(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: -)
أقاويل الثقات في تأويل الأسماء والصفات والآيات المحكمات والمشتبهات   (مرعي الكرمي)

القسم: الفرق والردود


الكتاب: أقاويل الثقات في تأويل الأسماء والصفات والآيات المحكمات والمشتبهات

المؤلف: مرعي بن يوسف بن أبى بكر بن أحمد الكرمى المقدسي الحنبلى (ت 1033 هـ)

المحقق: شعيب الأرناؤوط [ت 1438 هـ]

الناشر: مؤسسة الرسالة - بيروت

الطبعة: الأولى، 1406

عدد الصفحات: 239

[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]

تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431

আসমা ও সিফাত এবং মুহকাম ও মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমদের উক্তিমালা   (মারয়ী আল-কারমী)

বিভাগ: বিভিন্ন দল ও মতবাদ এবং তাদের খণ্ডন


গ্রন্থ: আসমা ও সিফাত এবং মুহকাম ও মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমদের উক্তিমালা

লেখক: মারয়ী বিন ইউসুফ বিন আবু বকর বিন আহমদ আল-কারমী আল-মাকদিসী আল-হানবালী (মৃত্যু: ১০৩৩ হিজরি)

সম্পাদক: শুআইব আল-আরনাউত [মৃত্যু: ১৪৩৮ হিজরি]

প্রকাশনী: মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ - বৈরুত

সংস্করণ: প্রথম, ১৪০৬ হিজরি

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৩৯

[বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর মূল মুদ্রিত কপির অনুরূপ]

শামেলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১ হিজরি

(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৪৫)
‌‌بِسم الله الرَّحْمَن الرَّحِيم

قَالَ العَبْد الْفَقِير إِلَى الله تَعَالَى مرعي بن يُوسُف الْحَنْبَلِيّ الْمَقْدِسِي

الْحَمد لله المنزه عَمَّا يخْطر بالبال أَو يتَوَهَّم فِي الْفِكر والخيال المحتجب برداء الْعِزّ والجلال لَا تُدْرِكهُ الْأَبْصَار وَهُوَ يدْرك الْأَبْصَار وَهُوَ اللَّطِيف الْخَبِير تحيرت الْعُقُول فِي حَقِيقَة ذَاته وتخبطت الأفهام فِي أَسْمَائِهِ وَصِفَاته واندهشت الْأَبْصَار فِي جلال حضراته لَيْسَ كمثله شَيْء وَهُوَ السَّمِيع الْبَصِير

وَالصَّلَاة وَالسَّلَام على من منحته بغاية تكرمتك وخصصته بمشاهدة رؤيتك وَهُوَ مَعَ ذَلِك يَقُول سُبْحَانَكَ مَا عرفناك حق معرفتك يَا من لَا مثل لَهُ وَلَا نَظِير وعَلى آله وَأَصْحَابه الَّذين سلكوا طَرِيق الْأَدَب مَعَ الله وَرَسُوله وسلموا فَسَلمُوا من مزلة الْقدَم ومذلة التَّقْصِير

وَبعد فَإِن الْعلم بالتفسير أَمر مُهِمّ وَالْعلم بالتأويل أهم وتصفية الْقلب من شوائب الأوهام أَسْنَى وَأتم وَمن السَّلامَة للمرء
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

আল্লাহ তাআলার মুখাপেক্ষী দরিদ্র বান্দা মারঈ ইবনে ইউসুফ আল-হাম্বলি আল-মাকদিসি বলেন:

সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি কল্পনাপ্রসূত যে কোনো বিষয় কিংবা চিন্তাজগতে উদিত সকল প্রকার ধারণা থেকে পবিত্র; যিনি মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের আবরণে আবৃত। কোনো দৃষ্টিই তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে প্রত্যক্ষ করেন; তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক পরিজ্ঞাত। তাঁর সত্তার প্রকৃত রহস্যের কিনারা করতে গিয়ে জ্ঞানসমূহ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তাঁর নাম ও গুণাবলির বর্ণনায় বোধশক্তি হয় বিভ্রান্ত এবং তাঁর মহিমাময় উপস্থিতির জাঁকজমকে দৃষ্টিসমূহ হয় বিমূঢ়। তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর ওপর, যাঁকে আপনি আপনার পরম সম্মানে ভূষিত করেছেন এবং আপনার দর্শনের সৌভাগ্যে বিশিষ্ট করেছেন; এতদসত্ত্বেও তিনি বলেন— হে মহান সত্তা, যাঁর কোনো উপমা বা সমকক্ষ নেই, আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমরা আপনাকে চেনার যথার্থ হক আদায় করতে পারিনি। আরও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কিরামের ওপর, যাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি শিষ্টাচারের পথ অবলম্বন করেছেন এবং আনুগত্য জ্ঞাপন করেছেন; ফলে তাঁরা পদস্খলন ও ত্রুটির লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

অতঃপর, নিশ্চয়ই তাফসির বা কুরআন ব্যাখ্যার জ্ঞান এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তাউইল বা গূঢ়ার্থের জ্ঞান আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর অলীক কল্পনা ও সংশয়ের কলুষতা থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা অধিকতর মহিমান্বিত ও পূর্ণাঙ্গ কাজ। আর মানুষের নিরাপত্তার জন্য...
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৪৬)
فِي دينه اقتفاء طَريقَة السّلف الَّذين أَمر أَن يَقْتَدِي بهم من جَاءَ بعدهمْ من الْخلف فمذهب السّلف أسلم ودع مَا قيل من أَن مَذْهَب الْخلف أعلم فَإِنَّهُ من زخرف الْأَقَاوِيل وتحسين الأباطيل فَإِن أُولَئِكَ قد شاهدوا الرَّسُول والتنزيل وهم أدرى بِمَا نزل بِهِ الْأمين جِبْرِيل وَمَعَ ذَلِك فَلم يَكُونُوا يَخُوضُونَ فِي حَقِيقَة الذَّات وَلَا فِي مَعَاني الْأَسْمَاء وَالصِّفَات ويؤمنون بمتشابه الْقُرْآن وَيُنْكِرُونَ على من يبْحَث عَن ذَلِك من فُلَانَة وَفُلَان

وإنكار الإِمَام مَالك على من سَأَلَهُ عَن معنى الإستواء أَمر مَشْهُور وَهُوَ فِي عدَّة من الْكتب مَنْقُول مسطور
দ্বীনের ক্ষেত্রে সালফে সালেহীন বা পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য, যাঁদের অনুসরণের নির্দেশ তাঁদের পরবর্তী উত্তরসূরিদের দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সালাফদের পথই অধিক নিরাপদ; আর 'খালাফদের পথ অধিক জ্ঞানগর্ভ'—এই উক্তিটি বর্জন করুন। কেননা এটি বাকচাতুর্য এবং অসত্যকে সুশোভিত করার নামান্তর মাত্র। কারণ তাঁরা স্বচক্ষে রাসূল এবং ওহী অবতীর্ণ হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন এবং আমীন জিবরাঈল যা নিয়ে অবতীর্ণ হতেন, সে সম্পর্কে তাঁরা সর্বাধিক অবগত ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁরা মহান আল্লাহর সত্তার প্রকৃত স্বরূপ কিংবা তাঁর নাম ও গুণাবলির গূঢ় রহস্য নিয়ে তর্কে লিপ্ত হতেন না। তাঁরা কুরআনের মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান রাখতেন এবং যারা এসব বিষয় নিয়ে খুঁটিনাটি অনুসন্ধান করত, তাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতেন।

ইমাম মালিকের নিকট ‘ইস্তিওয়া’র অর্থ সম্পর্কে প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে তিনি যে ধমক দিয়েছিলেন, তা একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা এবং এটি বহু কিতাবে উদ্ধৃত ও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৪৭)
هَذَا وَقد أَحْبَبْت أَن أذكر بعض كَلَام الْأَئِمَّة الخائضين فِي مَعَاني الْأَسْمَاء وَالصِّفَات الْوَارِدَة فِي الْأَحَادِيث والآيات وَإِن كَانَ الأولى ترك ذَلِك خوف الْوُقُوع فِي الزلل الذميم لَكِن لَا بَأْس بذلك مَعَ قصد الْإِرْشَاد والتعليم

هَذَا وَلم أَقف فِي هَذَا الْفَنّ على مُصَنف وَلم أظفر فِيهِ بمؤلف وَإِنَّمَا جمعته من كَلَام الْأَئِمَّة مفرقا وذممته هُنَا مُلَفقًا يحْتَاج إِلَيْهِ الطَّالِب وَهُوَ من أجل المطالب وسميته

‌‌أقاويل الثِّقَات فِي تَأْوِيل الْأَسْمَاء وَالصِّفَات

فَأَقُول وَبِاللَّهِ التَّوْفِيق وَمِنْه أَرْجُو الْهِدَايَة إِلَى أقوم طَرِيق

‌‌مُقَدّمَة

أعلم وفقك الله أَن التَّفْسِير هُوَ بَيَان معنى اللَّفْظ
অতঃপর, আমি সেই সকল ইমামগণের কতিপয় বক্তব্য উল্লেখ করার ইচ্ছা পোষণ করেছি, যারা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অর্থ নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেছেন। যদিও নিন্দনীয় স্খলনে পতিত হওয়ার আশঙ্কায় তা পরিহার করাই ছিল শ্রেয়তর, তবে হেদায়েত ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে তা আলোচনা করাতে কোনো দোষ নেই।

বিষয়টির অবস্থা এই যে, আমি এ শাস্ত্রে স্বতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ বা রচনার সন্ধান পাইনি; বরং আমি ইমামগণের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বক্তব্যের মধ্য থেকে তা সংগ্রহ করেছি এবং এখানে সুসমন্বিতভাবে সংকলিত করেছি। একজন জ্ঞানান্বেষীর জন্য এটি একান্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি শ্রেষ্ঠতম অন্বেষাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আর আমি এর নামকরণ করেছি—

‌‌আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ব্যাখ্যায় নির্ভরযোগ্য ইমামগণের বক্তব্যসমূহ

আমি বলছি—আর আল্লাহর সাহায্যেই সাফল্য অর্জিত হয় এবং তাঁরই নিকট আমি সরলতম পথের দিশা প্রার্থনা করি—

‌‌ভূমিকা

জেনে রাখুন—আল্লাহ আপনাকে তাওফীক দান করুন—নিশ্চয়ই তাফসীর হলো শব্দের মর্মার্থ সুস্পষ্ট করা।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৪৮)
الْخَفي والتأويل هُوَ أَن يُرَاد بِاللَّفْظِ مَا يُخَالف ظَاهره أَو هُوَ صرف اللَّفْظ عَن ظَاهره لِمَعْنى آخر وَهُوَ فِي الْقُرْآن كثير وَمن ذَلِك آيَات الصِّفَات المقدسة وَهِي من الْآيَات المتشابهات

وَقد اخْتلفُوا فَقيل الْقُرْآن كُله مُحكم لقَوْله تَعَالَى {كتاب أحكمت آيَاته} هود 1

وَقيل كُله متشابه لقَوْله تَعَالَى {نزل أحسن الحَدِيث كتابا متشابها} الزمر 23

وَالأَصَح إنقسامه إِلَيْهِمَا وَالْمرَاد بأحكمت آيَاته أتقنت
খফি (প্রচ্ছন্ন) এবং তাবিল (ব্যাখ্যা) হলো শব্দ দ্বারা তার বাহ্যিক বা আভিধানিক অর্থের বিপরীত কোনো অর্থ উদ্দেশ্য করা, অথবা কোনো সংগত কারণে শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে অন্য অর্থের দিকে ফিরিয়ে নেয়া। কুরআনে এর প্রয়োগ ব্যাপক; যেমন মহান আল্লাহর পবিত্র গুণাবলি সম্পর্কিত আয়াতসমূহ, যা 'মুতাশাবিহাত' বা রূপক আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

এ বিষয়ে আলিমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, সম্পূর্ণ কুরআনই 'মুহকাম' (সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ়); যেহেতু আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।" (সূরা হুদ: ১)।

আবার কেউ বলেছেন, এর পুরোটাই 'মুতাশাবিহ' (পরস্পর সদৃশ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ); কারণ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন সর্বোত্তম বাণী, যা একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিতাব।" (সূরা যুমার: ২৩)।

তবে অধিকতর সঠিক মত হলো, কুরআন এই উভয় প্রকারেই (মুহকাম ও মুতাশাবিহ) বিভক্ত। আর "আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে" বলতে এর নিপুণতা ও সুদৃঢ়তাকে বোঝানো হয়েছে।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৪৯)
وتنزهت عَن نقص يلْحقهَا رب متشابها أَنه يشبه بعضه بَعْضًا فِي الْحق والصدق والإعجاز

وَاخْتلفُوا فِي الْمُحكم والمتشابه

فَقيل الْمُحكم مَا وضح مَعْنَاهُ والمتشابه نقيضه

وَقيل الْمُحكم مَا لَا يحْتَمل من التَّأْوِيل إِلَّا وَجها وَاحِدًا والمتشابه مَا احْتمل أوجها

وَقيل الْمُحكم مَا تَأْوِيله تَنْزِيله والمتشابه مَا لَا يدرى إِلَّا بالتأويل

وَقيل الْمُحكم مَا لم تَتَكَرَّر أَلْفَاظه والمتشابه الْقَصَص والأمثال

وَقيل الْمُحكم مَا يعرفهُ الراسخون فِي الْعلم والمتشابه مَا ينْفَرد الله بِعِلْمِهِ

وَقيل الْمُتَشَابه الْحُرُوف الْمُقطعَة فِي أَوَائِل السُّور وَمَا سوى ذَلِك مُحكم وَقيل غير ذَلِك

وَقَالَ جمَاعَة من الْأُصُولِيِّينَ الْمُحكم مَا عرف المُرَاد مِنْهُ قيل وَلَو بالتأويل والمتشابه مَا اسْتَأْثر الله بِعِلْمِهِ كالحروف الْمُقطعَة وَهُوَ معنى قَول بَعضهم إِن الْمُحكم هُوَ المكشوف الْمَعْنى الَّذِي لَا يتَطَرَّق إِلَيْهِ إِشْكَال وَاحْتِمَال والمتشابه مَا يتعارض
এবং এটি এমন সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র যা একে স্পর্শ করতে পারে; এর আয়াতসমূহ পরস্পর সদৃশ হওয়ার অর্থ হলো—সত্যতা, সততা এবং অলৌকিকত্বের দিক থেকে এর এক অংশ অন্য অংশের সদৃশ।

মুহকাম (সুস্পষ্ট) ও মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট বা রূপক) বিষয়ে আলিমগণ মতভেদ করেছেন।

কেউ কেউ বলেছেন, মুহকাম হলো যার অর্থ সুস্পষ্ট, আর মুতাশাবিহ হলো তার বিপরীত।

আবার বলা হয়েছে, মুহকাম হলো তা-ই যা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কেবল একটিই অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা রাখে, আর মুতাশাবিহ হলো তা যা একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে।

আরও বলা হয়েছে, মুহকাম হলো তা যার ব্যাখ্যা এর অবতীর্ণ শব্দের মধ্যেই নিহিত, আর মুতাশাবিহ হলো যা ব্যাখ্যা ব্যতীত অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ বলেন, মুহকাম হলো যার শব্দাবলি বারবার আসেনি, আর মুতাশাবিহ হলো বিভিন্ন কাহিনী এবং উপমাসমূহ।

আবার বলা হয়েছে, মুহকাম হলো তা যা গভীর জ্ঞানের অধিকারী পণ্ডিতগণ জানেন, আর মুতাশাবিহ হলো তা যার জ্ঞান আল্লাহ কেবল নিজের জন্যই নির্দিষ্ট রেখেছেন।

কেউ কেউ বলেন, মুতাশাবিহ হলো সূরার শুরুতে ব্যবহৃত বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ, আর এ ছাড়া বাকি সব মুহকাম। এ বিষয়ে আরও অন্যান্য মতামতও বর্ণিত হয়েছে।

