القسم: التراجم والطبقات
الكتاب: مسامرات الظريف بحسن التعريف
المؤلف: محمد بن عثمان بن محمد السنوسي، أبو عبد الله (ت 1318هـ)
[الكتاب مرقم آليا غير موافق للمطبوع]
عدد الصفحات: 488
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: জীবনী ও স্তরসমূহ
গ্রন্থ: সুনিপুণ পরিচয়ের মাধ্যমে সুধীজনের সান্ধ্যকালীন আলাপচারিতা
লেখক: মুহাম্মদ বিন উসমান বিন মুহাম্মদ আস-সানুসী, আবু আব্দুল্লাহ (মৃত্যু ১৩১৮ হিজরি)
[গ্রন্থটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যায়িত, যা মুদ্রিত কপির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়]
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৮৮
শামিলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
আমি আল্লাহর প্রশংসার পর বলছি, যাঁর মাধ্যমে বিপদ-আপদ দূরীভূত হয়, বালা-মুসিবত দূর হয়, বিপর্যয়সমূহ অপসারিত হয় এবং দুঃখ-দুর্দশা প্রতিরোধ হয়। আর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর নবী ও মনোনীত বান্দার ওপর, তাঁর প্রিয় ও নির্বাচিত রসূলের ওপর; এমন সালাত যা কষ্টের চিহ্নসমূহ মুছে দেয় এবং বিপদের বাহিনীকে পরাজিত করে। যখন কালচক্র তার সমস্ত কূটকৌশল নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে এল, আমাকে তার ভয়াবহতার নিছক পেয়ালাসমূহ পান করাল, আমাকে আমার আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করল এবং আমার পূর্ণিমাকে গ্রাস করে অন্ধকারের চাদর পরিয়ে দিল, আমার ওপর শোকের সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আমাকে পিতা ও সন্তানহীন করে দিল; ফলে তুচ্ছ ব্যক্তিরাও আমার ওপর আধিপত্য বিস্তার করল এবং আমি কোনো আর্তনাদ শ্রবণকারী বা সাহায্যকারী খুঁজে পেলাম না। আমি অনবরত তার জুলুম থেকে আশ্রয় চেয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু কোনো আশ্রয়দাতা পাচ্ছিলাম না, এবং তার বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করছিলাম কিন্তু কোনো সাহায্যকারীর দেখা মিলছিল না। এমতাবস্থায় আমি সেই পরিস্থিতির আবর্তে পঙ্কিলতা ও ভীতিপ্রদ অবস্থার সঙ্গী হয়ে পড়েছিলাম। তখন মান্যবর বিবেক আমাকে এমন এক আহ্বান জানাল যা অন্তর ও কর্ণসমূহ সাগ্রহে গ্রহণ করেছে: হে ব্যক্তি! তুমি তো এক বিস্ময়কর কাজ করেছ এবং তাঁকে ভুলে গেছ যাঁর কথা ভুলে যাওয়া সমীচীন নয়। হে মানুষ! শোক ও দুঃখের আবর্তনে তুমি এমনভাবে মূর্ছিত হয়েছ যে, তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষদের আশ্রয়ে যাওয়ার কথা বিস্মৃত হয়েছ, অথচ তাঁরাই কালের ক্ষতসমূহ নিরাময়কারী। আল্লাহর কসম! তুমি মূল দরজা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছ এবং এমন ব্যক্তির কাছে জাকাত প্রার্থনা করছ যে নেসাব পরিমাণ মালের মালিক নয়। তুমি জামিনদারের সন্ধান করছ অথচ মূল জিম্মাদার উপস্থিত রয়েছেন; নিরাপত্তা দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও তুমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আছ। আল্লাহর মনোনীত ওলী এবং আত্মমর্যাদাবান ও প্রভাবশালীদের থেকে তুমি কোথায় বিচ্যুত হয়ে আছ? সেই মহান অভিভাবক থেকে তুমি কোথায় দূরে সরে আছ, যাঁর দরবারে সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব ও গুণাবলী পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং যাঁর আহ্বানকারীর ডাকে কামনা-বাসনা সাড়া দিয়েছে; যাঁর প্রাঙ্গণে আশা-আকাঙ্ক্ষা উচ্চশিখরে আরোহণ করে এবং যাঁর সন্ধানী নিজের আশা পূরণ করে প্রত্যাবর্তন করে। যাঁর জ্ঞান দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং যাঁর দান-অনুগ্রহ মুষলধারে বৃষ্টির মতো বর্ষিত হয়। কালের পৃষ্ঠায় যাঁর গৌরবগাথা লিখিত হয়েছে এবং যাঁর ভেতর ও বাহির নির্মল হয়েছে। তিনি প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী হয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন এবং যাবতীয় কল্যাণের চরম সীমায় পৌঁছে তা করায়ত্ত করেছেন। কোনো বাক্যই কি তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার হক আদায় করতে সক্ষম? কোনো লক্ষ্যভেদী কি তাঁর গন্তব্যে পৌঁছার আশা করতে পারে? অসম্ভব, সুদূরপরাহত! তিনি তো এই যুগের ললাটের তিলক এবং মহাকালের শ্রেষ্ঠ উপহারসমূহের একটি। তিনি সচেষ্ট হয়ে গৌরব অন্বেষণ করেন এবং আসীন অবস্থায়ও নক্ষত্রতুল্য উচ্চতা স্পর্শ করেন। তিনি শরীয়ত ও হাকীকতের সমন্বয়কারী এবং অনুসারীদের পরম বন্ধু ও সাথী হিসেবে গ্রহণকারী। অতঃপর বিবেকের সেই আহ্বানে আমি আমার তন্দ্রা থেকে সজাগ হলাম এবং আমার গাফলত থেকে চৈতন্য ফিরে পেলাম। আমি বুঝতে পারলাম যে আমি তৃষ্ণার্ত অথচ পানি আমার সম্মুখেই ছিল, আমি পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম অথচ আমার পাশেই আমার ইমাম বিদ্যমান ছিলেন। আর এই সম্বোধন ও উত্তরের উদ্দেশ্য এবং তত্ত্বজ্ঞানের নিশানধারী হলেন তিনিই, যাঁর সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই। যিনি সূক্ষ্ম জ্ঞান ও সুগভীর উপলব্ধির মাধ্যমে বিস্ময়কর বিষয়াদি আনয়ন করেন। তিনি অবশিষ্ট পণ্ডিতগণের উত্তরসূরি এবং কঠিন সময়ের জন্য সঞ্চিত সম্পদ। যিনি তাঁর আশ্রয়ে আসা ব্যক্তিকে সুরক্ষা প্রদান করেন এবং তৃষ্ণার্ত আগন্তুককে পরিতৃপ্ত করেন। তিনি আমার নির্ভরতা ও আশ্রয়স্থল, আমার পাথেয় ও পরিত্রাণ দাতা, আমার মুক্তি ও উদ্ধারের উৎস এবং আমার সমস্ত গন্তব্য ও শরণাপন্নের মূল লক্ষ্য। তিনি প্রজ্ঞার চূড়ান্ত ফলাফল, যাতে কোনো সন্দেহ বা অস্পষ্টতা নেই; তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের আধার, যাঁর সমকক্ষ হওয়া আয়াসের পক্ষেও সম্ভব নয়। যখন সমস্ত ভিত্তি বিলীন হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি মারেফতের ভিত্তি উন্মোচন করেছেন। যখন মানুষ আধ্যাত্মিক শিক্ষার পোশাক ত্যাগ করেছিল, তখন তিনি সেই ভূষণে সজ্জিত হয়েছিলেন। তিনি আমার মাওলা ও উস্তাদ আবুল আব্বাস, সাইয়্যিদি আহমদ বিন পাবাস। তিনি সর্বদা জ্ঞান ও মারেফতের নিত্যনতুন শাখা-প্রশাখায় সমৃদ্ধ থাকুন; তিনি এই যুগের এক বিস্ময়কর নিদর্শন এবং আদনানি বংশের সুন্নাহর পতাকাবাহী ও প্রচারক।
