেন, যার সাথে খলিফার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। খলিফা বললেন, "আজকের এই দিনে তোমার মতামত কী?" তিনি বললেন, "এগুলো ভিক্ষুকদের আঁচড়ের মতো, কারণ এগুলোর কোনো মূল্য নেই। আমি যা নিয়ে এসেছি তার দিকে লক্ষ্য করুন।" এরপর তিনি তার আস্তিন থেকে সোনার পাত লাগানো একটি আবনূস কাঠের বাক্স বের করলেন এবং তা থেকে একটি সবুজ রেশমি কাপড় সরালেন, যার ভেতর থেকে একটি বড় রত্নখচিত চামচ বেরিয়ে এল, যা থেকে উল্কার মতো জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। তিনি সেটি খলিফার সামনে রাখলেন। মুতাওয়াক্কিল এমন কিছু আগে কখনো দেখেননি। তিনি বললেন, "তুমি এটি কোথায় পেলে?" তিনি বললেন, "সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে।"
এরপর তিনি বর্ণনা করলেন যে, এটি আমার পিতার কাছে উম্মে জাফর জুবায়দার পক্ষ থেকে তিনবার চিকিৎসার বিনিময়ে তিন লক্ষ দিনারের সাথে এসেছিল। এর মধ্যে একটি ছিল তার গলায় এক প্রকার ব্যথা, যা শ্বাসরোধের আশঙ্কাজনক ছিল। আমার পিতা তাকে রক্তমোক্ষণ (ফাসদ), শীতলীকরণ এবং তার বর্ণিত একটি বিশেষ পানীয় গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ফলে তিনি তার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী একটি অদ্ভুত সুন্দর চীনা পাত্রে আরোগ্য লাভ করেন, যাতে এই চামচটি ছিল। আমার পিতা আমাকে এটি তুলে নেওয়ার সংকেত দিলে আমি তাই করলাম এবং সেটি আমার চাদরে জড়িয়ে নিলাম। ভৃত্য আমার সাথে এটি নিয়ে টানাটানি করলে তিনি তাকে বললেন, "ওর সাথে কোমল আচরণ করো এবং তাকে এটি ফেরত দিতে বলো, বিনিময়ে তাকে দশ হাজার দিনার দাও।" আমি অস্বীকৃতি জানালাম। তখন আমার পিতা বললেন, "হে আমার কর্ত্রী, আমার ছেলে কখনো চুরি করেনি, তার প্রথম প্রচেষ্টাতেই তাকে লজ্জিত করবেন না যাতে তার মন ভেঙে না যায়।" তিনি হাসলেন এবং সেটি তাকে ও আমাকে উপহার দিলেন।
যদিও এই চামচের বুনন সম্পর্কে কোনো সংবাদ নেই, তবে বর্ণনার আলোকচ্ছটা ইঙ্গিত দেয় যে এটি লাল ইয়াকুত পাথর ছিল। তিনি অন্য দুই অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: এক দাসীর খবরের কারণে তার মুখের দুর্গন্ধ পরিবর্তনের ভয় ছিল, এবং তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তার কাছে এর চেয়ে মৃত্যু সহজ। তখন তিনি তাকে আসর পর্যন্ত ক্ষুধার্ত রাখলেন এবং তাকে মাছ খাওয়ালেন এবং জোর করে নিম্নমানের খেজুরের সিরকা পান করালেন। এতে তার বমি বমি ভাব হলো এবং তিনি বমি করলেন। তিন দিন ধরে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করা হলো। এরপর তিনি তাকে বললেন, "যিনি তোমাকে এ সংবাদ দিয়েছিলেন তার মুখের সামনে নিশ্বাস ছাড়ো এবং তাকে জিজ্ঞেস করো যে তা দূর হয়েছে কি না।"
তৃতীয়টি ছিল এই যে, তিনি তীব্র হেঁচকির কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলেন, যা কক্ষের বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল। তখন তিনি ভৃত্যদের নির্দেশ দিলেন আঙিনার ছাদে বড় মাটির পাত্রগুলো তোলার জন্য এবং সেগুলোকে আঙিনার চারপাশের কিনারে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে পানি দিয়ে পূর্ণ করতে। প্রতিটি পাত্রের পেছনে একজন করে ভৃত্য বসানো হলো। যখন তিনি এক হাতের তালু অন্য হাতের ওপর মারলেন, তারা সেগুলোকে বাড়ির মাঝখানে ফেলে দিল। এতে এক বিকট শব্দ হলো যা তাকে আতঙ্কিত করে তুলল। ফলে তিনি লাফিয়ে উঠলেন এবং তার হেঁচকি বন্ধ হয়ে গেল।
উমাইয়া এবং আব্বাসীয় আমলের শুরুর দিকে রত্নরাজির প্রাচুর্য ছিল, এমনকি বলা হয় যে তা দিয়ে পাত্র তৈরি করা হতো। এই কারণেই ইমাম শাফিঈ কিতাবুল হারমালা-তে বলেছেন: "ইয়াকুত এবং স্ফটিকের পাত্র ব্যবহার করা জায়েজ নেই, কারণ এগুলোর মূল্য স্বর্ণের সমান এবং এতে অপচয় স্বর্ণের চেয়েও বেশি।" কিন্তু কিতাবুল উম্ম-এ তিনি বলেছেন: "এগুলোর ব্যবহার বৈধ, কারণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিষেধাজ্ঞার কারণ সুনির্দিষ্ট।"