উসুলবিদগণের একটি দল বলেছেন, মুহকাম হলো তা যার উদ্দিষ্ট অর্থ জানা যায়—বলা হয়েছে যে, তা যদি ব্যাখ্যার মাধ্যমেও হয়—আর মুতাশাবিহ হলো তা যা আল্লাহ নিজের জ্ঞানের জন্য খাস করে নিয়েছেন, যেমন বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ। এটি মূলত তাদেরই কথার অর্থ যারা বলেন যে, মুহকাম হলো এমন সুস্পষ্ট অর্থের অধিকারী বাক্য যাতে কোনো অস্পষ্টতা বা একাধিক সম্ভাবনার অবকাশ নেই, আর মুতাশাবিহ হলো যা আপাতবিরোধী।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫০)
فِيهِ الإحتمال وَيجوز أَن يعبر بِهِ عَن الْأَسْمَاء الْمُشْتَركَة كالقرء وكاللمس المتردد بَين الْمس وَالْوَطْء وَقد يُطلق على ماورود فِي صِفَات الله تَعَالَى مِمَّا يُوهم ظَاهره الْجِهَة والتشبيه وَيحْتَاج إِلَى تَأْوِيله

قيل وَالْحكمَة فِي الْمُتَشَابه الإبتلاء بإعتقاده فَإِن الْعقل مبتلى بإعتقاد حَقِيقَة الْمُتَشَابه كإبتلاء الْبدن بأَدَاء الْعِبَادَة

وَقيل هُوَ لإِظْهَار عجز الْعباد كالحكيم إِذا صنف كتاب أجمل فِيهِ أَحْيَانًا ليَكُون مَوضِع خضوع المتعلم لأستاذه وكالملك يتَّخذ عَلامَة يمتاز بهَا من يطلعه على سره وَلِأَنَّهُ لَو لم يبتل الْعقل الَّذِي هُوَ أشرف مَا فِي الْإِنْسَان لاستمر فِي أبهة الْعلم على التمرد فبذلك يسْتَأْنس إِلَى التذلل بعز الْعُبُودِيَّة والمتشابه هُوَ مَوضِع خضوع الْعُقُول لبارئها استسلاما واعترافا بقصورها

وَقَالَ الْفَخر من الملحدة من طعن فِي الْقُرْآن لأجل اشتماله على المتشابهات وَقَالَ إِنَّكُم تَقولُونَ إِن تكاليف الْخلق مرتبطة
এতে অস্পষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে 'আসমা মুশ্তারাকাহ' বা বহু অর্থবোধক বিশেষ্যসমূহ প্রকাশ করা বৈধ, যেমন 'কুরু' এবং 'লামস' (স্পর্শ), যা সাধারণ স্পর্শ ও যৌন মিলনের মধ্যে দোলায়মান। এটি আল্লাহ তাআলার গুণাবলি সংক্রান্ত ঐ সকল বর্ণনাতেও প্রয়োগ করা হতে পারে যেগুলোর বাহ্যিক অর্থ দিক (স্থান) ও সাদৃশ্যের ভ্রম সৃষ্টি করে এবং যা ব্যাখ্যার (তাউইল) মুখাপেক্ষী হয়।

বলা হয়েছে যে, মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট বিষয়ের রহস্য হলো এর প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করা। কেননা মানুষের বুদ্ধি মুতাশাবিহ-এর প্রকৃত হাকিকতে বিশ্বাসের মাধ্যমে সেভাবেই পরীক্ষিত হয়, যেভাবে শরীর ইবাদত পালনের মাধ্যমে পরীক্ষিত হয়।

আরও বলা হয়েছে যে, এটি বান্দাদের অক্ষমতা প্রকাশের জন্য; যেমন একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি যখন কোনো গ্রন্থ রচনা করেন, তখন তিনি তাতে মাঝে মাঝে সংক্ষেপ বা অস্পষ্টতা অবলম্বন করেন যাতে তা ছাত্রের তার শিক্ষকের প্রতি বিনয় প্রকাশের ক্ষেত্র হয়। আবার যেমন কোনো রাজা এমন কোনো বিশেষ চিহ্ন গ্রহণ করেন যার মাধ্যমে তিনি তাকে পৃথক করে নেন যাকে তিনি তার গোপন রহস্য সম্পর্কে অবগত করেন। আর এ কারণেও যে, মানুষের শরীরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ বুদ্ধিবৃত্তিকে যদি পরীক্ষা করা না হতো, তবে তা জ্ঞানের দম্ভে অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকতো। ফলে এর মাধ্যমে সে দাসত্বের গৌরবে বিনয়ী হতে অভ্যস্ত হয়। আর মুতাশাবিহ হলো স্বীয় স্রষ্টার নিকট বুদ্ধিবৃত্তির বিনয়, আত্মসমর্পণ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেওয়ার ক্ষেত্র।

ইমাম ফখর বলেন, বিচ্যুত বা নাস্তিকদের মধ্যে কেউ কেউ কোরআনের সমালোচনা করেছে তাতে মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট বিষয় থাকার কারণে এবং বলেছে যে, তোমরা তো দাবি করো যে সৃষ্টির ওপর অর্পিত বিধানসমূহ নির্ভরশীল...
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫১)
بِهَذَا الْقُرْآن إِلَى قيام السَّاعَة ثمَّ إِنَّه يتَمَسَّك بِهِ كل ذِي مَذْهَب على مذْهبه فالجبري يتَمَسَّك بآيَات الْجَبْر كَقَوْلِه {وَجَعَلنَا على قُلُوبهم أكنة} الْآيَة الْأَنْعَام 25 الْإِسْرَاء 46

والقدري يَقُول هَذَا مَذْهَب الْكفَّار لقَوْله {وَقَالُوا قُلُوبنَا فِي أكنة مِمَّا تدعونا إِلَيْهِ وَفِي آذاننا وقر} فصلت 5 وَقَوله {وَقَالُوا قُلُوبنَا غلف} الْبَقَرَة 88

ومنكر الرُّؤْيَة يتَمَسَّك بقوله {لَا تُدْرِكهُ الْأَبْصَار} الْأَنْعَام 102

ومثبت الْجِهَة بآيَات الْجِهَة وَغير ذَلِك ويسمي كل وَاحِد الْآيَات الْمُوَافقَة لمذهبه محكمَة والمخالفة لَهُ متشابهة فَكيف يَلِيق بالحكيم أَن يَجْعَل الْكتاب الَّذِي هُوَ الْمرجع فِي الدّين هَكَذَا

قَالَ وَالْجَوَاب أَن الْعلمَاء ذكرُوا لذَلِك فَوَائِد كمزيد الْمَشَقَّة لزِيَادَة الثَّوَاب وليجتهد فِي التَّأَمُّل فِيهِ صَاحب كل مَذْهَب يَعْنِي فَإِن أصَاب فَلهُ أَجْرَانِ وَإِن أَخطَأ فِي الْفُرُوع فَلهُ أجر وَفِي الْأُصُول خلاف إِلَى غير ذَلِك من الْفَوَائِد

وَاخْتلفُوا هَل الْمُتَشَابه مِمَّا يعلم على قَوْلَيْنِ منشؤهما الْوَقْف على الله أَو الْعلم فِي قَوْله تَعَالَى {وَمَا يعلم تَأْوِيله إِلَّا الله والراسخون فِي الْعلم} آل عمرَان 7
এই কুরআনের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত। অতঃপর প্রত্যেক মাযহাবের অনুসারী নিজ নিজ মতাদর্শ অনুযায়ী একে আঁকড়ে ধরে। সুতরাং জাবরপন্থীগণ অদৃষ্টবাদ সংক্রান্ত আয়াতগুলো আঁকড়ে ধরে, যেমন মহান আল্লাহর বাণী: "এবং আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়েছি" (সূরা আল-আনআম: ২৫, সূরা আল-ইসরা: ৪৬)।

পক্ষান্তরে কদরপন্থীগণ বলেন, এটি কাফিরদের মতাদর্শ; কারণ মহান আল্লাহর বাণী: "তারা বলে, আপনি আমাদের যে বিষয়ের দিকে আহ্বান করছেন, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আবৃত এবং আমাদের কানে রয়েছে বধিরতা" (সূরা ফুসসিলাত: ৫) এবং আল্লাহর বাণী: "এবং তারা বলে, আমাদের অন্তর আচ্ছন্ন" (সূরা আল-বাকারাহ: ৮৮)।

আর যারা (পরকালে আল্লাহর) দর্শন অস্বীকার করে, তারা মহান আল্লাহর এই বাণীটি আঁকড়ে ধরে: "দৃষ্টিসমূহ তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না" (সূরা আল-আনআম: ১০৩)।

এবং আল্লাহর জন্য দিক (জিহাত) সাব্যস্তকারীগণ দিক-সংক্রান্ত আয়াতসমূহ এবং অনুরূপ অন্যান্য আয়াতসমূহ আঁকড়ে ধরে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাযহাবের অনুকূল আয়াতগুলোকে 'মুহকাম' (সুস্পষ্ট) এবং প্রতিকূল আয়াতগুলোকে 'মুতাশাবিহ' (রূপক বা অস্পষ্ট) বলে অভিহিত করে। এমতাবস্থায়, মহা প্রজ্ঞাময় সত্তার শানে এটি কীভাবে সমীচীন হতে পারে যে, তিনি দ্বীনের মূল কিতাবকে এমন (মতভেদের উৎস) হিসেবে নির্ধারণ করবেন?

তিনি বলেন, এর উত্তর হলো—উলামায়ে কিরাম এর পেছনে অনেক উপকারিতা উল্লেখ করেছেন। যেমন সওয়াব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অধিক পরিশ্রমের সুযোগ রাখা এবং যেন প্রতিটি মাযহাবের অনুসারী এতে গভীর চিন্তা-গবেষণায় ব্রতী হতে পারে। অর্থাৎ, সে যদি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে তবে তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব, আর যদি শাখা-প্রশাখাগত (ফুরু) বিষয়ে ভুল করে তবে তার জন্য রয়েছে একটি সওয়াব। তবে মৌলিক বিষয়ের (উসুল) ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এছাড়া আরও অনেক উপকারিতা বিদ্যমান।

মুতাশাবিহ আয়াত সম্পর্কে মানুষ অবগত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে আলিমগণ দুটি মতে বিভক্ত হয়েছেন। এই মতভেদের মূল উৎস হলো মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীতে বিরতি (ওয়াকফ) কোথায় হবে—'আল্লাহ' শব্দের ওপর নাকি 'জ্ঞানে সুগভীরদের' ওপর: "অথচ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর প্রকৃত ব্যাখ্যা জানে না; আর যারা জ্ঞানে সুগভীর..." (সূরা আলে ইমরান: ৭)।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫২)
قَالَ الإِمَام الْخطابِيّ مَذْهَب أَكثر الْعلمَاء أَن الْوَقْف التَّام فِي هَذِه الْآيَة على الله وَأَن مَا بعده وَهُوَ قَوْله {والراسخون فِي الْعلم} اسْتِئْنَاف رُوِيَ ذَلِك عَن ابْن مَسْعُود وَأبي بن كَعْب وَابْن عَبَّاس وَعَائِشَة

وَمَال إِلَى هَذَا الْحَافِظ السُّيُوطِيّ فِي الإتقان وَحَكَاهُ عَن الْأَكْثَرين من الصَّحَابَة وَالتَّابِعِينَ وأتباعهم وَمن بعدهمْ خُصُوصا أهل السّنة قَالَ وَهُوَ أصح الرِّوَايَات عَن ابْن عَبَّاس

قَالَ وَيدل لصِحَّة مَذْهَب الْأَكْثَرين مَا أخرجه عبد الرزاق فِي تَفْسِيره وَالْحَاكِم فِي مُسْتَدْركه عَن ابْن عَبَّاس أَنه كَانَ يقْرَأ وَمَا يعلم تأوليه إِلَّا الله وَيَقُول الراسخون فِي الْعلم آمنا بِهِ فَهَذَا يدل على أَن الْوَاو للإستئناف لِأَن هَذِه الرِّوَايَة وَإِن لم تثبت بهَا الْقِرَاءَة فَأَقل درجاتها أَن تكون خَبرا بِإِسْنَاد صَحِيح إِلَى ترجمان الْقُرْآن فَيقدم كَلَامه فِي ذَلِك على من دونه

وَعَن الْفراء أَن فِي قِرَاءَة أبي بن كَعْب أَيْضا وَيَقُول
ইমাম খাত্তাবী বলেন, অধিকাংশ আলেমের অভিমত হলো এই আয়াতে পূর্ণ বিরতি বা 'ওয়াকফে তাম' হবে 'আল্লাহ' শব্দের ওপর। আর এর পরবর্তী অংশ অর্থাৎ "এবং যারা জ্ঞানে সুগভীর" কথাটি একটি নতুন বাক্য হিসেবে শুরু হবে। এই অভিমতটি ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কাব, ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।

হাফেজ সুয়ূতী তাঁর 'আল-ইতকান' গ্রন্থে এই মতের প্রতিই ঝোঁক প্রকাশ করেছেন এবং তিনি অধিকাংশ সাহাবী, তাবিঈ, তাঁদের অনুসারী এবং পরবর্তী উলামায়ে কেরাম, বিশেষ করে আহলুস সুন্নাহর আলিমদের পক্ষ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, এটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধতম বর্ণনা।

তিনি আরও বলেন, অধিকাংশের এই মাযহাবের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে দলিল হলো যা ইমাম আবদুর রাজ্জাক তাঁর তাফসিরে এবং হাকেম তাঁর মুস্তাদরাকে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তিলাওয়াত করতেন: "এবং এর প্রকৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে—আমরা এতে ঈমান এনেছি।" এটি প্রমাণ করে যে, এখানে 'ওয়াও' বর্ণটি নতুন বাক্য শুরুর (ইস্তিনাফ) জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ এই বর্ণনাটি যদিও প্রচলিত তিলাওয়াত হিসেবে স্বীকৃত নয়, তবুও অন্ততপক্ষে এটি 'তরজুমানুল কুরআন' (কুরআনের মুখপাত্র)-এর পক্ষ থেকে একটি সহিহ সনদে বর্ণিত বক্তব্য। অতএব, এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকারযোগ্য।

আল-ফাররা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, উবাই ইবনে কাবের কেরাআতেও "এবং তারা বলে" কথাটি উল্লেখ রয়েছে।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৩)
الراسخون

وَعَن الْأَعْمَش قَالَ فِي قِرَاءَة ابْن مَسْعُود وَإِن تَأْوِيله إِلَّا عِنْد الله والراسخون فِي الْعلم يَقُولُونَ آمنا بِهِ

وَذهب قوم إِلَى أَن الْوَاو فِي قَوْله والراسخون للْعَطْف لَا للإستئناف مِنْهُم مُجَاهِد وَالضَّحَّاك وَالربيع بن أنس وَمُحَمّد بن جَعْفَر ويروى أَيْضا عَن ابْن عَبَّاس

قَالَ ابْن عَبَّاس أَنا مِمَّن يعلم تَأْوِيله

وَرجح هَذَا جماعات من الْمُحَقِّقين كَابْن فورك وَالْغَزالِيّ وَالْقَاضِي أبي بكر بن الطّيب وَقَالَ النَّوَوِيّ إِنَّه الْأَصَح وَابْن الْحَاجِب إِنَّه الْمُخْتَار محتجين أَن الله تَعَالَى لَا يُخَاطب الْعَرَب بِمَا لَا سَبِيل إِلَى مَعْرفَته لأحد من الْخلق وَأَيْضًا فالإيمان بِهِ وَاجِب على عُمُوم الْمُؤمنِينَ فَلَا يبْقى لوصفهم بالرسوخ فِي الْعلم وَأَنَّهُمْ أولُوا الْأَلْبَاب فَائِدَة تميزهم عَن عُمُوم الْمُؤمنِينَ

