القسم: البلاغة
الكتاب: نصرة الثائر على المثل السائر
المؤلف: صلاح الدين خليل بن أيبك الصفدي (ت 764هـ)
[الكتاب مرقم آليا غير موافق للمطبوع]
عدد الصفحات: 97
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: অলঙ্কারশাস্ত্র
গ্রন্থ: আল-মাসালুস সায়িরের উপর নুসরতুত থায়ির
লেখক: সালাহুদ্দীন খলীল বিন আইবাক আস-সাফাদী (মৃত্যু ৭৬৪ হিজরি)
[বইটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যায়িত, যা মুদ্রিত সংস্করণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়]
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৯৭
শামেলায় প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
সেখানে 'আলিফ' বর্ণগুলো এমন শাখা যার ওপর 'হামজা'গুলো কপোত হয়ে বসে আছে। 'লাম-আলিফ' বর্ণগুলো এমন যে, তার কমনীয় দেহের আলিঙ্গন দেখে প্রেমিক ঈর্ষা বোধ করে। 'সোয়াদ' বর্ণগুলো পিপাসার্ত চোখ এবং ব্যাকুল হৃদয়ের তৃষ্ণা নিবারণ করে। 'ওয়াও' বর্ণগুলো অলকের কুঞ্চনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 'মিম' বর্ণগুলোর ঠোঁটের কাছে মুখগুলো এগিয়ে আসে যেন চুম্বনের সুধা পান করা যায়। 'সিন' বর্ণগুলো যেন সেই দাঁতগুলোর শুভ্র উজ্জ্বলতা। 'দাল' বর্ণগুলো পিঠ বাঁকানোর মাধ্যমে লেখকের প্রতি আনুগত্যের ইঙ্গিত দেয়। 'জিম' বর্ণগুলো শিকারি পাখির নখর সদৃশ, যা প্রশংসার আতিশয্যে চড়ুই পাখির মতো কম্পমান হৃদয়গুলোকে শিকার করে। তাতে এমন কিছু রয়েছে যা আত্মা কামনা করে এবং চক্ষু শীতল করে; সেখানে যা আছে তা চিরস্থায়ী, আর তার অভিবাদন হলো প্রশংসা। তার হাত গলিত স্বর্ণে বিচরণ করে, আর সৃষ্টি শীতল লৌহে আঘাত করে। এটি সেই হাত যা তার মুক্তা দিয়ে রাজাদের মুকুট সুশোভিত করে এবং স্বর্ণের দ্যুতি ছড়ানোর মাধ্যমে কাগজের পাতায় মহানুভবতার নিদর্শন প্রকাশ করে। তার হাতের কারুকার্যের পূর্বে আমি কল্পনাও করিনি যে মেঘ কখনো স্বর্ণবৃষ্টি ঘটাতে পারে, কিংবা পানি কখনো আগুনের সাহায্য নিতে পারে। আমি ভাবিনি যে কলমগুলো এমন তলোয়ার হতে পারে যা সম্পদের রক্ত প্রবাহিত করে নদী বইয়ে দেয়। তার সেই দৃষ্টির আগে আমি জানতাম না যে গোধূলি ঊষার উদয়কে ভয় পায় না, কিংবা মিলনের রঙ বিচ্ছেদের রঙের ওপর প্রভাব ফেলে না। আমি ভাবিনি যে রাত বিদ্যুতের প্রান্ত ধরে ঝুলে থাকবে অথচ সরবে না, কিংবা সন্ধ্যার স্বর্ণাভ আভা ঘোর অমানিশার আঁধারের সাথে প্রবাহিত হবে। আমি ভাবিনি যে কোনো উদার হাত তার কলমের নিদর্শন এবং মহানুভবতার অলৌকিকতা দিয়ে দাবি করবে যে, তার স্পর্শে কঠিন পাথর জড়তা ত্যাগ করে; আর তার বাগ্মিতা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ধ্রুবতারাকে পরিচালিত করে স্বচ্ছ ও সুপেয় পানির নহরের কাছে নিয়ে যায়। গুণীজনদের হস্তলিপি এই কলমের মার্জিত রূপের সামনে কেবল একটি পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা মাত্র। কলমগুলো যেন কেবল কাষ্ঠখণ্ড যা স্বর্ণের ওপর প্রজ্বলিত হয়েছে, ফলে স্বর্ণ গলে কোমল