ইরাক থেকে আগত কেউ বর্ণনা করেছেন যে, আবু তাহির ইবনে বাহাউদ দাওলার কাছে—যিনি প্রথমে সাবরা-র দায়িত্বশীল ছিলেন এবং পরে বাগদাদের মালিক হন—একটি বড় লাল ইয়াকুতের টুকরো ছিল যা স্বর্ণের পিণ্ডে বসানো ছিল। তিনি একে "জাবাল" (পাহাড়) নামে ডাকতেন। সম্ভবত এটি ফাখরুদ দাওলার ছিল, কারণ এর বর্ণনা তার সাথে মিলে যায়। হাসান এবং হুসাইন নামক দুই রাজী ভাই বর্ণনা করেছেন যে, আমির ইয়ামিনুদ দাওলা মাহমুদ (রাহিমাহুল্লাহ) তাদের আঙ্গুরের দানার মতো একটি ইয়াকুত দেখিয়েছিলেন যার ওজন ছিল বারো মিসকাল। তারা এর মূল্য বিশ হাজার দিনার নির্ধারণ করলে তিনি তাদের সত্যয়ন করেন এবং বলেন: "এটি শাহ ত্রিলোচনপালের ছিল এবং এটি তাদের কোনো এক বণিকের কাছে চার লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে বন্ধক ছিল। যদি তার কাছে এর মূল্য বিশ হাজার দিনার না হতো, তবে তিনি এটি ছাড়িয়ে নিতেন না।" যদিও এটি সেই বর্গাকার রমানী ইয়াকুতের দেড় মিসকাল বা এক মিসকালের সমতুল্য ছিল না যা আগে "নাজম" (তারকা) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
জাওলা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তার কাছে একটি বড় রত্নখণ্ড ছিল যা একটি আরোহণের যন্ত্রে লাগানো ছিল। চারজন লোক এর চার প্রান্ত ধরে থাকত যাতে তিনি এর ওপর তার পা রাখেন এবং রত্নের ওপর পা রেখে তারা তাকে হাওদায় উঠিয়ে দিত এবং তিনি তাতে খচ্চরের পিঠের ওপর উঠে বসতেন।
দুই ভাই উল্লেখ করেছেন যে, তারা আমির শহীদ মাসউদের জন্য—আল্লাহ তার শাহাদাতের বিনিময়ে তার মর্তবা বুলন্দ করুন—রায় এবং জিবাল অঞ্চলে অবস্থানকালে সাত হাজার নিশাপুরী দিনার দিয়ে একটি সিংহ আকৃতির লম্বাটে লাল ইয়াকুত ক্রয় করেছিলেন। বলা হয় এটিই ছিল সেই পাহাড় (আল-জাবাল), সম্ভবত এটিই সেই পাথর যা কাবুসের ভাইয়ের উজির সিয়াহর মালিকানাধীন ছিল; তিনি এটি তার পিতার রাজত্বের অংশ হিসেবে পেয়েছিলেন। বর্ণিত আছে যে, এটি ছিল সিংহের মতো, যখন হাতের মুঠোয় নেওয়া হতো তখন তা কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুলির পাশ দিয়ে দৃশ্যমান হতো।
সারান দিবে রত্ন অনুসন্ধানের অনুমতি নিয়ে একটি উপকথার মতো গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয় যে, রত্ন সংগ্রহকারী ব্যক্তি তার মাথা ন্যাড়া করল এবং তামা দিয়ে মাথার একটি আবরণ তৈরি করল যাতে চালুনির মতো ছিদ্র ছিল। মাথার পেছনের অংশে রত্ন রাখার মতো একটি গর্ত রাখল। এরপর সে তার মাথা এতে ঢুকিয়ে দিল এবং অপেক্ষা করল যতক্ষণ না তার কামানো চুল গজাচ্ছে। চুলগুলো ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে এল এবং সেই তামার আবরণের ওপর এমনভাবে জড়িয়ে গেল যে তা ঢেকে ফেলল। এরপর সে একটি লাঠিতে ভর দিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় ভিক্ষুকের বেশে তল্লাশি চৌকি অতিক্রম করে চলে গেল।
আমি খাওয়ারিজমে প্রতি বছর আমির ইয়ামিনুদ দাওলার কাছে পাঠানো উপহার সামগ্রীর মধ্যে একটি ছুরি দেখেছিলাম যার হাতলটি ছিল লাল ইয়াকুতের। যখন হাত দিয়ে তা ধরা হতো, তখন হাতলের ওপর ও নিচ দিয়ে এর দুই প্রান্ত দেখা যেত। কিন্তু এটি ছিল অস্বচ্ছ। তার বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করার পর আমার মনে হলো যে সম্ভবত এটি করকান্দ ছিল। এরপর আমি আর এ সম্পর্কে কোনো সংবাদ পাইনি।