وَقَالَ أهل التَّحْقِيق وَالتَّحْقِيق أَن الْمُتَشَابه يتنوع

فَمِنْهُ مَا لَا يعلم بِيَقِين أَلْبَتَّة كالحروف الْمُقطعَة فِي أَوَائِل السُّور وَالروح والساعة مِمَّا اسْتَأْثر الله بغيبه وَهَذَا لَا يتعاطى علمه أحد لَا ابْن عَبَّاس وَلَا غَيره

وَمن قَالَ من الْعلمَاء الحذاق إِن الراسخين لَا يعلمُونَ
জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ

আল-আ'মাশ থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে মাসউদের কিরাত সম্পর্কে বলেন: "আর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না; এবং জ্ঞানে সুগভীর ব্যক্তিবর্গ বলে, আমরা এতে ঈমান এনেছি।"

একদল আলিম এই মত পোষণ করেছেন যে, মহান আল্লাহর বাণী "এবং জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ" অংশে 'ওয়াও' (আর) অক্ষরটি পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে সংযোজক (আতফ) হিসেবে এসেছে, নতুন বাক্য শুরু করার (ইস্তিনাফ) জন্য নয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুজাহিদ, দাহহাক, রাবি বিন আনাস এবং মুহাম্মদ বিন জাফর; এটি ইবনে আব্বাস থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: "আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা এর ব্যাখ্যা জানেন।"

গবেষক আলিমগণের বিভিন্ন দল এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, যেমন—ইবনে ফুরাক, আল-গাযালি এবং কাযী আবু বকর ইবনুত তাইয়িব। ইমাম নববী এটিকে 'সর্বাপেক্ষা সঠিক' এবং ইবনুল হাজিব এটিকে 'নির্বাচিত মত' বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আল্লাহ তাআলা আরবদের এমন কিছু দিয়ে সম্বোধন করেন না যা সৃষ্টির কারো পক্ষে অনুধাবন করার কোনো পথ নেই। এছাড়া, মুতাশাবিহ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা সকল মুমিনের জন্যই সাধারণ কর্তব্য; এমতাবস্থায় তাঁদেরকে সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং 'প্রজ্ঞাবান' হিসেবে বর্ণনা করার বিশেষ কোনো সার্থকতা থাকে না যা তাঁদেরকে সাধারণ মুমিনদের থেকে পৃথক করে।

সত্যসন্ধানী আলিমগণ বলেন, প্রকৃত বিষয় হলো মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট অর্থবোধক বিষয়সমূহ কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে।

তন্মধ্যে কিছু বিষয় এমন রয়েছে যা নিশ্চিতভাবে কখনোই জানা সম্ভব নয়; যেমন—বিভিন্ন সূরার প্রারম্ভে ব্যবহৃত বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ (হুরূফে মুকাত্তাআত), রূহ এবং কিয়ামতের সময়কাল—যা আল্লাহ কেবল নিজের অদৃশ্যের জ্ঞানের জন্য নির্দিষ্ট রেখেছেন। ইবনে আব্বাস বা অন্য কেউই এগুলোর জ্ঞান অর্জন করতে পারেন না।

আর প্রাজ্ঞ আলিমদের মধ্য থেকে যারা বলেন যে, জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গও তা জানেন না—
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৪)
الْمُتَشَابه فَإِنَّمَا أَرَادَ هَذَا النَّوْع

وَأما مَا يُمكن حمله فِي وُجُوه اللُّغَة فيتأول وَيعلم تَأْوِيله الْمُسْتَقيم ويزال مَا فِيهِ من تَأْوِيل غير مُسْتَقِيم

وَقَالَ الْخطابِيّ الْمُتَشَابه على ضَرْبَيْنِ

أَحدهمَا مَا إِذا رد إِلَى الْمُحكم وَاعْتبر بِهِ عرف مَعْنَاهُ

وَالْآخر مَا لَا سَبِيل إِلَى الْوُقُوف على حَقِيقَته وَهُوَ الَّذِي يتبعهُ أهل الزيغ فيطلبون تَأْوِيله وَلَا يبلغون كنهه فيرتابون فِيهِ فيفتنون

وَقَالَ الإِمَام الرَّاغِب جَمِيع الْمُتَشَابه على ثَلَاثَة أضْرب

ضرب لَا سَبِيل إِلَى الْوُقُوف عَلَيْهِ كوقت السَّاعَة وَخُرُوج الدَّابَّة وَنَحْو ذَلِك

وَضرب للْإنْسَان سَبِيل إِلَى مَعْرفَته كالألفاظ الْعَرَبيَّة وَالْأَحْكَام الغلقة

وَضرب مُتَرَدّد بَين الْأَمريْنِ يخْتَص بمعرفته بعض الراسخين فِي الْعلم وَيخْفى على من دونهم وَهُوَ الْمشَار إِلَيْهِ بقوله صلى الله عليه وسلم لِابْنِ عَبَّاس اللَّهُمَّ فقهه فِي الدّين وَعلمه التَّأْوِيل
মুতাশাবিহ দ্বারা তিনি মূলত এই প্রকারটিকেই বুঝিয়েছেন।

আর যা ভাষাগত বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, তার তাউয়িল (ব্যাখ্যা) করা হবে এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা নির্ধারণ করা হবে, আর এতে বিদ্যমান ভুল ব্যাখ্যাসমূহ দূর করা হবে।

ইমাম খাত্তাবী (রহ.) বলেন, মুতাশাবিহ দুই প্রকার।

প্রথমটি হলো তা, যাকে মুহকাম (সুস্পষ্ট আয়াত)-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে এবং তার আলোকে বিবেচনা করলে তার অর্থ অনুধাবন করা যায়।

দ্বিতীয়টি হলো তা, যার প্রকৃত তত্ত্ব উদ্ঘাটন করার কোনো পথ নেই। পথভ্রষ্ট লোকেরা এরই অনুসরণ করে এবং এর ব্যাখ্যার সন্ধান করে; কিন্তু তারা এর মূল রহস্যে পৌঁছাতে পারে না, ফলে তারা সন্দেহে নিপতিত হয় এবং বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়।

ইমাম রাগিব (রহ.) বলেন, সকল মুতাশাবিহ তিন প্রকারের হয়ে থাকে।

এক প্রকার হলো এমন, যা অবগত হওয়ার কোনো পথ নেই; যেমন কিয়ামতের সময়, (কিয়ামতের প্রাক্কালে) ভূগর্ভস্থ জন্তুর আত্মপ্রকাশ এবং এই জাতীয় বিষয়সমূহ।

আরেক প্রকার হলো এমন, যা জানার সাধ্য মানুষের রয়েছে; যেমন জটিল আরবি শব্দাবলি এবং দুর্বোধ্য বিধানসমূহ।

আর অন্য প্রকারটি হলো এই দুইয়ের মাঝামাঝি, যা সম্পর্কে গভীর ইলমের অধিকারী কতিপয় আলেম অবগত হতে পারেন, কিন্তু অন্যদের কাছে তা অস্পষ্ট থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আব্বাস (রাযি.)-এর জন্য যে দুআ করেছিলেন, তাতে মূলত এই প্রকারটিরই ইঙ্গিত রয়েছে: "হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা দান করুন এবং তাকে তাউয়িল (ব্যাখ্যা) শিক্ষা দিন।"
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৫)
قَالَ وَإِذا عرفت هَذَا عرفت أَن الْوُقُوف على قَوْله {وَمَا يعلم تَأْوِيله إِلَّا الله} وَوَصله بقوله {والراسخون فِي الْعلم} جائزان وَأَن لكل وَاحِد مِنْهُمَا وَجها حَسْبَمَا دلّ عَلَيْهِ التَّفْصِيل الْمُتَقَدّم

وَقَالَ أَيْضا والمتشابه من جِهَة الْمَعْنى أَوْصَاف الله تَعَالَى وأوصاف الْقِيَامَة فَإِن تِلْكَ الصِّفَات لَا تتَصَوَّر لنا إِذْ كَانَ لَا يحصل فِي نفوسنا صُورَة مَا لم نحسه أَو لَيْسَ من جنسه انْتهى

وَهُوَ كَلَام فِي غَايَة الْحسن وَالتَّحْقِيق

وَاخْتلفُوا هَل يجوز الْخَوْض فِي الْمُتَشَابه على قَوْلَيْنِ

مَذْهَب السّلف وَإِلَيْهِ ذهب الْحَنَابِلَة وَكثير من الْمُحَقِّقين عدم الْخَوْض خُصُوصا فِي مسَائِل الْأَسْمَاء وَالصِّفَات فَإِنَّهُ ظن وَالظَّن يُخطئ ويصيب فَيكون من بَاب القَوْل على الله بِلَا علم وَهُوَ مَحْظُور ويمتنعون من التَّعْيِين خشيَة الْإِلْحَاد فِي الْأَسْمَاء وَالصِّفَات وَلِهَذَا قَالُوا وَالسُّؤَال عَنهُ بِدعَة فَإِنَّهُ لم يعْهَد من الصَّحَابَة التَّصَرُّف فِي أَسْمَائِهِ تَعَالَى وَصِفَاته بالظنون وَحَيْثُ عمِلُوا بالظنون فَإِنَّمَا عمِلُوا بهَا فِي تفاصيل الْأَحْكَام الشَّرْعِيَّة لَا فِي المعتقدات الإيمانية

وروى الشَّيْخَانِ وَغَيرهمَا عَن عَائِشَة رضي الله عنها قَالَت تَلا رَسُول الله صلى الله عليه وسلم هَذِه الْآيَة {هُوَ الَّذِي أنزل عَلَيْك الْكتاب}
তিনি বলেন, যখন আপনি বিষয়টি অনুধাবন করলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে "আল্লাহ ব্যতীত এর ব্যাখ্যা আর কেউ জানে না" - এই অংশে থামা এবং এটিকে "এবং যারা জ্ঞানে সুগভীর" - এর সাথে মিলিয়ে পড়া উভয়ই বৈধ। পূর্বোক্ত বিস্তারিত আলোচনা অনুযায়ী এগুলোর প্রতিটিরই একটি যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অর্থের দিক থেকে রূপক বা অস্পষ্ট বিষয়গুলো হলো মহান আল্লাহর গুণাবলী এবং কিয়ামতের বৈশিষ্ট্যসমূহ। কারণ এই গুণাবলী আমাদের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়; যেহেতু যা আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করি না বা যা আমাদের পরিচিত কোনো কিছুর সমজাতীয় নয়, তার কোনো প্রতিকৃতি আমাদের হৃদয়ে গঠিত হয় না। সমাপ্ত।

এটি অত্যন্ত চমৎকার এবং গভীর গবেষণালব্ধ একটি বক্তব্য।

রূপক বা অস্পষ্ট বিষয়সমূহের মর্মার্থ অনুসন্ধানে গভীরে প্রবেশ করা বৈধ কি না, সে বিষয়ে আলেমগণের মাঝে দুটি মতভেদ রয়েছে।

সালাফ বা পূর্বসূরিগণের মাযহাব—যার প্রতি হাম্বলিগণ এবং অনেক গবেষক আলেমও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন—হলো এই বিষয়ে গভীরে প্রবেশ না করা, বিশেষ করে আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত বিষয়সমূহে। কেননা এটি অনুমাননির্ভর, আর অনুমান সঠিক হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে; ফলে এটি জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলার নামান্তর হয়ে দাঁড়াবে, যা একটি নিষিদ্ধ কাজ। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে সত্যচ্যুতি বা বিভ্রান্তির আশঙ্কায় তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ থেকে বিরত থাকেন। এই কারণেই তাঁরা বলেছেন, এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা নতুন উদ্ভাবন বা বিদআত। কেননা সাহাবীগণের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলী নিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁরা যেখানেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছেন, তা কেবল শরীয়তের বিধি-বিধানের খুঁটিনাটি শাখাসমূহেই করেছেন, ঈমানী বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নয়।

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ আয়েশা (আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হন) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (আল্লাহর শান্তি ও রহমত তাঁর ওপর বর্ষিত হোক) এই আয়াতটি পাঠ করলেন: "তিনিই সেই সত্তা যিনি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন..."
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৬)
إِلَى قَوْله {أولُوا الْأَلْبَاب} آل عمرَان 7 قَالَت فَقَالَ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم فَإِذا رَأَيْت الَّذين يتبعُون مَا تشابه مِنْهُ فَأُولَئِك الَّذين سمى الله فَاحْذَرْهُمْ

وروى الطَّبَرَانِيّ فِي الْكَبِير عَن أبي مَالك الْأَشْعَرِيّ أَنه سمع رَسُول الله صلى الله عليه وسلم يَقُول لاأخاف على أمتِي إِلَّا ثَلَاث خلال أَن يكثر لَهُم المَال فيتحاسدوا فيقتتلوا وَأَن يفتح لَهُم الْكتاب فَيَأْخذهُ الْمُؤمن يَبْتَغِي تَأْوِيله وَمَا يعلم تَأْوِيله إِلَّا الله الحَدِيث

وَفِي حَدِيث ابْن مرْدَوَيْه إِن الْقُرْآن لم ينزل ليكذب بعضه بَعْضًا فَمَا عَرَفْتُمْ فاعملوا بِهِ وَمَا تشابه فآمنوا بِهِ
...আলে ইমরানের ৭ নং আয়াতের {বিবেকসম্পন্নগণ} অংশ পর্যন্ত। তিনি (আয়েশা রা.) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “যখন তোমরা তাদের দেখবে যারা কুরআনের অস্পষ্ট বা রূপক আয়াতগুলোর অনুসরণ করছে, তারাই সেই ব্যক্তি যাদের কথা আল্লাহ (আয়াতে) উল্লেখ করেছেন; সুতরাং তাদের থেকে সতর্ক থেকো।”

ইমাম তাবারানি তাঁর ‘আল-মুজামুল কাবীর’ গ্রন্থে আবু মালিক আল-আশআরি (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন: “আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে তিনটি বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো ভয় করি না: তাদের মাঝে সম্পদের প্রাচুর্য ঘটবে যার ফলে তারা পরস্পরকে ঈর্ষা করবে ও একে অপরের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে; আর তাদের নিকট কিতাব উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, অতঃপর মুমিন ব্যক্তিও তার ব্যাখ্যার অনুসন্ধান করবে, অথচ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ এর গূঢ় রহস্য বা ব্যাখ্যা জানে না...” — (হাদিসটির শেষ পর্যন্ত)।

এবং ইবনে মারদুওয়াইহ-এর বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: “নিশ্চয়ই কুরআন এক অংশ অন্য অংশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি; সুতরাং তোমরা এর যেটুকু অনুধাবন করতে পারো সে অনুযায়ী আমল করো এবং যা রূপক বা অস্পষ্ট তার ওপর ঈমান আনো।”
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৭)
وروى الْحَاكِم عَن ابْن مَسْعُود رضي الله عنه عَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ كَانَ الْكتاب الأول ينزل من بَاب وَاحِد على حرف وَاحِد وَنزل الْقُرْآن من سَبْعَة أَبْوَاب على سَبْعَة أحرف زجر وَأمر وحلال وَحرَام ومحكم ومتشابه وأمثال فأحلوا حَلَاله وحرموا حرَامه وافعلوا مَا أمرْتُم بِهِ وانتهوا عَمَّا نهيتم عَنهُ واعتبروا بأمثاله وَاعْمَلُوا بمحكمه وآمنوا بمتشابهه وَقُولُوا آمنا بِهِ كل من عِنْد رَبنَا وروى الْبَيْهَقِيّ فِي الشّعب نَحوه من حَدِيث أبي هُرَيْرَة

وروى ابْن جرير عَن ابْن عَبَّاس عَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ أنزل الْقُرْآن على أَرْبَعَة أحرف حَلَال وَحرَام لَا يعْذر أحد بجهالته وَتَفْسِير تفسره الْعَرَب وَتَفْسِير تفسره الْعلمَاء ومتشابه لَا يُعلمهُ إِلَّا الله وَمن ادّعى علمه سوى الله فَهُوَ كَاذِب ثمَّ رَوَاهُ من وَجه آخر عَن ابْن عَبَّاس مَوْقُوفا بِنَحْوِهِ

