القسم: البلدان والرحلات
الكتاب: غرائب الاغتراب ونزهة الألباب في الذهاب والإقامة والإياب
المؤلف: شهاب الدين محمود بن عبد الله الحسيني الألوسي (ت 1270هـ)
[الكتاب مرقم آليا غير موافق للمطبوع]
عدد الصفحات: 222
تاريخ النشر بالشاملة: 8 ذو الحجة 1431
বিভাগ: দেশসমূহ ও ভ্রমণকাহিনী
গ্রন্থ: গরাইবুল ইগতিরাব ওয়া নুযহাতুল আলবাব ফীয যাহাবি ওয়াল ইকামাত ওয়াল ইয়াব (প্রবাসের বিস্ময়কর ঘটনাবলী এবং গমন, অবস্থান ও প্রত্যাবর্তনে বুদ্ধিমানদের চিত্তবিনোদন)
লেখক: শিহাবউদ্দীন মাহমুদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হুসাইনি আল-আলুসি (মৃত্যু ১২৭০ হি.)
[গ্রন্থটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যায়িত, যা মুদ্রিত কপির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়]
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২২
শামিলা লাইব্রেরিতে প্রকাশের তারিখ: ৮ জিলহজ ১৪৩১
যখন প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে আমার চক্ষু শীতল হলো এবং আল্লাহর প্রশংসায় আমার বিষণ্ণতার যাতনা দূরীভূত হলো, আর পরিবার-পরিজন দর্শনের মাধ্যমে আমি সফলকাম হলাম এবং মিলনের ক্ষুর দিয়ে বিচ্ছেদের শত্রুর পেট ফেড়ে ফেললাম, তখন আমি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ সংকলন করতে মনস্থ করলাম, যেখানে যাওয়া এবং আসার মধ্যকার যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহের সারসংক্ষেপ একত্রিত করব। এবং সম্ভবত এর পরিসরে আমি জটিল বিষয়াদির সমাধান করব, কিছু অধ্যায়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব এবং অবস্থানকালীন আমার ঘটনাবলী সাধ্যমতো পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনা করব; তবে এমন কিছু বিষয় থেকে বিমুখ থাকব যা কিয়ামত পর্যন্ত আমার পক্ষে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এতে আমি কতিপয় মহান ব্যক্তির জীবনী বর্ণনা করব, যার আকাশে সূর্য ও পূর্ণিমার চাঁদ এবং এর যোগ্য ব্যক্তিদের উদয় ঘটাব। আমি নিজের জীবনী দিয়েই শুরু করছি, যদিও আমি আমার শ্রেণির অধমতম ব্যক্তি, বরং আমি তার দুধে থাকা খড়কুটা থেকেও নগণ্য, তার আবর্জনার নখকাটা থেকেও তুচ্ছ এবং তার মুক্তার পাশে ধূলিকণা সদৃশ। তবে কখনো কখনো সেবকরা মনিবদের সম্মুখে অগ্রসর হয়, ফরজ ইবাদতের পূর্বে নফল আদায় করা হয় এবং এককের ঘরের সংখ্যা দশকের ঘরের সংখ্যার পূর্বে স্থান পায়। গোলাপ তার শাখা থেকে দেরিতে বের হওয়াকে দোষারোপ করে না, আর বর্শার ফলক তার অগ্রভাগে থাকাকে অপছন্দ করে না। আমি এতে আমার সফরের কারণ এবং পরবাসের মরুপ্রান্তরে যে কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি তা বিস্তারিত বর্ণনা করব। এই সবকিছুতেই আমি সংক্ষিপ্ত ও পরিমিত পথ অবলম্বন করেছি, পাছে পাঠকরা বিরক্ত না হয়ে পড়ে যা অধিকাংশ মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। আমি এর নাম রেখেছি "প্রবাসের বিস্ময় ও গন্তব্য, অবস্থান ও প্রত্যাবর্তনে জ্ঞানীদের বিনোদন"। আমি তাঁর নিকট প্রার্থনা করছি যেন তিনি আমার মর্যাদাকে আমার পুণ্যকর্মের ওপর মিথ্যারোপের তিক্ততা আস্বাদন না করান এবং আমার শুভ্র ও পবিত্র পোশাকে নিন্দার কালি না ছিটান। আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদি ও অন্তে রক্ষাকারী। আমার মনে হয়, ইনশাআল্লাহ তাআলা আপনি একে এমন এক কিতাব হিসেবে পাবেন যার উদ্দেশ্যে উট সাজিয়ে সফর করা যায় এবং এর পরিচ্ছেদ ও অধ্যায়গুলো থেকে আকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করা হয়। কেননা এটি সূক্ষ্ম গবেষণা, উচ্চাঙ্গের উদ্দেশ্য, মাধুর্যপূর্ণ পত্রাবলী এবং ললিত সমস্যায় পরিপূর্ণ; এর গদ্যরীতি এতই নিকটবর্তী যে তা অর্জনের লোভ জাগায়, আবার হস্তগত করার জন্য এতই দূরবর্তী যে তা অসম্ভব মনে হয়। যেন এটি তারুণ্যের উন্মেষ থেকে চুরি করা এবং প্রিয়জনদের মিলনের স্বাদ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বরং আমার জীবনের শপথ! যদি কোনো কথার মাধ্যমে পাথর গলানো যেত, কিংবা যার প্রবাহ থেকে নির্গত নির্যাস