মুতাদিদ বিষয়টি জানতে পারলেন, কিন্তু তিনি কারো কাছে তা প্রকাশ করলেন না যে তিনি এটি শুনেছেন এবং সেখানে যা কিছু আবাদ করা হয়েছিল তা ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন। এখন আমরা পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসি। আমরা সেই বিখ্যাত 'আল-জাবাল' (পাহাড়) নামক রত্নটি সম্পর্কে বলব, যার নাম অন্য কিছুর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। এটি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান একটি লাল ইয়াকুত পাথরের খণ্ড, যা আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। ইব্রাহিম ইবনে মাহদি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি এটি তাঁর পিতার জন্য তিন লক্ষ দিনার দিয়ে ক্রয় করেছিলেন। যখন দিনারের থলিগুলো একটির ওপর আরেকটি রাখা হলো, তখন তা পাহাড়ের মতো স্তূপ হয়ে গিয়েছিল (এজন্যই এর নাম আল-জাবাল)। তিনি এটি হাদিকে উপহার দিয়েছিলেন। আর হারুনুর রশিদকে 'ইসমাইলি' নামে পরিচিত আংটিটি উপহার দেন, যা ছিল এমন এক মরকত (পান্না) দিয়ে তৈরি যার কোনো নজির দেখা যায়নি। তাতে একটি ছিদ্র ছিল এবং তিনি বছরের পর বছর ধরে সেই ছিদ্রটি বন্ধ করার জন্য এর সদৃশ কিছু খুঁজছিলেন, অবশেষে দীর্ঘ সময় পর তা খুঁজে পান। তিনি তা সংস্কারের ব্যবস্থা করলেন এবং স্বর্ণকারদের উপস্থিত করলেন। তারা তাঁর সামনে একটি আংটি তৈরি করল এবং খোদাই করা অংশটিতে মস্তাকি আঠা দিয়ে প্রলেপ দিল যাতে তা রত্নের ছিদ্রে বসানো যায়। হারুনুর রশিদ আংটিটি তাঁর হাতের তালুতে রেখে উভয়ের সাদৃশ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এমন সময় একটি মাছি সেটির ওপর বসল এবং মাছির পায়ে তা আটকে গেল; মাছিটি সেটি নিয়ে উড়ে চলে গেল। তখন হারুনুর রশিদ বললেন— আল্লাহ তাআলা তাঁর বাণীতে সত্যই বলেছেন: "অন্বেষণকারী এবং অন্বেষিত উভয়েই কতই না দুর্বল।"
যখন হাদি খলিফা হলেন এবং হারুনুর রশিদ তাঁর কাছে প্রবেশ করলেন, হাদি রশিদকে 'ইসমাইলি' আংটিটি পরিহিত অবস্থায় দেখলেন। তিনি এটি দেখে ঈর্ষান্বিত হলেন এবং চাইলেন যে এটি যেন 'আল-জাবাল' রত্নটির সাথে যুক্ত থাকে। রশিদ যখন তাঁর নিকট থেকে বেরিয়ে গেলেন, তখন হাদি ফজল ইবনে রবি এবং ইসমাইল আসওয়াদকে তাঁর পেছনে পাঠালেন এই নির্দেশ দিয়ে যে, তিনি যেন ইসমাইলি আংটিটি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন; আর যদি তিনি তা না করেন, তবে যেন তাঁর মাথা নিয়ে আসা হয়। রবি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনাটি খুলে বললেন। তখন রশিদ বললেন— আল্লাহর কসম, আমি এটি নিজের হাত ছাড়া অন্য কারো মাধ্যমে দেব না। অতঃপর তিনি তাদের সাথে ফিরে আসলেন এবং যখন তারা একটি ব্রিজের কাছে পৌঁছালেন, তখন তিনি আঙুল থেকে আংটিটি খুলে বললেন, হে ফজল, এটাই কি সেই ইসমাইলি আংটি? তিনি বললেন— হ্যাঁ। তখন রশিদ আংটিটি দজলা নদীতে ফেলে দিলেন। তারা সেটি অনেক খুঁজলেন কিন্তু পেলেন না। অবশেষে রশিদ যখন খলিফা হলেন এবং তাঁর খেলাফতের এক বছর অতিবাহিত হলো, তখন তিনি আল-খুলদ প্রাসাদে থাকা অবস্থায় মুসা (হাদি) তাঁর সাথে যে আচরণ করেছিলেন তা স্মরণ করলেন। ফলে তাঁর সেই আংটির কথা মনে পড়ে গেল এবং তিনি ফজলকে নির্দেশ দিলেন ডুবুরি দিয়ে সেটি খুঁজে বের করতে। ফজল বললেন— হে আমার প্রভু, এটি অনেকবার খোঁজা হয়েছে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে আমার মনে হয় এর ওপর চার হাতেরও বেশি পলি বা কাদা জমে গিয়েছে। এরপর ফজল ডুবুরিদের নিয়ে সেখানে গেলেন। তখন তাদের মধ্যে একজন বলল, আপনি হারুনুর রশিদের দাঁড়ানোর স্থানে দাঁড়ান এবং আংটির ওজনের সমপরিমাণ একটি মাটির ঢেলা সেভাবে নিক্ষেপ করুন যেভাবে তিনি আংটিটি নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি তা-ই করলেন। পানির স্রোতের কারণে ঢেলাটি যতটুকু সরে যেতে পারে তা হিসাব করে যখন ডুবুরি সেই নিক্ষিপ্ত স্থানে ডুব দিল এবং তলদেশে পৌঁছাল, তখন সে হুবহু সেই আংটিটি বের করে আনল। রশিদ সেটি 'আল-জাবাল' রত্নটির সাথে যুক্ত করলেন, যেমনটি হাদি চেয়েছিলেন; যদিও তাকদির হাদিকে তাঁর আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেয়নি। নসর উল্লেখ করেছেন যে, সেই রত্নটি ছিল গাঢ় লাল এবং স্বচ্ছ। এর ওজন ছিল এক দানাক কম তিন মেসকাল এবং এর মূল্য ছিল দশ কোটি দিনার।