وروى ابْن أبي حَاتِم من طَرِيق الْعَوْفِيّ عَن ابْن عَبَّاس رَضِي
ইমাম হাকেম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ একটি দরজা দিয়ে একটি পদ্ধতিতে (হরফ) অবতীর্ণ হতো, কিন্তু কুরআন সাতটি দরজা দিয়ে সাতটি পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। সেগুলো হলো—নিষেধাজ্ঞা, আদেশ, হালাল, হারাম, সুস্পষ্ট (মুহকাম), অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) এবং দৃষ্টান্তসমূহ। সুতরাং তোমরা এর হালালকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করো, হারামকে হারাম হিসেবে গণ্য করো, যা আদেশ করা হয়েছে তা পালন করো এবং যা নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকো। এর দৃষ্টান্তসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, সুস্পষ্ট আয়াত অনুযায়ী আমল করো এবং অস্পষ্ট আয়াতসমূহের ওপর ঈমান আনো এবং বলো—'আমরা এর ওপর ঈমান আনলাম, সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে'।" ইমাম বায়হাকি 'শুয়াবুল ইমান'-এ আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

ইবনে জারির ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "কুরআন চারটি বিষয়ের ভিত্তিতে অবতীর্ণ হয়েছে—হালাল ও হারাম, যার ব্যাপারে অজ্ঞতা কারও জন্য অজুহাত হিসেবে গণ্য হবে না; এমন ব্যাখ্যা (তাফসির) যা আরবরা তাদের ভাষার মাধ্যমে বুঝতে পারে; এমন ব্যাখ্যা যা আলেম সমাজ অনুধাবন করেন; এবং এমন অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) বিষয় যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর জ্ঞান রাখার দাবি করলে সে মিথ্যাবাদী।" অতঃপর তিনি অন্য সূত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে 'মাওকুফ' হিসেবে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আবি হাতিম আওফি-এর সূত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে...
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৮)
الله عَنهُ قَالَ نؤمن بالمحكم وندين بِهِ ونؤمن بالمتشابه وَلَا ندين بِهِ وَهُوَ من عِنْد الله كُله

وروى أَيْضا عَن عَائِشَة رضي الله عنها قَالَت كَانَ رسوخهم فِي الْعلم أَن آمنُوا بمتشابهه وَلَا يعلمونه

وروى الدَّارمِيّ فِي مُسْنده عَن سُلَيْمَان بن يسَار أَن رجلا يُقَال لَهُ صبيغ قدم الْمَدِينَة فَجعل يسْأَل عَن متشابه الْقُرْآن فَأرْسل إِلَيْهِ عمر وَقد أعد لَهُ عراجين النّخل فَقَالَ من أَنْت قَالَ عبد الله بن صبيغ فَأخذ عمر عرجونا من تِلْكَ العراجين فَضَربهُ حَتَّى أدْمى رَأسه

وَفِي رِوَايَة فَضَربهُ بِالْجَرِيدِ حَتَّى ترك ظَهره دبرة ثمَّ تَركه حَتَّى برأَ ثمَّ أعَاد عَلَيْهِ الضَّرْب ثمَّ تَركه حَتَّى برأَ فَدَعَا بِهِ ليعيده عَلَيْهِ فَقَالَ إِن كنت تُرِيدُ قَتْلِي فاقتلني قتلا جميلا أَو ردني إِلَى أرضي فَأذن لَهُ إِلَى أرضه وَكتب إِلَى أبي مُوسَى الْأَشْعَرِيّ أَن لَا يجالسه أحد من الْمُسلمين
আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন, তিনি বলেন: আমরা মুহকাম (সুস্পষ্ট) আয়াতসমূহের ওপর ঈমান আনি এবং সে অনুযায়ী দ্বীন পালন করি, আর মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট) আয়াতসমূহের ওপরও ঈমান আনি কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করি না; আর এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।

আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: ইলমের ক্ষেত্রে তাদের গভীরতা ছিল এই যে, তারা মুতাশাবিহ বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছে অথচ তারা এর প্রকৃত ব্যাখ্যা জানত না।

দারেমি তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে সুলায়মান ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সাবিগ নামক এক ব্যক্তি মদিনায় এসে কুরআনের মুতাশাবিহ বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে ডেকে পাঠালেন এবং তার জন্য খেজুরের শুকনো ডাল প্রস্তুত করে রাখলেন। উমর জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কে? সে উত্তর দিল: আমি আল্লাহর বান্দা সাবিগ। তখন উমর সেই ডালগুলোর একটি নিলেন এবং তাকে প্রহার করলেন, এমনকি তার মাথা রক্তাক্ত হয়ে গেল।

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাকে খেজুরের ডাল দিয়ে এমনভাবে প্রহার করলেন যে তার পিঠ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। এরপর তিনি তাকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিলেন। অতঃপর পুনরায় তাকে প্রহার করলেন এবং সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর আবার তাকে প্রহারের উদ্দেশ্যে ডাকলে সে বলল: আপনি যদি আমাকে হত্যা করতেই চান, তবে দয়া করে আমাকে উত্তম পন্থায় হত্যা করুন, নতুবা আমাকে আমার নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিন। অতঃপর উমর তাকে তার দেশে ফেরার অনুমতি দিলেন এবং আবু মুসা আল-আশআরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এই মর্মে পত্র লিখলেন যে, কোনো মুসলিম যেন তার সাথে না বসে।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৫৯)
وَفِي كتاب الْفُرُوع لِابْنِ مُفْلِح الْحَنْبَلِيّ وَعمر بن الْخطاب أَمر بهجر صبيغ بسؤاله عَن الذاريات والمرسلات والنازعات انْتهى

وَهَذَا مِنْهُ رضي الله عنه لسد بَاب الذريعة

وَالْآيَة الشَّرِيفَة قد دلّت على ذمّ متبعي الْمُتَشَابه ووصفهم بالزيغ وابتغاء الْفِتْنَة وعَلى تمدح الَّذين فَوضُوا الْعلم إِلَى الله وسلموا إِلَيْهِ كَمَا مدح الله الْمُؤمنِينَ بِالْغَيْبِ

وَقَالَ الإِمَام فَخر الدّين صرف اللَّفْظ عَن الرَّاجِح إِلَى الْمَرْجُوح لَا بُد فِيهِ من دَلِيل مُنْفَصِل وَهُوَ إِمَّا لَفْظِي أَو عَقْلِي فَالْأول لَا يُمكن إعتباره فِي الْمسَائِل الْأُصُولِيَّة لِأَنَّهُ لَا يكون قَاطعا لِأَنَّهُ مَوْقُوف على انْتِفَاء الإحتمالات الْعشْرَة الْمَعْرُوفَة وانتفاؤها مظنون وَالْوُقُوف على المظنون مظنون والظني لَا يكْتَفى بِهِ فِي الْأُصُول

وَأما الْعقلِيّ فَإِنَّمَا يُفِيد صرف اللَّفْظ عَن ظَاهره لكَون الظَّاهِر محالا

وَأما إِثْبَات الْمَعْنى المُرَاد فَلَا يُمكن بِالْعقلِ لِأَن طَرِيق ذَلِك تَرْجِيح مجَاز على مجَاز وَتَأْويل على تَأْوِيل وَذَلِكَ التَّرْجِيح لَا يُمكن إِلَّا بِالدَّلِيلِ اللَّفْظِيّ وَالدَّلِيل اللَّفْظِيّ فِي التَّرْجِيح ضَعِيف لَا يُفِيد إِلَّا الظَّن وَالظَّن لَا يعول عَلَيْهِ فِي الْمسَائِل الْأُصُولِيَّة
ইবন মুফলিহ আল-হাম্বলীর 'আল-ফুরু' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব সাবীগকে বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কারণ সে আয-যারিয়াত, আল-মুরসালাত এবং আন-নাযিআত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। [সমাপ্ত]

এবং তাঁর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপটি ছিল ফিতনার পথ রুদ্ধ করার (সাদ্দুদ যারী'আহ) উদ্দেশ্যে।

পবিত্র আয়াতটি মুতাশাবিহ বা রূপক বিষয়ের অনুসারীদের নিন্দা জ্ঞাপন করেছে এবং তাদের বিচ্যুতি ও ফিতনা অন্বেষণের বিশেষণে বিশেষিত করেছে। পক্ষান্তরে, এটি তাদের প্রশংসা করেছে যারা প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করে, যেমনিভাবে আল্লাহ অদৃশ্যে বিশ্বাসী মুমিনদের প্রশংসা করেছেন।

ইমাম ফখরুল দীন আল-রাযী বলেছেন: কোনো শব্দের অর্থকে প্রবল বা স্পষ্ট অর্থ থেকে সরিয়ে অপ্রবল বা রূপক অর্থের দিকে ফিরিয়ে নিতে হলে অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র দলীল প্রয়োজন। সেই দলীল হয় শাব্দিক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক হবে। প্রথমটি (শাব্দিক দলীল) উসূল বা মৌলিক আকিদাগত বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এটি অকাট্য নয়। কেননা এটি সুপরিচিত দশটি সম্ভাবনার অনুপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, আর সেই সম্ভাবনাগুলোর অনুপস্থিতি কেবল একটি ধারণা মাত্র। ধারণার ওপর ভিত্তি করে যা অর্জিত হয় তা-ও ধারণা মাত্র, আর উসূলের ক্ষেত্রে ধারণা যথেষ্ট নয়।

আর বুদ্ধিবৃত্তিক দলীলের ক্ষেত্রে তা কেবল শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখে, কারণ এক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থটি অসম্ভব সাব্যস্ত হয়।

কিন্তু উদ্দিষ্ট অর্থ সাব্যস্ত করা বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল দ্বারা সম্ভব নয়। কারণ এর পদ্ধতি হলো এক রূপক অর্থকে অন্য রূপক অর্থের ওপর কিংবা এক ব্যাখ্যাকে অন্য ব্যাখ্যার ওপর প্রধান্য দেওয়া। আর এই প্রাধান্য প্রদান কেবল শাব্দিক দলীলের মাধ্যমেই সম্ভব, অথচ প্রাধান্য প্রদানের ক্ষেত্রে শাব্দিক দলীল দুর্বল, যা কেবল ধারণা প্রদান করে। আর উসূল বা মৌলিক আকিদাগত বিষয়ে ধারণার ওপর নির্ভর করা যায় না।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬০)
القطعية فَلهَذَا اخْتَار الْأَئِمَّة الْمُحَقِّقُونَ من السّلف وَالْخلف بعد إِقَامَة الدَّلِيل الْقَاطِع على أَن حمل اللَّفْظ على ظَاهره محَال ترك الْخَوْض فِي تعْيين التَّأْوِيل انْتهى

وتوسط ابْن دَقِيق الْعِيد فَقبل التَّأْوِيل إِن قرب فِي لِسَان الْعَرَب نَحْو {على مَا فرطت فِي جنب الله} الزمر 56 أَي فِي حَقه وَمَا يجب لَهُ لَا إِن بعد أَي كتأويل اسْتَوَى باستولى

إِذا تقرر هَذَا فَاعْلَم أَن من المتشابهات آيَات الصِّفَات الَّتِي التَّأْوِيل فِيهَا بعيد فَلَا تؤول وَلَا تفسر

وَجُمْهُور أهل السّنة مِنْهُم السّلف وَأهل الحَدِيث على الْإِيمَان بهَا وتفويض مَعْنَاهَا المُرَاد مِنْهَا إِلَى الله تَعَالَى وَلَا نفسرها مَعَ تنزيهنا لَهُ عَن حَقِيقَتهَا

فقد روى الإِمَام اللالكائي الْحَافِظ عَن مُحَمَّد بن الْحسن قَالَ اتّفق الْفُقَهَاء كلهم من الْمشرق إِلَى الْمغرب على الْإِيمَان بِالصِّفَاتِ من غير تَفْسِير وَلَا تَشْبِيه

وَقد روى اللاكائي أَيْضا فِي السّنة من طَرِيق قُرَّة بن
সুনিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে। এই কারণেই সালাফ এবং খালাফ যুগের বিজ্ঞ ও গবেষক ইমামগণ, শব্দের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা যে অসম্ভব—সে বিষয়ে অকাট্য দলিল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদানের গভীরে প্রবেশ না করার পথ বেছে নিয়েছেন। সমাপ্ত।

ইবনে দাকীকুল ঈদ এ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি ঐ সকল ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন যা আরবি ভাষায় ব্যবহারের দিক থেকে নিকটবর্তী; যেমন: {হায় আফসোস! আল্লাহর প্রতি (ফী জানবিল্লা-হ) আমার কর্তব্যে আমি যে অবহেলা করেছি} (সূরা যুমার: ৫৬), অর্থাৎ তাঁর প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদার ক্ষেত্রে। কিন্তু তিনি সুদূরপরাহত ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করেননি; যেমন: 'ইস্তাওয়া' শব্দের ব্যাখ্যা 'ইস্তাওলা' (কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা) দ্বারা করা।

বিষয়টি যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হলো, তখন জেনে রাখুন যে, মুতাশাবিহাত বা অস্পষ্ট অর্থবোধক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত হলো মহান আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কিত আয়াতসমূহ, যেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা প্রদান করা সুদূরপরাহত। সুতরাং সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করা যাবে না।

সালাফ ও আহলে হাদিসসহ জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন এবং এগুলোর নিহিত উদ্দেশ্যমূলক অর্থ মহান আল্লাহর ওপর সোপর্দ করার (তাফওয়ীদ) নীতি অবলম্বন করেন। আমরা আল্লাহ তাআলাকে সৃষ্টির সদৃশ হওয়া থেকে পবিত্র ঘোষণা করার পাশাপাশি এগুলোর কোনো (বাহ্যিক বা মনগড়া) ব্যাখ্যা প্রদান করি না।

হাফেজ ইমাম লালকায়ী মুহাম্মদ ইবনে হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত পৃথিবীর সকল ফকিহ কোনো প্রকার ব্যাখ্যা প্রদান ও সাদৃশ্য আরোপ ব্যতিরেকেই গুণবাচক বিষয়গুলোর ওপর ঈমান আনয়নের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

ইমাম লালকায়ী তাঁর 'আস-সুন্নাহ' গ্রন্থে কুররা ইবনে... এর সূত্রে আরও বর্ণনা করেছেন যে:
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬১)
خَالِد عَن الْحسن عَن أمه عَن أم سَلمَة رضي الله عنها فِي قَوْله تَعَالَى {الرَّحْمَن على الْعَرْش اسْتَوَى} طه 5 الإستواء مَعْلُوم والكيف مَجْهُول وَالْإِيمَان بِهِ وَاجِب وَالسُّؤَال عَنهُ بدعه والبحث عَنهُ كفر

وَهَذَا لَهُ حكم الحَدِيث الْمَرْفُوع لِأَن مثله لَا يُقَال من قبيل الرَّأْي

وَقَالَ الإِمَام التِّرْمِذِيّ فِي الْكَلَام على حَدِيث الرُّؤْيَة الْمَذْهَب فِي هَذَا عِنْد أهل الْعلم من الْأَئِمَّة مثل سُفْيَان الثَّوْريّ وَابْن الْمُبَارك وَمَالك وَابْن عُيَيْنَة ووكيع وَغَيرهم أَنهم قَالُوا نروي هَذِه الْأَحَادِيث كَمَا جَاءَت ونؤمن بهَا وَلَا يُقَال كَيفَ وَلَا نفسر وَلَا نتوهم

وَذكرت فِي كتابي الْبُرْهَان فِي تَفْسِير الْقُرْآن عِنْد قَوْله تَعَالَى {هَل ينظرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيهم الله فِي ظلل من الْغَمَام} الْبَقَرَة 210 وَبعد أَن ذكرت مَذَاهِب المتأولين أَن مَذْهَب السّلف هُوَ عدم الْخَوْض فِي مثل هَذَا وَالسُّكُوت عَنهُ وتفويض علمه إِلَى الله تَعَالَى
খালিদ হাসান থেকে, তিনি তাঁর জননী থেকে, তিনি উম্মে সালামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে মহান আল্লাহর বাণী— {পরম করুণাময় আরশের ওপর উঠলেন} [ত্বহা: ৫] প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে: (আল্লাহর) উঠা সুবিদিত এবং এর ধরন বা প্রকৃতি অজ্ঞাত; এতে ঈমান আনা ওয়াজিব, এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বিদআত এবং এর (স্বরূপ নিয়ে) অনুসন্ধান করা কুফর।