দ্বারা জ্বলন্ত অঙ্গার নিভিয়ে ফেলা যেত, অথবা যার অর্থের মাধ্যমে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থতা লাভ করত, কিংবা যার গাঠনিক সৌন্দর্যে কোনো ভগ্ন হৃদয় জোড়া লাগত—তবে তা অবশ্যই এই কালাম হতো; যা সাহিত্যমনা শ্রোতাদের সিজদা করতে বাধ্য করে এবং জ্ঞানীদের সচেতন হৃদয়ের ধমনীতে বৃক্ষের ভেতর পানির প্রবাহের ন্যায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু আমি পুরো গ্রন্থে এই গদ্যরীতির অনুসরণ করিনি। কারণ এমন কোন বাগান আছে যার প্রতিটি ফুলই সুগন্ধিযুক্ত? হাতের সব আঙুলও বৈশিষ্ট্যে সমান নয়। আর প্রতিটি আয়াতই মুখগহ্বর উন্মুক্ত করে "হে জমিন! তুমি (পানি) গিলে ফেল" এমন অলঙ্কারপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নয়। সব নক্ষত্রই বিচরণশীল নয় এবং রাতের সব অংশই শেষরাত নয়। তা সত্ত্বেও আমি অনেক সময় গদ্যরীতি পুরোপুরি ত্যাগ করেছি এবং তার পরিবর্তে এমন অভিব্যক্তি নিয়ে এসেছি যা আমি আশা করি ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির নিকট সন্তোষজনক হবে। যাতে শ্রবণেন্দ্রিয়ের জন্য আমার দস্তরখান হয় বৈচিত্র্যময় এবং মেধার জন্য পানীয় হয় জ্ঞান ও মাধুর্যের আধার। কারণ একঘেয়ে খাবার বিরক্তি সৃষ্টি করে, যদিও তা সুস্বাদু ও মহান হয়। আর বর্তমানে অধিকাংশ শ্রোতার প্রকৃতি হলো ইসরায়েলিদের মতো; তারা কখনোই এক প্রকার খাদ্যের ওপর ধৈর্য ধরতে পারে না, যদিও তা সুস্বাদু খাদ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর সাথে আমার মেধা হলো ঐশ্বরিক জ্যোতি বা তাজাল্লিয়াতের হাতে; সম্ভবত তারা আমার হাতে তা সমর্পণ করে না যাতে আমি কিছু অনুচ্ছেদ রচনা করতে পারি। কখনো কখনো তা আমার থেকে পলায়ন করে এবং সুরাইয়া নক্ষত্রের ন্যায় আমার নাগালের বাইরে চলে যায়। তখন আমি সাদাসিধে কথা বলতে বাধ্য হই, যার সম্পর্কে আমি এটুকু ছাড়া আর কিছু বুঝি না যে তা বোধগম্য। সুতরাং আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন যে ওজর কবুল করে এবং আমার পক্ষ থেকে যা উপস্থিত হয়েছে তাতেই তুষ্ট থাকে। আসুন আমরা বান্দাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে 'নুযহাতুল আলবাব' কিতাবের উদ্দেশ্য শুরু করি। আল্লাহ তাআলার নিকট থেকেই সবকিছুর শুরু এবং তাঁর নিকটই প্রত্যাবর্তন। আমি বলছি: (তকদিরের ফয়সালাকারীর হাতে আমার অস্তিত্বের খাঁটি দুগ্ধ শূন্যতার গোবর এবং সম্ভাব্যতার রক্তের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান জগতের পেয়ালায় নির্গত হয়েছে, জুমার নামাজের কিঞ্চিৎ পূর্বে, ১২১৭ হিজরি সনের ১৪ই শাবান; যাঁর কামালের (পরিপূর্ণতা) পরিধি কোনো বর্ণনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় তাঁর হিজরতের বছর থেকে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন যতক্ষণ কোনো নবজাতক জন্মগ্রহণ করে এবং যতক্ষণ এই মহাবিশ্বে কোনো অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে। একজন সুদক্ষ সাহিত্যিকের চোখে যা অলঙ্কারশাস্ত্রীয় রূপসীর গালের দুটি তিল সদৃশ মনে হবে, এমন দুটি পঙক্তির প্রতিটি চরণের মাধ্যমে আমার জন্মের বছরকে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করেছেন প্রখ্যাত কবি আল-আত্বরাকজি মোল্লা আব্দুল হামিদ। তিনি বলেছেন:
আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে যখন তার আলোর ছটা … দানশীলতার উদয়াচল থেকে উদ্ভাসিত হলো
সুসংহত হানিফ দ্বীনের তারিখ রচয়িতা বলেছে … উচ্চতর জগত মাহমুদের জন্মে মুখরিত হয়েছে
