(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: -)
إرشاد النقاد إلى تيسير الاجتهاد القسم: أصول الفقه
الكتاب: إرشاد النقاد إلى تيسير الاجتهاد
المؤلف: محمد بن إسماعيل المعروف بالأمير الصنعاني (صاحب سبل السلام) (1099 - 1182 هـ)
قدم له وخرج نصوصه وعلق عليه: صلاح الدين مقبول أحمد
الناشر: الدار السلفية - الكويت
الطبعة: الأولى، 1405 هـ - 1985 م
عدد الصفحات: 183
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
ইশাদুল নুক্কাদ ইলা তাইসিরিল ইজতিহাদ (الاجتهاد) বিভাগ: উসুলুল ফিকহ (أصول الفقه)
গ্রন্থ: ইশাদুল নুক্কাদ ইলা তাইসিরিল ইজতিহাদ (الاجتهاد)
লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল, যিনি আমির আস-সানআনি নামে পরিচিত (সুবুলুস সালাম গ্রন্থের রচয়িতা) (১০৯৯ - ১১৮২ হিজরি)
ভূমিকা, মূলপাঠের সূত্র যাচাই (تخريج) ও টীকা প্রদান করেছেন: সালাহউদ্দীন মকবুল আহমদ
প্রকাশক: আদ-দারুস সালাফিয়্যাহ - কুয়েত
সংস্করণ: প্রথম، ১৪০৫ হিজরি - ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৮৩
[গ্রন্থের পৃষ্ঠা নম্বর মূল মুদ্রণকপির অনুরূপ]
শামেলায় প্রকাশের তারিখ: ৮ যিলহজ ১৪৩১
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৩)
مُقَدّمَة الْمُحَققبِسم الله الرَّحْمَن الرَّحِيم الِاجْتِهَاد إِن الْحَمد لله نحمده ونستعينه وَنَسْتَغْفِرهُ ونعوذ بِاللَّه من شرور أَنْفُسنَا وَمن سيئات أَعمالنَا من يهده الله فَلَا مضل لَهُ وَمن يضلل فَلَا هادي لَهُ وَأشْهد أَن لَا إِلَه إِلَّا الله وَحده لَا شريك لَهُ وَأشْهد أَن مُحَمَّد عَبده وَرَسُوله {يَا أَيهَا الَّذين آمنُوا اتَّقوا الله حق تُقَاته وَلَا تموتن إِلَّا وَأَنْتُم مُسلمُونَ} آل (عمرَان 102) {يَا أَيهَا النَّاس اتَّقوا ربكُم الَّذِي خَلقكُم من نفس وَاحِدَة وَخلق مِنْهَا زَوجهَا وَبث مِنْهُمَا رجَالًا كثيرا وَنسَاء وَاتَّقوا الله الَّذِي تساءلون بِهِ والأرحام إِن الله كَانَ عَلَيْكُم رقيبا} النِّسَاء 1 {يَا أَيهَا الَّذين آمنُوا اتَّقوا الله وَقُولُوا قولا سديدا يصلح لكم أَعمالكُم وَيغْفر لكم ذنوبكم وَمن يطع الله وَرَسُوله فقد فَازَ فوزا عَظِيما} الْأَحْزَاب 70 71 أما بعد فَإِن خير الحَدِيث كتاب الله وَخير الْهَدْي هدي مُحَمَّد صلى الله عليه وسلم وَشر الْأُمُور محدثاتها وكل محدثة بِدعَة وكل بِدعَة ضَلَالَة وكل ضَلَالَة فِي النَّار لقد قدر الله عز وجل لشريعة الْإِسْلَام خلودها وكفاءتها وصلاحيتها
মুহাক্কিকের (সম্পাদকের) ভূমিকাপরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। ইজতিহাদ (اجتهاد)। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের নফসের অনিষ্টতা এবং আমাদের মন্দ আমলসমূহ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই, আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তাকে পথ প্রদর্শনকারী কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসুল। {হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না} (আল ইমরান ১০২)। {হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর থেকে তাঁর জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁদের উভয় থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে যাচনা করো এবং রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হতে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন} (আন নিসা ১)। {হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমলসমূহ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করল} (আল আহজাব ৭০ ৭১)। অতঃপর, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম হাদিস হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভুদ বিষয়সমূহ (محدثات), আর প্রতিটি নবউদ্ভুদ বিষয়ই হলো বিদআত (بدعة), প্রতিটি বিদআত হলো পথভ্রষ্টতা (ضلالة) এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতা জাহান্নামে। মহান আল্লাহ ইসলামি শরীয়তের জন্য এর স্থায়িত্ব, পর্যাপ্ততা এবং উপযোগিতা নির্ধারণ করেছেন।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৪)
لكل زمَان وَمَكَان فَأوحى إِلَى عَبده وَرَسُوله مُحَمَّد بن عبد الله النَّبِي الْأُمِّي صلى الله عليه وسلم الْقُرْآن الْمجِيد ذَلِك الدستور الْكَامِل الخالد للبشرية جَمْعَاء قَائِلا {وَإنَّهُ لكتاب عَزِيز لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِل من بَين يَدَيْهِ وَلَا من خَلفه تَنْزِيل من حَكِيم حميد} فصلت 41 42 وَأمر رَسُوله ببيانه وَشَرحه حَيْثُ قَالَ {وأنزلنا إِلَيْك الذّكر لتبين للنَّاس مَا نزل إِلَيْهِم ولعلهم يتفكرون} النَّحْل 44 وَأوجب طَاعَة رَسُوله على الْأمة فِي كل مَا يَأْمر وَينْهى قَائِلا {وَمَا آتَاكُم الرَّسُول فَخُذُوهُ وَمَا نهاكم عَنهُ فَانْتَهوا وَاتَّقوا الله إِن الله شَدِيد الْعقَاب} الْحَشْر 7 فَجعل الله عز وجل كِتَابه الْكَرِيم مَعَ سنة نبيه صلى الله عليه وسلم الْمصدر الأساسي لِلْإِسْلَامِ فِي العقائد وَالْأَحْكَام والعبادات والمعاملات وَجَمِيع أُمُور المعاش والمعاد مَعَ هَذَا لم يهمل الله سبحانه وتعالى عقول هَذِه الْأمة الَّتِي أخرجت للنَّاس تَأمر بِالْمَعْرُوفِ وتنهى عَن الْمُنكر وتؤمن بِاللَّه وَلم يعطل مداركها وَلم يجمد أفكارها فَتكون متحيرة مشدوهة أَمَام الْمسَائِل الْجُزْئِيَّة الَّتِي تستجد مَعَ تغير الْعَصْر بل دَفعهَا إِلَى التفكير الدَّائِم فِي الْإِنْسَان والكون والحياة وحثها على الْعَمَل الدؤب لصالح الْأمة وَحملهَا على الِاجْتِهَاد المنشود لاستنباط الجزئيات المستحدثة من الكليات المقررة وَالْأُصُول الثَّابِتَة من الْكتاب وَالسّنة {وَإِذا جَاءَهُم أَمر من الْأَمْن أَو الْخَوْف أذاعوا بِهِ وَلَو ردُّوهُ إِلَى الرَّسُول وَإِلَى أولي الْأَمر مِنْهُم لعلمه الَّذين يستنبطونه مِنْهُم وَلَوْلَا فضل الله عَلَيْكُم وَرَحمته لاتبعتم الشَّيْطَان إِلَّا قَلِيلا} النِّسَاء 83 لما كَانَ إِعْمَال الْفِكر فِي نُصُوص الْكتاب وَالسّنة وَسِيلَة التعرف على الْأَحْكَام
প্রত্যেক কাল ও পাত্রের জন্য তিনি তাঁর বান্দা ও রাসূল, উম্মী নবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন মহিমান্বিত কুরআন—যা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ ও শাশ্বত জীবনবিধান। মহান আল্লাহ বলেন: {নিশ্চয় এটি এক পরাক্রমশালী কিতাব। এতে মিথ্যা প্রবেশ করতে পারে না—না সম্মুখ থেকে, আর না পেছন থেকে; এটি প্রজ্ঞাময়, চিরপ্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ} (ফুসসিলাত ৪১-৪২)। তিনি তাঁর রাসূলকে এর ব্যাখ্যা ও বিশদ বর্ণনার নির্দেশ দিয়ে বলেন: {আমি আপনার প্রতি যিকর অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের জন্য তা স্পষ্ট করে দেন যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে} (আন-নাহল ৪৪)। তিনি তাঁর রাসূল যা আদেশ করেন ও যা নিষেধ করেন, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর আনুগত্য করা উম্মতের জন্য আবশ্যক করে বলেছেন: {রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো; আর আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর} (আল-হাশর ৭)।
মহান আল্লাহ তাঁর সম্মানিত কিতাবকে তাঁর নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহর সাথে আকিদা, আহকাম (বিধান), ইবাদত, মুয়ামালাত (লেনদেন) এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সকল বিষয়ের মৌলিক উৎস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এর পাশাপাশি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই উম্মতের বিবেক-বুদ্ধিকে অবহেলা করেননি, যাদেরকে মানবজাতির কল্যাণে বের করা হয়েছে—যারা সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে। তিনি তাদের বোধশক্তিকে অকেজো করে দেননি এবং তাদের চিন্তাধারাকে স্থবির করে দেননি যাতে তারা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে উদ্ভূত নতুন নতুন খুঁটিনাটি সমস্যার সামনে বিভ্রান্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। বরং তিনি তাদের মানুষ, মহাবিশ্ব ও জীবন নিয়ে নিরন্তর চিন্তার প্রেরণা দিয়েছেন এবং উম্মতের কল্যাণে নিরলস কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি তাদের কুরআন ও সুন্নাহর সুনির্ধারিত মূলনীতি ও অটল ভিত্তিগুলো থেকে নতুন উদ্ভূত শাখা বিষয়গুলো উদ্ভাবনের জন্য কাঙ্ক্ষিত গবেষণার প্রতি ধাবিত করেছেন। {যখন তাদের কাছে শান্তি বা ভয়ের কোনো সংবাদ আসে, তখন তারা তা প্রচার করে দেয়। অথচ তারা যদি তা রাসূলের কাছে কিংবা তাদের উলুল আমরের (কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিবর্গের) কাছে পেশ করত, তবে তাদের মধ্যে যারা গবেষণার মাধ্যমে তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম, তারা অবশ্যই তার স্বরূপ অনুধাবন করতে পারত। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকলে অল্প কয়েকজন ছাড়া তোমরা সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে} (আন-নিসা ৮৩)। যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহর নস (মূল পাঠ) সমূহে চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করাই হলো বিধানাবলী জানার মাধ্যম...
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৫)
غير الْمَنْصُوص عَلَيْهَا وَكَانَ الِاجْتِهَاد طَرِيقا حتميا للوقوف على مرامي الشَّرِيعَة وسبيل الْحفاظ على خلودها وصلاحيتها ومرونتها فتح الْإِسْلَام بَاب الِاجْتِهَاد على مصراعيه إِلَى مَا شَاءَ الله أَمَام عُلَمَاء الْأمة الْأَكفاء البررة العاملين بِالْكتاب وَالسّنة وَذَلِكَ لتغطية حاجات النَّاس حسب تجدّد الْمصَالح وَتغَير الْأَعْرَاف وَتقدم الزَّمن فأحببنا أَن نقدم بَين يَدي كتاب إرشاد النقاد إِلَى تيسير الِاجْتِهَاد بحثا يتَعَلَّق بِهَذَا الْمَوْضُوع الْهَام وَهَذَا الْبَحْث يحتوي على بَابَيْنِ الأول حكم الإجتهاد فِي الْمسَائِل الْفِقْهِيَّة بعد الْأَئِمَّة الْأَرْبَعَة وَالثَّانِي حكم الإجتهاد فِي الحكم على الحَدِيث فِي الْأَعْصَار الْمُتَأَخِّرَة
যেসব বিষয় সুস্পষ্ট নস বা বর্ণনা বহির্ভূত (غير المنصوص عليها), সেখানে শরিয়তের লক্ষ্যসমূহ অনুধাবন এবং এর স্থায়িত্ব, উপযোগিতা ও নমনীয়তা বজায় রাখার জন্য ইজতিহাদ (اجتهاد) ছিল একটি অনিবার্য পথ। ইসলাম উম্মাহর যোগ্য, পুণ্যবান এবং কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমলকারী আলেমদের সামনে আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যাতে জনকল্যাণের নবায়ন, প্রথার বিবর্তন এবং সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা যায়। তাই আমরা ‘ইরশাদুন্নুক্কাদ ইলা তাইসিরিল ইজতিহাদ’ গ্রন্থের প্রারম্ভে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা উপস্থাপন করতে চেয়েছি। এই গবেষণাটি দুটি অধ্যায় সংবলিত; প্রথমটি হলো চার ইমামের পরবর্তী সময়ে ফিকহী মাসআলাসমূহে ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর বিধান এবং দ্বিতীয়টি হলো পরবর্তী যুগে হাদিসের মান নির্ণয়ের (الحكم على الحديث) ক্ষেত্রে ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর বিধান।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৭)
- صلى الله عليه وسلم َ - الْبَاب الأول حكم الإجتهاد فِي الْمسَائِل الْفِقْهِيَّة صلى الله عليه وسلم َ -
الإجتهاد فِي اللُّغَة الإجتهاد فِي اللُّغَة مَأْخُوذ من الْجهد بِفَتْح الْجِيم وَضمّهَا وَهُوَ الْمَشَقَّة والإجتهاد والتجاهد بذل الوسع والمجهود والتجاهد بذل الوسع كالإجتهاد وعَلى هَذَا يُقَال اجْتهد فِي الْأَمر أَي بذل وَسعه وطاقته فِي طلبه ليبلغ إِلَى نهايته سَوَاء كَانَ هَذَا الْأَمر من الْأُمُور الحسية كالمشي وَالْعَمَل أَو الْأُمُور المعنوية كاستخراج حكم أَو نظرية عقلية أَو شَرْعِيَّة أَو لغوية فَيُقَال بذل طاقته ووسعه فِي تَحْقِيق أَمر من الْأُمُور الَّتِي تَسْتَلْزِم كلفة أَو مشقة فَقَط وَلَا يُقَال اجْتهد فِي حمل قلم أَو كِتَابَة سطر أَو سطور عَمَّا لَيْسَ فِيهِ مشقة
الإجتهاد فِي اصْطِلَاح الْأُصُولِيِّينَ قد عرفه عُلَمَاء الْأُصُول بتعريفات تخْتَلف عباراتها وتتحد مَعَانِيهَا فِي
- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - প্রথম অধ্যায়: ফিকহি (فقهية) মাসআলাসমূহে ইজতিহাদ (إجتهاد)-এর বিধান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -
আভিধানিক অর্থে ইজতিহাদ (إجتهاد) আভিধানিক অর্থে ইজতিহাদ (إجتهاد) শব্দটি জীম বর্ণে ফাতহাহ (যবর) ও যম্মাহ (পেশ) উভয় যোগে পঠিত 'জুহদ' (الجهد) শব্দ থেকে গৃহীত, যার অর্থ হলো কষ্ট বা ক্লেশ (مشقة)। আর ইজতিহাদ (إجتهاد) ও তাজাহুদ (تجاهد) হলো সামর্থ্যের চূড়ান্ত ব্যয় (بذل الوسع); মাজহুদ (المجهود) ও তাজাহুদ (التجاهد) শব্দদ্বয়ও ইজতিহাদ (إجتهاد)-এর ন্যায় সামর্থ্য ব্যয় করা অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর ওপর ভিত্তি করেই বলা হয়: 'সে কোনো বিষয়ে ইজতিহাদ (اجتهد) করেছে', অর্থাৎ সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিজের সাধ্য ও সামর্থ্য বিলিয়ে দিয়েছে যাতে তার শেষ সীমায় পৌঁছানো যায়। চাই বিষয়টি বাহ্যিক কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় হোক যেমন হাঁটা বা কাজ করা, অথবা কোনো তাত্ত্বিক বিষয় হোক যেমন কোনো বিধান বা হুকুম (حكم) আহরণ করা, কিংবা কোনো আকলি বা বুদ্ধিভিত্তিক (عقلية), শরয়ি (شرعية) বা ভাষাগত মতবাদ বিশ্লেষণ করা। সুতরাং কেবল সেই সব বিষয় বাস্তবায়নে সাধ্য ও সামর্থ্য ব্যয় করার ক্ষেত্রেই এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় যেগুলোতে শ্রম বা কষ্ট (مشقة) রয়েছে। কিন্তু একটি কলম বহন করা অথবা এক বা একাধিক লাইন লেখার মতো সহজ কাজ যাতে কোনো কষ্ট (مشقة) নেই, সে ক্ষেত্রে ইজতিহাদ (اجتهد) করেছে বলা হয় না।
উসুলশাস্ত্রবিদদের (الأصوليين) পরিভাষায় ইজতিহাদ (إجتهاد) উসুল (أصول) শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এর এমন কিছু সংজ্ঞা প্রদান করেছেন যেগুলোর শব্দবিন্যাস ভিন্ন হলেও অর্থগুলো অভিন্ন নিম্নোক্ত বিষয়ে যে—
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৮)