এটি ‘হাদিসে মারফু’ এর মর্যাদা রাখে; কারণ এ জাতীয় বিষয় ব্যক্তিগত বিচার-বুদ্ধি বা মতামতের ভিত্তিতে বলা সম্ভব নয়।

ইমাম তিরমিযী (আল্লাহর) দর্শন সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনায় বলেন: সুফিয়ান আস-সাওরী, ইবনুল মুবারক, মালিক, ইবনে উয়াইনাহ এবং ওয়াকি‘র ন্যায় ইমামগণের অন্তর্ভুক্ত বিদগ্ধ উলামায়ে কেরামের নিকট এ বিষয়ের অনুসৃত পথ হলো—তাঁরা বলেছেন: ‘আমরা এই হাদিসগুলো যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সেভাবেই বর্ণনা করি এবং এগুলোতে বিশ্বাস রাখি; এর প্রকৃতি কেমন তা বলা যাবে না, আমরা এর (নিজস্ব) কোনো ব্যাখ্যা করি না এবং এ নিয়ে কোনো কল্পনাও করি না’।

আমি আমার ‘আল-বুরহান ফী তাফসীরিল কুরআন’ গ্রন্থে মহান আল্লাহর বাণী— {তারা কি কেবল এরই অপেক্ষা করছে যে, মেঘমালার ছায়াতলে আল্লাহর শুভাগমন ঘটবে?} [আল-বাক্বারাহ: ২১০] এর ব্যাখ্যায় রূপক ব্যাখ্যাকারীদের মতবাদসমূহ উল্লেখ করার পর বলেছি যে, সালাফদের অনুসৃত পথ হলো এই জাতীয় বিষয়ের গভীরে প্রবেশ না করা, এ নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এর প্রকৃত জ্ঞান মহান আল্লাহর নিকট সোপর্দ করা।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬২)
قَالَ ابْن عَبَّاس هَذَا من المكتوم الَّذِي لَا يُفَسر فَالْأولى فِي هَذِه الْآيَة وَمَا شاكلها أَن يُؤمن الْإِنْسَان بظاهرها ويكل علمهَا إِلَى الله تَعَالَى وعَلى ذَلِك مَضَت أَئِمَّة السّلف

وَكَانَ الزُّهْرِيّ وَمَالك وَالْأَوْزَاعِيّ وسُفْيَان الثَّوْريّ وَاللَّيْث بن سعد وَابْن الْمُبَارك وَأحمد بن حَنْبَل وَإِسْحَاق يَقُولُونَ فِي هَذِه الْآيَة وأمثالها أمروها كَمَا جَاءَت

وَقَالَ سُفْيَان بن عُيَيْنَة وناهيك بِهِ كل مَا وصف الله بِهِ نَفسه فِي كِتَابه فتفسيره قِرَاءَته وَالسُّكُوت عَنهُ لَيْسَ لأحد أَن يفسره إِلَّا الله وَرَسُوله

وَسُئِلَ الإِمَام ابْن خُزَيْمَة عَن الْكَلَام فِي الْأَسْمَاء وَالصِّفَات فَقَالَ وَلم يكن أَئِمَّة الْمُسلمين وأرباب الْمذَاهب أَئِمَّة الدّين مثل مَالك وسُفْيَان وَالْأَوْزَاعِيّ وَالشَّافِعِيّ وَأحمد وَإِسْحَاق وَيحيى بن يحيى وَابْن الْمُبَارك وَأبي حنيفَة وَمُحَمّد بن الْحسن وَأبي يُوسُف يَتَكَلَّمُونَ فِي ذَلِك وَينْهَوْنَ أَصْحَابهم عَن الْخَوْض فِيهِ ويدلونهم على الْكتاب وَالسّنة

وَسمع الإِمَام أَحْمد شخصا يروي حَدِيث النُّزُول وَيَقُول
ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, এটি সেই অপ্রকাশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যার ব্যাখ্যা করা হয় না। সুতরাং এই আয়াত এবং এর সদৃশ আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য পন্থা হলো—মানুষ এর বাহ্যিক শব্দের ওপর ঈমান আনবে এবং এর প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহ তাআলার নিকট সোপর্দ করবে। সালাফে সালেহীন বা পূর্বসূরি ইমামগণ এই নীতির ওপরই অতিবাহিত হয়েছেন।

যুহরি, মালিক, আওযায়ি, সুফিয়ান সাওরি, লাইস বিন সাদ, ইবনুল মুবারক, আহমাদ বিন হাম্বল এবং ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ) এই আয়াত ও এর সমগোত্রীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে বলতেন: এগুলো যেভাবে এসেছে, ঠিক সেভাবেই বহাল রাখো।

সুফিয়ান বিন উয়াইনা (রাহিমাহুল্লাহ)—যাঁর জ্ঞান ও মর্যাদা আপনার জন্য যথেষ্ট—বলেছেন: আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে নিজের যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা হলো কেবল তা পাঠ করা এবং এ বিষয়ে মৌনতা অবলম্বন করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত অন্য কারো জন্য এগুলোর (নিজস্ব) ব্যাখ্যা করার অধিকার নেই।

ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: মুসলিম উম্মাহর ইমামগণ, বিভিন্ন মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং দ্বীনের বরেণ্য ব্যক্তিত্বগণ—যেমন মালিক, সুফিয়ান, আওযায়ি, শাফিয়ি, আহমাদ, ইসহাক, ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া, ইবনুল মুবারক, আবু হানিফা, মুহাম্মদ বিন হাসান এবং আবু ইউসুফ (রাহিমাহুমুল্লাহ)—এসব বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করতেন না। বরং তাঁরা তাঁদের অনুসারীদের এসবের গভীরে প্রবেশ করতে নিষেধ করতেন এবং তাঁদেরকে কিতাব ও সুন্নাহর অনুসরণের দিকনির্দেশনা দিতেন।

ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) জনৈক ব্যক্তিকে 'নুযূল' বা অবতরণ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করতে এবং বলতে শুনলেন—
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৩)
ينزل بِغَيْر حَرَكَة وَلَا انْتِقَال وَلَا تغير حَال فَأنْكر أَحْمد ذَلِك وَقَالَ قل كَمَا قَالَ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم فَهُوَ كَانَ أغير على ربه مِنْك

وَقَالَ الْأَوْزَاعِيّ لما سُئِلَ عَن حَدِيث النُّزُول يفعل الله مَا يَشَاء

وَقَالَ الفضيل بن عِيَاض إِذا قَالَ لَك الجهمي أَنا أكفر بِرَبّ يَزُول عَن مَكَانَهُ فَقل أَنا أُؤْمِن بِرَبّ يفعل مَا يَشَاء

وَاعْلَم أَن الْمَشْهُور عِنْد أَصْحَاب الإِمَام أَحْمد أَنهم لَا يتأولون الصِّفَات الَّتِي من جنس الْحَرَكَة كالمجيء والإتيان فِي الظلل وَالنُّزُول كَمَا لَا يتأولون غَيرهَا مُتَابعَة للسلف

وَفِي كتاب الْفِقْه الْأَكْبَر فِي العقائد تصنيف الإِمَام أبي حنيفَة وَهُوَ سُبْحَانَهُ شَيْء لَا كالأشياء بِلَا جسم وَلَا جَوْهَر وَلَا عرض وَلَا حد لَهُ وَلَا ضد لَهُ وَلَا ند وَلَا مثل وَله يَد وَوجه وَنَفس فَمَا ذكر الله تَعَالَى فِي الْقُرْآن من ذكر الْوَجْه وَالْيَد وَالنَّفس فَهُوَ لَهُ صِفَات بِلَا كَيفَ وَلَا يُقَال إِن يَده قدرته أَو نعْمَته لِأَن فِيهِ إبِْطَال الصّفة وَهُوَ قَول أهل الْقدر والإعتزال وَلَكِن يَده صفته بِلَا كَيفَ وغضبه وَرضَاهُ صفتان من صِفَاته بِلَا كَيفَ وَالْقَضَاء وَالْقدر والمشيئة صِفَاته فِي الْأَزَل بِلَا كَيفَ انْتهى
তিনি কোনো নড়াচড়া, স্থান পরিবর্তন বা অবস্থার পরিবর্তন ছাড়াই অবতরণ করেন; ইমাম আহমদ (র.) এই উক্তির প্রতিবাদ করলেন এবং বললেন, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা বলেছেন তুমিও কেবল তাই বলো; কারণ তিনি তোমার চেয়ে তাঁর রব সম্পর্কে অধিক আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ছিলেন।"

ইমাম আওযায়ী (র.)-কে যখন আল্লাহর অবতরণ (নুযুল) সংক্রান্ত হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন, "আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।"

ফুযাইল ইবনে ইয়াদ (র.) বলেন, "যদি কোনো জাহমি তোমাকে বলে যে, 'আমি এমন রবে বিশ্বাস করি না যিনি নিজ স্থান পরিবর্তন করেন', তবে তুমি বলো, 'আমি এমন রবে বিশ্বাস করি যিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন'।"

জেনে রেখো যে, ইমাম আহমদ (র.)-এর অনুসারীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মত হলো, তাঁরা গতি বা নড়াচড়া প্রকৃতির গুণাবলি—যেমন মেঘমালার ছায়ায় মহান আল্লাহর আগমন, পদার্পণ এবং অবতরণ—এগুলোর কোনো রূপক ব্যাখ্যা (তাউইল) করেন না, ঠিক যেমন তাঁরা পূর্বসূরিদের (সালাফ) অনুসরণে অন্যান্য গুণাবলিরও কোনো রূপক ব্যাখ্যা করেন না।

ইমাম আবু হানিফা (র.) রচিত আকিদাবিষয়ক গ্রন্থ 'আল-ফিকহুল আকবার'-এ বর্ণিত হয়েছে: তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন এক সত্তা যা অন্য কোনো বস্তুর মতো নয়; শরীর, সারবস্তু (জাওহার) কিংবা আপেক্ষিক বৈশিষ্ট্য (আরায) ছাড়াই তিনি বিদ্যমান। তাঁর কোনো সীমা নেই, কোনো প্রতিপক্ষ নেই, কোনো সমকক্ষ নেই এবং কোনো উদাহরণ নেই। তাঁর হাত, চেহারা এবং নফস (সত্তা) রয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে চেহারা, হাত ও নফস সম্পর্কে যা কিছু উল্লেখ করেছেন, তা সবই তাঁর জন্য নির্ধারিত গুণ (সিফাত), যার ধরণ বা প্রকৃতি নির্ণয় করা যায় না। এ কথা বলা সমীচীন হবে না যে, তাঁর 'হাত' মানে তাঁর 'ক্ষমতা' বা 'নেয়ামত'; কারণ এতে মহান আল্লাহর গুণকে অস্বীকার করা হয়, যা মূলত কদরিয়া ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের অভিমত। বরং তাঁর হাত তাঁরই একটি গুণ যার ধরণ অজ্ঞাত; এবং তাঁর ক্রোধ ও সন্তুষ্টি তাঁর গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত যার ধরণ নির্ণয়যোগ্য নয়। অনুরূপভাবে তাঁর ফয়সালা, ভাগ্য এবং ইচ্ছা অনাদিকাল থেকেই তাঁর গুণ হিসেবে সাব্যস্ত, যার কোনো ধরণ ও প্রকৃতি মানুষের জানা নেই। সমাপ্ত।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৪)
قَالَ الْعَلامَة ابْن الْهمام إِن الإصبع وَالْيَد صفة لَهُ تَعَالَى لَا بِمَعْنى الْجَارِحَة بل على وَجه يَلِيق بِهِ وَهُوَ سُبْحَانَهُ أعلم وَسَيَأْتِي تَتِمَّة كَلَامه

وَمن الْعجب أَن أَئِمَّتنَا الْحَنَابِلَة يَقُولُونَ بِمذهب السّلف ويصفون الله بِمَا وصف بِهِ نَفسه وَبِمَا وَصفه بِهِ رَسُوله من غير تَحْرِيف وَلَا تَعْطِيل وَمن غير تكييف وَلَا تَمْثِيل وَمَعَ ذَلِك فتجد من لَا يحْتَاط فِي دينه ينسبهم للتجسيم ومذهبهم أَن المجسم كَافِر بِخِلَاف مَذْهَب الشَّافِعِيَّة فَإِن المجسم عِنْدهم لَا يكفر فقوم يكفرون المجسمة فَكيف يَقُولُونَ بالتجسيم وَإِنَّمَا نسبوا لذَلِك مَعَ أَن مَذْهَبهم هُوَ مَذْهَب السّلف والمحققين من الْخلف لما أَنهم بالغوا فِي الرَّد على المتأولين للإستواء وَالْيَد وَالْوَجْه وَنَحْو ذَلِك كَمَا يَأْتِي وهم وَإِن أثبتوا ذَلِك مُتَابعَة للسلف لكِنهمْ يَقُولُونَ كَمَا هُوَ فِي كتب عقائدهم إِنَّه تَعَالَى ذَات لَا تشبه الذوات مُسْتَحقَّة للصفات الْمُنَاسبَة لَهَا فِي جَمِيع مَا يسْتَحقّهُ

قَالُوا فَإِذا ورد الْقُرْآن وصحيح السّنة فِي حَقه بِوَصْف تلقي فِي التَّسْمِيَة بِالْقبُولِ وَوَجَب إثْبَاته لَهُ على مَا يسْتَحقّهُ وَلَا يعدل بِهِ عَن حَقِيقَة الْوَصْف إِذْ ذَاته تَعَالَى قَابِلَة للصفات اللائقة بهَا

قَالُوا فَنصف الله تَعَالَى بِمَا وصف بِهِ نَفسه وَلَا نزيد عَلَيْهِ
আল্লামা ইবনুল হুমাম বলেন যে, অঙ্গুলি ও হস্ত মহান আল্লাহর গুণবিশেষ, যা কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অর্থে নয়; বরং এমনভাবে যা তাঁর শানের উপযোগী। আর তিনি সুবহানাহু ওয়াতাআলা সমধিক পরিজ্ঞাত। তাঁর বক্তব্যের অবশিষ্ট অংশ সামনে আসবে।

এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, আমাদের হাম্বলি ইমামগণ সালাফদের মাযহাব অনুযায়ী কথা বলেন এবং আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর রাসুল তাঁর জন্য যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোর মাধ্যমেই তাঁর গুণগান করেন—কোনো প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার, ধরন নির্ধারণ ও সাদৃশ্য প্রদান ছাড়াই। এতৎসত্ত্বেও আপনি এমন কিছু লোক পাবেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন না করে তাঁদেরকে দেহবাদের (তাজসিম) দিকে নিসবত করে। অথচ তাঁদের মাযহাব হলো দেহবাদী ব্যক্তি কাফির, যা শাফেয়ি মাযহাবের বিপরীত; কেননা শাফেয়িদের নিকট দেহবাদীকে কাফির বলা হয় না। সুতরাং যে কওম দেহবাদীদের কাফির মনে করে, তারা কীভাবে দেহবাদের কথা বলতে পারে? মূলত তাঁদেরকে এই অপবাদ দেওয়া হয়েছে—যদিও তাঁদের মাযহাবই হলো সালাফ ও পরবর্তী যুগের সত্যনিষ্ঠ গবেষক আলেমদের মাযহাব—কারণ তাঁরা ইস্তিওয়া, হস্ত, মুখমণ্ডল এবং এ জাতীয় বিষয়গুলোর অপব্যাখ্যাকারীদের কঠোর প্রতিবাদ করেছেন, যেমনটি সামনে আসবে। তাঁরা সালাফদের অনুসরণে এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করলেও তাঁদের আকিদার কিতাবসমূহে যেমনটি বর্ণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ এমন এক সত্তা যা অন্য কোনো সত্তার সদৃশ নয়, তিনি তাঁর শান অনুযায়ী সকল উপযুক্ত গুণাবলি পাওয়ার যোগ্য।