আমি আমার বাড়িতে থাকা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলাম এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আমার বাসস্থান ও প্রতিবেশী ত্যাগের কষ্ট সহ্য করলাম। আমি আল্লাহর ধূসর বাজপাখির (বাজ আল্লাহ আল-আশহাব) ছায়াতলে বসবাস করতে শুরু করলাম, যাঁর ওপর রয়েছে এমন জ্যোতির্ময় নূর যা বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়, যা আবরণ তৈরি করে আবার আবরণমুক্তও থাকে—আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহস্যকে পবিত্র করুন এবং জান্নাতের সুউচ্চ উদ্যানে তাঁর আলোচনাকে সমুন্নত করুন। ১২৫০ হিজরি সনের রমজান মাস আসা পর্যন্ত আমি সেখানেই ছিলাম। এটি ছিল আমার ওপর তাকদিরের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সেই স্পষ্ট বিচ্ছেদের বন্ধনগুলো শিথিল হওয়ার শুরু। সেই সময় নকিব আমাকে গাউসিয়া দরবারে ওয়াজ করার নির্দেশ দিলেন। তখন বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তিত থাকায় আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাতে রাজি হলাম। ঘটনাক্রমে উত্তম তকদিরের ফয়সালায় গুরুত্বপূর্ণ উজির আলী রেজা আমার ওয়াজ শোনার জন্য আসলেন। তিনি তা প্রতিটি পরিচ্ছেদ অনুযায়ী শ্রবণ করলেন এবং এর রহস্যসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুধাবন করলেন। এতে তিনি অত্যন্ত অভিভূত ও আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং আমার প্রশংসায় এমন সব কথা বললেন যা মুখে প্রকাশ করা কঠিন। এরপর তিনি আমাকে ঈদের দিন তাঁর নিকট যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, আর পূর্ববর্তী নকিব তখন উপস্থিত থেকে সবকিছু শুনছিলেন। এতে নকিবের বিশাল অন্তর সংকুচিত হয়ে এল এবং তিনি তাঁর পূর্বের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হলেন। ঈদের দিন যখন এল, আমি তাঁর প্রাসাদে গেলাম এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। সেখানে আমি এমন সম্মান প্রত্যক্ষ করলাম যা আগে কখনো দেখিনি। তিনি আমাকে সেই সব পদ ফিরিয়ে দিলেন যা আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং আমার থেকে বিমুখ করা হয়েছিল। তাঁর দর্শনে আমার চক্ষু শীতল হতো এবং আমি সপ্তাহে এক বা দুইবার তাঁর কাছে যেতাম। ঈদুল আজহায় তিনি আমাকে আজমিয়ার খতিব হিসেবে নিযুক্ত করলেন এবং আমার সঙ্গীদের মধ্য থেকে আমাকেই বিশেষভাবে পছন্দ করে নিলেন। ফলে আমি প্রতি জুমায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে রাজদরবারে যেতে শুরু করলাম। সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনিই একমাত্র আমার সাথে কথা বলতেন, মনে হতো রাজদরবারে আমি ছাড়া আর কোনো আফিন্দি নেই। প্রতি রাতে আমি তাঁর সাথে একত্রিত হতাম এবং তাঁর সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রায় সারা রাত জাগরণ করতাম। সেই সময়ে আমি 'আল্লাহর ছায়া সুলতানের আনুগত্যে আল্লাহর আনুগত্যের প্রমাণ' নামক গ্রন্থটি রচনা করি এবং তা তাঁর সামনে পেশ করি। তিনি আমাকে মারজান ওয়াকফ এবং শ্রোতামণ্ডলীর নিকট থেকে ইস্তাম্বুলে অধ্যাপনার পদমর্যাদা অর্জনের সুযোগ করে দেন। অতঃপর তিনি আমাকে হানাফি মাজহাবের মুফতি হিসেবে নিযুক্ত করেন। গাউসিয়া দরবারে যেদিন তিনি আমার ওয়াজ শুনেছিলেন, সেদিনই তিনি আমাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, যাঁর হিম্মতের কোনো তুলনা নেই এবং যাঁর উমরসুলভ আত্মমর্যাদাবোধ অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই মহান ব্যক্তি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন এবং একদিনও দেরি না করার ওপর অটল ছিলেন। যাঁর শ্রেষ্ঠত্বের নদী প্রবাহিত হয়ে জনপদসমূহ প্লাবিত করেছে, তিনি হলেন আমার মওলা আব্দুল বাকি আফিন্দি আল-উমরি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিরাপদে রাখুন; তিনি আমার সকল বিষয়ে সাহায্যকারী ছিলেন। যখনই আমার হাত আমার স্বার্থ রক্ষায় অক্ষম হতো, তখন তিনিই আমার হাত ও শক্তিতে পরিণত হতেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর শত্রুদের অবজ্ঞায় তাঁর জীবনকে দীর্ঘায়িত করুন। সেই উজির সর্বদা আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকেন, এমনকি তিনি সুলতানের পক্ষ থেকে আমাকে একটি রাজকীয় পদক প্রদান করেন। এই শহরের কোনো আলেম এর আগে এই সম্মান পাননি। এটি তখন ঘটেছিল যখন ইরান থেকে বেশ কিছু ইলমি প্রশ্ন এসেছিল এবং সমসাময়িক বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তার উত্তর দিতে সক্ষম হননি। এই সব কিছুই আমার জীবনী গ্রন্থ 'হাদিকাতুল উরুদ ফি মাদায়েহ আবিস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ'-এ বিস্তারিত বর্ণিত আছে। পরিশেষে, যখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনাদি ইলম প্রকাশ করতে চাইলেন এবং তাঁর বিশাল করুণার মাধ্যমে তাঁকে তাঁর শাসনের শেষ দিনে পৌঁছে দিলেন, তখন বাগদাদের শাসনভার মুহাম্মদ নাজিব পাশার ওপর এবং দামেস্কের শাসনভার আলী রেজার ওপর অর্পিত হলো। আলী রেজাকে দামেস্কে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে কষ্টসাধ্য হওয়া সত্ত্বেও আনুগত্য করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় ছিল না। যখন নাজিব আসলেন, তখন আমার প্রতি তাঁর আচরণ গিরগিটির মতো রং বদলাতে লাগল। কখনও সদ্ভাব, আবার কখনও—আল্লাহর পানাহ—বিমুখতা। আমি উভয় অবস্থাতেই তাঁর ছায়ার চেয়েও বেশি অনুগত ছিলাম এবং তাঁর পরিবারের চেয়েও দ্রুত তাঁর নির্দেশ পালনে তৎপর ছিলাম। তিনি কতবার আমাকে বরখাস্ত করার সংকল্প করেছেন কিন্তু পারেননি, কারণ আয়ু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব ছিল না। মহান আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য, এমনকি পদের জন্যও একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে রেখেছেন। যখন তাঁর নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এল এবং অনাদিকাল থেকে যা ফয়সালা ছিল তা বাস্তবায়িত হলো, তখন নিন্দুকদের কথায় তিনি আমাকে আমার পদ থেকে বরখাস্ত করলেন। এতে আমি এমনভাবে আনন্দিত হলাম যেন এটাই ছিল আমার পরম লক্ষ্য। কারণ আমি আমার তাফসির 'রুহুল মাআনি' সমাপ্ত করতে ব্যস্ত ছিলাম এবং ইফতা-এর কাজ আমার সময়কে সংকুচিত করে দিচ্ছিল। হ্যাঁ, আমার থেকে 'ওয়াকফে মারজান' কেড়ে নেওয়া হলো, যা আমাকে দুঃখের চাদরে আবৃত করল এবং তাঁর বিমুখতার ছুরিতে আমার হৃদপিণ্ডের ধমনী ছিন্ন হয়ে গেল। আমার আসবাবপত্র ও কিতাবসমূহ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ল, এমনকি আমার অবস্থা এমন হলো যে ক্ষুধার তাড়নায় মাদুর খাওয়ার উপক্রম হলো এবং তার ওপর তাফসিরের কালি পান করার অবস্থা হলো। আমি আমার বরখাস্তের পাহাড়ের চূড়ায় এমনভাবে আরোহণ করলাম যা আমার শিশুসুলভ বুদ্ধিও কল্পনা করতে পারেনি। আর তা হলো এই যে, মহান উসমানীয় সাম্রাজ্যের (যাকে সৃষ্টিজগতের পালনকর্তা চিরস্থায়ী করুন) পক্ষ থেকে আমাকে রাজকীয় উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। এটি একদিকে যেমন আমাকে আনন্দিত করল, অন্যদিকে এর চারপাশ বিষণ্নতার প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। আমাকে ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, আমি যেন শহর থেকে বেরিয়ে যাই এবং দুঃখের গর্তে পতিত হই। অতঃপর আমাকে ওজর পেশ করার পরামর্শ দেওয়া হলো এবং দূরত্বের কারণে ভ্রমণ করা অসম্ভব বলে জাহির করতে বলা হলো, সাথে তাফসিরের কাজে ব্যস্ততা এবং উজিরের কাজ আঞ্জাম দেওয়ার কথা উল্লেখ করতে বলা হলো। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আমি লিখলাম এবং তিনিও লিখলেন, কিন্তু তিনি দিনকে রাতের সাথে মিলিয়ে ফেললেন (অর্থাৎ সত্য গোপন করলেন)। তা সত্ত্বেও তিনি আমার পত্রটি শাইখুল ইসলাম ও হিতৈষীর নিকট পৌঁছালেন, যিনি সত্যের বাহনসমূহের লাগাম শক্তভাবে ধারণ করেন। পত্রটি ফরাসি দূতের মাধ্যমে পাঠানো হলো, যা আমাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক খাদের কিনারে নিয়ে গেল। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো এবং আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই। পরিবারের ভরণপোষণের দুশ্চিন্তায় পড়ে দেশান্তরী হওয়া ছাড়া আমি অন্য কোনো উপায় দেখলাম না। আমি মনে মনে বললাম, সফর অবশ্যই করতে হবে, যদিও তা কষ্টের অংশ হয়। যাতে আমি আমার অবস্থা এবং যে বিপদের মধ্যে আছি তা মহান উসমানীয় সাম্রাজ্যের করুণার দরবারে পেশ করতে পারি।
বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থের 'নফল নামাজ দুই রাকাত করে পড়া' পরিচ্ছেদে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সকল বিষয়ে ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন, যেমন তিনি আমাদের কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন: তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের সংকল্প করে, সে যেন ফরজ ব্যতিরেকে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, এরপর বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আপনার কুদরতের উসিলায় আপনার নিকট সামর্থ্য ভিক্ষা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আপনি সক্ষম, আমি অক্ষম; আপনি জানেন, আমি জানি না; এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি আপনি জানেন যে এই কাজটি আমার দ্বীন, আমার জীবন ও আমার কর্মের পরিণামের জন্য (অথবা তিনি বললেন: আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য) কল্যাণকর, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দিন ও সহজ করে দিন এবং তাতে আমাকে বরকত দান করুন। আর যদি আপনি জানেন যে এই কাজটি আমার দ্বীন, আমার জীবন ও আমার কর্মের পরিণামের জন্য (অথবা তিনি বললেন: আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য) অকল্যাণকর, তবে তা আমার থেকে ফিরিয়ে নিন এবং আমাকেও তা থেকে সরিয়ে রাখুন। আর যেখানেই হোক আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারিত করুন, এরপর তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করুন। তিনি বলেন, এরপর সে যেন তার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে।
তিনি (ইমাম বুখারী) 'কিতাবুদ দাওয়াত'-এ জাবির (রা.) থেকে আরও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সকল বিষয়ে কুরআনের সূরার মতো ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন: যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করে সে যেন নামাজ পড়ে, এরপর বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি... এবং তিনি পুরো দোয়াটি উল্লেখ করেন এবং শেষে বলেন, সে যেন তার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে।
সহীহ বুখারীর 'কিতাবুত তাওহীদ'-এ তাঁর থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাহাবীদের সকল বিষয়ে ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন যেমন তিনি তাঁদের কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন: যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করে সে যেন ফরজ ব্যতিরেকে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, এরপর বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি... 'আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী' পর্যন্ত। তবে এখানে 'মহান' (আল-আজীম) শব্দটি বলেননি। এরপর বলতেন: হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে এই বিষয়টি—এরপর সে সুনির্দিষ্টভাবে বিষয়টির নাম উল্লেখ করবে—আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণকর (অথবা তিনি বলেছেন: আমার দ্বীন, জীবন ও কর্মের পরিণামের জন্য), তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত ও সহজ করে দিন এবং তাতে আমাকে বরকত দিন। হে আল্লাহ! আর যদি আপনি জানেন যে এটি আমার দ্বীন, জীবন ও কর্মের পরিণামের জন্য অকল্যাণকর (অথবা তিনি বলেছেন: আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য), তবে আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে দিন এবং যেখানেই হোক আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারিত করুন, এরপর তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করুন।
তাবারানী 'আল-মু'জাম আস-সাগীর'-এ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন যেমন কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন: তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আপনার কুদরতের উসিলায় আপনার নিকট সামর্থ্য ভিক্ষা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আপনি সক্ষম, আমি অক্ষম; আপনি জানেন, আমি জানি না; এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি এই কাজে আমার দ্বীন, দুনিয়া ও কর্মের পরিণামে কল্যাণ থাকে, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন। আর যদি অন্য কিছু আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে যেখানেই হোক কল্যাণ আমার জন্য সহজ করে দিন এবং যেখানেই হোক মন্দ আমার থেকে ফিরিয়ে দিন এবং আমাকে আপনার ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট করুন।