الْجُمْلَة ومغزاها فِيمَا يَلِي الإجتهاد هُوَ استفراغ الوسع وبذل المجهود فِي طلب الحكم الشَّرْعِيّ عقليا كَانَ أَو نقليا قَطْعِيا كَانَ أَو ظنيا على وَجه يحس من النَّفس الْعَجز عَن الْمَزِيد عَلَيْهِ
شُرُوط الإجتهاد إِن شُرُوط الإجتهاد الَّتِي قررها الأصوليون فِيهَا بعض الِاخْتِلَاف من حَيْثُ الزِّيَادَة وَالنُّقْصَان وَيُمكن لنا أَن نقسم هَذِه الشُّرُوط قسمَيْنِ حَتَّى يحتويا كل مَا ذكر فِيهَا بالإيجاز الْقسم الأول الشُّرُوط الْعَامَّة شُرُوط التَّكْلِيف وَهِي 1 الْإِسْلَام 2 الْبلُوغ 3 الْعقل
সারসংক্ষেপ এবং এর তাৎপর্য নিম্নরূপ: ইজতিহাদ (اجتهاد) হলো কোনো শরয়ি বিধান (الحكم الشرعي) অন্বেষণে নিজের পূর্ণ সামর্থ্য ও প্রচেষ্টা ব্যয় করা; চাই তা যুক্তিভিত্তিক (عقلي) হোক কিংবা বর্ণনাভিত্তিক (نقلي), সুনিশ্চিত (قطعي) হোক কিংবা ধারণাপ্রসূত (ظني), এমন পর্যায়ে পৌঁছানো যেন নিজের মধ্যে এর অতিরিক্ত আর কিছু করার অক্ষমতা অনুভূত হয়।
ইজতিহাদের শর্তাবলি (شروط الاجتهاد) উসুলবিদগণ (الأصوليون) ইজতিহাদের যে সকল শর্তাবলি নির্ধারণ করেছেন, তাতে সংযোজন ও বিয়োজনের দিক থেকে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। বর্ণিত সকল বিষয়কে সংক্ষেপে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা এই শর্তাবলিকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে পারি। প্রথম ভাগ: সাধারণ শর্তাবলি তথা শরয়ি দায়িত্বারোপের শর্তাবলি (شروط التكليف); আর সেগুলো হলো: ১. ইসলাম, ২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (البلوغ) এবং ৩. জ্ঞান বা আকল (العقل)।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৯)
الْقسم الثَّانِي الشُّرُوط التأهيلية وَهِي تتنوع إِلَى نَوْعَيْنِ الأول الشُّرُوط الأساسية وَهِي 1 معرفَة الْكتاب 2 معرفَة السّنة 3 معرفَة اللُّغَة 4 معرفَة أصُول الْفِقْه 5 معرفَة مَوَاضِع الْإِجْمَاع الثَّانِي الشُّرُوط التكميلية وَهِي 1 معرفَة الْبَرَاءَة الْأَصْلِيَّة 2 معرفَة مَقَاصِد الشَّرِيعَة
দ্বিতীয় বিভাগ: যোগ্যতাসূচক শর্তাবলি (الشروط التأهيلية), যা দুই ভাগে বিভক্ত; প্রথমটি হলো মৌলিক শর্তাবলি (الشروط الأساسية), আর তা হলো: ১. কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান ২. সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান ৩. ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান ৪. উসুল আল-ফিকহ (أصول الفقه) সম্পর্কে জ্ঞান ৫. ঐক্যমত (الإجماع)-এর ক্ষেত্রসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান। দ্বিতীয়টি হলো পরিপূরক শর্তাবলি (الشروط التكميلية), আর তা হলো: ১. মূল দায়মুক্তি (البراءة الأصلية) সম্পর্কে জ্ঞান ২. শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহ (مقاصد الشريعة) সম্পর্কে জ্ঞান।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১০)
3 - معرفَة الْقَوَاعِد الْكُلية 4 معرفَة مَوَاضِع الْخلاف 5 الْعلم بِالْعرْفِ الْجَارِي فِي الْبَلَد 6 معرفَة الْمنطق 7 عَدَالَة الْمُجْتَهد وصلاحه 8 حسن الطَّرِيقَة وسلامة المسلك 9 الْوَرع والعفة 10 رصانة الْفِكر وجودة الملاحظة 11 الإفتقار إِلَى الله تَعَالَى والتوجه إِلَيْهِ بِالدُّعَاءِ 12 ثقته بِنَفسِهِ وَشَهَادَة النَّاس لَهُ بالأهلية 13 مُوَافقَة عمله مُقْتَضى قَوْله
৩ - সমষ্টিক নিয়মাবলী (القواعد الكلية) সম্পর্কে জ্ঞান ৪. মতভেদের ক্ষেত্রসমূহ (مواضع الخلاف) সম্পর্কে জ্ঞান ৫. জনপদে প্রচলিত প্রথা (العرف) সম্পর্কে জ্ঞান ৬. যুক্তিবিদ্যা (المنطق) সম্পর্কে জ্ঞান ৭. মুজতাহিদের (المجتهد) ন্যায়পরায়ণতা (عدالة) ও তাঁর সততা ৮. পদ্ধতির উৎকর্ষ ও সঠিক কর্মপন্থা ৯. খোদাভীতি (الورع) ও চারিত্রিক পবিত্রতা ১০. চিন্তার গভীরতা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ১১. মহান আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা এবং দোয়ার মাধ্যমে তাঁর অভিমুখী হওয়া ১২. নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং যোগ্যতা (الأهلية) সম্পর্কে মানুষের সাক্ষ্য ১৩. তাঁর কথা ও কাজের মধ্যকার সামঞ্জস্য।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১১)
أهمية الإجتهاد إِن الإجتهاد فِي الْإِسْلَام أقوى دَلِيل على أَن ديننَا الحنيف هُوَ الدّين الشَّامِل الخالد الوحيد الَّذِي يُسَايِر ركب الحضارة الإنسانية عبر العصور والأجيال ويرحب بِكُل التغيرات الطارئة والمشاكل الناجمة من تجدّد الظروف والمصالح على اخْتِلَاف المجتمعات الإنسانية فِي مَشَارِق الأَرْض وَمَغَارِبهَا ويعرض لَهَا حلولا مُنَاسبَة فِي ضوء الْأَحْكَام الْكُلية وَالْأُصُول الثَّابِتَة من الْكتاب وَالسّنة
الإجتهاد منحة إلهية مستمرة إِن مسَائِل الْعَصْر تتجد ووقائع الْوُجُود لَا تَنْحَصِر ونصوص الْكتاب وَالسّنة محصورة محدودة فَكَانَ الإجتهاد فِي الْأُمُور المستحدثة حَاجَة إسلامية ملحة لمسايرة ركب الْحَيَاة الإنسانية تَلْبِيَة لهَذِهِ الْحَاجة قد قَامَ الصَّحَابَة رضي الله عنهم وَمن بعدهمْ من التَّابِعين وأتباعهم وأئمة الْإِسْلَام وفقهاء الْأمة بالإجتهاد فِي الْمسَائِل المستجدة فِي عصورهم وَصَارَ الإجتهاد منحة ربانية مستمرة يتمتع بهَا الْمُسلمُونَ بجهود الْمُجْتَهدين الْأَكفاء فِي كل زمَان وَمَكَان وَلم تكن خَاصَّة بعصر دون عصر وبمصر دون مصر حَتَّى يفهم ونعوذ بِاللَّه تَعَالَى أَن رَحْمَة الله عز وجل صَارَت عقيمة بعد ذَلِك وانقطعت عَن الْعلمَاء الْمُتَأَخِّرين المتأهلين وَلَا شكّ أَن هَذَا الإعتقاد بإنتهاء الإجتهاد والمجتهدين تحجر رَحْمَة الله الواسعة وَحكم على قدره وقضائه بِدُونِ علم يشبه بصيحة فِي وَاد وَنفخ فِي رماد أَمَام قَول الله عز وجل {وَآخَرين مِنْهُم لما يلْحقُوا بهم وَهُوَ الْعَزِيز الْحَكِيم ذَلِك فضل الله يؤتيه من يَشَاء وَالله ذُو الْفضل الْعَظِيم} الْجُمُعَة 2 3
ইজতিহাদের গুরুত্ব ইসলামে ইজতিহাদ হলো এই প্রসঙ্গের বলিষ্ঠতম প্রমাণ যে, আমাদের এই সত্যনিষ্ঠ দ্বীনই একমাত্র ব্যাপক ও চিরস্থায়ী জীবনব্যবস্থা, যা যুগে যুগে মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে চলে এবং পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিভিন্ন মানব সমাজে অবস্থা ও স্বার্থের পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত সকল নতুন পরিবর্তন ও সমস্যাকে স্বাগত জানায়; আর কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক বিধান ও অপরিবর্তনীয় মূলনীতির আলোকে সেগুলোর যথোপযুক্ত সমাধান পেশ করে।
ইজতিহাদ একটি নিরন্তর ঐশী দান যুগের মাসআলাসমূহ প্রতিনিয়ত নতুনভাবে আবির্ভূত হয় এবং বাস্তব জগতের ঘটনাবলী অসীম, অথচ কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যসমূহ (نصوص) সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট। তাই মানবজীবনের অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে নতুন উদ্ভূত বিষয়সমূহে ইজতিহাদ করা একটি জরুরি ইসলামি প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রয়োজনীয়তা পূরণে সাহাবীগণ (صحابة) (রাদিয়াল্লাহু আনহুম), তাঁদের পরবর্তী তাবিঈগণ (تابعين), তাঁদের অনুসারী তাবি-তাবিঈগণ (أتباع التابعين), ইসলামের ইমামগণ এবং উম্মাহর ফকিহগণ নিজ নিজ যুগে উদ্ভূত মাসআলাসমূহে ইজতিহাদ করেছেন। ফলে ইজতিহাদ একটি নিরন্তর ঐশী দানে পরিণত হয়েছে, যা থেকে মুসলমানগণ প্রতি যুগে ও স্থানে যোগ্য মুজতাহিদগণ (مجتهدين)-এর প্রচেষ্টার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে। এটি নির্দিষ্ট কোনো যুগে বা নির্দিষ্ট কোনো জনপদে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমরা মহান আল্লাহর কাছে পানাহ চাই এই ধারণা থেকে যে, আল্লাহর রহমত এরপর বন্ধ হয়ে গেছে এবং পরবর্তী সময়ের যোগ্য আলেমদের থেকে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিঃসন্দেহে ইজতিহাদ ও মুজতাহিদগণ (مجتهدين)-এর সমাপ্তি ঘটেছে বলে বিশ্বাস করা মহান আল্লাহর প্রশস্ত রহমতকে সংকুচিত করার নামান্তর। আর জ্ঞান ছাড়াই তাঁর তাকদির ও ফয়সালার ওপর এমন রায় প্রদান করা যেন জনশূন্য প্রান্তরে চিৎকার করা কিংবা ছাইয়ের মধ্যে ফুঁ দেওয়ার মতো; অথচ মহান আল্লাহর বাণী হলো: "এবং তাদের মধ্য হতে অন্যদের জন্যও (রাসূলকে পাঠানো হয়েছে), যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।" (সূরা আল-জুমুআ: ২-৩)।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১২)
وَعَن أنس بن مَالك رضي الله عنه أَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ مثل أمتِي مثل الْمَطَر لَا يدرى أَوله خير أم آخِره هَذَا وَلَا يسوغ لأحد أَن يَدعِي أَن الْأَئِمَّة الْمُجْتَهدين الْمُتَقَدِّمين استوعبوا كل مَا هُوَ كَائِن إِلَى يَوْم الْقِيَامَة لِأَن اسْتِيعَاب مَا كَانَ وَمَا يكون من صِفَات الله عز وجل الَّتِي لَا يُشَارِكهُ فِيهَا أحد غَيره {وَعِنْده مفاتح الْغَيْب لَا يعلمهَا إِلَّا هُوَ وَيعلم مَا فِي الْبر وَالْبَحْر وَمَا تسْقط من ورقة إِلَّا يعلمهَا وَلَا حَبَّة فِي ظلمات الأَرْض وَلَا رطب وَلَا يَابِس إِلَّا فِي كتاب مُبين} الْأَنْعَام 59 وَلأَجل هَذَا لم يكن الصَّحَابَة وَمن بعدهمْ يجتهدون فِي الْمسَائِل الخيالية بل كَانُوا يكْرهُونَ الْكَلَام فِيمَا لم يَقع ويمتنعون من الْإِجَابَة عَن الإفتراضات عَن مَسْرُوق بن الأجدع قَالَ سَأَلت أبي بن كَعْب عَن شَيْء فَقَالَ أَكَانَ بعد قلت لَا قَالَ فاصبر حَتَّى يكون فَإِن كَانَ اجتهدنا لَك رَأينَا وَعَن عمر بن الْخطاب رضي الله عنه قَالَ إيَّاكُمْ وَهَذِه العضل فَإِنَّهَا إِذا نزلت بعث الله لَهَا من يقيمها ويفسرها
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা.) বলেছেন: "আমার উম্মতের উদাহরণ বৃষ্টির ন্যায়; জানা যায় না যে এর প্রথমাংশ অধিক কল্যাণকর নাকি শেষাংশ।" এমতাবস্থায় কারো জন্য এটা দাবি করা সংগত নয় যে, পূর্ববর্তী মুজতাহিদ (مجتهد) ইমামগণ কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিতব্য সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছেন। কারণ যা কিছু হয়েছে এবং যা কিছু হবে, তার সর্বাঙ্গীণ জ্ঞান হলো মহান আল্লাহর বিশেষ গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত, যাতে অন্য কেউ তাঁর অংশীদার নয়। (যেমন ইরশাদ হয়েছে:) "আর তাঁর নিকটই রয়েছে অদৃশ্যের চাবিকাঠি, তিনি ব্যতীত আর কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রের যা কিছু আছে, তা তিনিই জানেন। কোনো পাতা ঝরে না কিন্তু তিনি তা জানেন এবং মাটির অন্ধকারে কোনো দানা কিংবা কোনো আর্দ্র বা শুষ্ক বস্তু নেই যা একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই।" [সুরা আল-আন'আম: ৫৯]
এই কারণেই সাহাবীগণ এবং তাঁদের পরবর্তীগণ কাল্পনিক মাসআলাসমূহে ইজতিহাদ (اجتهاد) করতেন না; বরং যা এখনো সংঘটিত হয়নি সে বিষয়ে আলোচনা করা তাঁরা অপছন্দ করতেন এবং কাল্পনিক প্রশ্নাবলির উত্তর প্রদান থেকে বিরত থাকতেন। মাসরুক ইবনুল আজদা' থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে কোনো একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, "তা কি ইতিমধ্যে ঘটেছে?" আমি উত্তর দিলাম, "না।" তিনি বললেন, "তবে তা ঘটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। কেননা যখন তা ঘটবে, তখন আমরা তোমাদের জন্য আমাদের রায় (رأي) অনুযায়ী ইজতিহাদ (اجتهاد) করব।" উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, "তোমরা এসব জটিল মাসআলা (العضل) থেকে বেঁচে থাকো। কারণ যখন এগুলো আপতিত হবে, আল্লাহ তখন এমন কাউকে পাঠাবেন যিনি এগুলো সমাধান ও ব্যাখ্যা করবেন।"
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৩)
كل هَذَا التوقي من الْكَلَام فِي الإفتراضات كَانَ إِيمَانًا بِأَن الجهود الإنسانية مهما بذلت فِي تدوين الْمسَائِل الخيالية والوقائع الْفَرْضِيَّة لَا تستوعبها وَأما عِنْد وُقُوعهَا فَالله الْقَادِر الْقَدِير عَالم الْغَيْب وَالشَّهَادَة يقيض من يحلهَا ويجتهد فِيهَا
مدى حريَّة التفكير والإجتهاد عِنْد الْأَئِمَّة وَاخْتِلَاف أَصْحَابهم مَعَهم إِن الْأَئِمَّة رحمهم الله كَانُوا يبذلون أقْصَى جهودهم للوصول إِلَى الْحق فِي الْمسَائِل الإجتهادية وَمَعَ هَذَا لم يَكُونُوا يقطعون بِأَن إجتهادهم هُوَ مسك الختام وَالْأَمر الآخر الَّذِي لَا يجوز خِلَافه قطعا بل كَانُوا يحتاطون احْتِيَاطًا لَازِما عِنْد إبداء آرائهم فِي الْمسَائِل وَيَخَافُونَ فِي ذَلِك مُخَالفَة النُّصُوص الصَّرِيحَة من الْكتاب وَالسّنة وَلأَجل هَذَا نصوا على الرُّجُوع إِلَى السّنة عِنْد ظُهُور مخالفتهم إِيَّاهَا وأوصوا تلاميذهم وأصحابهم بترك أَقْوَالهم الْمُخَالفَة لَهَا وَهِي مستفيضة فِي مَكَانهَا
কাল্পনিক এবং সম্ভাব্য ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে মানবিক প্রচেষ্টা যতই ব্যয় করা হোক না কেন, তা কখনোই সেগুলোকে পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারবে না—এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই সম্ভাব্য বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এমন সতর্কতা অবলম্বন করা হতো। তবে যখন তা বাস্তবে সংঘটিত হবে, তখন দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞাতা সর্বশক্তিমান আল্লাহ এমন কাউকে নির্দিষ্ট করে দেবেন, যিনি এর সমাধান করবেন এবং এ বিষয়ে গবেষণা/স্বাধীন বিচারবুদ্ধি (إجتهاد) প্রয়োগ করবেন।
আইম্মাহগণের নিকট চিন্তা ও গবেষণা/স্বাধীন বিচারবুদ্ধি (إجتهاد)-এর স্বাধীনতার পরিধি এবং তাঁদের সাথে তাঁদের অনুসারীদের মতপার্থক্য নিশ্চয়ই আইম্মাহগণ (আল্লাহ তাঁদের ওপর রহম করুন) গবেষণালব্ধ (إجتهادية) মাসআলাসমূহে সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য তাঁদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করতেন। এতদসত্ত্বেও তাঁরা এই অটল সিদ্ধান্ত দিতেন না যে, তাঁদের এই গবেষণা/স্বাধীন বিচারবুদ্ধিই (إجتهاد) চূড়ান্ত এবং এর বিরুদ্ধাচরণ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। বরং তাঁরা মাসআলাসমূহে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করার সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং এক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের (نصوص) বিপরীতে যাওয়ার ভয় পোষণ করতেন। এ কারণেই তাঁরা তাঁদের মতের বিপরীতে সুন্নাহর সুস্পষ্টতা প্রকাশ পেলে সুন্নাহর দিকেই ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের ছাত্র ও অনুসারীদের অসিয়ত করেছেন তাঁদের সেই সব বক্তব্য বর্জন করতে যা সুন্নাহর পরিপন্থী। এই বিষয়বস্তুর বর্ণনাগুলো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সুপ্রসিদ্ধ (مستفيضة)।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৪)