হয়ে গেছে। এই লিপি তার হাতের পরশ ছাড়া অন্য কিছু নয় বলে গণ্য করা হয়; কারণ তিনি এর জন্য শোকের পোশাক পরিবর্তন করে দিয়েছেন এবং বর্ণের নববধূর দেহকে সুগন্ধি জাফরান দিয়ে উজ্জ্বল করেছেন। তিনি ইহসানের চোখের মণি প্রকাশ করেছেন এই প্রমাণে যে, তা কেবল কালোতেই (কালিতেই) দেখা যায়। তার প্রতি সিজদা করা হয়েছে এবং এই সিজদা করা আবশ্যক ছিল কারণ এটি মুকুটের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তাকে চুম্বন করা হয়েছে এবং চুম্বনই ছিল তার প্রাপ্য, কারণ হৃদয় এখান থেকেই জান্নাতের হুরদের সাথে কথোপকথন করে। কেনই বা তার মূল সত্তা শ্রেষ্ঠ হবে না যাকে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে? আর কেনই বা তার বর্ণগুলো চুম্বনের মাধ্যমে গৃহীত হবে না? মানুষ হাত দিয়ে লেখে, আর তিনি চোখ দিয়ে লিখেছেন। মানুষ এই শিল্প থেকে 'হুনাইনের যুদ্ধের' পর 'খুফ্ফায় হুনাইন' (নিরাশ হয়ে ফেরা) লাভ করেছে। আর এই কলম তার সৌন্দর্যের মাধ্যমে দর্শকদের জন্য স্বর্ণের উজ্জ্বলতা জয় করেছে। তার জন্য 'কিমিয়া' (পরশমণি) সত্য প্রমাণিত হয়েছে, কারণ তিনি আধা দিনার মূল্যের কালি দিয়ে এক হাজার দিনার মূল্যের এক একটি ছত্র লিখেছেন। তার এই দিনগুলোতে বরং তার এই নহরগুলোতে দীর্ঘ বিচরণ রয়েছে। এই লিপি ওজনে হালকা এবং ছত্রে কম হওয়া সত্ত্বেও কৃতজ্ঞতার ভারী বোঝা বহন করে। তার দলিলের নহরগুলোর প্রশংসা কেন গলিত স্বর্ণের তুলাদণ্ডে হালকা হবে না? আর কৃতজ্ঞতার কাফেলা কেনই বা পথ হারাবে যখন অগ্নিশিখা সদৃশ অলকগুচ্ছ তাকে পথ দেখিয়েছে? তিনি একে প্রসারিত করেছেন এবং গুটিয়ে নিয়েছেন যতক্ষণ না তা উত্তরসূরিদের জন্য রক্ষিত হয়েছে। এতে এমন এক দর্শক বিচরণ করে যে কখনো ক্লান্ত হয় না। তার শেষ দৃষ্টি ছিল তার প্রথম দেখার মতোই বিস্ময়কর। তার বৈচিত্র্যের কারণে সে মোহাচ্ছন্ন হয়ে এক একটি বর্ণ বা কাগজের ওপর তার মাযহাব বা মতবাদ গড়ে তোলে। সে যখন একে বারবার পাঠ করে তখন তার পিপাসা আরও বেড়ে যায়, যদিও সেখানে সুধা পানের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। এর তীব্র আলো চোখের মণিকে ধাঁধিয়ে দেয় যখন তা দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
এক লেখকের বর্ণনায় তাবুগুলোর অবস্থা ছিল নিম্নরূপ: তাবুগুলো জীর্ণ হয়ে বিভিন্ন উপাদানে মিশে গেছে। সেগুলো এতটাই পাতলা হয়ে গেছে যে মেঘের বারিবিন্দুর সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। আমরা কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি, আর আমাদের কষ্ট ছিল সেই তাবুগুলোর মাঝে ফাঁটল দেখতে পাওয়া। তাতে আকাশের তালি লাগানো তালি রয়েছে (অর্থাৎ তাবু ছিঁড়ে আকাশ দেখা যায়)। বাতাস বইলে সেগুলো আগে-পিছে নড়াচড়া করে দ্রুত খুলে যাওয়ার উপক্রম হয়, যেন শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণা। তাবুগুলো আমাদের বন্ধনে থাকা সত্ত্বেও আমাদের ত্যাগ করেছে, এবং খুঁটিতে বাঁধা থাকা সত্ত্বেও বিদ্ধ হয়েছে। বাতাস