হারুনুর রশিদ রত্ন-পাথরের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন এবং সেগুলো সংগ্রহ করার ব্যাপারে অতিশয় আগ্রহী ছিলেন। তিনি কিন্দি-র পিতামহ সাব্বাহ জওহারিকে সেরেন্দ্বীপের (শ্রীলঙ্কার) অধিপতির নিকট পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি সেখান থেকে কিছু রত্ন ক্রয় করে আনেন। রাজা তাঁকে সম্মান জানালেন ও স্বাগত জানালেন এবং তাঁর রত্নভাণ্ডার দেখালেন। তিনি সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলেন এবং সেগুলোর মহিমা ও বিশালাকার দেখে বিস্মিত হচ্ছিলেন। পরিশেষে তিনি এমন একটি লাল ইয়াকুত দেখলেন যার সমতুল্য কোনো কিছু রাজাদের ভাণ্ডারে ইতিপূর্বে কখনো দেখেননি। তাঁর বিস্ময় চরমে পৌঁছাল। রাজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন— আপনি কি ইতিপূর্বে এর মতো কিছু দেখেছেন? তিনি বললেন— আল্লাহর কসম, না। রাজা বললেন— তবে কি আপনি এর মূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন? অথচ সবাই এতে অক্ষম হয়েছে। তিনি বললেন— আমি পারব। এটি রাজার কাছে কঠিন মনে হলো এবং তিনি তাঁকে বললেন— আমি তো আপনার বুদ্ধিমত্তাকেই প্রাধান্য দিতাম, কিন্তু আপনি এমন বিষয়ের দাবি করে আমার অন্তর্দৃষ্টিকে ভুল প্রমাণ করলেন যা সকলেই করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাব্বাহ বললেন— আপনার অন্তর্দৃষ্টি ভুল করেনি। আর যদি আপনি এর সত্যতা যাচাই করতে চান, তবে আপনার কাছে রত্ন বিশেষজ্ঞরা একত্রিত করুন। রাজা তাদের একত্রিত করলেন। সাব্বাহ একটি চাদর আনালেন এবং সেটি বিছিয়ে এর চার প্রান্ত চারজনকে দিয়ে শূন্যে ধরিয়ে রাখলেন। তারপর তিনি ইয়াকুত পাথরটি পূর্ণ শক্তি দিয়ে সেই চাদরের ওপর নিক্ষেপ করলেন। যখন সেটি চাদরের ওপর পড়ল, তখন তিনি রাজাকে বললেন— এর মূল্য হলো ভূমি থেকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ততটুকু উচ্চতা পর্যন্ত মণি-মুক্তা দিয়ে পূর্ণ করা যতটুকু উচ্চতায় এটি নিক্ষেপের ফলে উঠেছিল। সমবেত লোকগণ এবং স্বয়ং রাজা তাঁর এই কথাটি পছন্দ করলেন। রাজা নির্দেশ দিলেন এবং তাঁর মুখ উত্তম রত্ন দ্বারা পূর্ণ করে দেওয়া হলো, তাঁকে সম্মানসূচক পোশাক পরানো হলো এবং তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ করে তাঁকে বিদায় দেওয়া হলো।
সালামি লাহহাম থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু বশর সিরাফি এক রাতে সেরেন্দ্বীপে তাঁর মামার নিকট ছিলেন। তখন তিনি একটি লাল ইয়াকুতের খণ্ড উপস্থিত করলেন এবং সেটি কিতাবের অক্ষরের ওপর রেখে তা পাঠ করছিলেন। বর্ণনাকারী এতে বিস্মিত হলেন এই ভেবে যে, এটি রাতের অন্ধকারে আলো দিচ্ছে; অথচ কোনো আলোক উৎস থেকে আলো পড়া ছাড়া কোনো স্বচ্ছ বস্তু কীভাবে আলোকিত হতে পারে? সেই ইয়াকুতটি ছিল গোলকের অর্ধাংশের মতো যার সমতল অংশটি ছিল কিতাবের দিকে। সূক্ষ্ম লেখাগুলো এ ধরনের স্ফটিকের মাধ্যমে পড়া যায়, কারণ এর ভেতর দিয়ে দেখলে লেখাগুলো মোটা মনে হয় এবং লাইনগুলো প্রশস্ত দেখায়। এ বিষয়ের কারণসমূহ আলোকবিজ্ঞানের (অপটিক্স) ওপর নির্ভরশীল।