وَكَذَلِكَ لَا يتَصَوَّر أَن إِمَامًا من الْأَئِمَّة الْأَعْلَام مهما بلغ من الْعلم وَالْحِفْظ والضبط والإتقان وَالْفضل والوجاهة يسْتَقلّ بالحكم على الشَّيْء ويستبد بِرَأْيهِ ويفرضه على الآخرين فرضا قَالَ الله عز وجل {نرفع دَرَجَات من نشَاء وَفَوق كل ذِي علم عليم} يُوسُف 76 {وَقَالَ} {قل الرّوح من أَمر رَبِّي وَمَا أُوتِيتُمْ من الْعلم إِلَّا قَلِيلا} الْإِسْرَاء 85 وَإِنِّي أعتقد وأدين بِأَن الْأَئِمَّة كَانُوا أبعد من أَن يتصفوا بِهَذِهِ الصّفة الكريهة من الاستبداد بِالرَّأْيِ وفرضه على الآخرين وَكَانُوا يدورون حَيْثُ دَار الْحق بِكُل أَمَانَة وإخلاص فَالْحق لَيْسَ محصورا فِي رَأْي أحد قطعا إِلَّا النَّبِي الْمَعْصُوم صلى الله عليه وسلم وَمَا أحسن مَا ورد عَن الإِمَام أبي حنيفَة من قَوْله عِنْد الْإِفْتَاء هَذَا رَأْي النُّعْمَان بن ثَابت يَعْنِي نَفسه وَهُوَ أحسن مَا قدرت عَلَيْهِ فَمن جَاءَ بِأَحْسَن مِنْهُ فَهُوَ أولى بِالصَّوَابِ وَنقل عَن الإِمَام الشَّافِعِي أَنه قَالَ مَا ناظرت أحدا إِلَّا قلت اللَّهُمَّ أجر الْحق على قلبه وَلسَانه فَإِن كَانَ الْحق معي اتبعني وَإِن كَانَ الْحق مَعَه اتبعته انطلاقا من هَذَا المبدأ الْعَادِل من حريَّة التفكير وَتَقْدِير رَأْي الآخرين اخْتلفت الْأَئِمَّة فِيمَا بَينهم فِي الْأُصُول وَاخْتلف أَصْحَابهم مَعَهم أَيْضا فِي الْأُصُول كَمَا اخْتلفُوا مَعَهم فِي الْفُرُوع
তেমনিভাবে এটি কল্পনাও করা যায় না যে, শ্রেষ্ঠ ইমামগণের মধ্য থেকে কোনো একজন ইমাম, ইলম (জ্ঞান), মুখস্থশক্তি (الحفظ), নির্ভুলতা (الضبط), পারদর্শিতা (الإتقان), মর্যাদা ও সম্মানে তিনি যে উচ্চ শিখরেই অবস্থান করুন না কেন, কোনো বিষয়ের ওপর এককভাবে হুকুম প্রদান করবেন কিংবা স্বীয় মতের ওপর একগুঁয়েমি করবেন এবং তা অন্যদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেবেন। আল্লাহ মহান ও পরাক্রমশালী ইরশাদ করেছেন: {আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি, আর প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপরেই রয়েছেন একজন মহাজ্ঞানী} (ইউসুফ: ৭৬)। তিনি আরও ইরশাদ করেছেন: {বলুন, রূহ আমার পালনকর্তার আদেশঘটিত এবং তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে} (বনী ইসরাঈল: ৮৫)। আর আমি বিশ্বাস করি এবং দ্বীনদারির সাথে এটি পোষণ করি যে, ইমামগণ নিজেদের রায়ের ব্যাপারে একগুঁয়ে হওয়া এবং তা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মতো এই ঘৃণ্য বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাঁরা পরম বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সাথে সর্বদা সত্যের অনুগামী হতেন, সত্য যেখানেই থাকুক না কেন। কেননা সত্য কোনোভাবেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, একমাত্র নিষ্পাপ (المعصوم) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া। ইমাম আবু হানিফা থেকে ফতোয়া প্রদানের সময় বর্ণিত তাঁর এই উক্তিটি কতই না চমৎকার! তিনি বলতেন, "এটি নুমান ইবনে সাবিতের (অর্থাৎ তাঁর নিজের) মতামত এবং এটিই আমার সাধ্যানুযায়ী সর্বোত্তম রায়। সুতরাং যে ব্যক্তি এর চেয়ে উত্তম কোনো রায় নিয়ে আসবে, তবে সেটিই সঠিক হওয়ার জন্য অধিক যোগ্য হবে।" ইমাম শাফেয়ী থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, "আমি যখনই কারো সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছি, তখনই বলেছি: হে আল্লাহ! আপনি তার হৃদয়ে ও জিহবায় সত্য জারি করে দিন। অতঃপর সত্য যদি আমার সাথে থাকে তবে সে যেন আমার অনুসরণ করে, আর সত্য যদি তার সাথে থাকে তবে আমি যেন তার অনুসরণ করি।" চিন্তার স্বাধীনতা এবং অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এই ন্যায়নিষ্ঠ নীতির ওপর ভিত্তি করেই ইমামগণ নিজেদের মধ্যে মূলনীতি (الأصول) সমূহের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং তাঁদের অনুসারীগণও তাঁদের সাথে মূলনীতি (الأصول) সমূহের ক্ষেত্রে যেমন ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তেমনি শাখা-প্রশাখা (الفروع) সংক্রান্ত বিষয়াবলির ক্ষেত্রেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৫)
فقد اخْتلف أَبُو يُوسُف وَمُحَمّد بن الْحسن الشَّيْبَانِيّ مَعَ شيخهما الإِمَام أبي حنيفَة حَتَّى فِي الْأُصُول قَالَ السُّبْكِيّ فَإِنَّهُمَا يخالفان أصُول صَاحبهمَا وَقَالَ ابْن خلكان فِي تَرْجَمَة أبي يُوسُف كَانَ الْغَالِب عَلَيْهِ مَذْهَب أبي حنيفَة وَخَالفهُ فِي مَوَاضِع كَثِيرَة وَقَالَ إِمَام الْحَرَمَيْنِ الْجُوَيْنِيّ استنكف مُحَمَّد بن الْحسن وَأَبُو يُوسُف عَن مُتَابَعَته فِي ثُلثي مذْهبه ووافقا الشَّافِعِي رحمهم الله فِي أَكثر الْمسَائِل وَقَالَ السُّيُوطِيّ وَكَذَلِكَ ابْن وهب وَابْن الْمَاجشون والمغيرة بن أبي حَازِم ومطرف بن كنَانَة لم يقلدوا شيخهم مَالِكًا فِي كل مَا قَالَ بل خالفوه فِي مَوَاضِع واختاروا غير قَوْله وَكَذَلِكَ القَوْل فِي الْمُزنِيّ وَأبي عبيد بن حربويه وَابْن خُزَيْمَة وَابْن سُرَيج فَإِن كلا مِنْهُم خَالف إِمَامه فِي أَشْيَاء وَاخْتَارَ مِنْهَا غير قَوْله يَتَّضِح من هَذَا أَن اجْتِهَاد الْمُجْتَهد ورأيه لَا يُمكن أَن يكون بِمَثَابَة حكم الله عز وجل وَلَو كَانَ كَذَلِك لما سَاغَ لأَصْحَاب الْأَئِمَّة أَن يخالفوا آراء شيوخهم
নিশ্চয়ই আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী তাঁদের উস্তাদ ইমাম আবু হানিফার সাথে এমনকি মৌলিক নীতিমালা (الأصول)-এর ক্ষেত্রেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন। আস-সুবকী বলেন, তাঁরা উভয়ে তাঁদের সঙ্গীর মৌলিক নীতিমালার (أصول) বিরোধিতা করতেন। ইবনে খাল্লিকান আবু ইউসুফের জীবনী (ترجمة) আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর ওপর আবু হানিফার মাযহাবের প্রভাব প্রবল ছিল, তবে তিনি বহু ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করেছেন। ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী বলেন, মুহাম্মদ ইবনুল হাসান এবং আবু ইউসুফ তাঁর মাযহাবের দুই-তৃতীয়াংশ বিষয়ে তাঁকে অনুসরণ করা থেকে বিরত থেকেছেন এবং অধিকাংশ মাসআলায় তাঁরা শাফিঈ-এর সাথে একমত হয়েছেন—আল্লাহ তাঁদের সকলের ওপর রহম করুন। আস-সুয়ুতী বলেন, অনুরূপভাবে ইবনে ওয়াহাব, ইবনুল মাজিশুন, মুগীরাহ ইবনে আবু হাযিম এবং মুতাররিফ ইবনে কিনানাহ তাঁদের উস্তাদ মালিককে প্রতিটি কথায় অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর মতের বাইরে ভিন্ন মত গ্রহণ করেছেন। আল-মুযানী, আবু উবাইদ ইবনে হারবুয়াহ, ইবনে খুযায়মাহ এবং ইবনে সুরাইজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনুরূপ; কেননা তাঁদের প্রত্যেকেই বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের ইমামের বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর মতের পরিবর্তে অন্য মতকে বেছে নিয়েছেন। এ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, কোনো একজন মুজতাহিদ (مجتهد)-এর ইজতিহাদ (اجتهاد) এবং তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত মহান আল্লাহর বিধানের সমতুল্য হতে পারে না। যদি বিষয়টি এমন হতো, তবে ইমামদের বিশিষ্ট অনুসারীগণের জন্য তাঁদের উস্তাদদের মতামতের বিরোধিতা করা বৈধ হতো না।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৬)
وَهَكَذَا كَانَ الْفِقْه الإسلامي فِي الْقُرُون الْمَشْهُود لَهَا بِالْخَيرِ فِي ازدهار مُسْتَمر ونمو متواصل وَتقدم دَائِم وَكَانَت اجتهادات الْأَئِمَّة بَين الْأَخْذ وَالعطَاء وَالرَّدّ وَالْقَبُول حَتَّى فِي أوساط أَصْحَابهم إِلَى أَن فَشَا التَّقْلِيد فِي نصف الْقرن الرَّابِع وَبَدَأَ التعصب المذهبي يبيض ويفرخ ويصور الْحَكِيم ولي الله الدهلوي مَا حدث فِي النَّاس بعد الْمِائَة الرَّابِعَة قَائِلا وَلم يَأْتِ قرن بعد ذَلِك إِلَّا وَهُوَ أَكثر فتْنَة وأوفر تقليدا وَأَشد انتزاعا للأمانة من صُدُور الرِّجَال حَتَّى اطمأنوا بترك الْخَوْض فِي أَمر الدّين وَبِأَن يَقُولُوا {إِنَّا وجدنَا آبَاءَنَا على أمة وَإِنَّا على آثَارهم مقتدون} الزخرف 22 وَإِلَى الله المشتكى وَهُوَ الْمُسْتَعَان وَبِه الثِّقَة وَعَلِيهِ التكلان
بَاب محزن من تأريخ الْمذَاهب الْفِقْهِيَّة نظرة على كتب الْمذَاهب الْفِقْهِيَّة وسير الْأَئِمَّة المتبوعين وكتابات عُلَمَاء الْمذَاهب لتقويم مذاهبهم وترجيحها على الْمذَاهب الْأُخْرَى تكشف مَا بَينهَا من أحقاد متأصلة واتهامات متبادلة وحروب متطاولة وهجمات عنيفة حَتَّى على الْأَئِمَّة وَحط أقدارهم وتسفيه آرائهم مَا يَجْعَل الْإِنْسَان الْمُسلم الْمنصف الْعَادِل يتَيَقَّن أَن قَول مقلدة الْمذَاهب الشَّائِع بَينهم إِن الْمذَاهب كلهَا حق وعَلى الصَّوَاب من الدعاوي الْمُجَرَّدَة الَّتِي لَا دَلِيل عَلَيْهَا وَالْوَاقِع التأريخي يصدق ذَلِك مُنْذُ نشوء التعصب الْأَعْمَى للمذاهب حَتَّى يَوْمنَا هَذَا وإليكم بعض الْأَدِلَّة على مَا قُلْنَاهُ على سَبِيل الْمِثَال لَا الْحصْر
1 -
كل حزب بِمَا لديهم فَرِحُونَ كل من مقلدة الْمذَاهب يَدعِي أَن الْحق مَا هُوَ عَلَيْهِ وَمَا عَلَيْهِ غَيره فَبَاطِل وجوبا
এভাবেই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্যপ্রাপ্ত শতাব্দীগুলোতে ইসলামি ফিকহ নিরন্তর সমৃদ্ধি, অব্যাহত প্রবৃদ্ধি এবং স্থায়ী অগ্রগতির পথে ছিল। এমনকি ইমামগণের ইজতিহাদসমূহ গ্রহণ ও বর্জন এবং খণ্ডন ও গ্রহণের দোলাচলে ছিল, এমনকি তাঁদের অনুসারীদের মধ্যেও। এই ধারা চতুর্থ হিজরি শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাকলিদ ছড়িয়ে পড়া এবং মাযহাবী গোঁড়ামি ডালপালা বিস্তার করা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। হাকিম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি চতুর্থ শতাব্দীর পরে মানুষের মধ্যে যা ঘটেছিল তার চিত্রায়ন করতে গিয়ে বলেন: "এরপর এমন কোনো শতাব্দী আসেনি যা পূর্বের চেয়ে অধিক ফিতনাপূর্ণ, অধিক তাকলিদ নির্ভর এবং মানুষের অন্তর থেকে আমানত ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিক কঠোর ছিল না। এমনকি তারা দ্বীনের বিষয়ে গবেষণাকে বর্জন করে এবং এ কথা বলে আশ্বস্ত হতে লাগল যে, {আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এক আদর্শের ওপর পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি} [সূরা যুখরুফ: ২২]।" আল্লাহর কাছেই সব অভিযোগ, তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী, তাঁর ওপরেই নির্ভরযোগ্যতা (الثقة) এবং তাঁর ওপরই ভরসা।
ফিকহি মাযহাবসমূহের ইতিহাসের একটি দুঃখজনক অধ্যায় ফিকহি মাযহাবসমূহের কিতাবাদি, অনুসরণীয় ইমামগণের জীবনী এবং নিজ মাযহাবের মূল্যায়ন ও অন্য মাযহাবের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য মাযহাবী আলেমদের লেখাগুলোর ওপর এক পলক দৃষ্টি দিলে তাদের মধ্যকার বদ্ধমূল বিদ্বেষ, পারস্পরিক অভিযোগ, দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ এবং ইমামদের ওপরও তীব্র আক্রমণ, তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং তাঁদের মতামতের তুচ্ছজ্ঞান করার বিষয়টি উন্মোচিত হয়। যা একজন ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফগার মুসলিমকে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে যে, মাযহাবের অন্ধ অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত এই দাবি যে 'সকল মাযহাবই সত্য ও সঠিক পথের ওপর রয়েছে'—তা একটি অন্তঃসারশূন্য দাবি যার কোনো প্রমাণ নেই। ঐতিহাসিক বাস্তবতা মাযহাবী অন্ধ গোঁড়ামির উদ্ভব থেকে আজ পর্যন্ত এই সত্যকে সমর্থন করে। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে কিছু প্রমাণ উদাহরণস্বরূপ নিচে দেওয়া হলো, যা সব নয় বরং সংক্ষিপ্তসার:
১ -
প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত মাযহাবের প্রত্যেক অন্ধ অনুসারীই দাবি করে যে, সে যা অনুসরণ করছে তা-ই সত্য এবং অন্যেরা যা করছে তা অবশ্যই বাতিল।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৭)
قَالَ الحصفكي وَهُوَ من أشهر المؤلفين الأحناف فِي الْفِقْه الْحَنَفِيّ وفيهَا أَي فِي الْأَشْبَاه إِذا سئلنا عَن مَذْهَبنَا وَمذهب مخالفنا قُلْنَا وجوبا مَذْهَبنَا صَوَاب يحْتَمل الْخَطَأ وَمذهب مخالفنا خطأ يحْتَمل الصَّوَاب وَإِذا سئلنا عَن معتقدنا ومعتقد خصومنا قُلْنَا وجوبا الْحق مَا نَحن عَلَيْهِ وَالْبَاطِل مَا عَلَيْهِ خصومنا وَأَيْضًا نسب الحصفكي أَبْيَات إِلَى عبد الله بن الْمُبَارك فِي مدح الإِمَام أبي حنيفَة وَمِنْهَا … فلعنة رَبنَا أعداد رمل … على من رد قَول أبي حنيفَة … وَنسب إِلَى أبي الْحسن الْكَرْخِي الْحَنَفِيّ أَنه قَالَ كل آيَة تخَالف مَا عَلَيْهِ أَصْحَابنَا فَهِيَ مؤولة أَو مَنْسُوخَة وَحَدِيث كَذَلِك فَهُوَ مؤول أَو مَنْسُوخ وَقَالَ إِمَام الْحَرَمَيْنِ الْجُوَيْنِيّ الشَّافِعِي نَحن ندعي أَن يجب على كَافَّة العاقلين وَعَامة الْمُسلمين شرقا وغربا بعدا وقربا انتحال مَذْهَب الشَّافِعِي وَيجب على الْعَوام الطغام والجهال الأنذال أَيْضا انتحال مذْهبه بِحَيْثُ لَا يَبْغُونَ عَنهُ حولا وَلَا يُرِيدُونَ بِهِ بَدَلا