তিনি আট রবিউল আউয়াল প্রত্যাবর্তন করলেন এবং আইন প্রণেতাদের তাদের কাজ সম্পন্ন করার জন্য উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে নিজের সুদৃঢ় নীতি অনুসরণ করলেন। তিনি কাজ সম্পন্ন করলেন এবং আইনী পরিষদগুলো গঠন করলেন। এ উপলক্ষে হিজরি ১২৭৭ সালের শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি রবিবার রাতে দেশটি নজিরবিহীনভাবে সজ্জিত হলো। রবিবার সকালে পরিষদসমূহের সভার সূচনা হলো। সেগুলোকে নিম্নোক্ত ক্রমানুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছিল: 'মজলিসুল আকবার' বা উচ্চ পরিষদ, যার দুইজন সভাপতি ছিলেন: মুস্তফা সাহেবুত তাবি এবং মুস্তফা খাজনাদার, আর এর সচিব ছিলেন খায়রুদ্দিন। এরপর 'মজলিসুল ইতিয়াদি' বা সাধারণ পরিষদ, যার সভাপতি ছিলেন মুহাম্মদ খাজনাদার এবং সচিব ছিলেন হাসুনা বিন আহমদ আল-হাদ্দাদ আল-আন্দালুসি। এরপর 'মজলিসুত তাহকীক' বা তদন্ত পরিষদ, যার সভাপতি ছিলেন সাহেবুত তাবি ইসমাইল আস-সুন্নি এবং সচিব ছিলেন শেখ মুহাম্মদ আশ-শাহিদ। এবং 'মজলিসুল জিনায়াত' বা ফৌজদারি পরিষদ, যার সভাপতি ছিলেন ফারহাত আগা আল-কাফ এবং সচিব ছিলেন শেখ সালিহ আন-নিফার। পরিষদগুলো আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা শুরু করল এবং জাতি তাদের বিচার ও রীতিনীতিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদর্শন করল। প্রায় তিন বছর আইনের শাসন অব্যাহত থাকল। তবে উচ্চ পরিষদ রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধির লক্ষে সহায়তা করকে ছয়টি স্তরে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিল, যার সর্বনিম্ন ছিল ছত্রিশ এবং সর্বোচ্চ ছিল একশত আট রিয়াল। এটি শহর ও গ্রামবাসী এবং রাজ্যের সকল বিদেশী বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তাদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারণ করা হতো। এই বিষয়ে উচ্চ পরিষদের প্রস্তাব হিজরি ১২৮০ সালের ১০ই শাওয়াল জারি হয়। অতঃপর সাধারণ ব্যক্তিদের জন্য বাহাত্তর রিয়াল নির্ধারণ করা হয় এবং এ সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আদেশ জারি করা হয়। যখন এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল, রাজ্যের অধিবাসীদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হলো। শহরের বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ এবং যাযাবর মরুবাসীদের বিচক্ষণ অংশ অভিযোগ উত্থাপন করল এবং বিনয়ের সাথে কর কমানোর আবেদন জানাল। কিন্তু রূঢ় যাযাবর মরুবাসীরা, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষজন একত্রিত হয়ে অস্ত্র ধারণ করল, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিল এবং বিদ্রোহের সংকল্প করল। তাদের এই ধূর্ততার নেতৃত্ব দিল তাদেরই এক রূঢ় ব্যক্তি, যে মূলত মাজের বংশোদ্ভূত এবং যার নাম ছিল আলী বিন গাযাহুম। ফারহাত আগা আল-কাফ একটি সেনাদল নিয়ে তাদের অঞ্চলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন, কিন্তু 'ওয়াানিফা' গোত্রের লোকেরা তাকে প্রতিহত করল এবং তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেল। তাদের মূর্খরা সীমা ছাড়িয়ে গেল এবং তারা আইন বাতিলের দাবি জানাতে লাগল। এমতাবস্থায় হিজরি ১২৮০ সালের ২৪শে জিলকদ সকালে আইন স্থগিত করার রাজকীয় নির্দেশ জারি করা হলো। পরের দিন ছত্রিশ রিয়ালের অতিরিক্ত কর মওকুফের উচ্চপর্যায়ের আদেশ জারি করা হলো। ১২৮০ হিজরি সনের ২৫শে জিলকদ রাজ্যের সর্বত্র তা ঘোষণা করা হলো। অতঃপর বিজয়ী বাহিনীগুলো অভিযানে বের হলো। সাহেবুত তাবি ইসমাইল আস-সুন্নি প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে পাহাড়ের দিকে যাত্রা করলেন। তিনি