ইসমাঈলীদের বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি ঘটনা হলো যে, আমীর আমীন আদ-দৌলা একদিন বলখ শহরে শিকারের উদ্দেশ্যে বের হলেন। বুখারার জনৈক সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল এবং পীড়াপীড়ি শুরু করল। আমীর এ জাতীয় লোকেদের প্রতি বিরক্ত হতেন, তাই তিনি তাকে লাঠি দিয়ে প্রহার করার নির্দেশ দিলেন। ঘটনাচক্রে তিনি যখন হাত নাড়ালেন, তখন তাঁর আংটির পাথরটি খসে পড়ে গেল। এটি চড় খাওয়া সেই বুখারী ব্যক্তির সামনেই ঘটল। বুখারী ব্যক্তিটি মিছিল অতিক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় ওত পেতে রইল, অতঃপর সে এসে রাস্তা থেকে পাথরটি কুড়িয়ে নিল। আমীর যখন ফিরে এলেন, তখন তাঁর দৃষ্টি আংটির ওপর পড়ল এবং তিনি পাথরটি খোঁজার নির্দেশ দিলেন এবং এ ব্যাপারে কড়াকড়ি করলেন। পরদিন তিনি যখন পুনরায় সওয়ার হলেন, বুখারী ব্যক্তিটি আগের দিনের মতোই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল এবং পুনরায় বিরক্ত করতে শুরু করল। আমীর তার মাথা মুদগর দিয়ে চূর্ণ করার নির্দেশ দিলেন। তখন বুখারী তাকে বলল, ‘আপনি যদি আপনার মাল থেকে আমাকে কিছুই না দেন, তবে আমার কাছে আপনার যে মাল রয়েছে তা গ্রহণ করুন।’ এই বলে সে তাকে পাথরটি হাতে দিল। আমীর এতে বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং তার কাছে পুরো ঘটনা জানতে চাইলেন। সে তাকে বিষয়টি খুলে বলল। আমীর বললেন, ‘আল্লাহ তোমার মাধ্যমে আমাকে বশীভূত ও লজ্জিত করেছেন।’ এরপর তিনি তাকে তিনশ দীনার প্রদানের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, ‘এটি গ্রহণ করো এবং এর জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিও না; কারণ এটি আমার দান নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। যদি আমার ইখতিয়ারে থাকত তবে আমি তোমাকে একটি দীনারও দিতাম না।’
এর চেয়েও বিস্ময়কর হলো ফরাওয়া অঞ্চলের এক ব্যক্তির ঘটনা, যার নাম ছিল আহমদ বিন হাসান আল-ইয়াযিদী। সে মদ্যপানে অত্যন্ত আসক্ত ছিল এবং এ পথে লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়েছিল। এক রাতে সে খাওয়ারিজমের জুরজানিয়া উপকণ্ঠে তার বন্ধুদের সাথে মদ্যপান করছিল। এ সময় তার অজান্তেই আংটির পাথরটি খসে পড়ে গেল। পরদিন পর্যন্ত সে বিষয়টি টেরও পায়নি, আর সে স্থানটির কথাও ভুলে গেল। এভাবে দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর এক রাতে জনৈক ব্যক্তি তার দরজায় করাঘাত করল এবং বলল, ‘ফকীহ আল-ইখশীদী খতীব আপনার কাছে এই পাথরটি পাঠিয়েছেন।’ দেখা গেল এটিই তার সেই হারিয়ে যাওয়া আংটির পাথর। পরদিন সকালে সে ফকীহের কাছে গিয়ে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। সেই ফকীহর একটি ইটের ভাটা ছিল যেখানে কাঁচা ইট পোড়ানো হতো। তিনি বললেন, ‘আমি ভাটার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর শ্রমিকরা পিঠ থেকে নামিয়ে ইটগুলো মাটিতে রাখছিল। এমন সময় একজনের হাত থেকে একটি ইট পড়ে ভেঙে গেল এবং তার ভাঙা অংশ থেকে এই পাথরটি বেরিয়ে এল। পাথরের ওপর তোমার নাম খোদাই করা দেখে আমি তোমাকে চিনতে পারলাম।’
এর বিপরীত একটি ঘটনা হলো, আল-মামুন যখন খোরাসান থেকে বাগদাদে ফিরলেন, তখন ফজল ইবনে রাবী তাঁকে ইয়াকুত পাথরের একটি আংটি উপহার দিলেন, যার কোনো নজির ছিল না। মামুন সেটি উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলেন এবং এক হাত থেকে অন্য হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে উপস্থিত সঙ্গীদের বললেন, ‘আমি এর চেয়ে সুন্দর পাথর আর দেখিনি।’ অতঃপর তিনি তাদের একটি ঘটনা শোনালেন যে, আবু মুসলিম (খুরাসানী) যিয়াদ বিন সালিহকে চীন অভিমুখে পাঠিয়েছিলেন। যিয়াদ তাঁর কাছে একটি পাথর পাঠান যা শেষ পর্যন্ত আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর হাতে পৌঁছায়। তিনি সেটি আব্দুল্লাহ বিন আলীকে দান করেন। সেখান থেকে সেটি আল-মাহদীর কাছে এবং পরে হারুনুর রশীদের কাছে পৌঁছে। একদিন হারুনুর রশীদ যখন গুলতি দিয়ে পাথর ছুড়ছিলেন, তখন হঠাৎ তাঁর আংটি থেকে পাথরটি খসে পড়ল। সেই স্থানের চারপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো কিন্তু কোনো হদিস পাওয়া গেল না। এতে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তাঁর মুসাল্লা (নামাযের স্থান) এর রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্মকর্তা অনুরূপ একটি পাথর বিশ হাজার দীনার দিয়ে কিনে আনলেন যাতে তাঁর শোক লাঘব হয়। কিন্তু হারুনুর রশীদ যখন সেটি দেখলেন, তখন বললেন, ‘আমার সেই পাথরের সাথে এর তুলনা কোথায়?’ মামুন আরও বললেন, ‘আমি এই মূল্যহীন পাথরের মর্যাদা কমিয়ে দেব।’ এই বলে তিনি সেটি ফজলকে ফেরত দিলেন এবং তাঁর দূতকে বললেন, ‘তাকে গিয়ে বলো, হে আবু আব্বাস! তোমার রাজত্ব চলে গেছে।’ পাথরটি যখন ফজলের কাছে ফিরে এল, তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে বললেন, ‘মামুন আজকের পর এক বছরের বেশি জীবিত থাকবেন না।’ সন্ধ্যা না হতেই মামুনের কাছে এ খবর পৌঁছে গেল। তিনি বিষয়টি গোপন রাখলেন এবং এক বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত কিছুই প্রকাশ করলেন না। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি যখন আব্বাস বিন আল-মুসায়্যিবের জানাজায় সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ফজলের এক সন্তান বাবে শামের কাছে তাঁর সামনে এসে দোয়া করল এবং নিজের পরিচয় দিল। মামুন তাকে নিজের সওয়ারির কাছে ডাকলেন। সে যখন খুব কাছে এল, মামুন তার দিকে ঝুঁকে নিচু স্বরে বললেন, ‘জেনে রেখো হে আবু আব্বাস! সেই সময় অতিক্রান্ত হয়েছে (অর্থাৎ আমি এখনো জীবিত)।’
আল্লাহর কসম, উমর ইবনে আব্দুল আজীজ নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা ও দুনিয়াবিমুখতার কারণে এই পাথরগুলোর প্রতি অত্যন্ত তুচ্ছজ্ঞান রাখতেন, অথচ তিনি সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি আংটির পাথর ক্রয় করেছিলেন। এ খবর শুনে উমর তাকে চিঠিতে লিখলেন, ‘অতঃপর সংবাদ এই যে, আমার কাছে খবর পৌঁছেছে তুমি এক হাজার দিরহাম দিয়ে আংটির পাথর কিনেছ। তাই আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি এটি বিক্রি করে দাও এবং সেই অর্থ দিয়ে এক হাজার ক্ষুধার্তকে আহার করাও। আর নিজের জন্য রূপার একটি আংটি তৈরি করো যার পাথরটিও হবে রূপার এবং তাতে খোদাই করে লিখবে: আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর দয়া করুন যে নিজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন।’ পুত্র তাঁর সেই আদেশ পালন করেছিলেন।
আর হারুনুর রশীদের পাথরটি দরজা ও ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বলা যায়, হতে পারে কোনো মাটি খননকারী সেটি পেয়ে গেছে, অথবা এমনও হতে পারে কোনো পাখি শূন্য থেকে নেমে এসে মাংস মনে করে সেটি গিলে ফেলেছে এবং পরে দূরে কোথাও গিয়ে উগরে দিয়েছে।
আব্দুল্লাহ বিন মারওয়ান বিন মুহাম্মাদের সাথে একটি লাল পাথর ছিল যার মূল্য ছিল এক হাজার দীনার। নূবা অঞ্চল থেকে ফেরার পথে পায়ে হেঁটে চলার সময় তিনি সেটি নিজের কাছে রাখতেন এবং বলতেন, ‘হায়! এর বিনিময়ে যদি আমার একটি আরোহণের পশু থাকত!’ মারওয়ানের বংশধরদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘পলায়নের সময় আমাদের কাছে কম মূল্যের জহরতই বেশি উপকারী ছিল, যার দাম পাঁচ দীনারের বেশি নয়। কারণ ছোট ছেলে বা খাদেম সেটি বের করে বিক্রি করতে পারত। কিন্তু আমরা দামী জহরত বের করার সাহস পেতাম না। ফলে অধিক মূল্যবান হওয়া আমাদের উপকারে আসত না বরং ক্ষতির কারণ হতো।’ এটি ঠিক তেমনই যেমন ইয়াযদাজিরদকে তার কোমরের জহরত কোনো উপকার করতে পারেনি; অথচ সেটির বিনিময়ে সে একজন ময়রা বা চাকিওয়ালার কাছে মাত্র চার দিরহাম চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই চাকির নিচেই তার মৃত্যু ঘটেছিল। এই কারণেই ইয়াযদাজিরদের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আপনি খুব কম অগ্নিউপাসককেই (মাজুসী) পাবেন যার কাছে সবসময় অন্তত চার দিরহাম গচ্ছিত থাকে না।