হাসফাকী—যিনি হানাফি ফিকহের অন্যতম প্রসিদ্ধ রচয়িতা—বলেন এবং আল-আশবাহ গ্রন্থে রয়েছে: যখন আমাদের মাযহাব এবং আমাদের বিরোধীদের মাযহাব সম্পর্কে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন আমরা আবশ্যিকভাবে বলি, "আমাদের মাযহাব সঠিক তবে ভুলের সম্ভাবনা রাখে এবং আমাদের বিরোধীদের মাযহাব ভুল তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।" আর যখন আমাদের আকিদাহ এবং আমাদের প্রতিপক্ষদের আকিদাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন আমরা আবশ্যিকভাবে বলি, "আমরা যার ওপর প্রতিষ্ঠিত তাই সত্য এবং আমাদের প্রতিপক্ষরা যার ওপর রয়েছে তা মিথ্যা।" এছাড়াও হাসফাকী ইমাম আবু হানিফার প্রশংসায় আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের দিকে কিছু পঙক্তি সম্পর্কিত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে: … বালুকণার সংখ্যার ন্যায় আমাদের রবের অভিশাপ … তার ওপর বর্ষিত হোক যে আবু হানিফার কথা প্রত্যাখ্যান করবে … আর আবুল হাসান আল-কারখী আল-হানাফির দিকে সম্পর্কিত করা হয় যে তিনি বলেছেন: "প্রত্যেক আয়াত যা আমাদের ইমামদের মতের পরিপন্থী হবে, তা ব্যাখ্যাযোগ্য (مؤولة) অথবা রহিত (منسوخة); এবং হাদিসও যদি অনুরূপ হয় তবে তাও ব্যাখ্যাযোগ্য (مؤول) অথবা রহিত (منسوخ)।" ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনি আশ-শাফিয়ি বলেছেন: "আমরা দাবি করি যে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এবং দূর ও নিকটবর্তী সকল বুদ্ধিমান ও সাধারণ মুসলিমের জন্য শাফিয়ি মাযহাব গ্রহণ করা আবশ্যক। আর সাধারণ মূর্খ ও হীন স্তরের অজ্ঞদের জন্যও তাঁর মাযহাব গ্রহণ করা আবশ্যক, যেন তারা তা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয় এবং এর পরিবর্তে অন্য কিছু কামনা না করে।"
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৮)
وَهَكَذَا كل وَاحِد يعظم إِمَامه ويرجح مذْهبه وَيَدْعُو إِلَى التقيد بِهِ ويسفه مَذَاهِب الآخرين ويبالغ فِي حط أقدارهم وَيرْفَع إِمَامه إِلَى منزلَة لم يبلغ بهَا أحد من أَصْحَاب النَّبِي صلى الله عليه وسلم
إقتداء المقلدين بَعضهم لبَعض فِي الصَّلَاة وصل الْخلاف المذهبي بَين المقلدين إِلَى أَن كثيرا من فُقَهَاء الأحناف قد أفتوا بِبُطْلَان صَلَاة الْحَنَفِيّ وَرَاء إِمَام شَافِعِيّ قَالَ ابْن الْهمام قَالَ أَبُو الْيُسْر اقْتِدَاء الْحَنَفِيّ بشافعي غير جَائِز لما روى مَكْحُول النَّسَفِيّ فِي كتاب لَهُ سَمَّاهُ الشعاع أَن رفع الْيَدَيْنِ فِي الصَّلَاة عِنْد الرُّكُوع وَالرَّفْع مِنْهُ مُفسد بِنَاء على أَنه عمل كثير وَمِنْهُم من قيد جَوَاز الِاقْتِدَاء بِهِ كقاضيخان بِأَن لَا يكون متعصبا وَلَا شاكا فِي إيمَانه ويحتاط فِي مَوْضُوع الْخلاف وَقد رد الشَّافِعِيَّة على هَذِه التهجمات الْحَنَفِيَّة بِأَن ألفوا كتبا ينتقصون فِيهَا مَذْهَب الْحَنَفِيَّة وَمن أشهرها كتاب مغيث الْخلق فِي تَرْجِيح القَوْل الْحق لأبي الْمَعَالِي عبد الملك الْجُوَيْنِيّ الشهير بِإِمَام الْحَرَمَيْنِ ت 478 هـ فقد عَابَ فِيهِ مَذْهَب الإِمَام أبي حنيفَة فِي الصَّلَاة وَقَالَ وَهُوَ يصور الصَّلَاة الَّتِي جوزها الْحَنَفِيَّة فَإِن من انغمس فِي مستنقع نَبِيذ وَلبس جلد كلب غير مدبوغ وَأحرم بِالصَّلَاةِ مبدلا بِصِيغَة التَّكْبِير تَرْجَمته تركيا أَو هنديا ويقتصر فِي الْقُرْآن على تَرْجَمَة قَوْله {مدهامتان} ثمَّ يتْرك الرُّكُوع وينقر النقرتين لَا قعُود بَينهمَا وَلَا يقْرَأ التَّشَهُّد ثمَّ يحدث عمدا فِي آخر صلَاته بدل التَّسْلِيم وَلَو انفلت مِنْهُ بِأَن سبقه
এভাবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইমামকে মহিমান্বিত করেন এবং স্বীয় মাযহাবকে প্রাধান্য (ترجيح) প্রদান করেন, সেটির অনুসরণে সীমাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং অন্যদের মাযহাবকে তুচ্ছজ্ঞান করেন। তারা অন্যদের মর্যাদা হ্রাসে অতিরঞ্জন করেন এবং নিজ ইমামকে এমন এক সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন, যা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীদের মধ্যে কেউ লাভ করেননি।
সালাতে মুকাল্লিদদের (مقلد) একে অপরের অনুসরণ (إقتداء) মুকাল্লিদদের (مقلد) মধ্যে মাযহাবী বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হানাফী ফকীহগণের (فقيه) অনেকে শাফেয়ী ইমামের পেছনে হানাফী ব্যক্তির সালাত বাতিল হওয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন। ইবনুল হুমাম বলেন, আবুল ইউসর বলেছেন: শাফেয়ী ইমামের পেছনে হানাফী ব্যক্তির অনুসরণ (إقتداء) করা বৈধ নয়। কারণ মাকহুল আন-নাসাফী তাঁর এক কিতাবে, যার নাম তিনি 'আশ-শুআ' রেখেছেন, বর্ণনা করেছেন যে, সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা (رفع اليدين) হলো সালাত বিনষ্টকারী (مفسد); যেহেতু এটি অত্যধিক কর্ম (عمل كثير)-এর অন্তর্ভুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ, যেমন কাজীখান, অনুসরণের (إقتداء) বৈধতাকে শর্তযুক্ত করেছেন এই মর্মে যে, ইমাম যেন গোঁড়া না হন এবং নিজের ঈমানের ব্যাপারে সন্দিহান না হন, আর মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন। শাফেয়ীগণ হানাফীদের এই আক্রমণের জবাব দিয়েছেন এমন সব কিতাব রচনার মাধ্যমে যেখানে তাঁরা হানাফী মাযহাবের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরেছেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ হলো ইমামুল হারামাইন হিসেবে পরিচিত আবুল মাআলী আব্দুল মালিক আল-জুওয়াইনী (মৃত্যু ৪৭৮ হিজরী)-এর কিতাব 'মুগীসুল খালক ফী তারজীহিল কাওলিল হাক্ক'। তিনি এতে সালাতের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার মাযহাবের সমালোচনা করেছেন। হানাফী মাযহাবে জায়েজ ঘোষিত সালাতের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি বলেন: "যদি কেউ নবীজ (খেজুরের রস) মিশ্রিত পচা পানিতে ডুব দেয় এবং অপ্রক্রিয়াজাত কুকুরের চামড়া পরিধান করে, আর তাকবীরের (تكبير) শব্দের পরিবর্তে তুর্কি বা হিন্দি অনুবাদের মাধ্যমে সালাতের ইহরাম (إحرام) বাঁধে, আর কুরআনের ক্ষেত্রে কেবল 'মুদহামমাতান' (مدهامتان) আয়াতের অনুবাদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে, অতঃপর রুকু বর্জন করে এবং দুই সেজদাহর মাঝে না বসে পাখির ঠোকরের মতো দুটি ঠোকর দেয়, আর তাশাহহুদ (تشهد) পাঠ না করে, এরপর সালামের (تسليم) পরিবর্তে সালাতের শেষে ইচ্ছাকৃতভাবে বায়ু ত্যাগ করে—অথবা যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ওযু নষ্ট হয়ে যায়..."
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ১৯)
الْحَدث يُعِيد الْوضُوء فِي أثْنَاء صلَاته وَيحدث بعده فَإِن لم يكن قَاصِدا فِي حَدثهُ الأول تحلل عَن صلَاته على الصِّحَّة ثمَّ قَالَ وَالَّذِي يَنْبَغِي أَن يقطع بِهِ كل ذِي دين أَن مثل هَذِه الصَّلَاة لَا يبْعَث الله بهَا نَبيا وَمَا بعث مُحَمَّد بن عبد الله صلوَات الله وَسَلَامه عَلَيْهِ لدعاء النَّاس إِلَيْهَا وَهِي قطب الْإِسْلَام وعماد الدّين وَقد زعم أَن هَذَا الْقدر أقل الْوَاجِب فَهِيَ الصَّلَاة الَّتِي بعث بهَا النَّبِي صلى الله عليه وسلم وَمَا عَداهَا آدَاب وَسنَن فَإِذن تدقيق الشَّافِعِي رضي الله عنه يلائم الأَصْل وَيُوَافِقهُ فَكَانَ أولى من تدقيق أبي حنيفَة رضي الله عنه لِأَنَّهُ يُخَالف الأَصْل
المحاريب الْأَرْبَعَة من أَسْوَأ آثَار التَّقْلِيد على الْأمة مَا وَقع من تَقْسِيم الْقَضَاء والإفتاء والتدريس على عُلَمَاء الْمذَاهب الْأَرْبَعَة وَتَخْصِيص قَاض لَك مَذْهَب من الْمذَاهب يصور المقريزي هَذِه الظَّاهِرَة تصويرا محزنا فَيَقُول فَلَمَّا كَانَت سلطنة الْملك الظَّاهِر بيبرس البند قداري ولي بِمصْر والقاهرة أَرْبَعَة قُضَاة وهم شَافِعِيّ ومالكي وحنفي وحنبلي فاستمر ذَلِك من سنة خمس وَسِتِّينَ وسِتمِائَة حَتَّى لم يبْق فِي مَجْمُوع أَمْصَار الْإِسْلَام مَذْهَب يعرف من مَذَاهِب أهل الْإِسْلَام سوى هَذِه الْمذَاهب الْأَرْبَعَة وعقيدة الْأَشْعَرِيّ وعملت لأَهْلهَا الْمدَارِس والخوانك والزوايا والربط فِي سَائِر ممالك الْإِسْلَام وعودي من تمذهب بغَيْرهَا وَأنكر عَلَيْهِ وَلم يول قَاض وَلَا قبلت شَهَادَة أحد وَلَا قدم للخطابة
যে ব্যক্তি নামাজের মধ্যে অপবিত্রতা (حدث) অর্জন করে, সে পুনরায় অজু করে এবং এরপর আবার অপবিত্র হয়; তবে যদি সে তার প্রথম অপবিত্রতার (حدث) ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত না হয়, তবে সে বিশুদ্ধতা (صحة) অনুযায়ী তার নামাজ সম্পন্ন করবে। এরপর তিনি বললেন, প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া উচিত যে, আল্লাহ তাআলা এই ধরণের নামাজ দিয়ে কোনো নবীকে প্রেরণ করেননি এবং মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (তাঁর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) মানুষকে এর দিকে আহ্বান করার জন্য প্রেরিত হননি। অথচ নামাজ হলো ইসলামের মূল কেন্দ্র এবং দ্বীনের স্তম্ভ। তিনি দাবি করেছেন যে, এই পরিমাণই হলো সর্বনিম্ন ওয়াজিব (واجب); সুতরাং এটিই সেই নামাজ যা দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছিলেন এবং এ ছাড়া বাকি সব হলো আদব ও সুন্নত। অতএব, ইমাম শাফেয়ি (রা.)-এর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ মূলনীতি (أصل)-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তার অনুকূল; তাই এটি ইমাম আবু হানিফা (রা.)-এর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের চেয়ে অধিকতর অগ্রাধিকারযোগ্য, কারণ তা মূলনীতি (أصل)-এর পরিপন্থী।
চারটি মেহরাব উম্মতের ওপর অন্ধ অনুসরণ (تقليد)-এর অন্যতম নিকৃষ্ট প্রভাব হলো বিচার ব্যবস্থা, ফতোয়া দান এবং শিক্ষকতাকে চার মাজহাব (مذاهب)-এর আলেমদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া এবং প্রত্যেক মাজহাবের জন্য একজন নির্দিষ্ট বিচারক নিযুক্ত করা। আল-মাকরিজি এই বিষয়টিকে একটি দুঃখজনক চিত্র হিসেবে তুলে ধরে বলেন: যখন সুলতান আল-মালিক আল-জহির বাইবার্স আল-বুন্দুকদারির রাজত্বকাল এলো, তখন মিসর ও কায়রোতে চারজন বিচারক নিযুক্ত করা হলো; তারা ছিলেন শাফেয়ি, মালেকি, হানাফি এবং হাম্বলি। এটি ৬৬৫ হিজরি থেকে অব্যাহত থাকে, এমনকি ইসলামের জনপদগুলোতে এই চার মাজহাব (مذاهب) এবং আশআরি (الأشعري) আকিদা ছাড়া অন্য কোনো মাজহাব (مذهب) পরিচিত রইল না। সমগ্র ইসলামি সাম্রাজ্যে এগুলোর অনুসারীদের জন্য মাদ্রাসা, খানকা, জাবিয়া এবং রিবাত তৈরি করা হলো। যারা এর বাইরে অন্য কোনো মাজহাবের (تمذهب) অনুসারী ছিল, তাদের সাথে শত্রুতা করা হতো, তাদের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হতো, তাদের কোনো বিচারক নিয়োগ করা হতো না, কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করা হতো না এবং কাউকে খতিব হিসেবেও সামনে আনা হতো না।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২০)
والإمامة والتدريس أحد مَا لم يكن مُقَلدًا لأحد هَذِه الْمذَاهب وَأفْتى فُقَهَاء هَذِه الْأَمْصَار بطول هَذِه الْمدَّة بِوُجُوب اتِّبَاع هَذِه الْمذَاهب وَتَحْرِيم مَا عَداهَا وَلم ينْتَه الْأَمر بِوُجُوب تَقْلِيد الْمذَاهب الْأَرْبَعَة بل صَار كل مَذْهَب مِنْهَا كَدين مُسْتَقل ونصوا على بطلَان الصَّلَاة خلف مُخَالف الْمَذْهَب كَمَا مضى وبالتالي كَانَ إنْشَاء المقامات للمذاهب الْأَرْبَعَة فِي الْحرم الْمَكِّيّ أمرا حتميا قَامَ بِهِ أشر مُلُوك الجراكسة فرج بن برقوق فِي أَوَائِل الْمِائَة التَّاسِعَة وَكَانَ الْأَمر على ذَلِك حَتَّى جمعهم الْملك الإِمَام عبد العزيز آل السُّعُود خلف إِمَام وَاحِد وَهدم ابْنه الْملك سعود بن عبد العزيز هَذِه المقامات الْأَرْبَعَة عِنْد الْبناء الْجَدِيد لبيت الله الْحَرَام فجزاهما الله خيرا وللأسف الشَّديد حَتَّى الْآن تُوجد الْمَسَاجِد الْخَاصَّة بأصحاب الْمذَاهب فِي بعض الْبلدَانِ وخاصة فِي شبه القارة الْهِنْدِيَّة
الزواج بَين المقلدين لقد وصل الْخلاف إِلَى أَن منع بعض الْفُقَهَاء الأحناف تزوج الْحَنَفِيّ من الْمَرْأَة الشَّافِعِيَّة ثمَّ صدرت فَتْوَى من فَقِيه آخر ملقب بمفتي الثقلَيْن فَأجَاز تزوج الْحَنَفِيّ بالشافعية وَعلل ذَلِك بقوله تَنْزِيلا لَهَا منزلَة أهل الْكتاب وَقَالَ الْعَلامَة رشيد رضَا وَقد بلغ من إِيذَاء بعض المتعصبين لبَعض فِي
ইমামতি এবং অধ্যাপনার পদগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে প্রদান করা হতো না, যতক্ষণ না তিনি এই মাযহাবগুলোর কোনো একটির অনুসারী হতেন। এই জনপদগুলোর ফকিহগণ সুদীর্ঘকাল ধরে এই মাযহাবগুলোর অনুসরণ করা ওয়াজিব হওয়া এবং এ ছাড়া অন্য সব কিছুর অনুসরণ হারাম হওয়ার ফতোয়া প্রদান করেছেন। বিষয়টি কেবল চার মাযহাবের তাকলিদ ওয়াজিব হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রতিটি মাযহাব একেকটি স্বতন্ত্র ধর্মের ন্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি তারা ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত বর্ণনার ন্যায় ভিন্ন মাযহাবের ব্যক্তির পেছনে নামাজ আদায় করা বাতিল হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট মত ব্যক্ত করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে, নবম শতাব্দীর শুরুর দিকে সার্কাসীয় রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাজা ফারাজ ইবনে বারকুক কর্তৃক মক্কার হারামে চার মাযহাবের জন্য পৃথক চারটি মাকাম (প্রার্থনাস্থল) নির্মাণ করা একটি অনিবার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকে, যতক্ষণ না ইমাম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ সকলকে একজন ইমামের পেছনে সমবেত করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র বাদশাহ সাউদ বিন আব্দুল আজিজ বায়তুল্লাহর নতুন নির্মাণকাজের সময় এই চারটি মাকাম ভেঙে ফেলেন; আল্লাহ তাদের উভয়কে উত্তম প্রতিদান দান করুন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, অদ্যাবধি কিছু দেশে মাযহাবপন্থীদের জন্য বিশেষ মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে।
মুকাল্লিদদের মধ্যে বিবাহ বিরোধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কোনো কোনো হানাফি ফকিহ শাফেয়ি নারীর সাথে হানাফি পুরুষের বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে 'মুফতিউস সাকলাইন' উপাধিধারী অন্য একজন ফকিহ একটি ফতোয়া প্রদান করেন যাতে তিনি শাফেয়ি নারীর সাথে হানাফি পুরুষের বিবাহ বৈধ ঘোষণা করেন। এর সপক্ষে তিনি যুক্তি দেখান যে, শাফেয়ি নারীকে 'আহলে কিতাব' বা কিতাবধারী নারীদের সমপর্যায়ে গণ্য করা হবে। আল্লামা রশিদ রিদা বলেন, কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকে একে অপরের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে...