তাঁরা বলেন, যদি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহয় মহান আল্লাহর সত্তার বিষয়ে কোনো গুণের বর্ণনা আসে, তবে নামকরণের ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা অপরিহার্য এবং তাঁর শান অনুযায়ী তা তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। গুণের প্রকৃত অর্থ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না, যেহেতু মহান আল্লাহর সত্তা তাঁর উপযোগী গুণাবলি গ্রহণের যোগ্য।

তাঁরা বলেন, আমরা মহান আল্লাহর গুণাবলি সেভাবেই বর্ণনা করি যেভাবে তিনি নিজের বর্ণনা দিয়েছেন এবং আমরা এর ওপর অতিরিক্ত কিছু যোগ করি না।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৫)
فَإِن ظَاهر الْأَمر فِي صِفَاته سُبْحَانَهُ أَن تكون مُلْحقَة بِذَاتِهِ فَإِذا امْتنعت ذَاته المقدسة من تَحْصِيل معنى يشْهد الشَّاهِد فِيهِ معنى يُؤَدِّي إِلَى كَيْفيَّة فَكَذَلِك القَوْل فِيمَا أَضَافَهُ إِلَى نَفسه من صِفَاته

هَذَا كَلَام أَئِمَّة الْحَنَابِلَة وَلَا خُصُوصِيَّة لَهُم فِي ذَلِك بل هَذَا مَذْهَب جَمِيع السّلف والمحققين من الْخلف

قَالَ الْحَافِظ السُّيُوطِيّ فِي كِتَابه الإتقان من الْمُتَشَابه آيَات الصِّفَات وَلابْن اللبان فِيهَا تصنيف مُفْرد نَحْو {الرَّحْمَن على الْعَرْش اسْتَوَى} طه 5 {كل شَيْء هَالك إِلَّا وَجهه} الْقَصَص 88 {وَيبقى وَجه رَبك} الرَّحْمَن 27 {ولتصنع على عَيْني} طه 39 {يَد الله فَوق أَيْديهم} الْفَتْح 10 {لما خلقت بيَدي} ص 75 {وَالسَّمَاوَات مَطْوِيَّات بِيَمِينِهِ} الزمر 67

وَجُمْهُور أهل السّنة مِنْهُم السّلف وَأهل الحَدِيث على الْإِيمَان بهَا وتفويض مَعْنَاهَا المُرَاد مِنْهَا إِلَى الله تَعَالَى وَلَا نفسرها مَعَ تنزيهنا لَهُ عَن حَقِيقَتهَا

قَالَ وَذَهَبت طَائِفَة من أهل السّنة إِلَى أَنا نؤولها على مَا يَلِيق بجلاله تَعَالَى وَهَذَا مَذْهَب الْخلف

قَالَ وَكَانَ إِمَام الْحَرَمَيْنِ يذهب إِلَيْهِ ثمَّ رَجَعَ عَنهُ فَقَالَ
মহান আল্লাহ তাআলার সিফাত বা গুণাবলির ক্ষেত্রে বাহ্যিক বিষয়টি হলো সেগুলো তাঁর সত্তার সাথে সংযুক্ত। সুতরাং তাঁর পবিত্র সত্তা যেহেতু এমন কোনো অর্থ গ্রহণ করা থেকে ঊর্ধ্বে যা কোনো প্রত্যক্ষকারীর নিকট কোনো প্রকারের আকার বা ধরন নির্দেশ করে, সেহেতু তিনি নিজের সত্তার প্রতি যেসকল গুণাবলি আরোপ করেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এটি হাম্বলী ইমামগণের বক্তব্য, তবে এটি কেবল তাঁদের সাথেই বিশেষায়িত নয়; বরং এটি সকল সালাফ (পূর্বসূরি) এবং পরবর্তী যুগের (খালাফ) গবেষক আলেমদের মাযহাব।

হাফেজ সুয়ূতী তাঁর ‘আল-ইতকান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট অর্থবোধক) বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত হলো গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহ। এ বিষয়ে ইবনুল লাব্বান একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন: {পরম করুণাময় আরশের ওপর সমুন্নত হয়েছেন} ত্বহা ৫, {তাঁর সত্তা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংসশীল} কাসাস ৮৮, {এবং আপনার প্রতিপালকের মহিমাময় সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে} আর-রহমান ২৭, {যাতে তুমি আমার চোখের সামনে লালিত-পালিত হও} ত্বহা ৩৯, {আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর} ফাতহ ১০, {যাকে আমি আমার নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি} সোয়াদ ৭৫, {এবং আকাশমণ্ডলী তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে} যুমার ৬৭।

সালাফ ও আহলে হাদিসসহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের অবস্থান হলো এগুলোর প্রতি ঈমান আনা এবং এগুলোর মাধ্যমে উদ্দিষ্ট প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলার ওপর সোপর্দ (তাফবীজ) করা। আমরা মহান আল্লাহকে এগুলোর সৃষ্টিগত হাকীকত বা বাস্তবতা থেকে পবিত্র ঘোষণা করার পাশাপাশি এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করি না।

তিনি বলেন, আহলে সুন্নাতের একদল আলিমের অভিমত হলো—আমরা এগুলোর এমন ব্যাখ্যা (তাবীল) করব যা আল্লাহ তাআলার শান ও মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এটিই হলো খালাফ বা পরবর্তী যুগের আলেমদের পথ।

তিনি বলেন, ইমামুল হারামাইনও প্রথমে এই মত পোষণ করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি এ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বলেন:
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৬)
فِي الرسَالَة النظامية الَّذِي نرتضيه رَأيا وندين الله تَعَالَى بِهِ عقدا هُوَ اتِّبَاع سلف الْأمة فَإِنَّهُم درجوا على ترك التَّعَرُّض لمعانيها ودرك مَا فِيهَا وهم صفوة الْإِسْلَام وَكَانُوا لَا يألون جهدا فِي ضبط قَوَاعِد الْملَّة والتواصي بحفظها وَتَعْلِيم النَّاس مَا يَحْتَاجُونَ إِلَيْهِ مِنْهَا فَلَو كَانَ تَأْوِيل هَذِه الظَّوَاهِر سائغا لَأَوْشَكَ أَن يكون اهتمامهم بهَا فَوق اهتمامهم بِفُرُوع الشَّرِيعَة فَإِذا انصرم عصرهم وعصر التَّابِعين على الإضراب عَن التَّأْوِيل كَانَ ذَلِك هُوَ الْوَجْه المتبع فَحق على ذِي الدّين أَن يعْتَقد تَنْزِيه الْبَارِي عَن صِفَات الْمُحدثين وَلَا يَخُوض فِي تَأْوِيل المشكلات ويكل مَعْنَاهَا إِلَى الرب

وَقَالَ الإِمَام ابْن الصّلاح وعَلى هَذِه الطَّرِيقَة مضى صدر الْأمة وساداتها وَإِيَّاهَا اخْتَار أَئِمَّة الْفُقَهَاء وقاداتها وإليها دَعَا أَئِمَّة الحَدِيث وأعلامه وَلَا أحد من الْمُتَكَلِّمين من أَصْحَابنَا يصدف عَنْهَا ويأباها انْتهى

قلت وَهَذَا القَوْل هُوَ الْحق وَأسلم الطّرق فَإنَّك تَجِد كل فريق من المتأولين يُخطئ الْأُخَر وَيرد كَلَامه وَيُقِيم الْبُرْهَان على صِحَة قَوْله ويعتقد أَنه هُوَ الْمُصِيب وَأَن غَيره هُوَ الْمُخطئ وَمن طالع كَلَام طوائف الْمُتَكَلِّمين والمتصوفين علم ذَلِك علم الْيَقِين … النَّاس شَتَّى وآراء مفرقة … كل يرى الْحق فِيمَا قَالَ واعتقدا …
'আল-রিসালাহ আল-নিজামিয়্যাহ' গ্রন্থে (ইমাম আল-জুওয়াইনি বলেছেন): যে মতটি আমরা পছন্দ করি এবং যে আকিদাকে আমরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করি, তা হলো উম্মতের পূর্বসূরিদের (সালাফ) অনুসরণ করা। কেননা তাঁরা এই পাঠসমূহের অর্থের অনুসন্ধান এবং তার মর্মোদঘাটন করা থেকে বিরত থেকেছেন। তাঁরা ছিলেন ইসলামের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁরা দ্বীনের মূলনীতিসমূহ সুসংহত করতে, তা সংরক্ষণের উপদেশ দিতে এবং মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ শিক্ষা দিতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেননি। যদি এই প্রকাশ্য অর্থগুলোর ব্যাখ্যা (তাবিল) করা বিধিসম্মত হতো, তবে এ বিষয়ে তাঁদের গুরুত্ব প্রদান শরীয়তের শাখা-প্রশাখাগুলোর (ফুরু) চেয়েও বেশি হতো। যেহেতু তাঁদের যুগ এবং তাবেঈগণের যুগ ব্যাখ্যার পথ পরিহার করার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে, সেহেতু এটাই হলো অনুসৃত পথ। অতএব, একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির কর্তব্য হলো মহান স্রষ্টাকে সৃষ্টির গুণাবলি থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করা এবং জটিল বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় লিপ্ত না হয়ে এর মর্মার্থ রবের ওপর ন্যস্ত করা।

ইমাম ইবনুস সালাহ বলেন: এই পথেই উম্মতের আদি অগ্রজগণ এবং নেতৃবৃন্দ পরিচালিত হয়েছেন। ফকীহ ইমামগণ এবং তাঁদের পথিকৃৎগণ এই পথই মনোনীত করেছেন। মুহাদ্দিস ইমামগণ ও তাঁদের বিশিষ্ট আলিমগণ এই পথের দিকেই আহ্বান করেছেন। আমাদের সহচরদের মধ্যে কালামশাস্ত্রবিদদের কেউই এই পথ থেকে বিমুখ হননি এবং একে অস্বীকার করেননি। (সমাপ্ত)

আমি (গ্রন্থকার) বলছি: এই বক্তব্যটিই সত্য এবং এটিই সর্বাধিক নিরাপদ পথ। কেননা আপনি লক্ষ্য করবেন যে, ব্যাখ্যাকারীদের প্রতিটি দলই অন্য দলকে ভুল সাব্যস্ত করছে, অন্যের বক্তব্য খণ্ডন করছে এবং নিজ মতের সত্যতার সপক্ষে দলিল পেশ করছে। তারা বিশ্বাস করে যে তারাই সঠিক এবং অন্যরাই ভ্রান্ত। যারা বিভিন্ন শ্রেণির কালামশাস্ত্রবিদ ও সুফিদের বক্তব্যসমূহ পাঠ করেছেন, তারা এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করেছেন … মানুষ নানা প্রকারের এবং তাদের মতাদর্শও ভিন্ন ভিন্ন … প্রত্যেকেই যা কিছু বলে এবং বিশ্বাস করে, তাতেই সত্যকে অবলোকন করে …
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৭)
قَالَ أَصْحَابنَا أسلم الطّرق التَّسْلِيم فَمَا سلم دين من لم يسلم لله وَرَسُوله وَيرد علم مَا اشْتبهَ إِلَى عالمه وَمن أَرَادَ علم مَا يمْتَنع علمه وَلم يقنع بِالتَّسْلِيمِ فهمه حجبه مرامه عَن خَالص التَّوْحِيد وصافي الْمعرفَة وَالْإِيمَان والتعمق فِي الْفِكر ذَرِيعَة الخذلان وَسلم الحرمان والإسراف فِي الْجِدَال يُوجب عَدَاوَة الرِّجَال إِذا علمت هَذَا فَهَذَا أَوَان الشُّرُوع فِي المُرَاد بعون الله تَعَالَى

اعْلَم أيدني الله وَإِيَّاك بِروح مِنْهُ أَن من الْمُتَشَابه صِفَات الله تَعَالَى فَإِنَّهُ يتَعَذَّر الْوُقُوف على تَحْقِيق مَعَانِيهَا والإحاطة بهَا بل على تَحْقِيق الرّوح وَالْعقل القائمين بالإنسان وَأهل الْإِسْلَام قد اتَّفقُوا على إِثْبَات مَا أثْبته الله لنَفسِهِ من أَوْصَافه الَّتِي نطق بهَا الْقُرْآن من نَحْو سميع وبصير وَعَلِيم وقدير ونافي ذَلِك كَافِر لِأَنَّهُ مكذب لصريح الْقُرْآن

وَاخْتلفُوا فِي المشتقات مِنْهَا فَقَالَت الْمُعْتَزلَة وَمن وافقهم إِنَّه تَعَالَى عليم بِذَاتِهِ بَصِير بِذَاتِهِ سميع بِذَاتِهِ لَا بِعلم وَسمع وبصر وَهَكَذَا بَقِيَّة الصِّفَات قد ثبتوا الْمُشْتَقّ بِدُونِ الْمُشْتَقّ مِنْهُ فِرَارًا من تعدد القدماء مَعَ الله تَعَالَى محتجين بِمَا يطول تَقْرِيره قائلين لَا يخبر عَنهُ تَعَالَى بِمَا يخبر بِهِ عَن شَيْء من خلقه إِلَّا أَن يَأْتِي نَص بِشَيْء من ذَلِك فَيُوقف عِنْده وَمَا لَا فَلَا وَلِأَن هَذِه الصِّفَات أَعْرَاض وَالْعرض لَا يقوم إِلَّا بجوهر متحيز وكل متحيز فجسم مركب أَو جَوْهَر فَرد وَمن قَالَ ذَلِك فَهُوَ مشبه لِأَن الْأَجْسَام متماثلة
আমাদের উলামাগণ বলেন, সর্বাপেক্ষা নিরাপদ পথ হলো সমর্পণ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেনি এবং অস্পষ্ট বিষয়াদির জ্ঞান এর যথার্থ প্রজ্ঞাবানের প্রতি সোপর্দ করেনি, তার দ্বীন নিরাপদ থাকেনি। আর যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করতে চায় যা অর্জন করা অসম্ভব এবং সমর্পণে তুষ্ট থাকতে পারে না, তার এই লক্ষ্য তাকে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ, স্বচ্ছ মারেফত এবং ঈমান থেকে বিচ্যুত করে দেয়। চিন্তার গভীরে অতি-নিমগ্নতা হলো লাঞ্ছনার বাহন ও বঞ্চিত হওয়ার সোপান। আর বিতর্কে বাড়াবাড়ি মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে। যখন আপনি এটি উপলব্ধি করলেন, তখন আল্লাহর সাহায্যে মূল উদ্দেশ্যে প্রবেশের এখনই সময়।

জেনে রাখুন—আল্লাহ আমাকে ও আপনাকে তাঁর পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা সাহায্য করুন—আল্লাহ তাআলার গুণাবলি অস্পষ্ট বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এগুলোর অর্থের প্রকৃত স্বরূপ এবং এগুলোর পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা অসম্ভব; এমনকি মানুষের মাঝে বিদ্যমান রূহ ও আকলের রহস্য উদঘাটন করাও দুঃসাধ্য। ইসলাম অনুসারীগণ এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর যে সকল গুণের কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন—যেমন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান—সেগুলোকে সাব্যস্ত করতে হবে। আর যে এগুলো অস্বীকার করবে সে কাফির বলে গণ্য হবে, কারণ সে পবিত্র কুরআনের অকাট্য বাণীকে অস্বীকারকারী।