তিনি 'আল-কাবীর'-এ তাঁর থেকেই আরও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের ইস্তিখারা শিক্ষা দিয়ে বলেছেন: তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে যেন বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি... তবে এখানে 'মহান' (আল-আজীম) শব্দটি বলেননি। আর তিনি বলেছেন: আমি যা চাচ্ছি তাতে যদি আমার দ্বীন ও কর্মের পরিণামে কল্যাণ থাকে, তবে তা আমার জন্য সহজ করে দিন। আর যদি অন্য কিছু আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে যেখানেই হোক আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারিত করুন। তিনি বলেন, এরপর সে দৃঢ় সংকল্প করবে।
হাফেজ নুরুদ্দিন আবুল হাসান আলী বিন আবু বকর তাঁর 'মাওয়ারিদুজ জামআন ইলা যাওয়াইদি ইবনে হিব্বান' গ্রন্থে আবু আইয়ুব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: বিয়ের প্রস্তাব গোপন রাখো, এরপর সুন্দরভাবে অজু করো, তারপর আল্লাহ তোমার জন্য যতটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু নামাজ পড়ো। এরপর তোমার রবের প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা করো, অতঃপর বলো: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি সক্ষম, আমি অক্ষম; আপনি জানেন, আমি জানি না; এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী। যদি আপনি অমুক নারীকে (তার নাম উল্লেখ করবে) আমার দ্বীন, দুনিয়া ও পরকালের জন্য কল্যাণকর মনে করেন, তবে তাকে আমার জন্য নির্ধারিত করুন। আর যদি অন্য কেউ তার চেয়ে আমার দ্বীন, দুনিয়া ও পরকালের জন্য বেশি কল্যাণকর হয়, তবে আমার জন্য তাই ফয়সালা করুন।
এতে আরও বর্ণিত হয়েছে আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে যেন বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আপনার জ্ঞানের উসিলায় কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আপনার কুদরতের উসিলায় আপনার নিকট সামর্থ্য ভিক্ষা করছি এবং আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আপনি সক্ষম, আমি অক্ষম; আপনি জানেন, আমি জানি না; এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি অমুক অমুক বিষয়টি আমার দ্বীন, জীবিকা ও কর্মের পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত ও সহজ করে দিন এবং তাতে আমাকে সাহায্য করুন। আর যদি অমুক অমুক বিষয়টি—অর্থাৎ যে কাজটির সে ইচ্ছা করেছে—আমার দ্বীন, জীবিকা ও কর্মের পরিণামের জন্য অকল্যাণকর হয়, তবে তা আমার থেকে ফিরিয়ে নিন। এরপর যেখানেই হোক আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারিত করুন। আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই, কোনো ক্ষমতা নেই।
এতে আরও বর্ণিত হয়েছে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে যেন বলে: হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আপনার কুদরতের উসিলায় আপনার নিকট সামর্থ্য ভিক্ষা করছি এবং আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আপনি সক্ষম, আমি অক্ষম; আপনি জানেন, আমি জানি না; এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি অমুক অমুক বিষয়টি আমার দ্বীন, জীবিকা ও কর্মের পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন ও তাতে আমাকে বরকত দিন। আর যদি অন্য কিছুতে কল্যাণ থাকে, তবে যেখানেই হোক আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারিত করুন এবং আমাকে আপনার তকদিরে সন্তুষ্ট রাখুন।
হাফেজ সাখাভী তাঁর 'আল-ইবতিহাজ বি-আযকারিল মুসাফির আল-হাজ' গ্রন্থে ইবনুস সুন্নী থেকে, তিনি ইব্রাহিম বিন বারা বিন নজর বিন আনাস বিন মালিক থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)...