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২১)
طرابلس الشَّام فِي آخر الْقرن الْمَاضِي أَن ذهب بعض شُيُوخ الشَّافِعِيَّة إِلَى الْمُفْتِي وَهُوَ رَئِيس الْعلمَاء وَقَالَ لَهُ اقْسمْ الْمَسَاجِد بَيْننَا وَبَين الْحَنَفِيَّة فَإنَّا فلَانا من فقهائهم يعدنا كَأَهل الذِّمَّة بِمَا أذاع فِي هَذِه الْأَيَّام من خلافهم فِي تزوج الرجل الْحَنَفِيّ بِالْمَرْأَةِ الشَّافِعِيَّة وَقَول بَعضهم لَا يَصح لِأَنَّهَا تشك فِي إيمَانهَا يَعْنِي أَن الشَّافِعِيَّة وَغَيرهم يجوزون أَن يَقُول الْمُسلم أَنا مُؤمن إِن شَاءَ الله وَقَول آخَرين بل يَصح نِكَاحهَا قِيَاسا على الذِّمِّيَّة
التناحر بَين الْمذَاهبقد حصل التناحر العجيب بن الْمذَاهب بِحَيْثُ لم يكن يحب صَاحب مَذْهَب أَن تبقى الْمذَاهب الْأُخْرَى وَذَلِكَ تَحت رِعَايَة الدولة يَقُول المقريزي وَكَانَت الأفريقية الْغَالِب عَلَيْهَا السّنَن والْآثَار إِلَى أَن قدم عبد الله بن فروج أَبُو مُحَمَّد الْفَارِسِي بِمذهب أبي حنيفَة ثمَّ غلب أَسد بن الْفُرَات بن سِنَان قَاضِي أفريقية بِمذهب أبي حنيفَة ثمَّ أَن الْمعز بن باديس حمل جَمِيع أهل إفريقية على التَّمَسُّك بِمذهب مَالك وَترك مَا عَداهَا من الْمذَاهب فَرجع أهل إفريقية وَأهل الأندلس كلهم إِلَى مَذْهَب مَالك إِلَى الْيَوْم رَغْبَة فِيمَا عِنْد السُّلْطَان وحرصا على طلب الدُّنْيَا فَكَانَ الْقَضَاء والإفتاء فِي جَمِيع تِلْكَ المدن وَسَائِر الْقرى لَا يكون إِلَّا لمن تسمى بالفقه على مَذْهَب مَالك فاضطرت الْعَامَّة إِلَى أحكامهم وفتاواهم فَفَشَا هَذَا الْمَذْهَب هُنَاكَ فشوا طبق تِلْكَ الأقطار كَمَا فَشَا مَذْهَب أبي حنيفَة بِبِلَاد الْمشرق وَذكر الْحَافِظ أَبُو الْفِدَاء إِسْمَاعِيل بن كثير الدِّمَشْقِي أَن الْملك الْأَفْضَل ابْن
বিগত শতাব্দীর শেষভাগে শাম দেশের ত্রিপোলিতে এমনটি ঘটেছিল যে, শাফিঈ মাযহাবের কয়েকজন প্রবীণ আলেম মুফতির কাছে যান—যিনি ছিলেন আলেমদের প্রধান—এবং তাঁকে বলেন: "আমাদের এবং হানাফীদের মধ্যে মসজিদগুলো ভাগ করে দিন। কেননা তাদের ফকিহদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি বর্তমানে তাদের মধ্যে প্রচারিত এই মতবিরোধের কারণে আমাদের জিম্মি প্রজাদের মতো গণ্য করছেন যে, কোনো হানাফী পুরুষ শাফিঈ নারীকে বিবাহ করতে পারবে কি না। তাদের কেউ কেউ বলছেন যে এটি বৈধ হবে না, কারণ সে (শাফিঈ নারী) তার ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে।" এর অর্থ হলো, শাফিঈ এবং অন্যরা একজন মুসলিমের জন্য "ইনশাআল্লাহ আমি মুমিন" বলা বৈধ মনে করেন। আবার অন্যরা বলছেন যে, বরং জিম্মি নারীর সাথে বিবাহের ওপর কিয়াস বা তুলনা করে শাফিঈ নারীর সাথে এই বিবাহ বৈধ হবে।
মাযহাবগুলোর মধ্যকার কোন্দলমাযহাবগুলোর মধ্যে এক বিস্ময়কর কোন্দল সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে কোনো এক মাযহাবের অনুসারী অন্য মাযহাবগুলো অবশিষ্ট থাকুক—তা পছন্দ করত না; আর এটি ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। মাকরিজি বলেন, আফ্রিকা (ইফ্রিকা) অঞ্চলে সুন্নাহ (السنن) এবং বর্ণনা (الآثار) -এর প্রাধান্য ছিল, যতক্ষণ না আবু মুহাম্মাদ আল-ফারিসি আবদুল্লাহ ইবনে ফাররুখ হানাফী মাযহাব নিয়ে সেখানে আগমন করেন। এরপর ইফ্রিকার বিচারক আসাদ ইবনে ফুরাত ইবনে সিনান হানাফী মাযহাবকে প্রাধান্য দান করেন। পরবর্তীতে আল-মুইজ ইবনে বাদিস ইফ্রিকার সকল মানুষকে মালিকী মাযহাব আঁকড়ে ধরতে এবং এর বাইরে অন্যান্য সকল মাযহাব বর্জন করতে বাধ্য করেন। ফলে ইফ্রিকা এবং আন্দালুসের সকল মানুষ সুলতানের অনুগ্রহ লাভের আশায় এবং দুনিয়া অর্জনের লালসায় আজ পর্যন্ত মালিকী মাযহাবের দিকেই ফিরে গেছে। ফলে সেই সকল শহর এবং অন্যান্য সকল জনপদে বিচারকার্য ও ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব শুধুমাত্র তাদের জন্যই নির্ধারিত ছিল যারা মালিকী মাযহাব অনুযায়ী ফিকহ চর্চা করত। সাধারণ মানুষ তাদের বিধান ও ফতোয়া মেনে নিতে বাধ্য হয়, ফলে সেই অঞ্চলগুলোতে এই মাযহাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক যেভাবে প্রাচ্যের দেশগুলোতে হানাফী মাযহাব বিস্তার লাভ করেছিল। হাফিজ (الحافظ) আবুল ফিদা ইসমাইল ইবনে কাসির আদ-দিমাশকি উল্লেখ করেছেন যে, মালিক আল-আফদাল ইবনে...
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২২)
صَلَاح الدّين ت 595 هـ كَانَ قد عزم فِي السّنة الَّتِي توفّي فِيهَا على إِخْرَاج الْحَنَابِلَة من بَلَده وَأَن يكْتب إِلَى بَقِيَّة إخْوَته بإخراجهم من الْبِلَاد وَذكر أَيْضا أَن عبد الغني الْمَقْدِسِي تعرض إِلَى مَسْأَلَة صِفَات الله عز وجل فِي دمشق فَغَضب عَلَيْهِ أَتبَاع الْمذَاهب الْأُخْرَى فَأمر الْأَمِير صارم الدّين برغش بنفيه من الْبَلَد وَأرْسل الْأُسَارَى من القلعة فكسروا مِنْبَر الْحَنَابِلَة وتعطلت يَوْمئِذٍ صَلَاة الظّهْر فِي محراب الْحَنَابِلَة
مدى انتشار الحروب وخراب الْبِلَاد بَين المتمذهبينلم تكن الخلافات والنزاعات بَين المقلدين مقتصرة على الآراء الْفِقْهِيَّة فَقَط بل بلغ بهم التعصب إِلَى الحروب الطاحنة فِيمَا بَينهم يرْوى لنا التأريخ الشي الْكثير من ذَلِك قَالَ ياقوت الْحَمَوِيّ وَهُوَ بصدد ذكر مَدِينَة أَصْبَهَان وَقد فَشَا الخراب فِي هَذَا الْوَقْت وَقَبله فِي نَوَاحِيهَا لِكَثْرَة الْفِتَن والتعصب بَين الشَّافِعِيَّة وَالْحَنَفِيَّة والحروب الْمُتَّصِلَة بَين الحزبين فَكلما ظَهرت طَائِفَة نهبت محلّة الْأُخْرَى وأحرقتها وخربتها لَا يَأْخُذهُمْ فِي ذَلِك إل وَلَا ذمَّة وَمَعَ ذَلِك فقد قل أَن تدوم بهَا دولة سُلْطَان أَو يُقيم بهَا فيصلح فاسدها وَكَذَلِكَ الْأَمر فِي رساتيقها وقراها الَّتِي كل وَاحِدَة مِنْهَا كالمدينة وَهَذَا غيض من فيض مِمَّا وَقع بَين أَتبَاع الْمذَاهب الَّذِي يندى لَهُ جبين التعصب أعاذنا الله جَمِيعًا من هَذَا الدَّاء العضال الَّذِي أصَاب الْأمة الإسلامية
সালাহ উদ্দিন (মৃত্যু ৫৯৫ হিজরি) যে বছর ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি তার রাজ্য থেকে হাম্বলিদের বহিষ্কার করার এবং তার অবশিষ্ট ভাইদের কাছেও পত্র লিখে তাদের রাজ্য থেকে হাম্বলিদের বহিষ্কার করার সংকল্প করেছিলেন। আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আব্দুল গণি আল-মাকদিসি দামেস্কে মহান আল্লাহর গুণাবলি (صفات) সংক্রান্ত মাসআলায় আলোচনা করায় অন্যান্য মাযহাবের (المذاهب) অনুসারীরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হন। তখন আমির সারিমুদ্দিন বারঘাশ তাকে দেশান্তরের আদেশ দেন এবং দুর্গ থেকে বন্দিদের পাঠান; তারা হাম্বলিদের মিম্বর ভেঙে ফেলে এবং সেদিন হাম্বলিদের মেহরাবে জোহরের সালাত স্থগিত হয়ে যায়।
মাযহাবপন্থীদের মধ্যে যুদ্ধের বিস্তার এবং দেশ ধ্বংসের ভয়াবহতামুকাল্লিদদের (المقلدين) মধ্যকার মতভেদ ও বিবাদ কেবল ফিকহি (الفقهية) মতামতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের গোঁড়ামি (التعصب) তাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ইতিহাস আমাদের এ সম্পর্কে প্রচুর তথ্য প্রদান করে। ইয়াকুত আল-হামাউই ইসফাহান শহরের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন: "বর্তমানে এবং এর আগে এই শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ হলো শাফেয়ি ও হানাফিদের মধ্যে প্রচুর ফিতনা (الفتن) ও গোঁড়ামি (التعصب) এবং এই দুই দলের মধ্যকার অবিরাম যুদ্ধ। ফলে যখনই এক দল বিজয়ী হতো, তারা অন্য দলের মহল্লা লুট করত এবং তা পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত; এক্ষেত্রে তারা কোনো আত্মীয়তা বা চুক্তির পরোয়া করত না। তা সত্ত্বেও, সেখানে কোনো সুলতানের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়া বা কারো পক্ষে সেখানে অবস্থান করে বিশৃঙ্খলা সংশোধন করা বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই অবস্থা ছিল এর অধীনস্থ উপশহর এবং গ্রামগুলোর ক্ষেত্রেও, যার প্রতিটি ছিল এক একটি শহরের মতো।" মাযহাব অনুসারীদের মধ্যে যা ঘটেছিল এটি তার সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু মাত্র, যা গোঁড়ামির ললাটকে লজ্জিত করে। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই দুরারোগ্য ব্যাধি (الداء العضال) থেকে রক্ষা করুন যা মুসলিম উম্মাহকে আক্রান্ত করেছে।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৩)
المتلاحمة ففرقها ولنختم هَذَا الْمَوْضُوع بِمَا أوردهُ اللكنوي فِي كتاب الْفَوَائِد البهية فِي تَرْجَمَة عِيسَى بن سيف الدّين أبي بكر بن أَيُّوب فقد قَالَ فِيهِ كَانَ متغاليا فِي التعصب لمَذْهَب أبي حنيفَة قَالَ لَهُ وَالِده يَوْمًا كَيفَ اخْتَرْت مَذْهَب أبي حنيفَة وَأهْلك كلهم شافعية فَقَالَ أترغبون عَن أَن يكون فِيكُم رجل وَاحِد مُسلم
رمتني بدائها وانسلت بعد هَذَا الاستعراض لتأريخ التناحرات المذهبية المقيتة آمل أَن تتبلور حَقِيقَة دَعْوَى أَن الْمذَاهب كلهَا حق وعَلى الصَّوَاب وتنكشف نوايا المقلدة الخبيثة ضد الْأَئِمَّة الآخرين وحربهم الشعواء على الْمذَاهب الْأُخْرَى مُؤمنين إِيمَانًا جَازِمًا بِأَن الْمَذْهَب الَّذِي هم عَلَيْهِ هُوَ الْحجَّة الشَّرْعِيَّة الوحيدة على كل فَرد من أَفْرَاد الْأمة وَلَا يجوز لأحد أَن يخرج عَنهُ من المؤسف المحزن المخزي أَن الجذوة التقليدية الجائرة لم تخمد حَتَّى الْآن فِي أوساط أَتبَاع الْمذَاهب فِي كثير من الْبلدَانِ وَلَو كَانَ الْأَمر بِأَيْدِيهِم لأخذوا الْجِزْيَة من أَتبَاع الْمذَاهب الْأُخْرَى كَمَا قَالَ مُحَمَّد بن مُوسَى البلاساغوني المبتدع قَاضِي دمشق الْمُتَوفَّى 506 هـ لَو كَانَ لي أَمر لأخذت الْجِزْيَة من الشَّافِعِيَّة يتقطع الْقلب حزنا وأسى على رضاهم عَن تِلْكَ الداهية الدهياء والمصيبة الصماء الَّتِي شتت شَمل الْأمة أَسْوَأ تشتيت فِي الْمَاضِي وتمزقها فِي الْمُسْتَقْبل شَرّ ممزق
সংযুক্ত বিষয়গুলোকে তিনি পৃথক করেছেন। আল-লখনভী ঈসা ইবনে সাইফুদ্দীন আবু বকর ইবনে আইয়ুবের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে 'আল-ফাওয়ায়িদ আল-বাহিয়্যাহ' গ্রন্থে যা উল্লেখ করেছেন, তা দিয়ে আমরা এই প্রসঙ্গের ইতি টানব। তিনি সেখানে বলেছেন যে, সে আবু হানিফার মাযহাবের প্রতি গোঁড়ামির ক্ষেত্রে চরমপন্থী ছিল। একদিন তার পিতা তাকে বললেন, "তুমি কীভাবে আবু হানিফার মাযহাব বেছে নিলে অথচ তোমার পরিবারের সকলেই শাফিয়ী?" সে উত্তরে বলল, "আপনাদের মাঝে একজন অন্তত মুসলিম ব্যক্তি থাকুক—এটা কি আপনারা অপছন্দ করেন?"