যদি কোনো নিদর্শন পাঠায় তবে তাবুগুলোর গর্দান তার সামনে নত হয়ে থাকে। আমরা যদি সেখানে বসি, তবে তা যেন রাস্তার মোড়ে বসা, আর তাবুগুলো যেন ধ্বংসের পথের ওপর বসে আছে। রাতে যদি তা ভেঙে পড়ে, তবে সেই পতনকে ঠেকানোর বা নিচুকে উপরে তোলার কেউ থাকে না। তাতে কালের সূঁচের এমন ক্ষত রয়েছে যা সেলাই করা যায় না। তাতে কালের এমন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে যা চোখ কখনো সত্য মনে করে আবার কখনো মিথ্যা ভাবে। তার আকাশ উন্মুক্ত হয়ে গেছে এবং বিদীর্ণ হয়েছে; সে তার রবের আদেশ পালন করেছে এবং এটাই তার জন্য সমীচীন ছিল। তার চামড়ায় এমন কোনো আবরণ অবশিষ্ট নেই যা দিয়ে অভিযোগ করা যায়, আর তার ধৈর্য ধরার মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। যখন বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন তাবু ও তার সঙ্গীদের অবস্থা দেখে মনে হয় যেন তারা সেই অপরাধী যারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করছে এবং তাদের সকল সহায়-সম্বল ও উপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আপনি দেখবেন তার চতুষ্পার্শ্ব কাঁপছে, আর মেঘের ঘনঘটা বাস্তবেই তার ওপর চড়াও হয়েছে। তার খুঁটিগুলো যেন ডালপালা যা বাতাস নাড়িয়ে দিচ্ছে, আর তার রশিগুলো যেন আগুনের ফুলকি যা কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকে ছিটকে এসেছে। আর যখন মেঘের সৃষ্টি হয় এবং বিদ্যুতের তলোয়ার কোষমুক্ত হয় এবং বৃষ্টির ধারা প্রবাহিত হয়, তখন সেই তলোয়ারের সামনে তাবুগুলো আহত সৈনিকের মতো এবং বৃষ্টির স্রোতের পেছনে পরিত্যক্ত লাশের মতো পড়ে থাকে। নূহের পুত্র যে দিন কোনো আশ্রয়দাতা ছিল না যা কামনা করেছিল, তাবুগুলোও তাই কামনা করে। আপনি তাবুগুলোকে পাতিহাঁসের মতো ভাসতে দেখবেন যখন আমরা নিমজ্জিত ও ভাসমান অবস্থার মাঝামাঝি থাকি। আমরা প্রতিদিন একে সীমার বাইরে আঘাত করি এবং গ্রীষ্মকালে যুদ্ধের উত্তাপ ও শীতকালে হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে একে গ্রহণ করি।
আমি বলছি: যদি এটি আমোদপ্রিয় ব্যক্তির শ্রবণকে আকৃষ্ট করে, তবে এতে খুব বড় কোনো প্রশংসা নেই। কারণ 'ফাউল' রূপটি সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আতিশয্য বুঝাতে ব্যবহৃত হয় যে আমোদ অনুভব করে। আর 'তারুব' (আমোদপ্রিয়) কেবল তাকেই বলা হয় যে সামান্যতম আনন্দেই বিগলিত হয় এবং সামান্য নেয়ামতেই আন্দোলিত হয়। যেমন: 'আকুল' (অধিক ভোজনকারী) এবং 'শারুব' (অধিক পানকারী) বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যে সামনে যা পায় তা-ই প্রচুর পরিমাণে আহার ও পান করে। আর যে ব্যক্তি আমোদপ্রিয় এবং এটি যার স্বভাবে বারবার প্রকাশ পায়, সে যদি এই বাণীতে আনন্দিত হয় তবে এতে এমন কোনো বিশেষত্ব নেই যা প্রশংসার দাবি রাখে। একারণেই বলা হয়েছে: কোনো বিষয়ের জন্য যে প্রস্তুত থাকে, তার জন্য সামান্য কারণই যথেষ্ট। বরং প্রশংসা তখনই সার্থক হয় যখন বলা হয়: এটি তাকেও আকৃষ্ট করে যে আমোদে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। যেমনটি তিনি দ্বিতীয় বাক্যে বলেছেন: 'এবং এটি হৃদয়ের গাম্ভীর্যকে বিচলিত করে'। কারণ প্রশংসার ক্ষেত্রে এটাই সুপরিচিত রীতি। যদি আপনি বলেন: এটি আল-বুহতুরীর এই বাণীর ক্ষেত্রেও আপত্তি হিসেবে আসবে:
ব্যথিত আমোদপ্রিয়ের শ্রবণশক্তিকে যা অন্য দিকে আকৃষ্ট করে … মা'বাদ এবং আকীদের গান শোনা থেকে।
আমি বলব: এটি আমি যা বলেছি তাকেই সমর্থন করে। কারণ তিনি বলেছেন: সে আমোদপ্রিয়ের শ্রবণকে মা'বাদ এবং আকীদের গান শোনা থেকে ফিরিয়ে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, অথচ এই দুজনই গানের আদি উৎস। সুতরাং যখন সে এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারীকে তার চিরাচরিত আনন্দ থেকে ফিরিয়ে নিজের কথা শোনার দিকে নিবিষ্ট করতে পারে, তখন সেটি প্রশংসার বিষয় হয়। এটি 'ধৈর্যশীলকে বিচলিত করা এবং পরহেজগারকে মুগ্ধ করা'র পর্যায়ভুক্ত। বুহতুরীর জন্য এই প্রশংসা কেবল তখনই সার্থক হয়েছে যখন তিনি বলেছেন: 'মা'বাদের গান থেকে'। ইবনুল আসীর যদি বলতেন: 'তার বাগ্মিতা দ্বারা আমোদপ্রিয়কে তার প্রিয় গানগুলো থেকে বিমুখ করে আকর্ষণ করে', তবে আমি তার ওপর এই আপত্তি করতাম না। আর আমি যা বলেছি প্রশংসার ক্ষেত্রে এটাই প্রতিষ্ঠিত রীতি।
আপনি কি নাবিগা আল-জুবিয়ানীর উক্তি দেখেননি:
যদি সে কোনো শুভ্রকেশ সন্ন্যাসীর সামনে প্রকাশিত হতো … যে আল্লাহর ইবাদতকারী, সংসারত্যাগী এবং আজীবন উপাসনায় মগ্ন;
তবে সে তার লাবণ্য ও সুন্দর বাণীর প্রতি অপলক তাকিয়ে থাকত … এবং একেই সঠিক পথ মনে করত, যদিও বাস্তবে তা সঠিক পথ নয়।
এবং ইমরাউল কায়সের উক্তি:
তার মতো রূপসীর দিকে ধৈর্যশীল ব্যক্তিও অনুরাগের সাথে তাকায় … যখন সে বর্ম ও অলংকারের মাঝে পূর্ণ যৌবনা হয়ে ওঠে।
এবং জনৈকা বাদ্যযন্ত্র বাদিকা সম্পর্কে কুশাজিমের কতই না চমৎকার উক্তি:
সেখানে তার আঙুলগুলো এমনভাবে আবর্তিত ও পরিবর্তিত হচ্ছিল … যেন পরস্পর আবদ্ধ দুটি হাতের আঙুলের বৈচিত্র্য।
সে যদি সেই সুর কোনো পরাজিত পলায়নপর ব্যক্তির পিছু পিছু বাজাত … তবে সে দ্রুতগামী বাহনের পিঠ থেকেও মায়াভরে ফিরে তাকাত ও থেমে যেত।
এবং আমি বলেছি:
সে তার বীণার তারগুলোকে এমন আঙুলে স্পর্শ করল … যা বিনয়ী ও অতি পরহেজগার ব্যক্তির অন্তরের স্থিরতা নিয়ে খেলা করে।
সে গেয়ে উঠল, সে যদি চাইত তবে তার বাণীর মিষ্টতা দিয়ে … দ্রুতগামী বিজলীর লাগামকেও অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারত।
আর আমি পুবালি বাতাসের ওপর বিস্মিত হলাম যে সেটি কেন থামল না … আনন্দে বিমোহিত হয়ে, কিন্তু তার তো কোনো শ্রবণকারী কান নেই।