অত্যন্ত কোমলতার সাথে পরিস্থিতি পরিচালনা করলেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তার আশ্বাসে যাযাবরদের ক্ষোভ প্রশমিত করলেন। তাদের ঐক্য ভেঙে গেল এবং কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও যাযাবরদের মধ্যে লুঠতরাজ হওয়ার পর তাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা মূর্খদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন। যখন ফিতনা প্রায় শান্ত হয়ে এল, তখন সাহেবুত তাবি উক্ত বাহিনী থেকে অসুস্থ অবস্থায় ফিরে এলেন এবং তার পরিবর্তে সেই বাহিনীর প্রধান হিসেবে আমালিয়্যাহর উজির রুস্তম সেখানে যাত্রা করলেন।
এরপর বিদ্রোহীদের নেতা আলী বিন গাযাহুম পুনরায় সক্রিয় হলেন এবং গোত্রগুলোকে নিজের পক্ষে জমায়েত করতে শুরু করলেন। সে নিজের জন্য রাজত্বের আকাঙ্ক্ষা করল এবং তার জন্য উজির নিয়োগ করল যারা তাকে 'বায় আলী বিন গাযাহুম' বলে সম্বোধন করত। সে একটি সিলমোহর এবং লেখকদল তৈরি করল এবং তার আদেশসমূহ বিদ্রোহীদের মাঝে কার্যকর হতে লাগল। এই ব্যাধি রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। যুদ্ধমন্ত্রী আহমদ জাররুক পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে রওনা হলেন। যখন সাধারণ বাহিনীর জরীদ অভিমুখে যাত্রার সময় উপস্থিত হলো, তখন আমির আলী বায় পনের হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বের হলেন। অধিকাংশ অঞ্চলে বিপর্যয় দেখা দিল। আমালিয়্যাহর উজির রুস্তম বিদ্রোহীদের নেতা আলী বিন গাযাহুমের সন্ধানে বের হলেন এবং তার বিজয়ী বাহিনী নিয়ে তার পিছু নিলেন। তিনি পদাতিক ও অশ্বারোহী যাযাবরদের দলের সাথে যুদ্ধ করলেন এবং আমির আলী বায়ের বাহিনীর সাহায্য চাইলেন। যাযাবররা তাজমুট নামক স্থানে তার মুখোমুখি হলো। তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, তাই কামানগুলো সারিবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত অশ্বারোহীদের তাদের মোকাবেলা করার নির্দেশ দিলেন। যখন বিদ্রোহীদের ঢল স্তিমিত হয়ে এল, তখন অশ্বারোহীরা কামানের পেছনে সরে এল এবং তাদের লক্ষ্য করে কামানগুলো অগ্নিবর্ষণ শুরু করল। এতে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে পলায়ন করল এবং জমিন তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল; তাদের লাশের স্তূপ পড়ে রইল। অশ্বারোহীরা তাদের পিছু ধাওয়া করল। যখন সেই হতভাগা বিদ্রোহী নেতা তার এই দশা দেখল এবং বুঝতে পারল যে সে ধরা পড়তে যাচ্ছে, তখন সে রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে পালিয়ে গেল এবং 'লামামশা' গোত্রের মধ্যে আশ্রয় নিল। ১২৮১ হিজরি সনের ১৪ই শাবান তার বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর তাদের নেতা তাকে বন্দি করল। এরপর তাকে 'হালক আল-ওয়াদি'র কারাগারে নিয়ে আসা হলো এবং সেখানেই সে মৃত্যুবরণ করল।