সে নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সরে পড়ল মাযহাবগত এই ঘৃণ্য সংঘাতের ইতিহাসের এই পর্যালোচনার পর আমি আশা করি যে, "সকল মাযহাবই সত্য এবং সঠিক (صواب) পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত"—এই দাবির বাস্তবতা স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ইমামদের বিরুদ্ধে অন্ধ-অনুসারীদের (مقلدة) বিদ্বেষপূর্ণ অভিসন্ধি এবং অন্যান্য মাযহাবের বিরুদ্ধে তাদের সর্বাত্মক যুদ্ধের স্বরূপ উন্মোচিত হবে। তারা এই দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে যে, তারা যে মাযহাব অনুসরণ করছে সেটিই উম্মাহর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একমাত্র শরয়ী দলিল (حجة) এবং এটি থেকে বিচ্যুত হওয়া কারো জন্য বৈধ নয়। এটি অত্যন্ত পরিতাপের, দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক যে, বহু দেশে মাযহাব অনুসারীদের মধ্যে এই অন্যায় অন্ধ-অনুসরণের অগ্নিশিখা আজও নির্বাপিত হয়নি। যদি ক্ষমতা তাদের হাতে থাকতো, তবে তারা অন্য মাযহাবের অনুসারীদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করত; যেমনটি দামেস্কের বিচারক বিদআতী (مبتدع) মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-বালাসাঘুনী (মৃত্যু ৫০৬ হিজরী) বলেছিলেন, "যদি আমার হাতে কর্তৃত্ব থাকত, তবে আমি শাফিয়ীদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণ করতাম।" সেই ভয়াবহ বিপদ এবং নিরেট মুসিবতের প্রতি তাদের এই সন্তুষ্টির কারণে অন্তর শোকে ও দুঃখে বিদীর্ণ হয়, যা অতীতে উম্মাহর ঐক্যকে চরমভাবে বিনষ্ট করেছে এবং ভবিষ্যতেও একে অতি মন্দভাবে ছিন্নভিন্ন করবে।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৪)
إِذا لم ينتبهوا لخطرها المحدق وشرها المستطير إِن تعجب فَعجب من هَؤُلَاءِ الَّذين يفترون على الدعاة المحايدين عَن التَّقْلِيد الْأَعْمَى والتعصب المذهبي الَّذين يتألمون من وَاقع الْمُسلمين المرير وَوضع الْأمة المتدهور وينادون بوحدة الْأمة بِالرُّجُوعِ إِلَى الْكتاب وَالسّنة والتحاكم إِلَيْهِمَا فِي الْمسَائِل الْمُخْتَلف فِيهَا مَعَ الاحترام وَالتَّقْدِير وَالِاعْتِبَار باجتهادات الْأَئِمَّة ورواد هَذِه الْأمة ويرمونهم بالشذوذ والتقوقع والرجعية والتقهقر وَالِاجْتِهَاد واللامذهبية وعمالة الاستعمار وَالْحَرب على الْمذَاهب والعداوة للأئمة رحمهم الله وَذَلِكَ كُله بأقلام من الدكاترة والمشايخ والمحدثين أَيهَا القارىء الْكَرِيم قلي لي بِاللَّه من هُوَ أَحَق بِأَن يَتَّصِف بِتِلْكَ الصِّفَات فِي ضوء مَا مضى ذكره من النزاعات والخلافات بَين المتمذهبين هَكَذَا صَار الْمَعْرُوف مُنْكرا وَالْمُنكر مَعْرُوفا وانعكست المفاهيم واختلت الموازين واحتجبت الْحَقَائِق وَلَكِنِّي أعتقد بِأَنَّهَا لَا تغيب عَن الْمُسلم الْمنصف الْعَادِل مهما حاول المغرضون … فَلَو لبس الْحمار ثِيَاب خَز … لقَالَ النَّاس يالك من حمَار … وَلَقَد أدْرك مدى هَذِه الخلافيات المذهبية بعض المغرضين الَّذين يقدمُونَ أعذارا بَارِدَة لعدم تطبيق الشَّرِيعَة الإسلامية كَمَا نقرأها فِي المجلات والصحف اليومية وَيَقُولُونَ أَن الْمذَاهب مُخْتَلفَة فَلَو طبقت الشَّرِيعَة فعلى أَي مَذْهَب تطبق وَلَا شكّ هَذَا موطن ضعف لَا يُمكن علاجه إِلَّا بِالرُّجُوعِ إِلَى الْكتاب وَالسّنة مَعَ الاستنارة من آراء الْمُجْتَهدين فِي القضايا وترجيحها على الْأُخْرَى حسب قُوَّة الْأَدِلَّة لَا كَثْرَة العاملين المتعصبين لمَذْهَب فِي ميدان تصنيف الْفِقْه الإسلامي
যদি তারা এর আসন্ন বিপদ এবং এর ব্যাপক অনিষ্ট সম্পর্কে সচেতন না হয়। যদি আপনি বিস্ময় প্রকাশ করেন, তবে বিস্ময় তো সেই সব লোকদের প্রতি যারা ঐ সকল নিরপেক্ষ দায়ীদের ওপর অপবাদ আরোপ করে যারা অন্ধ অনুসরণ ও মাযহাবী গোঁড়ামি থেকে মুক্ত; যারা মুসলিমদের তিক্ত বাস্তবতা এবং উম্মাহর এই অবনতিশীল অবস্থায় ব্যথিত হন এবং কুরআন ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে ও মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোতে এই দুইয়ের ফয়সালা মেনে নিয়ে উম্মাহর ঐক্যের ডাক দেন, পাশাপাশি ইমামগণ ও এই উম্মাহর অগ্রপথিকদের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তের (الاجتهاد) প্রতি সম্মান, মর্যাদা ও বিবেচনা পোষণ করেন। তারা তাদেরকে বিচ্যুতি (الشذوذ), সংকীর্ণতা, পশ্চাৎপদতা, পশ্চাদপসরণ, গবেষণার (الاجتهاد) দাবিদার হওয়া, মাযহাবহীনতা, সাম্রাজ্যবাদের দালালি, মাযহাবসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইমামদের (আল্লাহ তাঁদের প্রতি রহম করুন) প্রতি বিদ্বেষের অপবাদ দেয়। আর এ সবই করা হচ্ছে কতিপয় ডক্টরেটধারী, শাইখ ও হাদীস বিশারদ (المحدثون)-দের কলমের মাধ্যমে। হে সম্মানিত পাঠক, আল্লাহর কসম করে আমাকে বলুন, ইতিপূর্বে উল্লিখিত মাযহাবপন্থীদের মধ্যকার বিবাদ ও মতবিরোধের আলোকে এই সকল বিশেষণে ভূষিত হওয়ার অধিক যোগ্য কে? এভাবেই স্বীকৃত সৎকাজগুলো মন্দ (المنكر) এবং মন্দ (المنكر) কাজগুলো স্বীকৃত সৎকাজ হিসেবে গণ্য হতে লাগল; ধারণাগুলো উল্টে গেল, মানদণ্ডগুলো ওলটপালট হয়ে গেল এবং সত্যগুলো আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, কোনো ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফকারী মুসলিমের কাছে সত্য হারিয়ে যাবে না, যতই স্বার্থান্বেষীরা চেষ্টা করুক না কেন … যদি কোনো গাধা রেশমী কাপড়ও পরিধান করে … তবে মানুষ বলবেই যে, 'তুমি কেমন গাধা' … আর এই মাযহাবী মতপার্থক্যের গভীরতা সেই সকল স্বার্থান্বেষী মহলের কেউ কেউ উপলব্ধি করতে পেরেছে যারা ইসলামী শরীয়ত বাস্তবায়ন না করার পক্ষে ঠুনকো অজুহাত পেশ করে, যেমনটি আমরা দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোতে পাঠ করি। তারা বলে যে, মাযহাবগুলো তো ভিন্ন ভিন্ন, সুতরাং যদি শরীয়ত প্রয়োগ করা হয় তবে কোন মাযহাব অনুযায়ী করা হবে? নিঃসন্দেহে এটি একটি দুর্বলতার জায়গা যা কুরআন ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত সমাধান করা সম্ভব নয়। আর এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে মুজতাহিদ (المجتهدون)-দের মতামত থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে এবং দলীলের শক্তির ভিত্তিতে কোনো একটি মতামতকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য (الترجيح) দিতে হবে; ইসলামী ফিকহ সংকলনের ক্ষেত্রে কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুসারীদের সংখ্যার আধিক্য দেখে নয়।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৫)
وَإِلَّا يكون عبارَة عَن تجميع آراء الْمذَاهب بأدلتها الْخَاصَّة الَّذِي لَا يخْتَلف عَن الْكتب الْقَدِيمَة للمذاهب شَيْئا كم نتمنى أَن تعد موسوعة فقهية على هَذَا الْمنْهَج السَّلِيم المحايد كي تكون مرجعا موحدا لتلقي الْأَحْكَام فِي الْقَضَاء ودستورا شَرْعِيًّا أقرب مَا يُمكن إِلَى الصَّوَاب وقانونا رسميا يجْتَمع عَلَيْهِ الشّعب كُله وكل هَذَا مُمكن بِأَدْنَى تَوْجِيه من المسئولين القائمين على هَذِه الْأَمَانَة الإسلامية {وَمَا ذَلِك على الله بعزيز} إِبْرَاهِيم 20
بَاب الإجتهاد وأسبابهلما تغلغل الْمَذْهَب فِي سويداء قُلُوبهم وغرز التَّقْلِيد الجامد براثنه فِي جسم الْأمة وفرطوا فِي الْقيام بالإجتهاد وَفِي الْمسَائِل واعتمدوا على الإحتكام إِلَى مَذْهَب من الْمذَاهب مهما كَانَ دَلِيله قُوَّة وضعفا نادوا بسد بَاب الإجتهاد فِي منتصف الْقرن الرَّابِع بِدُونِ دَلِيل وَبِدُون حق لأسباب تتلخص فِي النقاط التالية ضعف السُّلْطَان السياسي للخلفاء العباسيين مِمَّا أثر فِي حَيَاة الْفِقْه وَالْفُقَهَاء فَلم يَجدوا التشجيع الَّذِي كَانَ يحفزهم على الإنتاج الفقهي تدوين الْمذَاهب وترتيب مسائلها وتبويبها مِمَّا جعل الْفُقَهَاء يركنون إِلَى هَذِه الثروة الْفِقْهِيَّة ويستغنون بهَا عَن الْبَحْث والاستنباط ضعف الثِّقَة بِالنَّفسِ والتهيب من الِاجْتِهَاد مِمَّا جعل الْفُقَهَاء يؤثرون التَّقْلِيد على الْخَوْض فِي ميدان الإجتهاد الْمُطلق إدعاء الإجتهاد مِمَّن لَيْسُوا أَهلا لَهُ فأفتوا بسد بَاب الإجتهاد دفعا لهَذَا
অন্যথায় এটি হবে স্ব-স্ব বিশেষ দলীল (دليل)-সহ মাযহাবগুলোর মতামতের একটি সংকলন মাত্র, যা মাযহাবগুলোর প্রাচীন গ্রন্থসমূহ থেকে কোনো অংশেই ভিন্ন হবে না। আমরা কতটা প্রত্যাশা করি যে, এই সঠিক ও নিরপেক্ষ মানহাজ অনুযায়ী একটি ফিকহী বিশ্বকোষ প্রস্তুত করা হোক, যেন তা বিচার বিভাগে বিধান গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ঐক্যবদ্ধ উৎস, সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী একটি শরয়ি সংবিধান এবং এমন একটি আনুষ্ঠানিক আইন হতে পারে যার ওপর পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হবে। আর এই মহান ইসলামি আমানতের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সামান্য দিকনির্দেশনায় এ সবকিছুই সম্ভব। {আর আল্লাহর জন্য এটি মোটেও কঠিন নয়} ইব্রাহিম ২০
ইজতিহাদ (اجتهاد) ও এর কারণসমূহ অধ্যায়যখন মাযহাবপ্রীতি তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হলো এবং স্থবির অন্ধ অনুকরণ (تقليد) জাতির দেহে তার নখর বিদ্ধ করল, আর তারা বিভিন্ন মাসয়ালায় ইজতিহাদ (اجتهاد) করার দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শন করল এবং দলীল (دليل) শক্তিশালী (قوة) হোক বা দুর্বল (ضعف) হোক—যেকোনো একটি মাযহাবের ওপর নির্ভর করাকেই গ্রহণ করে নিল, তখন তারা কোনো দলীল (دليل) ও অধিকার ছাড়াই চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর দরজা বন্ধ করার ঘোষণা দিল। এর কারণসমূহ নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোতে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো: আব্বাসীয় খলিফাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার দুর্বলতা (ضعف), যা ফিকহ ও ফকীহদের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। ফলে তারা এমন কোনো উৎসাহ খুঁজে পাননি যা তাদের ফিকহী জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মাযহাবসমূহ সংকলিত হওয়া এবং সেগুলোর মাসয়ালাসমূহ বিন্যস্ত ও অধ্যায়ভুক্ত হওয়া, যা ফকীহদের এই ফিকহী সম্পদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল এবং তাদের গবেষণা ও মাসয়ালা উদ্ভাবন (استنباط) থেকে বিমুখ করেছিল। আত্মবিশ্বাসের দুর্বলতা (ضعف) এবং ইজতিহাদ (اجتهاد) করার ব্যাপারে ভয়-ভীতি, যা ফকীহদেরকে মুতলাক (مطلق) ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে অন্ধ অনুকরণকে (تقليد) প্রাধান্য দিতে বাধ্য করেছিল। যারা ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর যোগ্য নন তাদের পক্ষ থেকে ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর দাবি করা; ফলে এই পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য তারা ইজতিহাদ (اجتهاد)-এর দরজা বন্ধ করার ফতোয়া প্রদান করেন।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৬)
الْفساد وحفظا لدين الله شيوع التحاسد بَين الْعلمَاء مِمَّا جعل الْكثير مِنْهُم يحجم عَن الِاجْتِهَاد خوفًا من أَن يكيد لَهُ أعداؤه ويرموه بالإبتداع فوقفوا عِنْد أَقْوَال الْمُتَقَدِّمين تعْيين الْقُضَاة والمفتين على الْمذَاهب مِمَّا كسر همم الْفُقَهَاء فِي الْخَوْض فِي الْمسَائِل عدم إعتداد الْعَامَّة بإجتهادات الْعلمَاء المعاصرين وثقتهم بالعلماء الْمُتَقَدِّمين خوف الْحُكَّام من اسْتِمْرَار الإجتهاد لما كَانَت تسببه إجتهادات بعض الْمُجْتَهدين لَهُم من تشويش وإحراج وقلق يَتَّضِح جليا بعد إمعان النّظر فِي هَذِه الْأَسْبَاب بِأَن مخاوف الْعلمَاء فِي اسْتِمْرَار الإجتهاد الْتَقت مَعَ رَغْبَة الْحُكَّام والساسة على إغلاق الِاجْتِهَاد وَإِن اخْتلفت الْمَقَاصِد والأهداف وَكَذَلِكَ لَيْسَ من بَين هَذِه العوامل أَي عَامل ديني فِي منع الِاجْتِهَاد
مَتى انسد بَاب الإجتهاد اخْتلف الْعلمَاء الْقَائِلُونَ بسد بَاب الإجتهاد فِي تعْيين وَقت بَدْء إغلاق بَاب الِاجْتِهَاد قَالَ صَاحب فواتح الرحموت ثمَّ إِن من النَّاس من حكم بِوُجُوب الْخُلُو من بعد الْعَلامَة النَّسَفِيّ واختتم الإجتهاد بِهِ وعنوا الإجتهاد فِي الْمَذْهَب وَأما الإجتهاد الْمُطلق فَقَالُوا