তবে তারা এসকল গুণ থেকে উৎসারিত শব্দাবলি নিয়ে মতভেদ করেছেন। মুতাজিলা এবং তাদের অনুসারীরা বলেছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বয়ং সত্তার দ্বারাই সর্বজ্ঞ, তাঁর সত্তার দ্বারাই সর্বদ্রষ্টা এবং সত্তার দ্বারাই সর্বশ্রোতা; অতিরিক্ত কোনো জ্ঞান, শ্রবণ বা দর্শন গুণের মাধ্যমে নয়। এভাবে অবশিষ্ট গুণাবলির ক্ষেত্রেও তারা মূল উৎস ছাড়াই কেবল উৎপন্ন শব্দাবলি সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহর সাথে একাধিক অনাদি সত্তার অস্তিত্বের ধারণা থেকে বাঁচতে তারা এটি করেছে এবং এর সপক্ষে দীর্ঘ যুক্তি পেশ করেছে। তারা বলে, আল্লাহর সৃষ্টির ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, আল্লাহর ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না যদি না এ বিষয়ে কোনো অকাট্য প্রমাণ থাকে। তাদের মতে, এ সকল গুণ হলো আপতিক বৈশিষ্ট্য, যা কেবল স্থান দখলকারী মৌলিক পদার্থের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর যা কিছু স্থান দখলকারী, তা মূলত দেহধারী বা যৌগিক পদার্থ অথবা অবিভাজ্য একক কণা। যারা এরূপ মত পোষণ করবে তারা মূলত সাদৃশ্য স্থাপনকারী, কারণ সকল দেহ বা বস্তু পরস্পর সদৃশ।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৮)
قَالُوا وَأما كَونه لَا يعقل عليم إِلَّا بِعلم وَسميع إِلَّا بسمع وبصير إِلَّا ببصر كضارب لَا يعقل إِلَّا بِضَرْب وقائم بِقِيَام فَهَذَا فِي الشَّاهِد وَأما فِي الْغَائِب فَلَا فقد صَحَّ النَّص بِأَن لَهُ تَعَالَى عينا وَأَعْيُنًا فيلزمكم أَن تَقولُوا إِنَّه تَعَالَى ذُو حدقة وناظر لِأَنَّهُ لَا يُوجد فِي الشَّاهِد إِلَّا مثل ذَلِك وَلَا يكون أَلْبَتَّة سميع فِي الْعَالم إِلَّا بأذن ذَات صماخ

وَقَالُوا أَيْضا التَّعْلِيل بالإشتقاق فِي مثل ذَلِك لَيْسَ بِحجَّة فقد علمنَا يَقِينا أَنه تَعَالَى بنى السَّمَاء كَمَا قَالَ {وَالسَّمَاء بنيناها} الذاريات 47 وَلَا يجوز أَن يُسمى سُبْحَانَهُ بِنَاء وَنَحْو ذَلِك

وَأجِيب بِأَنَّهُ قد صرحت النُّصُوص من الْكتاب وَالسّنة بِإِثْبَات الصِّفَات كَقَوْلِه تَعَالَى {أنزلهُ بِعِلْمِهِ} النِّسَاء 166 وَقَوله {وَمَا تحمل من أُنْثَى وَلَا تضع إِلَّا بِعِلْمِهِ} فاطر 11 وَقَوله {إِن الله هُوَ الرَّزَّاق ذُو الْقُوَّة} الذاريات 58 فَأثْبت لنَفسِهِ الْقُوَّة وَهِي الْقُدْرَة بِاتِّفَاق الْمُفَسّرين

وَفِي الحَدِيث اللَّهُمَّ إِنِّي أستخيرك بعلمك وأستقدرك بقدرتك
তাঁরা বলেন: জ্ঞান ব্যতীত 'জ্ঞাতা', শ্রবণশক্তি ব্যতীত 'শ্রবণকারী' এবং দৃষ্টিশক্তি ব্যতীত 'দর্শনকারী'র অস্তিত্ব যেমন কল্পনা করা যায় না—ঠিক যেমন আঘাত করা ব্যতীত 'আঘাতকারী' এবং দণ্ডায়মান হওয়া ব্যতীত 'দণ্ডায়মান ব্যক্তি'র ধারণা করা সম্ভব নয়—এসব কেবল দৃশ্যমান জগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু অদৃশ্যের (আল্লাহর) ক্ষেত্রে তা নয়। কেননা সহীহ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহর চক্ষু রয়েছে। এমতাবস্থায় তোমাদের জন্য এটা বলাও আবশ্যক হয়ে পড়বে যে, মহান আল্লাহ অক্ষিগোলক ও মণির অধিকারী; কারণ দৃশ্যমান জগতে এর ব্যতিরেকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। আর এই জগতে কর্ণকুহরবিশিষ্ট কান ছাড়া কেউই শ্রবণকারী হতে পারে না।

তাঁরা আরও বলেন: এই জাতীয় ক্ষেত্রে শব্দমূলগত ব্যুৎপত্তির মাধ্যমে কারণ দর্শানো কোনো অকাট্য প্রমাণ নয়। কারণ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, মহান আল্লাহ আকাশ নির্মাণ করেছেন, যেমন তিনি বলেছেন: {আর আকাশ, আমি তা নির্মাণ করেছি} (আয-যারিয়াত: ৪৭)। অথচ মহান আল্লাহকে 'নির্মাণকারী' বা এই জাতীয় নামে অভিহিত করা বৈধ নয়।

এর উত্তরে বলা হয় যে, কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যসমূহ স্পষ্টভাবে মহান আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্ত করেছে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী: {তিনি তা তাঁর নিজ জ্ঞানসহ অবতীর্ণ করেছেন} (আন-নিসা: ১৬৬)। তাঁর বাণী: {কোনো নারী তাঁর জ্ঞান ব্যতীত গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসবও করে না} (ফাতির: ১১)। এবং তাঁর বাণী: {নিশ্চয়ই আল্লাহই রিযিকদাতা এবং তিনি মহাশক্তিশালী} (আয-যারিয়াত: ৫৮)। এখানে তিনি নিজের জন্য 'শক্তি' সাব্যস্ত করেছেন, যা মুফাসসিরগণের ঐকমত্য অনুযায়ী 'ক্ষমতা'র অর্থ বহন করে।

হাদীসে এসেছে: "হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং আপনার ক্ষমতার মাধ্যমে আপনার নিকট সামর্থ্য ভিক্ষা করছি।"
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৬৯)
وَأَيْضًا قيل إِنَّه يلْزمهُم أَن تكون الذَّات علما وقدرة وحياة لثُبُوت خَصَائِص هَذِه الصِّفَات لَهَا فَإِنَّهُ قد تحقق فِي الْمَعْقُول أَن مَا يعلم بِهِ الْمَعْلُوم علم وَأَيْضًا فَهَذِهِ الصِّفَات لَا تقوم بِنَفسِهَا والذات قَائِمَة بِنَفسِهَا وَهُوَ جمع بَين النقيضين

وَأَجَابُوا بِأَن المُرَاد أنزلهُ وَهُوَ يُعلمهُ أَو أنزلهُ بِإِذْنِهِ وَأمره لِأَن مَا تعدى من الْأَفْعَال بِحرف الْبَاء فَإِن الدَّاخِلَة عَلَيْهِ يكون آلَة كضربت زيدا بِالسَّوْطِ وَأخذت المنديل بيَدي وَكَون الْعلم هُوَ الَّذِي نزل بِهِ لَا يتَصَوَّر إِذْ علمه تَعَالَى لَا ينْفَصل عَن ذَاته

والمناقشة فِي مثل هَذَا تطول وَتخرج عَن الْمَقْصُود وَالْمَقْصُود إِنَّمَا هُوَ الْإِشَارَة إِلَى أَن كل وَاحِد يَدعِي أَن الْحق بِيَدِهِ وَيُقِيم الدَّلِيل عَلَيْهِ كَمَا تقدم فنسكت نَحن عَن الْخَوْض فِي ذَلِك وَلَا نبحث فِي تَحْقِيقه فَإِنَّهُ بِدعَة ونفوض علمه إِلَى الله تَعَالَى وَلَا نكفر أحدا من أهل الْفرق بِمَا ذهب إِلَيْهِ واعتقده خُصُوصا مَعَ قيام الشُّبْهَة وَالدَّلِيل عِنْده فَإِن الْإِيمَان الْمُعْتَبر فِي الشَّرْع هُوَ تَصْدِيق الْقلب الْجَازِم بِمَا علم ضَرُورَة مَجِيء الرَّسُول بِهِ من عِنْد الله تَفْصِيلًا فِيمَا علم تَفْصِيلًا كالتوحيد والنبوة وإجمالا فِيمَا علم إِجْمَالا كالأنبياء السالفة وَالصِّفَات الْقَدِيمَة الَّتِي نطق بهَا الْقُرْآن

وَهَذَا هُوَ الْحق فَلَا نكفر بَقِيَّة الْفرق خلافًا لمن زعم من الْمُتَكَلِّمين أَن الْإِيمَان هُوَ الْعلم بِاللَّه وَصِفَاته على سَبِيل الْكَمَال والتمام فَبِهَذَا لَا جرم اقدم كل طَائِفَة على تَكْفِير من عداهُ من الطوائف لَكِن لَا بَأْس بالْقَوْل بتكفير بعض الغلاة من أهل الْبدع فَإِن من الْجَهْمِية من غلا حَتَّى رمى بعض الْأَنْبِيَاء
আরও বলা হয়েছে যে, তাদের মতানুসারে এটি আবশ্যক হয়ে পড়ে যে খোদ সত্তাই (জাত) হবে জ্ঞান, ক্ষমতা ও জীবন; কারণ এই গুণাবলির বৈশিষ্ট্যসমূহ সত্তার জন্য সুসাব্যস্ত। কেননা যুক্তিশাস্ত্রে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, যার মাধ্যমে কোনো জ্ঞাত বিষয় পরিজ্ঞাত হওয়া যায়, তা-ই জ্ঞান। অধিকন্তু, এই গুণাবলি স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে অবস্থান করে না, অথচ সত্তা স্বয়ংসম্পূর্ণ; এমতাবস্থায় গুণাবলিকে সত্তার সমার্থক মনে করা দুটি বিপরীত বিষয়ের একত্রীকরণ।

তারা উত্তর দিয়েছেন যে, এর অর্থ হলো—তিনি তা অবতীর্ণ করেছেন এমতাবস্থায় যে তিনি তা জানেন, অথবা তিনি তা তাঁর অনুমতি ও আদেশে অবতীর্ণ করেছেন। কারণ যেসকল ক্রিয়া 'বা' অব্যয় যোগে ব্যবহৃত হয়, সেখানে উক্ত অব্যয়টি যন্ত্র বা মাধ্যম নির্দেশ করে; যেমন: 'আমি জায়েদকে চাবুক দিয়ে প্রহার করেছি' এবং 'আমি রুমালটি হাত দিয়ে গ্রহণ করেছি'। এমতাবস্থায় 'জ্ঞান' নিজেই অবতীর্ণ হয়েছে—এমনটি কল্পনা করা যায় না, যেহেতু মহান আল্লাহর জ্ঞান তাঁর সত্তা থেকে পৃথক হয় না।

এজাতীয় আলোচনা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং তা মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। মূল উদ্দেশ্য হলো কেবল এটুকু ইঙ্গিত করা যে, প্রত্যেকেই দাবি করে যে সত্য তাদের নিকট রয়েছে এবং ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে তারা নিজ নিজ সপক্ষে দলিলও পেশ করে। সুতরাং আমরা এসকল বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকি এবং এর চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই না; কারণ এটি একটি বিদআত বা নব-উদ্ভাবিত বিষয়। আমরা এর প্রকৃত জ্ঞান মহান আল্লাহর নিকট সমর্পণ করি। আমরা বিভিন্ন ফেরকার কাউকেই তাদের গৃহীত মত ও বিশ্বাসের কারণে কাফির আখ্যা দেই না, বিশেষত যখন তাদের নিকট কোনো সংশয় বা দলিল বিদ্যমান থাকে। কেননা শরিয়তে গ্রহণযোগ্য ঈমান হলো—আল্লাহর পক্ষ হতে রাসুল যা নিয়ে এসেছেন বলে অকাট্যভাবে জানা গেছে, অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাসের সাথে তা মেনে নেওয়া; যা বিস্তারিতভাবে জানা গেছে তাতে বিস্তারিত বিশ্বাস স্থাপন করা (যেমন তাওহিদ ও নবুওয়াত), আর যা সাধারণভাবে জানা গেছে তাতে সাধারণ বিশ্বাস স্থাপন করা (যেমন পূর্ববর্তী নবীগণ এবং কুরআনে বর্ণিত চিরন্তন গুণাবলি)।

আর এটিই হলো সত্য। সুতরাং আমরা অন্যান্য ফেরকাগুলোকে কাফির বলি না; সেই সকল কালামশাস্ত্রবিদের বক্তব্যের বিপরীতে যারা ধারণা করেন যে—ঈমান হলো পরিপূর্ণ ও সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। মূলত এই ধারণার বশবর্তী হয়েই প্রত্যেক দল তাদের বিরোধী অন্য দলগুলোকে কাফির আখ্যা দিতে উদ্যত হয়েছে। তবে বিদআতিদের মধ্যে যারা চরমপন্থী, তাদের কাউকে কাফির বলায় কোনো দোষ নেই; কেননা জাহমিয়াদের মধ্যে এমন কিছু চরমপন্থী রয়েছে যারা এমনকি কোনো কোনো নবীকেও অপবাদ প্রদান করেছে।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৭০)
بالتشبيه فَقَالَ ثَلَاثَة من الْأَنْبِيَاء مشبهة مُوسَى حَيْثُ قَالَ {إِن هِيَ إِلَّا فتنتك} وَعِيسَى حَيْثُ قَالَ {تعلم مَا فِي نَفسِي وَلَا أعلم مَا فِي نَفسك} وَمُحَمّد حَيْثُ قَالَ ينزل رَبنَا كل لَيْلَة إِلَى سَمَاء الدُّنْيَا

وَمن الْمُتَشَابه صفة الرَّحْمَة وَالْغَضَب وَالرِّضَا وَالْحيَاء والإستهزاء وَالْمَكْر وَالْعجب فِي قَوْله تَعَالَى {الرَّحْمَن الرَّحِيم} الْفَاتِحَة 1 3 النَّمْل 30 {غضب الله عَلَيْهِم} المجادلة 14 الممتحنة 13 {رضي الله عنهم} الْمَائِدَة 119 {وَالله لَا يستحيي من الْحق} الْأَحْزَاب 53 {الله يستهزئ بهم} الْبَقَرَة 15 {ومكروا ومكر الله} آل عمرَان 54 {بل عجبت} بِضَم التَّاء {ويسخرون} الصافات 12
সাদৃশ্যদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে, নবীদের মধ্যে তিনজন সাদৃশ্যসূচক বক্তব্য দিয়েছেন: মূসা (আ.), যখন তিনি বলেছিলেন, {এটি কেবল আপনার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা}; ঈসা (আ.), যখন তিনি বলেছিলেন, {আপনি জানেন যা আমার অন্তরে আছে, কিন্তু আমি জানি না যা আপনার সত্তায় আছে}; এবং মুহাম্মদ (সা.), যখন তিনি বলেছিলেন, আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

আর অস্পষ্ট বিষয়াবলির (মুতাশাবিহ) অন্তর্ভুক্ত হলো দয়া, ক্রোধ, সন্তুষ্টি, লজ্জা, উপহাস, কৌশল এবং বিস্ময় প্রকাশ সংক্রান্ত গুণাবলি; যেমন মহান আল্লাহর বাণী: {পরম করুণাময়, অতি দয়ালু} (আল-ফাতিহা ১, ৩; আন-নামল ৩০); {আল্লাহ তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন} (আল-মুজাদালা ১৪; আল-মুমতাহিনা ১৩); {আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন} (আল-মায়িদা ১১৯); {এবং আল্লাহ সত্যের বিষয়ে সংকুচিত বা লজ্জাবোধ করেন না} (আল-আহযাব ৫৩); {আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন} (আল-বাকারাহ ১৫); {তারা কৌশল অবলম্বন করেছিল এবং আল্লাহও কৌশল করেছিলেন} (আল-ইমরান ৫৪); {বরং আমিই বিস্মিত হয়েছি} —এখানে ‘তা’ বর্ণটি পেশ বা যম্মাহ যোগে পঠিত— {আর তারা উপহাস করে} (আস-সাফফাত ১২)।
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৭১)
فمذهب السّلف فِي هَذَا وَنَحْوه أَنهم يَقُولُونَ صِفَات الله تَعَالَى لَا يطلع لَهَا على مَاهِيَّة وَإِنَّمَا تمر كَمَا جَاءَت