নাসর বলেন - আমির আর-রাদ্বী নুহ বিন মানসুর আল-সামানির একটি মোহরযুক্ত আংটি ছিল যার প্রতিটি অংশকে 'বাতীখাহ' বলা হতো। এর একটির পাথর ছিল লাল ইয়াকুত যা আঙুর ফলের মতো এবং অপরটি ছিল একই আকার ও আকৃতির হীরা। বলা হয় যে, মানুষ এর চেয়ে বড় কোনো দানা (রত্ন) দেখেনি। মুসলিম বাদশাহগণ আল্লাহর ঘর কাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং তারা যা উত্তম মনে করতেন তা সেখানে উপহার হিসেবে পাঠাতেন। এটি ছিল আবদুল মুত্তালিবের অনুসরণে, যখন তিনি যমযম কূপ খনন করেছিলেন—যা তখন ভরাট ছিল—এবং সেখানে তিনি 'কালয়ী' নামক তলোয়ার খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি সেগুলো কাবার দরজায় স্থাপন করেন এবং দুটি সোনার হরিণও পান যার একটি দরজার অলঙ্করণে ব্যবহৃত হয় এবং অন্যটি ভেতরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণস্বরূপ ছিল, যখন তিনি পারস্যের বাযান কর্তৃক প্রেরিত সোনার একটি অলঙ্কার ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন যা তিনি ইসলাম গ্রহণের সময় অগ্নি উপাসনা ত্যাগ ও এর রীতিনীতি বর্জনের প্রতীক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। এরপর উমর ইবনুল খাত্তাবের সময় থেকে এটি শুরু হয়। তিনি মাদায়েন বিজয়ের পর প্রাপ্ত দুটি অর্ধচন্দ্র (হেলাল), কাওয়াদুশাহ এবং অতি মূল্যবান মণি-মুক্তা দিয়ে তৈরি দুটি পেয়ালা সেখানে ঝুলিয়ে দেন। এই সব কিছু কাবার ভেতরে দামী মণি-মুক্তা এবং উন্নত মানের যবরজদ পাথর দ্বারা সজ্জিত ছিল।
এরপর ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া দুটি অর্ধচন্দ্র পাঠান যা দামেস্কের একটি গির্জায় ছিল এবং সেগুলো লাল ইয়াকুত (কিিব্রত আহমার) দ্বারা খচিত ছিল। একেকটি অর্ধচন্দ্রের মূল্য ছিল এক লক্ষ দিনার। ইয়াজিদ সেগুলো বিক্রি করেননি বরং কাবার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। সাথে ছিল দুটি পেয়ালা, যার একটি আকিক এবং অন্যটি 'মহা' পাথরের তৈরি, এবং দুটি শিশি যার একটি আকিক ও অন্যটি ইয়াকুতের। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের কাবার দরজা সোনার পাত দিয়ে মুড়ে দেন। আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান কাবায় দুটি স্বর্ণ-সূর্য (শামসাহ) এবং কাঁচের তৈরি দুটি পেয়ালা পাঠান এবং মাঝখানের স্তম্ভটি সোনার পাত দিয়ে ঢেকে দেন। ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক দুটি পেয়ালা পাঠান যার বর্ণনা কিতাবসমূহে উল্লেখ নেই। আস-সাফফাহ সেখানে চার হাজার দিনার মূল্যের একটি সবুজ যবরজদ ফলক পাঠান। আল-মানসুর সেখানে ফেরআউনীয় একটি শিশি এবং রুপার একটি বিশাল তখতি পাঠান যা রুমের সম্রাট তাকে উপহার দিয়েছিলেন। আল-মামুন কাবুলের শাসকের ইসলাম গ্রহণের পর তার কাছ থেকে প্রাপ্ত সোনা ও রুপার মূর্তিগুলো এবং একটি ইয়াকুত পাথর পাঠান যা হজের মৌসুমে কাবার সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখা হতো। আল-মুতাওয়াক্কিল মুক্তা, ইয়াকুত ও যবরজদ খচিত একটি সোনার শামসাহ পাঠান যার শিকল প্রতি হজের মৌসুমে ঝোলানো হতো।