বিপর্যয় রোধ এবং আল্লাহর দ্বীন রক্ষার খাতিরে আলেমদের মধ্যে পারস্পরিক হিংসার বিস্তার, যা তাদের অনেককে এই ভয়ে গবেষণা (اجتهاد) থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছিল যে, তাদের শত্রুরা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে এবং তাদের ওপর নবউদ্ভাবন (إبتداع)-এর অপবাদ আরোপ করবে। ফলে তারা পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্যের ওপরই সীমাবদ্ধ রইলেন। নির্দিষ্ট মাজহাব (مذاهب) অনুযায়ী বিচারক ও মুফতিদের নিয়োগ প্রদান, যা মাসআলা গবেষণার ক্ষেত্রে ফকিহ (فقهاء)-দের উদ্যমকে ভেঙে দিয়েছিল। সমসাময়িক আলেমদের গবেষণা (اجتهاد)-এর প্রতি সাধারণ মানুষের গুরুত্ব না দেওয়া এবং পূর্ববর্তী আলেমদের ওপর তাদের অগাধ আস্থা। শাসকদের মনে গবেষণার (اجتهاد) ধারাবাহিকতা নিয়ে ভয়, কারণ কোনো কোনো মুজতাহিদ (مجتهدين)-এর গবেষণা তাদের জন্য বিভ্রান্তি, বিব্রতকর অবস্থা ও অস্থিরতা তৈরি করত। এই কারণগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইজতিহাদ অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলেমদের আশঙ্কা এবং ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করার বিষয়ে শাসক ও রাজনীতিকদের ইচ্ছা একই মোহনায় মিলিত হয়েছিল, যদিও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ভিন্ন ছিল। একইভাবে, ইজতিহাদ রুদ্ধ করার এই প্রভাবকগুলোর মধ্যে কোনো ধর্মীয় কারণ ছিল না।
কখন ইজতিহাদের দরজা রুদ্ধ হয়েছিল? ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হওয়ার প্রবক্তা আলেমগণ ইজতিহাদ রুদ্ধ হওয়ার শুরুর সময় নির্ধারণে মতভেদ করেছেন। ফাওয়ালিহুর রাহমুত গ্রন্থের লেখক বলেছেন, অতঃপর কিছু লোক আল্লামা নাসাফীর পরবর্তী সময় থেকে মুজতাহিদশূন্য হওয়া আবশ্যক বলে রায় দিয়েছেন এবং তার মাধ্যমেই ইজতিহাদের সমাপ্তি হয়েছে বলে গণ্য করেছেন। এর দ্বারা তারা মাজহাবভিত্তিক গবেষণা (اجتهاد في المذهب) উদ্দেশ্য করেছেন। আর স্বাধীন গবেষণা (الاجتهاد المطلق)-এর ব্যাপারে তারা বলেছেন-
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৭)
اختتم بالأئمة الْأَرْبَعَة حَتَّى أوجبوا تَقْلِيد وَاحِد من هَؤُلَاءِ على الْأمة وَهَذَا كُله هوس من هوساتهم لم يَأْتُوا بِدَلِيل وَلَا يعبأ بكلامهم وَإِنَّمَا هم من الَّذين حكم الحَدِيث أَنهم أفتوا بِغَيْر علم فضلوا وأضلوا وَلم يفهموا أَن هَذَا إِخْبَار بِالْغَيْبِ فِي خمس لَا يعلمهُنَّ إِلَّا الله تَعَالَى وَذكر ابْن حزم وَابْن قيم الجوزية قَول طَائِفَة قَالَت لَيْسَ لأحد أَن يخْتَار بعد أبي حنيفَة وَأبي يُوسُف وَزفر بن الْهُذيْل وَمُحَمّد بن الْحسن وَالْحسن بن زِيَاد اللؤْلُؤِي وَهَذَا قَول كثير من الْحَنَفِيَّة وَقَالَ بكر بن الْعَلَاء الْقشيرِي الْمَالِكِي لَيْسَ لأحد أَن يخْتَار بعد الْمِائَتَيْنِ من الْهِجْرَة وَقَالَ آخَرُونَ لَيْسَ لأحد أَن يخْتَار بعد الْأَوْزَاعِيّ وسُفْيَان الثَّوْريّ ووكيع بن الْجراح وعبد الله بن الْمُبَارك وَقَالَت طَائِفَة لَيْسَ لأحد أَن يخْتَار بعد الشَّافِعِي وَاخْتلفُوا مَتى انسد بَاب الإجتهاد على أَقْوَال كَثِيرَة مَا أنزل الله بهَا من سُلْطَان وَمِمَّا يَتَرَتَّب على فَتْوَى سد بَاب الإجتهاد أَنه يجوز خلو الْعَصْر من الْمُجْتَهد وَذهب إِلَيْهِ الْآمِدِيّ وَابْن الْحَاجِب والكمال بن الْهمام وَابْن السُّبْكِيّ والبهاري وَغَيرهم
তারা চার ইমাম (الأئمة الأربعة) পর্যন্ত বিষয়টি সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন, এমনকি উম্মতের ওপর তাঁদের যে কোনো একজনের অনুকরণ (تقليد) করা বাধ্যতামূলক করেছেন। এই সব কিছুই তাদের এক প্রকার প্রলাপ; তারা এর কোনো দলীল (دليل) পেশ করেনি এবং তাদের এসব কথার কোনো গুরুত্ব নেই। বরং তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের সম্পর্কে হাদিস ফয়সালা দিয়েছে যে, তারা জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া (فتوى) প্রদান করেছে, ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করেছে। তারা বুঝতে পারেনি যে, এটি পাঁচটি অদৃশ্যের সংবাদ (إخبار بالغيب) সম্পর্কিত বিষয়, যা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কেউ জানে না। ইবনে হাজম এবং ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যাহ একটি দলের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যারা বলেছে যে, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, জুফার বিন আল-হুজাইল, মুহাম্মদ বিন আল-হাসান এবং হাসান বিন জিয়াদ আল-লু’লুয়ির পরে আর কারও ইজতিহাদ (اجتهاد) করার অবকাশ নেই। এটি অনেক হানাফিপন্থীর বক্তব্য। বকর বিন আল-আলা আল-কুশাইরী আল-মালিকী বলেছেন যে, হিজরি দুই শতকের পরে আর কারও জন্য নতুন করে ইজতিহাদ (اجتهاد) করা বৈধ নয়। অন্যরা বলেছে, আওজাঈ, সুফিয়ান সাওরী, ওয়াকি ইবনুল জাররাহ এবং আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের পরে আর কারও ইজতিহাদ (اجتهاد) করার অধিকার নেই। একদল বলেছে যে, শাফিয়ির পরে আর কারও পছন্দ বা ইজতিহাদ (اجتهاد) করার সুযোগ নেই। ইজতিহাদের দ্বার রুদ্ধ (انسداد باب الاجتهاد) হওয়া প্রসঙ্গে তারা এমন অনেক মতভেদে লিপ্ত হয়েছে, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ (سلطان) অবতীর্ণ করেননি। ইজতিহাদের দ্বার রুদ্ধ হওয়ার ফতোয়া (فتوى) থেকে যা উদ্ভূত হয় তা হলো, কোনো যুগ একজন মুজতাহিদ (مجتهد) শূন্য থাকা সম্ভব। আল-আমিদি, ইবনুল হাজিব, কামাল ইবনুল হুমাম, ইবনুস সুবকি, আল-বিহারি এবং আরও অনেকে এই মত পোষণ করেছেন।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৮)
وَقَالَ الرَّافِعِيّ الْخلق كالمتفقين على أَنه لَا مُجْتَهد الْيَوْم وَقَالَ الزَّرْكَشِيّ وَلَعَلَّه أَخذه من كَلَام الرَّازِيّ أَو من قَول الْغَزالِيّ فِي الْوَسِيط حَيْثُ صرح قَائِلا قد خلا الْعَصْر عَن الْمُجْتَهد المستقل ثمَّ عقب على ذَلِك وَقَالَ وَنقل الِاتِّفَاق عَجِيب وَالْمَسْأَلَة خلافية بَيْننَا وَبَين الْحَنَابِلَة وساعدهم بعض أَئِمَّتنَا وَقَالَ الْحَنَابِلَة بِعَدَمِ جَوَاز خلو الْعَصْر عَن الْمُجْتَهد وَقَالَ ابْن بدران ذهب أَصْحَابنَا إِلَى أَنه لَا يجوز خلو الْعَصْر عَن مُجْتَهد وَإِلَى ذَلِك ذهب طوائف وَلم يذكر ابْن عقيل خلاف هَذَا إِلَّا عَن بعض الْمُحدثين
ردود الْعلمَاء على سد بَاب الإجتهاد إِن سد بَاب الإجتهاد على الْعلمَاء الْأَكفاء من جنايات التَّقْلِيد على الْأمة قَالَ الشَّوْكَانِيّ فَإِن هَذِه الْمقَالة بخصوصها أَعنِي انسداد بَاب الإجتهاد لَو لم يحدث من مفاسد التَّقْلِيد إِلَّا هِيَ لَكَانَ فِيهَا كِفَايَة وَنِهَايَة فَإِنَّهَا حَادِثَة رفعت الشَّرِيعَة بأسرها استلزمت نسخ كَلَام الله وَرَسُوله وَتَقْدِيم غَيرهمَا واستبدال غَيرهمَا بهما
… يَا ناعي الْإِسْلَام قُم وانعه
… قد زَالَ عرف وبدا مُنكر
…
ইমাম রাফেয়ি বলেন, সকলে যেন এ ব্যাপারে একমত যে বর্তমান যুগে কোনো মুজতাহিদ (مجتهد) নেই। ইমাম যারকাশি বলেন, সম্ভবত তিনি এটি ইমাম রাজির বক্তব্য থেকে অথবা ইমাম গাজ্জালির আল-অসিত গ্রন্থের বক্তব্য থেকে গ্রহণ করেছেন, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বর্তমান কাল স্বাধীন মুজতাহিদ (مجتهد مستقل) শূন্য হয়ে পড়েছে। অতঃপর তিনি এর ওপর মন্তব্য করে বলেন, এ বিষয়ে ঐকমত্য (إجماع) বর্ণনা করা আশ্চর্যজনক; অথচ বিষয়টি আমাদের এবং হাম্বলিদের মধ্যে একটি মতপার্থক্যপূর্ণ (خلافية) মাসআলা। আমাদের কিছু ইমামও তাদের সমর্থন করেছেন। হাম্বলিগণ বলেছেন যে, কোনো যুগ মুজতাহিদ (مجتهد) শূন্য হওয়া জায়েজ নয়। ইবনু বাদরান বলেন, আমাদের সাথীগণ (হাম্বলিগণ) এই মত পোষণ করেছেন যে, কোনো কাল মুজতাহিদ (مجتهد) শূন্য হওয়া বৈধ নয় এবং একদল আলিমও এই মতের দিকে গিয়েছেন। ইবনু আকিল কিছু হাদিস বিশারদ (محدثون) ব্যতীত এর বিপরীত কোনো মত উল্লেখ করেননি।
ইজতিহাদের (اجتهاد) দরজা বন্ধ করার বিষয়ে আলেমদের প্রতিবাদ যোগ্য আলেমদের জন্য ইজতিহাদের (اجتهاد) পথ রুদ্ধ করা উম্মতের ওপর অন্ধ অনুসরণের (تقليد) অন্যতম একটি অপরাধ। শাওকানি বলেন, এই নির্দিষ্ট উক্তিটি অর্থাৎ ইজতিহাদের (اجتهاد) পথ রুদ্ধ হওয়া—যদি অন্ধ অনুসরণের (تقليد) অপকারিতাগুলোর (مفاسد) মধ্যে কেবল এটিই প্রকাশ পেত, তবে এটিই (ক্ষতির জন্য) যথেষ্ট এবং চূড়ান্ত হতো। কারণ এটি এমন এক নবউদ্ভাবিত বিষয় যা সমগ্র শরিয়তকে (شريعة) বিলুপ্ত করে দিয়েছে এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর রহিতকরণ (نسخ) এবং এই দুইয়ের পরিবর্তে অন্য কিছুকে স্থলাভিষিক্ত করা ও অগ্রাধিকার দেওয়াকে আবশ্যক করে তুলেছে
… হে ইসলামের শোকগাথা পাঠকারী, ওঠো এবং বিলাপ করো
… পরিচিত সুন্নাহ বিলুপ্ত হয়েছে এবং বর্জনীয় (منكر) বিষয় প্রকাশিত হয়েছে
…
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ২৯)
وَقد رد الْعلمَاء على هَذِه الْمقَالة فِي كل عصر وإليكم بَيَان وجهات نظرهم حول سد بَاب الإجتهاد بِاخْتِصَار نصا أَو إِشَارَة قَالَ أَبُو الْحسن عَليّ بن عمر الْمَعْرُوف بِابْن الْقصار الْمَالِكِي الْبَغْدَادِيّ ت 397 هـ فِي كِتَابه الْمُقدمَة فِي أصُول الْفِقْه الْبَاب التَّاسِع عشر فِي الإجتهاد وَفِيه تِسْعَة فُصُول ثمَّ قَالَ الثَّالِث فِيمَن يتَعَيَّن عَلَيْهِ الإجتهاد أفتى أَصْحَابنَا رضي الله عنهم بِأَن الْعلم على قسمَيْنِ فرض عين وَفرض كِفَايَة فَفرض الْعين الْوَاجِب على كل أحد هُوَ علمه بحالته الَّتِي هُوَ فِيهَا وَأما فرض الْكِفَايَة الْعلم الَّذِي لَا يتَعَلَّق بِحَالَة الْإِنْسَان فَيجب على الْأمة أَن تكون مِنْهُم طَائِفَة يتفقهون فِي الدّين ليكونوا قدوة للْمُسلمين حفظا للشَّرْع من الضّيَاع وَالَّذِي يتَعَيَّن لهَذَا من النَّاس من جاد حفظه وَحسن إِدْرَاكه وَطَابَتْ سجيته وَمن لَا فَلَا وَقَالَ أَبُو الْحسن عَليّ بن مُحَمَّد الْمَاوَرْدِيّ ت 405 هـ التَّقْلِيد مُخْتَلف باخْتلَاف أَحْوَال النَّاس بِمَا فيهم من آلَة الِاجْتِهَاد الْمُؤَدِّي إِلَيْهِ أَو عَدمه لِأَن طلب الْعلم من فروض الْكِفَايَة وَلَو منع جَمِيع النَّاس من التَّقْلِيد وكلفوا الِاجْتِهَاد لتعين فرض الْعلم على الكافة وَفِي هَذَا اختلال نظام وَفَسَاد فَلَو كَانَ يجمعهُمْ التَّقْلِيد لبطل الِاجْتِهَاد وَسقط فرض الْعلم وَفِي هَذَا تَعْطِيل الشَّرِيعَة وَذَهَاب الْعلم فَلذَلِك وَجب الِاجْتِهَاد على من تقع بِهِ الْكِفَايَة قَالَ أَبُو مُحَمَّد عَليّ بن حزم الأندلسي الظَّاهِرِيّ ت 456 هـ بعد نقل قَوْلهم
বিদ্বানগণ প্রত্যেক যুগে এই বক্তব্যের প্রতিউত্তর দিয়েছেন। ইজতিহাদের (اجتهاد) দ্বার রুদ্ধ করার বিষয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা—যা স্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতে ব্যক্ত হয়েছে—আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করা হলো। আবু আল-হাসান আলি ইবনে উমর, যিনি ইবনুল কাসসার আল-মালিকি আল-বাগদাদি (মৃত্যু ৩৯৭ হিজরি) নামে পরিচিত, তাঁর 'আল-মুকাদ্দিমাহ ফি উসুলিল ফিকহ' গ্রন্থের ঊনবিংশ অধ্যায়ে—যা ইজতিহাদ (اجتهاد) বিষয়ক এবং নয়টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত—বলেন: "তৃতীয় পরিচ্ছেদটি হলো তাঁদের সম্পর্কে যাদের ওপর ইজতিহাদ (اجتهاد) করা অবধারিত। আমাদের ইমামগণ (আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন) ফতোয়া দিয়েছেন যে, জ্ঞান দুই প্রকার: ফরজে আইন (فرض عين) এবং ফরজে কিফায়া (فرض كفاية)। ফরজে আইন (فرض عين) যা প্রত্যেকের ওপর আবশ্যক, তা হলো নিজের সমসাময়িক অবস্থা ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। আর ফরজে কিফায়া (فرض كفاية) হলো সেই জ্ঞান যা মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয়। এমতাবস্থায় উম্মতের ওপর ওয়াজিব হলো তাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে, যাতে তারা মুসলিমদের জন্য আদর্শ হতে পারে এবং শরিয়তকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। আর মানুষের মধ্যে এই কাজের জন্য তারাই নির্দিষ্ট হবে যাদের মুখস্থশক্তি প্রবল, অনুধাবন ক্ষমতা প্রখর এবং স্বভাব নির্মল; যাদের মধ্যে এই গুণাবলি নেই তারা নয়।" আবু আল-হাসান আলি ইবনে মুহাম্মদ আল-মাওয়ার্দি (মৃত্যু ৪০৫ হিজরি) বলেন: "তাকলিদ (تقليد) মানুষের অবস্থাভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে; যা তাদের মধ্যে ইজতিহাদ (اجتهاد) করার যোগ্যতা থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভরশীল। কারণ জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরজে কিফায়া (فرض كفاية) এর অন্তর্ভুক্ত। যদি সকল মানুষকে তাকলিদ (تقليد) থেকে বারণ করা হতো এবং ইজতিহাদ (اجتهاد) করতে বাধ্য করা হতো, তবে জ্ঞান অর্জন করা সকলের ওপর ফরজে আইন হয়ে যেত; আর এতে সমাজব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় দেখা দিত। আবার যদি সবাই কেবল তাকলিদ (تقليد) করত, তবে ইজতিহাদ (اجتهاد) বিলুপ্ত হতো এবং জ্ঞান অর্জনের আবশ্যকতা রহিত হয়ে যেত, যার ফলে শরিয়ত অকেজো হয়ে যেত এবং ইলম বিদায় নিত। তাই যাদের দ্বারা এই আবশ্যকতা পূরণ হওয়া সম্ভব, তাদের ওপর ইজতিহাদ (اجتهاد) করা ওয়াজিব।" আবু মুহাম্মদ আলি ইবনে হাজম আল-আন্দালুসি আজ-জাহিরি (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি) তাঁদের বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর বলেন—