আর তার এই উক্তি সম্পর্কে: 'এবং জমিনে তাকে ক্লান্ত দেখা যায় না', আমি এমন কাউকে শুনিনি যে অলঙ্কারপূর্ণ বাণীর প্রশংসা এভাবে করেছে। বাণীর ক্ষেত্রে কখনও ক্লান্তি বা অবসাদ গুণারোপ করা যায় না। বরং এটি পূর্বের পরিচ্ছেদে বর্ণিত মদকে বুদ্ধি, ধর্ম ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করার মতো বিষয়। তিনি কি জানতেন না যে, ক্লান্তি বা অবসাদ হলো দেহের বৈশিষ্ট্য এবং তা চলাফেরা ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ফল? বাণী কখনও ক্লান্ত হয় না, বরং ক্লান্তি আসে সেই অঙ্গের ওপর যা তা উচ্চারণ করে। তদ্রূপ কিতাবও ক্লান্ত হয় না, বরং সেই লেখকই ক্লান্ত হন যিনি তা লিখেছেন।
কতই না সুন্দর এই কবির উক্তি:
যখন সে কাগজ হাতে নেয়, সে তার পাতায় গচ্ছিত রাখে … পুষ্পশোভিত বাগান অথবা মুক্তার মালা।
সে প্রতিটি চিন্তাকে গভীর ভাবনার সংঘাত থেকে রক্ষা করেছে … এবং কলমগুলো থেকে চিন্তার গুরুভার নামিয়ে দিয়েছে।
ইবনুল আসীর যদি এখানে সেই লেখককে বুঝিয়ে থাকেন যার কাছ থেকে এই বর্ণিত কিতাবটি উৎসারিত হয়েছে, তবে বাণীর পূর্বাপর বর্ণনায় এমন কোনো প্রমাণ নেই যা এটি নির্দেশ করে।
আল-ওয়াহিদ আবু আল-তায়্যিবের এই বাণীর সমালোচনা করেছেন:
সব তলোয়ার যখন দীর্ঘক্ষণ আঘাত চালিয়ে যায় … তখন তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেবল সাইফুদ্দৌলার তলোয়ার ব্যতীত।
তিনি বলেছেন: তলোয়ারের ক্ষেত্রে ক্লান্তি আসে না, যদি না তিনি তলোয়ারের ধারের ভোঁতা হয়ে যাওয়ার অর্থে রূপক হিসেবে এটি ব্যবহার করে থাকেন। তিনি বলেন: যখন আমি এটি লক্ষ্য করলাম তখন বললাম: পবিত্র সেই সত্তা যিনি আমাদের প্রভুকে দান করেছেন এবং কার্পণ্য করেননি, এবং তাকে বাণীর নব্যুয়ত দ্বারা বিশিষ্ট করেছেন কিন্তু তাকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেননি। যদি ওহীর দরজা বন্ধ না হতো তবে বলা হতো এটি একটি অবতীর্ণ কিতাব। আল্লাহ বাগ্মীদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যেহেতু তারা তার যুগে জীবিত ছিল না এবং হিংসার রোগে আক্রান্ত হয়নি যা তাদেরকে তার জ্বলন্ত অঙ্গারে দগ্ধ করত। আর তারা যদি তা থেকে বেঁচেও যেত, তবে তাদের বাণীসমূহ তার বাণীর হাত থেকে রেহাই পেত না যা কালির দাগ মুছে ফেলার মতো তাদের কীর্তিকে মুছে দিয়েছে। তাদের বাণীগুলো তার আসার আগ পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল, কিন্তু যখন তিনি এলেন তখন সেগুলো কবরে সমাহিত হলো যেমন তাদের পূর্বসূরিরা চলে গেছে।
আমি বলছি: এর মধ্যে শিষ্টাচারের চরম অভাব রয়েছে। এমন প্রশংসা বাদ দিয়েও মানুষের জন্য অন্য পথ খোলা থাকে যা তাকে এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
আর তার উক্তি: 'তাকে বাণীর নব্যুয়ত দ্বারা বিশিষ্ট করেছেন কিন্তু তাকে প্রেরণ করেননি'—এটি আবু আল-আলা আল-মা'আররীর উক্তি থেকে গৃহীত হয়েছে:
মুহাম্মদের পর যদি ওহী বন্ধ না হতো … তবে আমরা বলতাম মুহাম্মদ তার পিতার স্থলাভিষিক্ত।
তিনি শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তাঁর মতোই, কেবল পার্থক্য এই যে … জিবরীল তাঁর কাছে রিসালাত নিয়ে আসেননি।
আর এমন কথা যে ব্যক্তি বলে সে কুফরি করেছে।
তিনি বলেছেন: তাঁর বাণীর এমন এক স্বাদ রয়েছে যার আস্বাদন অন্যান্য বাণীর মাঝে চেনা যায়, আর স্থূল দেহের তুলনায় রুহের লাঘবতা সুবিদিত। সুতরাং যদি তা আস্বাদন দ্বারা চেনা না যেত, তবে তা তার চিহ্ন দ্বারা চেনা যেত। সুবহে সাদিকের উজ্জ্বলতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না এবং তার আলোর জন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। এটি সুবিদিত যে, ডাল দেখলেই তার মূল চেনা যায় এবং বাচনভঙ্গি দেখলেই কথা চেনা যায়।
আমি বলছি: তার এই উক্তি: 'তাঁর বাণীর এমন এক স্বাদ রয়েছে যার আস্বাদন অন্যান্য বাণীর মাঝে চেনা যায়'—ইবনে আমীরা ইবনুল আব্বারের প্রেরিত এক কিতাবের উত্তরে কতই না চমৎকার জবাব দিয়েছিলেন, সেই উত্তরের কিছু অংশ ছিল নিম্নরূপ:
তাঁর উক্তি: এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ কিতাব, যা তাঁর দিকে নিসবত হওয়ার কারণে 'কারীমি' (মর্যাদাপূর্ণ), আর এটি তাঁর দুই হাতের মধ্য থেকে শ্বেতশুভ্র হাতের দিকে নিসবত হওয়ার কারণে 'কালিমি' (মুসা আ.-এর ন্যায়)। এটি 'মাসিহি' (ঈসা আ.-এর ন্যায়) কারণ এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রাণহীনতাকে জীবিত করেছে। এটি 'মুহাম্মাদি', কারণ রূহুল কুদস আমার হৃদয়ে যা ফুঁকে দিয়েছেন, তার কারণে এটি প্রায় সেই স্তরের হয়ে গিয়েছে। সুতরাং আমি তাঁর সেই সম্বোধন থেকে বঞ্চিত হইনি, যা দিনগুলোতে ঈদের আনন্দ এবং রাতগুলোতে বাসর রাতের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা এটিকে আরবি ভাষার জন্য টিকিয়ে রাখুন; কারণ এটি না থাকলে তা অপ্রকাশিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকত, সংরক্ষিত হতো না। এটি না থাকলে অক্ষরের অবস্থাসমূহ পরিবর্তিত হয়ে যেত এবং প্রাঞ্জলতা তার যন্ত্র হিসেবে অক্ষরের ভিত্তিগুলোকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করত। ফলে তার সুউচ্চ আলিফ বসে যেত, নিদ্রিত বা মৃত্যুবরণ করত, এবং দাল-এর কুঁজো পিঠের বক্রতা এত বৃদ্ধি পেত যে তার গণ্ডদেশ ধূলিসাৎ হয়ে অবনমিত হতো। আর সিন-এর দাঁতগুলো এমনভাবে পড়ে যেত যে কামড় দেওয়ার মতো কোনো মাড়িও অবশিষ্ট থাকত না।
তাঁর উক্তি: তিনি এটি পাঠ করেছেন, আর এর অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেমে থাকেনি বরং তা উৎসর্গিত হয়েছে। তিনি এর মেঘমালার বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন, যা তাঁর জন্য কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং যার ধারা বন্ধ হয়নি। তিনি এমন এক সুস্পষ্ট বর্ণনাশৈলীর অট্টালিকা প্রত্যক্ষ করেছেন, যা যদি প্রতিদ্বন্দ্বীরা দেখত, তবে তাদের অট্টালিকাগুলো ভিত্তি থেকে উপড়ে যেত এবং তাদের ওপর ছাদ ভেঙে পড়ত। আল্লাহর কসম! তিনি এক এমন বাগ্মী যে, যখন তিনি কথা বলেন, বিচ্ছেদের দিনে চোখের পানির চেয়েও তাঁর কাছে কথার প্রাচুর্য বেশি থাকে। আর যদি অন্য কেউ কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে হোসেনের (রা.) শাহাদাতের দিনে কারবালার প্রান্তরের পানির চেয়েও তা তাঁর কাছে নগণ্য মনে হয়।