আল-মুতায-এর মা কাবিহা প্রচুর মণি-মুক্তা জমা করেছিলেন যা দ্বীন বা দুনিয়ার কোনো কাজে আসেনি। তুর্কিরা যখন তার ছেলের কাছে সালিহ বিন ওয়াসিফকে হত্যার পরিবর্তে পঞ্চাশ হাজার দিনার দাবি করেছিল, তখন তিনি সেই অর্থ দিয়ে ছেলেকে সাহায্য করেননি। ছেলে তার মায়ের কাছে আশ্রয় চাইলেও তিনি কৃপণতা করেন এবং উত্তর দেন যে তার কাছে কোনো সম্পদ নেই। সালিহ আল-মুতাযকে হত্যার পর তার গুপ্তস্থানে তিনটি ঝুড়ি (আস্ফাত) খুঁজে পান। প্রথমটিতে ছিল এক 'মাক্কুক' পরিমাণ পান্না (যমরুদ), যার সমতুল্য কিছু আল-মুতাওয়াক্কিল বা অন্য কেউ আগে দেখেনি। দ্বিতীয় ঝুড়িতে ছিল আধা মাক্কুক পরিমাণ বড় বড় মুক্তা, যা কেউ কল্পনাও করেনি যে মানুষের হাতে এমন কিছু থাকতে পারে। তৃতীয়টিতে ছিল আধা 'কাইলাজাহ' পরিমাণ লাল ইয়াকুত যার গুণের কোনো তুলনা শোনা যায়নি। বিক্রয়ের পরিবর্তে সালিহকে এগুলো দুই হাজার দিনারে প্রদান করা হয়। সেই ঝুড়িগুলোতে মণি-মুক্তা ছাড়াও আরও দশ লক্ষ দিনার মূল্যের সম্পদ ছিল যা তিনি মূর্খতা ও কৃপণতার কারণে নষ্ট করেছিলেন; অথচ এর আগেই তিনি তার ছেলেকে হারিয়েছেন এবং খিলাফতকে দুর্বল করেছেন। তার এই বাণিজ্যের ফলাফল কেবল লাঞ্ছনা আর অপমানই বয়ে এনেছিল। হজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় সালিহ তার ওপর যে আচরণ করেছিলেন তাতে তিনি রিক্তহস্তে ও অপমানিত অবস্থায় বের হন এবং তার অভিশাপের মাধ্যমে নিজের কলঙ্ক প্রকাশ করেন।
মণি-মুক্তার বিবরণ বিস্তারিতভাবে জানা যায় না। তবে খোরাসানের আমিল (প্রশাসক) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি কোনো এক কিসরার (পারস্য সম্রাট) একটি সোনার তৈরি খেজুর গাছ পেয়েছিলেন। এর ডালপালার মাঝে মণি-মুক্তার সারি ছিল যা কাঁচা ও পাকা খেজুরের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি সেটি ইরাকে মুসআব বিন ইবনুল জুবায়েরের কাছে পাঠান। এর মূল্য নিরূপণ করা হয়েছিল বিশ লক্ষ দিনার। মুসআব তার সঙ্গীদের বললেন, "তোমাদের মতে এর যোগ্য কে?" তারা বললেন, "আপনিই এর যোগ্য, এটি আপনার সন্তানের জন্য রেখে দিন।" তিনি বললেন, "না, বরং আমি এটি এমন একজনকে দেব যিনি আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন এবং তিনি আমাদের চেয়ে তাদের জন্য বেশি উপকারী। এটি আবদুল্লাহ বিন আবি ফারওয়াহ-কে দিয়ে দাও।" অতঃপর তিনি তা গ্রহণ করলেন।
যখন মুসলমানরা নাহাওয়ান্দে প্রবেশ করলেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহ করলেন, তখন সায়িব (যিনি লব্ধ সম্পদের দায়িত্বে ছিলেন) অগ্রসর হলেন। এমতাবস্থায় পারস্যের ধর্মীয় প্রধান (হুরমুযান) হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের কাছে এসে বললেন, "আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা দেবেন যাতে আমি আপনাকে আমার জানা তথ্য জানাতে পারি?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ, তোমার কাছে যা আছে তা বলো।" সে বলল, "নুহাইরিজান আমার কাছে কিসরার একটি ভাণ্ডার গচ্ছিত রেখেছে। আপনি যদি আমাকে এবং আমার পছন্দের ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেন তবে আমি তা বের করে দেব।" হুজাইফা বললেন, "আমি তোমাকে সেই নিরাপত্তা দিলাম।" সে দুটি বড় ঝুড়ি নিয়ে এল যাতে কেবল ইয়াকুত এবং মুক্তা ছিল। মুসলমানরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এগুলো বণ্টন না করে কেবল উমরের জন্য খাস করা হবে। সায়িব সেগুলো নিয়ে উমরের কাছে পৌঁছালে উমর বললেন, "এগুলো বায়তুল মালে রাখো যতক্ষণ না আমি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিই। আর তুমি তোমার বাহিনীর কাছে ফিরে যাও।" তিনি তাই করলেন। উমর সারারাত এ নিয়ে চিন্তিত রইলেন। সকালে তিনি সায়িবকে ডেকে বললেন, "আমিরুল মুমিনিনের সাথে দেখা করো।" তিনি তাই করলেন। উমর তাকে দেখে বললেন, "সায়িবের মায়ের ছেলের সাথে আমার কী সম্পর্ক! বরং সায়িবের মায়ের ছেলের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এই ঝুড়ি দুটি নাও এবং যেখান থেকে এনেছ সেখানেই নিয়ে যাও এবং এর মূল্য মুসলমানদের অনুদানে খরচ করো।" সায়িব নির্দেশমতো কাজ করলেন এবং সেগুলো কুফার মসজিদে রাখলেন। উমর বিন হুরাইথ সেগুলো বিশ লক্ষ দিরহামে কিনে নিলেন এবং পরবর্তীতে অনারবদের ভূমিতে চল্লিশ লক্ষ দিরহামে বিক্রি করলেন।