ইস্তিখারাকারী যখন দুআ থেকে অবসর হবে, তখন ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) যেমনটি বলেছেন, তার বক্ষ যে বিষয়ের জন্য প্রশস্ত হয় সে অনুযায়ী সে অগ্রসর হবে। আল্লামা হাইতামী 'হাশিয়াতুল ইদাহ'-এ বলেন, যদি কোনো কিছুর জন্য তার বক্ষ প্রশস্ত না হয়, তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, সে সালাত ও দুআর মাধ্যমে ইস্তিখারার পুনরাবৃত্তি করবে যতক্ষণ না কোনো কিছুর জন্য তার বক্ষ প্রশস্ত হয়, যদিও তা সাতবারের বেশি হয়। আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে সাতবারের যে সীমাবদ্ধতা এসেছে— "যখন তুমি কোনো কাজের সংকল্প করবে তখন তাতে তোমার রবের কাছে সাতবার ইস্তিখারা করো, এরপর তোমার অন্তরে যা অগ্রগামী হয় তার দিকে তাকাও, কারণ তাতেই কল্যাণ রয়েছে"— তা সম্ভবত অধিকাংশ সময়ের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, কারণ বক্ষ প্রশস্ত হওয়া সাধারণত সাতবারের বেশি বিলম্বিত হয় না। তবে এই হাদীসের সনদ 'গরীব' (সূত্র বিরল), ফলে ইবন আব্দুস সালামের বক্তব্যই উত্তম বলা হয়েছে যে, এরপর সে যা ইচ্ছা করবে, কারণ সেটিই কল্যাণকর। কেননা কিছু বর্ণনায় এসেছে, সে দুআ করবে এরপর সংকল্প করবে (অর্থাৎ যে বিষয়ে ইস্তিখারা করেছে তাতে অগ্রসর হবে), এবং এই বর্ণনাটি আগের হাদীসটি অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। কেউ কেউ মনে করেন যে, মনে যে বিষয়টি উদিত হয় তার ওপর নির্ভর করা যদি শরীয়তসম্মত হয়, তবে তা হাক্কানি ইলহাম বা সত্য অন্তপ্রেরণা। কিন্তু ইবন জামা'আ যেমন বলেছেন, ইস্তিখারাকারীর উচিত নিজের নফসের বিরুদ্ধে এমনভাবে সাধনা করা যাতে করে কাজটি করা বা না করার প্রতি তার কোনো ব্যক্তিগত ঝোঁক অবশিষ্ট না থাকে, এবং সালাতের শুরু থেকে দুআর শেষ পর্যন্ত যেন তার রবের প্রতি সুদৃঢ় মুরাকাবা বা ধ্যান বজায় থাকে। আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে কোনো কিছুর জন্যই তার বক্ষ প্রশস্ত হয়নি, তবে সে সালাত ও দুআর পুনরাবৃত্তি করবে যদিও তা সাতবারের অধিক হয়, যেমনটি ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এর ক্ষেত্রে জানা যায় যে, তিনি একটি বিষয়ে এক বছর পর্যন্ত ইস্তিখারা করেছিলেন। যদি বিষয়টি হাতছাড়া হওয়ার ভয় থাকে এবং পুনরাবৃত্তি করার পরও বক্ষ প্রশস্ত না হয়, তবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য যা সহজ করে দেন তাতেই সে প্রবৃত্ত হবে, ইনশাআল্লাহ তাতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কতিপয় শ্রেষ্ঠ আলিম বলেছেন, আনাস (রা.)-এর হাদীস এবং দুআর পর সংকল্প করার হাদীসটির মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। সেটি এভাবে যে, প্রথম হাদীসটি (হৃদয়ে যা আসে তা অনুসরণ করা) তার জন্য যে নিজের অন্তরের মুরাকাবা করতে পারে, হৃদয়ে উদিত বিভিন্ন চিন্তার মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম, সুসংহত এবং প্রথম চিন্তা ও পরবর্তী চিন্তাগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে যার কাছে বিষয়টি অস্পষ্ট থাকে না। কারণ তার অন্তর স্বচ্ছ এবং সে মহান রবের দরবারে উপস্থিত চিত্ত; সুতরাং সে-ই হৃদয়ে অগ্রগামী প্রথম চিন্তার ওপর নির্ভর করবে যেমনটি উক্ত হাদীসে এসেছে। সূফীগণ বলেছেন, রব্বানি চিন্তা (আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা চিন্তা) হলো প্রথম উদিত চিন্তা এবং তা ভুল হয় না। আর দ্বিতীয় হাদীসটি (সংকল্প করা) তার জন্য যে মুরাকাবা, চিন্তার নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্রগামী চিন্তাকে চিনে নেওয়ার ক্ষেত্রে পারদর্শী নয়। ফলে সে ইস্তিখারার পর যে বিষয়ে ইস্তিখারা করেছে তাতে প্রবৃত্ত হওয়ার সংকল্প করবে। আর আল্লাহ তাআলাই কল্যাণ সহজ করে দেন এবং অকল্যাণ দূর করেন। তিনি পরম করুণাময় ও দয়ালু।