শেখ তাজউদ্দীন আল-কিন্দির পত্রের জবাবে তাঁর উক্তি: আমি এটি ভেবেছিলাম এবং আল্লাহ সেই ভাবনাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তিনি সফলতার সোপানে আরোহণ করেছেন এবং আকাশ থেকে শব্দ ও মেঘমালা থেকে কাগজ গ্রহণ করেছেন। আমি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের সত্যতায় বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং তাঁর নক্ষত্রতুল্য শব্দ চয়নের পারদর্শিতা আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে, যখন তিনি সেগুলোকে চমৎকার ও বিশুদ্ধ শব্দমালায় উপস্থাপিত করেছেন। আমি জামাআতকে বললাম: তাজের (তাজউদ্দীন) কথা হলো কথার মুকুট (তাজ), আর রাজত্ব হলো কিন্দা গোত্রে; একসময় তাদের কলমগুলো ছিল তলোয়ার, আর এখন তাদের তলোয়ারগুলোই হলো কলম।
তাঁর উক্তি: আমি এতে সূক্ষ্মতার চরম শিখর এবং নয়নাভিরাম উপহার প্রত্যক্ষ করেছি। এর শব্দের জাদুতে আমি প্রায় বিমোহিত হয়ে পড়েছিলাম। যদি আমার মনে এই আশঙ্কা না থাকত যে কালচক্র আমার হৃদয়ে এর সুউচ্চ স্থান সম্পর্কে জেনে ফেলবে, আর যদি আমার এই ভয় না থাকত যে এর সৌন্দর্যের কথা প্রচার করলে আমার শত্রুরা এর মাধ্যমেই আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠবে, তবে আমি এমন কথা বলতাম যা এই শিল্পের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে ম্লান করে দিত। আমি তাদের মধ্যে এমন সব বাণ নিক্ষেপ করতাম যা থেকে কোনো কবির পাহাড়সম দম্ভ বা কোনো লেখকের বর্মও আত্মরক্ষা করতে পারত না। এগুলো আর কিছুই নয় বরং নিদর্শনসমূহ, যার প্রতিটি তার অপরটির চেয়ে মহান। এগুলো এমন এক উর্বর চিন্তা যা জুমআর দিনগুলোতে রিজিকপ্রাপ্ত হয়, যখন চিন্তাসমূহ তাদের শনিবারে তাদের প্রাপ্য রিজিক লাভ করে।
তাঁর উক্তি: এগুলো মহৎ রচনাবলি, যার শব্দগুলো যেন হাসছে এবং অর্থগুলো যেন কথা বলছে। এর অক্ষরগুলো আনন্দিত চোখের পুতলি হয়ে উঠেছে এবং এর পঙক্তিগুলো যেন নববধূর মতো উদ্ভাসিত হচ্ছে, যার ওপর হরকতগুলো অলঙ্কারস্বরূপ এবং নুক্তাগুলো যেন ছিটানো মুক্তা।
তাঁর উক্তি: এটি এমন এক কিতাব যার অর্থসমূহ সুউচ্চ এবং অন্ত্যমিলগুলো সিন অক্ষর দ্বারা সমাপ্ত। আর সিন অক্ষরের হক হলো তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। সিন অক্ষর ক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে তাকে ভবিষ্যৎকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়। এটি এমন এক দিগন্ত যেখানে শাস্তির গগনচুম্বী মেঘ ছাড়া আর কিছুই নেই। এটি এমন এক সমুদ্র যেখানে সাঁতার কাটার অধিকার কেবল তারই আছে যে মুখ থেকে মুক্তা বের করে এবং সমুদ্রকে নিজের আঁচলে ধারণ করে। আর এখানে সমুদ্র বলতে আমি কেবল তাঁর সম্মানিত হাতকেই বুঝিয়েছি, প্রকৃত সমুদ্র নয়।