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৩০)
لَيْسَ لأحد أَن يخْتَار فأقوال فِي غَايَة الْفساد وَكيد للدّين لإخفاء بِهِ وضلال مغلق وَكذب على الله تَعَالَى إِذْ نسبوا ذَلِك إِلَيْهِ أَو دين جَدِيد أتونا بِهِ من عِنْد أنفسهم لَيْسَ من دين مُحَمَّد صلى الله عليه وسلم فِي شَيْء وَهِي كَمَا نرى متدافعة متفاسدة ودعاوي متفاضحة متكاذبة لَيْسَ بَعْضهَا بِأولى من بعض وَلَا بَعْضهَا أَدخل فِي الضَّلَالَة والحمق من بعض وَقَالَ القَاضِي حُسَيْن بن مُحَمَّد بن أَحْمد الْمروزِي ت 462 هـ نقلا عَن الزبير فِي المسكت لن تَخْلُو الأَرْض من قَائِم لله بِالْحجَّةِ فِي كل وَقت وعهد وزمان وَذَلِكَ قَلِيل فِي كثير فَأَما أَن يكون غير مَوْجُود كَمَا قَالَ الْخصم فَلَيْسَ بصواب لِأَنَّهُ لَو عدم المجتهدون لم تقم الفراض كلهَا وَلَو بطلت الفراض كلهَا لحلت النقمَة بذلك فِي الْخلق وَقَالَ ابْن عقيل الْحَنْبَلِيّ ت 514 هـ لم يذكر خلاف هَذَا أَي خلاف عدم جَوَاز خلو الْعَصْر عَن مُجْتَهد فِي أَصْحَابنَا إِلَّا عَن بعض الْمُحدثين وَقَالَ أَبُو مُحَمَّد الْحُسَيْن بن مَسْعُود اللّغَوِيّ الْمَعْرُوف بِابْن الْفراء ت 516 هـ
কারও জন্য (নিজের পছন্দ অনুযায়ী) কোনো মত বেছে নেওয়ার অধিকার নেই; কারণ এই বক্তব্যগুলো চরম বিপর্যয়পূর্ণ এবং দ্বীনকে বিলুপ্ত করার একটি ষড়যন্ত্র, গভীর বিভ্রান্তি এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি মিথ্যাচার। কারণ তারা এগুলো তাঁর দিকে সম্বন্ধ করেছে অথবা তারা নিজেদের পক্ষ থেকে নতুন এক ধর্ম নিয়ে এসেছে, যার সাথে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দ্বীনের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। আর আমরা যেমনটি দেখতে পাচ্ছি, এই মতগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক ও ত্রুটিপূর্ণ এবং এদের দাবিগুলো পরস্পরকে লাঞ্ছিতকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। এদের একটি অপরটির চেয়ে কোনোভাবেই শ্রেয় নয় এবং এদের একটির বিভ্রান্তি ও মূর্খতা অপরটির চেয়ে কম নয়। কাজী হুসাইন ইবন মুহাম্মদ ইবন আহমদ আল-মারওয়াযী (মৃত্যু ৪৬২ হিজরি) 'আল-মুসকিত' গ্রন্থে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, পৃথিবী কোনো কালেই, কোনো যুগে বা সময়ে আল্লাহর দলিল (حجة) পেশকারী থেকে শূন্য থাকবে না; যদিও সংখ্যায় অধিক লোকের মধ্যে তারা হবে নগণ্য। প্রতিপক্ষ যেমনটি বলেছে যে, এমন কেউ বিদ্যমান নেই—তা সঠিক নয়। কারণ যদি মুজতাহিদগণ (مجتهدون) না থাকেন, তবে সমস্ত ফরজ বা আবশ্যিক বিধানসমূহ (فرائض) প্রতিষ্ঠিত থাকবে না; আর যদি সমস্ত ফরজ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে তার কারণে সৃষ্টির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। ইবন আকিল আল-হাম্বলি (মৃত্যু ৫১৪ হিজরি) বলেছেন, আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে কেবল কিছু হাদিস বিশারদগণ (محدثون) ব্যতীত আর কেউ এর বিপরীতে কোনো মত দেননি; অর্থাৎ কোনো যুগ মুজতাহিদ (مجتهد) শূন্য হওয়া অসম্ভব হওয়ার বিষয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করেননি। আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবন মাসউদ আল-লুগাভী, যিনি ইবনুল ফারা (মৃত্যু ৫১৬ হিজরি) নামে পরিচিত, তিনি বলেছেন—
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৩১)
الْعلم يَنْقَسِم إِلَى فرض عين وَفرض كِفَايَة وَذكر فرض الْعين ثمَّ قَالَ وَفرض الْكِفَايَة هُوَ أَن يتَعَلَّم مَا يبلغ رُتْبَة الِاجْتِهَاد وَمحل الْفَتْوَى وَالْقَضَاء وَيخرج من عداد المقلدين فعلى كَافَّة النَّاس الْقيام بتعلمه غير أَنه إِذا قَامَ من كل نَاحيَة وَاحِد أَو اثْنَان سقط الْفَرْض عَن البَاقِينَ فَإِذا قعد الْكل عَن تعلمه عصوا جَمِيعًا لما فِيهَا من تَعْطِيل أَحْكَام الشَّرْع قَالَ الله تَعَالَى {فلولا نفر من كل فرقة مِنْهُم طَائِفَة ليتفقهوا فِي الدّين} التَّوْبَة 122 وَقَالَ أَبُو الْفَتْح أَحْمد بن عَليّ بن مُحَمَّد الْمَعْرُوف بِابْن برهَان ت 520 هـ الْبَارِي سبحانه وتعالى قَادر على التَّنْصِيص على حكم الْحَوَادِث والوقائع وَلم يفعل وَلَكِن نَص على أصُول ورد معرفَة الحكم فِي الْفُرُوع إِلَى النّظر وَالِاجْتِهَاد قَالَ أَبُو الْفَتْح مُحَمَّد بن عبد الكريم الشهرستاني ت 548 هـ ثمَّ الِاجْتِهَاد من فروض الكفايات لَا من فروض الْأَعْيَان حَتَّى إِذا اشْتغل بتحصيله وَاحِد سقط الْفَرْض عَن الْجَمِيع وَإِن قصر فِيهِ أهل عصر عصوا بِتَرْكِهِ وأشرفوا على خطر عَظِيم فَإِن الْأَحْكَام الاجتهادية إِذا كَانَت مرتبَة على الِاجْتِهَاد وترتيب الْمُسَبّب على السَّبَب وَلم يُوجد السَّبَب كَانَت الْأَحْكَام عاطلة فَلَا بُد إِذن من مُجْتَهد قَالَ السُّيُوطِيّ فَانْظُر كَيفَ حكم بعصيان أهل الْعَصْر بأسرهم إِذا قصروا فِي الْقيام بِهَذَا الْفَرْض وَأقَام على فرضيته دَلِيلا عقليا قَطْعِيا لَا شُبْهَة فِيهِ
জ্ঞান ব্যক্তিগত আবশ্যকতা (فرض عين) এবং সামষ্টিক আবশ্যকতা (فرض كفاية)-এ বিভক্ত। তিনি ব্যক্তিগত আবশ্যকতা (فرض عين)-এর কথা উল্লেখ করার পর বলেন যে, সামষ্টিক আবশ্যকতা (فرض كفاية) হলো এমন জ্ঞান অর্জন করা যা গবেষণার স্তর (رتبة الِاجْتِهَاد), ফতোয়া প্রদানের যোগ্যতা এবং বিচারকার্য পরিচালনার পর্যায়ে পৌঁছে দেয় এবং তাকে অন্ধ অনুসারীদের (مقلدين) গণ্ডি থেকে বের করে আনে। সুতরাং সকল মানুষের ওপরই এটি শিক্ষা করার দায়িত্ব বর্তায়, তবে প্রতিটি এলাকা থেকে যদি এক বা দুইজন এটি সম্পন্ন করেন, তবে অবশিষ্টদের ওপর থেকে এই আবশ্যকতা (الفرض) রহিত হয়ে যায়। কিন্তু যদি সকলে এটি শিক্ষা করা থেকে বিরত থাকে, তবে শরীয়তের বিধানাবলি অচল হয়ে পড়ার কারণে তারা সকলেই পাপে লিপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান (يتفقهوا) অর্জন করতে পারে" (সুরা আত-তাওবাহ: ১২২)।
আবুল ফাতহ আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ, যিনি ইবনে বুরহান (মৃত্যু: ৫২০ হিজরি) নামে পরিচিত, তিনি বলেন: মহান স্রষ্টা সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল নতুন উদ্ভূত সমস্যা ও ঘটনার বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা (التنصيص) করতে সক্ষম ছিলেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তিনি মূলনীতিগুলোর (أصول) ওপর পাঠ (نص) প্রদান করেছেন এবং শাখা-প্রশাখাগুলোর (فروع) বিধান নির্ণয়ের দায়িত্ব চিন্তাভাবনা (النظير) ও গবেষণার (الاجتهاد) ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
আবুল ফাতহ মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারিম শাহরাস্তানি (মৃত্যু: ৫৪৮ হিজরি) বলেন: অতঃপর গবেষণা (الاجتهاد) সামষ্টিক আবশ্যকতার (فروض الكفايات) অন্তর্ভুক্ত, ব্যক্তিগত আবশ্যকতার (فروض الأعيان) অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি যদি একজন ব্যক্তি এটি অর্জনে ব্রতী হন, তবে সকলের পক্ষ থেকে এই আবশ্যকতা (الفرض) রহিত হয়ে যায়। আর যদি কোনো যুগের মানুষ এতে অবহেলা করে, তবে তারা এটি বর্জনের কারণে পাপে লিপ্ত হবে এবং এক মহা বিপদের সম্মুখীন হবে। কেননা গবেষণালব্ধ বিধানগুলো (الأحكام الاجتهادية) যখন গবেষণার (الاجتهاد) ওপর নির্ভরশীল এবং কার্যকারণের বিন্যাসের (ترتيب المسبب على السبب) ওপর প্রতিষ্ঠিত, এমতাবস্থায় যদি সেই কারণটিই (السبب) না থাকে, তবে বিধানগুলো অচল হয়ে পড়বে। সুতরাং একজন গবেষক (مجتهد) থাকা অপরিহার্য।
ইমাম সুয়ূতী বলেন: লক্ষ্য করুন, তিনি কীভাবে এক যুগের সকল মানুষকে পাপী হওয়ার ফয়সালা দিয়েছেন যদি তারা এই আবশ্যকতা (الفرض) পালনে অবহেলা করে। আর তিনি এর আবশ্যকতার সপক্ষে এমন একটি অকাট্য (قطعيا) ও সংশয়হীন যৌক্তিক দলিল (دليلا عقليا) উপস্থাপন করেছেন যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
(খণ্ড: ১)
ইরশাদুন নুক্কাদ ইলা তাইসীরিল ইজতিহাদ
(পৃষ্ঠা: ৩২)
وَقَالَ الْعِزّ بن عبد السلام ت 660 هـ شرحا لقَوْل ابْن الْحَاجِب إِنَّه لَا يجوز تَوْلِيَة الْمُقَلّد الْبَتَّةَ وَيرى هَذَا الْقَائِل أَن رُتْبَة الإجتهاد مَقْدُور على تَحْصِيلهَا وَهِي شَرط فِي الْفَتْوَى وَالْقَضَاء وَهِي مَوْجُودَة إِلَى الزَّمَان الَّذِي أخبر صلى الله عليه وسلم عَنهُ بِانْقِطَاع الْعلم وَلم نصل إِلَيْهِ إِلَى الْآن وَإِلَّا كَانَت الْأمة مجتمعة على الْخَطَأ وَذَلِكَ بَاطِل وَقَالَ السُّيُوطِيّ مُعَلّقا عَلَيْهِ فَانْظُر كَيفَ صرح بِأَن رُتْبَة الِاجْتِهَاد غير متعذرة وَإِنَّهَا بَاقِيَة إِلَى زَمَانه وَبِأَنَّهُ يلْزم من فقدها اجْتِمَاع الْأمة على الْبَاطِل وَهُوَ محَال وَقَالَ مُحَمَّد بن مُحَمَّد بن إِبْرَاهِيم الْأنْصَارِيّ الْمَعْرُوف بِابْن سراقَة الشَّافِعِي ت 662 هـ وَلَو كَانَ جَمِيع الْعلم جليا لَا يحْتَاج إِلَى بحث واجتهاد وَلَا إِلَى نظر واستنباط لَكَانَ علم التَّوْحِيد كَذَلِك فَكَانَ الْعلم بِاللَّه سُبْحَانَهُ ضَرُورَة وَكَانَ فِي ذَلِك سُقُوط المثوبة وَإِبْطَال الشَّرِيعَة وَاسْتغْنى عَن الْعَمَل لطلب الثَّوَاب وَخَوف الْعقَاب وَهَذِه صفة الْآخِرَة وَحكم بَقَاء الْخلق فِي الْجنَّة قَالَ السُّيُوطِيّ مُعَلّقا عَلَيْهِ فَانْظُر كَيفَ جعل ترك الإجتهاد مُؤديا إِلَى إبِْطَال الشَّرِيعَة وَهُوَ نَظِير مَا نَص عَلَيْهِ غَيره قَالَ يحيى بن شرف النَّوَوِيّ ت 676 هـ الْمُجْتَهد الْمُطلق هُوَ الَّذِي يتَأَدَّى بِهِ فرض الْكِفَايَة
ইজ্জ বিন আব্দুস সালাম (মৃত্যু ৬৬০ হিজরি) ইবনুল হাজিবের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন যে, মুকাল্লিদ (مقلد) বা অনুসারীকে কোনোভাবেই নিয়োগ দেওয়া বৈধ নয়। এই বক্তা মনে করেন যে, ইজতিহাদের (اجتهاد) স্তর অর্জন করা আয়ত্তাধীন এবং এটি ফতোয়া ও বিচারকার্যের জন্য একটি শর্ত। এটি সেই সময় পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে যে সময় সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলম বা জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন, আর আমরা এখন পর্যন্ত সেই সময়ে পৌঁছাইনি। অন্যথায় সমগ্র উম্মত ভুলের ওপর ঐক্যবদ্ধ হতো, যা বাতিল (باطل)। সুয়ূতী এর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, লক্ষ্য করুন তিনি কীভাবে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ইজতিহাদের (اجتهاد) স্তর অর্জন করা দুঃসাধ্য নয় এবং তা তাঁর সময় পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল; এবং এটিও যে, এর অনুপস্থিতিতে উম্মতের বাতিলের (باطل) ওপর একমত হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা অসম্ভব (محال)। ইবনে সুরাকা আশ-শাফিয়ী হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম আল-আনসারি (মৃত্যু ৬৬২ হিজরি) বলেন: যদি সমস্ত জ্ঞান সুস্পষ্ট হতো যার জন্য কোনো গবেষণা ও ইজতিহাদ (اجتهاد), কিংবা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও নির্যাস উদ্ঘাটনের (استنباط) প্রয়োজন না হতো, তবে তাওহীদের জ্ঞানও তেমনি হতো। ফলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা স্বতঃসিদ্ধ হয়ে পড়ত, আর এতে প্রতিদান রহিত হতো এবং শরীয়ত অকার্যকর হয়ে যেত। তখন সওয়াব অর্জন ও শাস্তির ভয়ে আমল করার প্রয়োজনীয়তা থাকতো না; আর এটি পরকালের বৈশিষ্ট্য এবং জান্নাতে সৃষ্টির চিরস্থায়ী অবস্থানের বিধান। সুয়ূতী এর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, লক্ষ্য করুন তিনি কীভাবে ইজতিহাদ (اجتهاد) বর্জন করাকে শরীয়ত বাতিলের কারণ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন; যা অন্যান্য আলেমদের বক্তব্যের অনুরূপ। ইয়াহইয়া বিন শরাফ আন-নববী (মৃত্যু ৬৭৬ হিজরি) বলেন: মুজতাহিদ মুতলাক (المجتهد المطلق) বা স্বাধীন গবেষক তিনিই, যার মাধ্যমে ফরজে কিফায়া (فرض الكفاية) আদায় হয়।