আর যুদ্ধমন্ত্রী আহমদ জাররুকের সেনাদলের কথা বললে বলতে হয়, তারা উপকূলীয় বিদ্রোহীদের দমন করতে অগ্রসর হয়ে হালকুল মানজিল নামক স্থানে অবতরণ করে। তাদের সাথে জেলাস গোত্র এবং আল-কালা আল-কুবরা শহরের অধিবাসীরা যোগদান করে। সেনাদলটি উক্ত শহরের নিকটবর্তী হলে খবর আসে যে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্রোহীরা তাদের এক হতভাগ্য নেতা মাসাকেন শহরের দাহমানি আল-বুজির নেতৃত্বে সমবেত হয়েছে। অতঃপর বিদ্রোহীরা সেনাদলের ওপর হামলা চালায় এবং সেনাদলটি ১২৮১ হিজরি সনের পহেলা জুমাদাল উলা শুক্রবার তাদের সাথে যোগদানকারী লোকবল নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে। সেনাদলটি বিজয়ী হয় এবং দাহমানি ও তার প্রধান সহযোগীদের বন্দি করা হয় এবং তাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের ফিতনা প্রশমিত হয় এবং সেই অঞ্চলের সামরিক লোকবল সেবার কাজে আনুগত্য প্রকাশ করে। এরপর সেনাদলটি সুসা শহরের চারপাশে অবস্থান নেয়, কারণ তারা অবাধ্য হওয়ার সাহস করেনি। জেলাস গোত্র ফিরে যায়, তবে তাদের কিছু লোক কাইরাওয়ানের ওপর চড়াও হয়েছিল এবং তারা এর গভর্নর রশিদ কাহিয়ার ক্ষতি করার উপক্রম করেছিল। যখন বিদ্রোহী নেতাদের বন্দি করার কাজ সমাপ্ত হলো, তখন রাষ্ট্রের সমর্থকদের হাত বিদ্রোহের সদস্যদের এবং তাদের অনুসারীদের পাকড়াও করতে সচেষ্ট হলো। যারা বিভেদের কাঠি নেড়েছিল, তাদের প্রত্যেকেই হত্যা, কারাবাস অথবা প্রহারের মতো শাস্তি ভোগ করল। বিদ্রোহের ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষে অনেক অপরাধীর ওপর কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। এই জরিমানা আল-আরাদ, জারবা, সাফাকুস এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্ত শহরের ওপর ধার্য করা হয়; কেবল সুসা ও আল-কালা আল-কুবরা এর আওতামুক্ত ছিল, কারণ তারা পূর্বেই আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। আমির আলী বের সেনাদল বন্দি বিদ্রোহীদের সাথে নিয়ে ফিরে আসে এবং ১২৮১ হিজরি সনের ২ জিলহজ বৃহস্পতিবার রাজধানীতে প্রবেশ করে।
শনিবার মহামান্য মুশির একটি নতুন পদক বিতরণ করেন, যা তিনি বিশেষভাবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। এটি স্বর্ণ ও রৌপ্য—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। তিনি তার ভাই সেনাপ্রধানকে একটি স্বর্ণপদক পরিয়ে দেন এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও তা প্রদান করেন। এরপর সাধারণ সৈন্যদের মাঝে রৌপ্যপদক বিতরণ করেন। যুদ্ধমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেনাদলের সদস্যদের সাথেও একই রূপ আচরণ করা হয়, যারা পাহারার কাজে বাজা পাহাড়ে অবস্থান করছিল। ১২৮৪ হিজরি সনের ১৯ জুমাদাল থানিয়া তাদের আগমন ঘটে। মুশির তার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ওপর অনুগ্রহের ধারা বর্ষণ করেন এবং একটি নতুন কাঁচখচিত পদক তৈরি করেন যার নাম দেন ‘আহদে আমালত’ এবং তিনি এটি সেনাপ্রধানদের ও বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পরিয়ে দেন। তিনি স্বীয় সহনশীলতার মাধ্যমে বিদ্রোহী ও সাধারণ প্রজাদের অবস্থার সংশোধন করেন এবং স্বয়ং শাসনভার পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি দুর্গগুলো সংস্কারের আদেশ দেন, রাহিয়াত অভিমুখে ওয়াদি আল-জারকা সেতু নির্মাণ করেন এবং কাইরাওয়ানের ব্যারাক নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেন, যার নির্মাণকাজ প্রথম মুশির শুরু করেছিলেন। তিনি এর একটি দ্বিতীয় প্রবেশদ্বার উন্মোচন করেন এবং ১২৮৩ হিজরিতে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর ব্যারাক উন্নত করেন এবং সমস্ত দুর্গের তামার কামানগুলো পরিবর্তন করে অন্য ধরনের কামান স্থাপন করা হয়। সৈন্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং আমির তার ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জনসাধারণের সাথে সদয় আচরণ করেন এবং রাজকীয় মর্যাদার নিদর্শনসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, এমনকি রাজা ব্যতীত অন্য কারো হাতে চুম্বন করা নিষিদ্ধ করেন।