قَالَ شيخ الْإِسْلَام ابْن تَيْمِية مَذْهَب سلف الْأمة وأئمتها أَن يصفو الله بِمَا وصف الله بِهِ نَفسه وَبِمَا وَصفه بِهِ رَسُوله من غير تَحْرِيف وَلَا تَعْطِيل وَلَا تكييف وَلَا تَمْثِيل وَلَا يجوز نفي صِفَات الله الَّتِي وصف بهَا نَفسه وَلَا تمثيلها بِصِفَات المخلوقين

وَمذهب الْخلف قَالُوا الرَّحْمَة لُغَة رقة الْقلب وانعطافه وَذَلِكَ من الكيفيات التابعة للمزاج وَالله منزه عَنْهَا فَالْمُرَاد بهَا فِي حَقه تَعَالَى إِرَادَة الْخَيْر وَالْإِحْسَان إِلَى من يرحمه فَإِن أَسمَاء الله تَعَالَى تُؤْخَذ بِاعْتِبَار الغايات الَّتِي هِيَ أَفعَال دون المبادئ الَّتِي هِيَ انفعالات

وَالْغَضَب هيجان النَّفس لإِرَادَة الإنتقام أَو غليان دم الْقلب وَعند إِسْنَاده إِلَيْهِ تَعَالَى يُرَاد بِهِ غَايَته فَإِن كَانَ إِرَادَة الإنتقام من العَاصِي فَإِنَّهُ من صِفَات الذَّات وَإِن كَانَ إحلال الْعقُوبَة كَانَ من صِفَات الْفِعْل

وَالْحيَاء هُوَ انقباض النَّفس عَن الْقَبِيح مَخَافَة الذَّم واشتقاقه من الْحَيَاة فَإِنَّهُ انكسار يعتري الْقُوَّة الحيوانية فيردها عَن أفعالها وَإِذا وصف بِهِ البارئ تَعَالَى كَمَا فِي قَوْله {وَالله لَا يستحيي من الْحق} الْأَحْزَاب 53 وكما فِي حَدِيث إِن ربكُم حييّ كريم يستحيي إِذا رفع العَبْد يَدَيْهِ إِلَيْهِ فَيَرُدهُمَا صفرا حَتَّى
এই এবং এই জাতীয় বিষয়সমূহে সালাফগণের মাযহাব হলো, তাঁরা বলেন: মহান আল্লাহর গুণাবলির প্রকৃত রূপ বা সত্তা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় না, বরং এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই অতিক্রম করানো হবে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: এই উম্মতের সালাফ এবং ইমামগণের মাযহাব হলো, আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর রাসূল তাঁর জন্য যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, তার মাধ্যমেই আল্লাহর গুণকীর্তন করা; কোনো ধরনের বিকৃতি, অস্বীকার, রূপদান ও সাদৃশ্যপ্রদান ব্যতিরেকে। আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য যেসব গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন তা অস্বীকার করা যেমন বৈধ নয়, তেমনি সেগুলোকে সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তুলনা করাও জায়েজ নয়।

আর খালাফদের মাযহাব হলো, তাঁরা বলেন: শাব্দিক অর্থে 'রহমত' বা দয়া বলতে হৃদয়ের কোমলতা ও সংবেদনশীলতাকে বোঝায়, যা মেজাজের অনুগামী বিশেষ অবস্থার অন্তর্ভুক্ত; আর আল্লাহ তাআলা তা থেকে পবিত্র। সুতরাং আল্লাহর ক্ষেত্রে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যাকে দয়া করা হয় তার প্রতি কল্যাণ ও অনুগ্রহের ইচ্ছা করা। কেননা মহান আল্লাহর নামসমূহকে চূড়ান্ত ফলাফলের (যা মূলত কর্ম) বিচারে গ্রহণ করা হয়, প্রাথমিক মানসিক অবস্থার (যা মূলত আবেগীয় প্রতিক্রিয়া) ভিত্তিতে নয়।

এবং 'গযব' বা রাগ হলো প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছায় আত্মার উত্তেজনা অথবা হৃদয়ের রক্ত টগবগ করে ওঠা। যখন এটি মহান আল্লাহর প্রতি সম্বোধিত হয়, তখন এর দ্বারা এর চূড়ান্ত লক্ষ্যই উদ্দেশ্য হয়। যদি তা পাপীর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা হয়, তবে তা 'সত্তাগত গুণের' (সিফাতে যাতিয়াহ) অন্তর্ভুক্ত; আর যদি তা শাস্তি প্রদান করা হয়, তবে তা 'কর্মগত গুণের' (সিফাতে ফিলিয়াহ) অন্তর্ভুক্ত।

এবং 'হায়া' বা লজ্জা হলো নিন্দার ভয়ে মন্দ কাজ থেকে আত্মার সংকুচিত হওয়া। এটি 'হায়াত' (জীবন) শব্দ থেকে উদ্ভূত; কেননা এটি এমন এক প্রকার স্থবিরতা যা জৈবিক শক্তির ওপর আপতিত হয়ে তাকে তার কর্ম থেকে নিবৃত্ত করে। যখন স্রষ্টা সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে এই গুণে বিশেষিত করা হয়— যেমন তাঁর বাণীতে রয়েছে: {আর আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা বোধ করেন না} আল-আহযাব ৫৩, এবং যেমন হাদিসে এসেছে: নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত লাজুক ও মহানুভব; যখন কোনো বান্দা তাঁর কাছে হাত তোলে, তখন তিনি তা শূন্য অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন...
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৭২)
يضع فيهمَا خيرا فَالْمُرَاد بِهِ التّرْك اللَّازِم للإنقباض العرضي كَمَا أَن المُرَاد من رَحمته وغضبه إِصَابَة الْخَيْر والإنتقام

والإستهزاء من بَاب الْعَبَث والسخرية وَالله تَعَالَى منزه عَن ذَلِك فَمَعْنَى {يستهزئ بهم} الْبَقَرَة 15 أَي يجازيهم على استهزائهم وَهُوَ من بَاب المشاكلة فِي اللَّفْظ ليزدوج الْكَلَام ك {جَزَاء سَيِّئَة بِمِثْلِهَا} الشورى 40 {نسوا الله فنسيهم} التَّوْبَة 67 أَو الْمَعْنى يعاملهم مُعَاملَة المستهزئ أما فِي الدُّنْيَا فبإجراء أَحْكَام الْمُسلمين علهيم وإستدراجهم بالإمهال وَأما فِي الْآخِرَة فيروى أَنه يفتح لأَحَدهم بَاب إِلَى الْجنَّة فيسرع نَحوه فَإِذا صَار إِلَيْهِ سد دونه ثمَّ يفتح لَهُ بَاب آخر فَإِذا أقبل إِلَيْهِ سد دونه

وَالْمَكْر فِي الأَصْل حِيلَة يتَوَصَّل بهَا إِلَى مضرَّة الْغَيْر وَالله منزه عَن ذَلِك فَلَا يُمكن إِسْنَاده إِلَيْهِ سُبْحَانَهُ إِلَّا بطرِيق المشاكلة

والضحك هُوَ رِضَاهُ تَعَالَى بِفعل عَبده ومحبته إِيَّاه وَإِظْهَار
তিনি তাদের মধ্যে কল্যাণ নিহিত রাখেন; এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সাময়িকভাবে সংকুচিত হওয়ার আবশ্যিক বর্জন, যেমনটি তাঁর রহমত ও ক্রোধ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কল্যাণ প্রাপ্তি ও প্রতিশোধ গ্রহণ।

বিদ্রূপ করা নিরর্থকতা ও উপহাসের পর্যায়ভুক্ত, আর আল্লাহ তাআলা এসব থেকে পবিত্র। সুতরাং {তিনি তাদের সাথে বিদ্রূপ করেন} (সূরা আল-বাকারা: ১৫) এর অর্থ হলো—তিনি তাদের বিদ্রূপের প্রতিফল প্রদান করেন। এটি শব্দের দিক থেকে ‘মুশাকাহলা’ (ভাষাগত সাদৃশ্য)-র অন্তর্ভুক্ত, যাতে বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে; যেমন: {মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ} (সূরা আশ-শুরা: ৪০) এবং {তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন} (সূরা আত-তাওবা: ৬৭)। অথবা এর অর্থ হলো—তিনি তাদের সাথে বিদ্রূপকারীর ন্যায় আচরণ করেন। পার্থিব জীবনে তাদের উপর মুসলিমদের বিধান জারি করার মাধ্যমে এবং অবকাশ প্রদানের দ্বারা তাদের ক্রমশ ধ্বংসের (ইসতিদরাজ) দিকে ধাবিত করার মাধ্যমে। আর পরকালে বর্ণিত রয়েছে যে, তাদের কারো জন্য জান্নাতের একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে, তখন সে সেদিকে দ্রুত ধাবিত হবে; কিন্তু যখন সে সেখানে পৌঁছাবে, তখন তার সামনে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর তার জন্য অন্য একটি দরজা খোলা হবে, কিন্তু যখন সে সেদিকে অগ্রসর হবে, তখনও তার সামনে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

মূলত ‘মাকর’ (কৌশল) হলো এমন একটি চাতুর্য যার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতিসাধন করা হয়; আল্লাহ তাআলা এ থেকে পবিত্র। সুতরাং সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি এটি আরোপ করা ‘মুশাকাহলা’ (ভাষাগত সাদৃশ্য) পদ্ধতি ব্যতীত সম্ভব নয়।

আর ‘হাসি’ (দহিক) হলো বান্দার কর্মের প্রতি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি, তার প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং প্রকাশ...
(খণ্ড: ১) আকাওয়ীলুস সিকাত ফী তাওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত ওয়াল আয়াতিল মুহকামাত ওয়াল মুতাশাবিহাত (পৃষ্ঠা: ৭৩)
نعْمَته عَلَيْهِ وَقَالَ بَعضهم الضحك اسْتِعَارَة فِي حق الرب سُبْحَانَهُ لِأَنَّهُ لَا يجوز عَلَيْهِ تغير الْحَالَات

والتعجب انفعال يحدث فِي النَّفس عِنْد الشُّعُور بِأَمْر خَفِي سَببه وَخرج عَن نَظَائِره وَلِهَذَا يُقَال إِذا ظهر السَّبَب بَطل الْعجب فَلَا يُطلق على الله أَنه متعجب لِأَنَّهُ لَا يخفى عَلَيْهِ شَيْء وَلِهَذَا قَالَ شُرَيْح لما قرئَ عِنْده {بل عجبت} بِضَم التَّاء إِن الله لَا يعجب من شَيْء إِنَّمَا يعجب من لَا يعلم قَالَ الْأَعْمَش فَذكرت ذَلِك لإِبْرَاهِيم فَقَالَ إِن شريحا كَانَ يُعجبهُ رَأْيه إِن عبد الله يَعْنِي ابْن مَسْعُود كَانَ أعلم من شُرَيْح وَكَانَ يقْرؤهَا عبد الله {بل عجبت} يَعْنِي بِضَم التَّاء وَكَذَلِكَ قَرَأَ الْكُوفِيُّونَ إِلَّا عَاصِمًا قَالُوا فالعجب من الله تَعَالَى إِمَّا على الْفَرْض والتخييل أَو هُوَ مَصْرُوف للمخاطب بِمَعْنى أَنه يجب أَن يتعجب مِنْهُ أَو هُوَ على معنى الإستعظام اللَّازِم لَهُ فَإِنَّهُ روعة تعتري الْإِنْسَان عِنْد استعظامه الشَّيْء

وَقيل إِنَّه مُقَدّر بالْقَوْل أَي قل يَا مُحَمَّد بل عجبت وَحِينَئِذٍ فَمَعْنَى الْقِرَاءَتَيْن وَاحِد

وَقَالَ الْمَهْدَوِيّ يجوز أَن يكون إِخْبَار الله عَن نَفسه بالعجب مَحْمُولا على أَنه ظهر من أمره وَسخطه على من كفر بِهِ مَا يقوم مقَام الْعجب من المخلوقين كَمَا يخبر عَنهُ تَعَالَى بالضحك عَمَّن رَضِي عَنهُ بِمَعْنى أَنه أظهر لَهُ من رِضَاهُ عَنهُ مَا يقوم مقَام الضحك من
তাঁর প্রতি তাঁর অনুগ্রহ। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, মহান রবের ক্ষেত্রে 'হাসি' একটি রূপক (ইস্তি'আরা), কারণ তাঁর ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হওয়া অসম্ভব।

আর বিস্ময় হলো মনের এমন এক প্রতিক্রিয়া যা কোনো গোপন কারণবিশিষ্ট এবং নজিরবিহীন বিষয় অনুভবের সময় সৃষ্টি হয়। এজন্যই বলা হয়: 'যখন কারণ প্রকাশ পায়, তখন বিস্ময় দূরীভূত হয়।' সুতরাং আল্লাহর ক্ষেত্রে 'বিস্মিত হওয়া' শব্দটি প্রয়োগ করা যায় না, কারণ তাঁর কাছে কোনো কিছুই গোপন নয়। এই কারণেই শুরাইহ্, যখন তাঁর সামনে 'তা' বর্ণে পেশ যোগে {বরং আমিই বিস্ময়াভিভূত হয়েছি} পাঠ করা হলো, তখন তিনি বললেন: 'আল্লাহ কোনো বিষয়ে বিস্ময়বোধ করেন না, বরং যে জানে না কেবল সেই বিস্ময়বোধ করে।' আ'মাশ বলেন: আমি ইব্রাহিম (নাখয়ী)-এর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি বললেন, 'শুরাইহ্ নিজের মতামতের প্রতি অতিমাত্রায় মুগ্ধ ছিলেন; অথচ আব্দুল্লাহ অর্থাৎ ইবনে মাসউদ শুরাইহ্ অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ছিলেন। আব্দুল্লাহ এই আয়াতটি {বরং আমিই বিস্ময়াভিভূত হয়েছি} অর্থাৎ 'তা' বর্ণে পেশসহ পাঠ করতেন।' কুফাবাসীগণও আসেম ব্যতীত এভাবেই পড়েছেন। তারা বলেন: মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে 'বিস্ময়' হয় কাল্পনিক অনুমিতি হিসেবে, অথবা তা সম্বোধিত ব্যক্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত—যার অর্থ হলো বিষয়টি এমন যে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করা উচিত। অথবা এটি কোনো বিষয়কে 'মহান গণ্য করার' (ইস্তি'জাম) অর্থে ব্যবহৃত, যা বিস্ময়ের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ; কারণ মানুষ কোনো বিষয়কে মহান বা বিশাল মনে করলে তার মধ্যে একপ্রকার শিহরণ অনুভূত হয়।

আর বলা হয়েছে যে, এখানে 'বলো' (কুল) শব্দটি উহ্য রয়েছে; অর্থাৎ হে মুহাম্মদ, আপনি বলুন: 'বরং আমিই বিস্ময় বোধ করেছি।' এমতাবস্থায় উভয় পাঠরীতির অর্থ অভিন্ন হয়ে যায়।

মাহদাবী বলেছেন: আল্লাহর নিজের পক্ষ থেকে বিস্ময়ের সংবাদ দেওয়াকে এভাবে ব্যাখ্যা করা বৈধ যে, যারা তাঁকে অস্বীকার করেছে তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ও অসন্তুষ্টি এমনভাবে প্রকাশ পেয়েছে যা সৃষ্টিজীবের বিস্ময়ের স্থলাভিষিক্ত। যেমনটি মহান আল্লাহ যাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁর প্রতি 'হাসি'র সংবাদ দেন; অর্থাৎ তিনি তাঁর সন্তুষ্টির মধ্য থেকে এমন কিছু প্রকাশ করেন যা সৃষ্টিজীবের হাসির স্থলাভিষিক্ত।