তাঁর উক্তি: মজলিস লিখেছে—আল্লাহ তাঁর অন্তরকে প্রশান্ত করুন এবং তাঁর নৈকট্য সহজ করে দিন। তাঁর কলমগুলো সর্বদা তাঁর বন্ধুদের হাতিয়ার হিসেবে শত্রুর বিরুদ্ধে অটল থাকুক যখন তারা যুদ্ধের আশঙ্কা করে। এই কলম আশাবাদীকে আশ্বস্ত করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে হতাশ করে। এর মাধ্যমে শ্রবণেন্দ্রিয় উর্বর হয় এবং উপকার প্রকাশিত হয়। তবে এটি আমাদের স্বভাবকে বদলে দেয় এবং আমাদের মাঝে ঈর্ষা তৈরি করে; আর আমরা যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামি, তখন এটি আমাদের হাতকে মজবুত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে।
তাঁর উক্তি: আমাদের সায়্যিদের বর্ণনার পর আর কোনো বর্ণনা থাকে না। তাঁর দুই চিবুকের মাঝে রয়েছে তলোয়ার, অথচ সাধারণ মানুষের দুই চিবুকের মাঝে থাকে কেবল জিহ্বা। হে তাঁর কলমসমূহ! তোমরা কথা বলো, কারণ খাপের ভেতরে তলোয়ারগুলো নির্বাক হয়ে গিয়েছে। হে ওয়ায়েলের কন্যা তাগলিব! তুমি গর্বভরে পথ চলো, কারণ বাগ্মীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে আর তারা লাঞ্ছিত। যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে সে সফল হয়েছে, আর এটি সুনিশ্চিত যে সত্য অস্বীকারকারীরা সফল হয় না।
তাঁর উক্তি: তিনি মিমিয়াহ (মীম অক্ষরান্ত কবিতা) পাঠ করেছেন, যা তাকে প্লাবনের মতো আবেগে ভাসিয়ে নিয়েছে এবং তাকে রূহ ও রায়হান (সুগন্ধি) দান করেছে। শয়তান যদি কবিতা আবৃত্তি করে থাকে, তবে এটি কোনো ফেরেশতার অনুপ্রাণিত বাণী। আমি সেই অন্ত্যমিলগুলোর ধারাবাহিকতা দেখে বিস্মিত হয়েছি। আমি দেখেছি কবিরা সংকীর্ণ উপত্যকায় যা রচনা করেছে তা-ই নিয়ে এসেছে, অথচ তাঁর চিন্তা ও কলম উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে বিচরণ করে তা নিয়ে এসেছে। এর প্রতিটি পঙক্তি যেন এক একটি কাব্যগ্রন্থ, ঠিক যেমন এর রচয়িতা এমন এক মানুষ যার জন্য হাজারো মানুষ উৎসর্গ হতে পারে। তাঁর কলমটি খাটো, কিন্তু সে তো কেবল বর্শার কাছ থেকে কলমের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই নিজের নাসিকা কর্তন করেছে।
আমি বলছি: কাজী ফাজিলের উক্তিতে 'ফিয়াফি' (মরুপ্রান্তর) শব্দের উল্লেখ এবং এই অনুপ্রাসে তিনি যে চমৎকার শিল্পকলা ব্যবহার করেছেন, তার প্রেক্ষিতে আমি আমাদের শাইখ হাফেজ ফাতহুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে সাইয়্যিদুন নাস-কে কিছু পঙক্তি লিখেছিলাম। তিনি পদ্য ও গদ্যে এর উত্তর দিয়েছিলেন। তাঁর গদ্যের অংশবিশেষ ছিল এমন: বরং এটি হলো সেই বৈধ জাদু যা আরোগ্য দান করে, এটিই হলো অন্ত্যমিলের সেই শক্তি, এটিই হলো সেই লক্ষ্য যা নির্বাসিত জীবনেও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করে।
অতঃপর আমি তাঁকে উত্তর লিখলাম, যার অংশবিশেষ ছিল: তিনি অলঙ্কারশাস্ত্রের কাবার আঙিনায় অবস্থান করছেন। কতই না সুন্দর সেই বর্ণনা যা আমার সালাম গ্রহণে প্রকাশিত হয়েছে এবং তাওয়াফের মধ্যে সংবৃত হয়েছে। হৃদয়ের পাখিটি উত্তরের জন্য উড়াল দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ডানার পালকের শক্তি ফুরিয়ে গিয়েছিল এবং প্রান্তদেশগুলোতে শূন্যতা দেখা দিয়েছিল। পুনরায় কাজী ফাজিলের কথার দিকে ফিরে যাচ্ছি।