১২৮৩ হিজরি সনের ৯ সফর এই সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয় এবং তিনি তার বিচক্ষণতার প্রয়োগ করেন। তবে ওই বিদ্রোহের ফলে লুটতরাজ ও শস্য নষ্ট হওয়ার কারণে কৃষিখাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে, যার ফলে উৎপাদন ও আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। দেশে মুদ্রার অভাব দেখা দিলে মুদ্রার সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে। বিদেশ থেকে তামার নতুন মুদ্রা আনা হয় যার মান ছিল অর্ধেক রিয়াল, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ এবং খাররুবা; যা দেশের মুদ্রার আদলে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু মুদ্রা বিনিময়কারীরা এর মান বাড়িয়ে দেয় এবং এর প্রকৃত মূল্য কমিয়ে ফেলে। ফলে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ১০০ রিয়াল সোনা বা রুপার বিনিময় মূল্য ৩০০ তামা-নির্মিত রিয়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে এক উইবা গমের দাম ৫৫ রিয়াল এবং এক মাতার তেলের দাম ১১০ রিয়ালে পৌঁছায়। এসব ঘটনা ছিল ১২৮৩ হিজরির শুরুর দিকের। অতঃপর আমির ১২৮৩ হিজরির ১১ শাবান উক্ত মুদ্রার মান অর্ধেক কমিয়ে দেন। এরপর ১৫ শাবান অবশিষ্ট মানের আরও অর্ধেক কমিয়ে দেন। ফলে পূর্বের আধা রিয়ালের মান বর্তমানে এক-অষ্টমাংশে দাঁড়ায় এবং অন্যান্য মুদ্রার মানও সেই অনুপাতে কমে যায়। এর মাধ্যমে মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল হয় এবং দ্রব্যমূল্য হ্রাস পায়। তবে সেই বছর বৃষ্টিপাতও কম হয়েছিল। ১২৮৪ হিজরির শুরুতে জাবাল বাজা অঞ্চলের অধিবাসীরা পুনরায় বিদ্রোহ শুরু করে। ফলে যুদ্ধমন্ত্রী আহমদ জাররুক নিয়মিত সেনাবাহিনী, গোলন্দাজ বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী এবং জাওয়াওয়া বাহিনীকে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন এবং তার সাথে হাম্মামা ও দুরাইদ গোত্রকেও সমবেত করেন। এরপর জুমাদাল উলার মাঝামাঝি সময়ে সেনাপ্রধান আলী বে তাদের সাথে যোগ দেন। তিনি বিদ্রোহের সকল পথ রুদ্ধ করে ফিতনা দমন করেন এবং ফিরে আসেন। তিনি জুমাদাল থানিয়ার ১৮ তারিখ ‘বারদো’ প্রাসাদে প্রবেশ করেন, যার ছয় দিন পূর্বে তার ভাই আদিল বে সেখানে পৌঁছেছিলেন। পূর্ববর্তী বিদ্রোহের সময় থেকে বাইরে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রুস্তমের সেনাদলও ফিরে আসে। এর ফলে বিরোধ মিটে যায় এবং মনগুলো সহযোগিতার লক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়। তবে শীতকালে জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং সেই রোগ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মহামারির আকারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের ওপর বিপদ ঘনীভূত হয়।