অষ্টম অধ্যায়আজ আল-জাওরা (বাগদাদ) তাঁর আগমনে ধন্য হয়েছে এবং সুহৃদগণ তাঁর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য-সুধা পান করেছে। তিনি আল-হাদবা (মসুল)-কে এমন অবস্থায় দেখেছেন যে তার যৌবন বিদায় নিয়েছে, তার পিঠ কুঁজো হয়ে গেছে এবং তার বার্ধক্য প্রকাশ পেয়েছে। সে তার অনুপযুক্ত পাত্রে পরিণীতা হয়েছে এবং তার স্বচ্ছতা বিলিয়ে দিয়েছে মলিন চরিত্র ও অন্তরের অধিকারীদের ওপর। তিনি তাঁর অদ্বিতীয় ভ্রাতা, মহান আল্লাহর এক সুমহান নিদর্শন আব্দুল বাকি এফেন্দির গৃহে অবস্থান করছেন। আমরা মহান আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁদের উভয়ের সাথে এক প্রাণবন্ত ও প্রফুল্ল বাগানে এবং সুদীর্ঘ ও প্রশস্ত এক সাহিত্যের ময়দানে অবস্থান করছি। সকল অমঙ্গল তাঁদের এড়িয়ে চলুক এবং তাঁদের শত্রুদের মস্তক তাঁদের পদতলে অবনত হোক। তাঁরা উভয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আকাশে সর্বদা দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং হাদবা ও জাওরা অঞ্চলের দুই জ্যোতিষ্ক হয়ে বিরাজ করুন। যখন আমি উল্লিখিত ব্যক্তির গৃহে অবস্থান করছিলাম—যাঁর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের ধারা সর্বদা প্রসারিত থাকুক—তখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে প্রখ্যাত উলামায়ে কেরাম আগমন করেন, যাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। তাঁদের মধ্যে প্রথম, অগ্রগণ্য, শ্রেষ্ঠ এবং অতি মূল্যবান ব্যক্তি হলেন মহৎ ও গুণী আব্দুল্লাহ এফেন্দি আল-উমারি। তিনি উমারি বংশবৃক্ষের নূর এবং ফারুকে আজমের উত্তরসূরিদের মুকুটমণি। উলামাদের নেতৃত্ব তাঁর ওপরই শেষ হয়েছে এবং আল-হাদবায় ইলম অন্বেষণকারীরা তাঁর প্রতিই ঝুঁকে থাকে। তারা তাঁর নিকট থেকেই বর্ণনা গ্রহণ করে এবং তাঁর স্বচ্ছ ইলমের প্রস্রবণ থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করে। তিনি ত্রিশ বছর আগে বাগদাদে এসেছিলেন এবং সেখানে কোনো এক বিশেষ কারণে প্রবাসী মহান আলেমদের নিকট পড়াশোনা করেছিলেন। নিয়তি তাঁর জন্য শ্রেষ্ঠত্বের দ্বার উন্মোচন করেছিল এবং জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে আহ্বান করে বলেছিল, 'তোমার স্থানে অটল থাকো, কারণ আমাদের প্রহরীরা সিংহের মতো জাগ্রত।' সেই সময়ে আমি তাঁর নিকট কতিপয় কিরাত পাঠ করেছিলাম, তাই তিনি কুরআনের ক্ষেত্রে আমার অন্যতম উস্তাদ এবং আমি তাঁর কারণে অন্যান্য সমসাময়িকদের ওপর গর্ব করি। তিনি তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ আল্লামা এবং তাঁর শহরের ইলমের নিশানধারী, পাঠদান ও উপকারের সাথী আলী এফেন্দি মাহজার বাশযাদার নিকট শিক্ষা সমাপন করেছেন। মোদ্দাকথা, তিনি অগ্রসর হয়েছেন এবং সমসাময়িকদের মধ্যে অগ্রগামী হয়েছেন, জ্ঞান ও চরিত্রে তাঁর শহরের আলেমদের ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর উপস্থিতিতে—তাঁর মর্যাদা দীর্ঘস্থায়ী হোক—এক দল লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে, শিয়া সম্প্রদায় 'যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন'—এই আয়াতের বিষয়ে কী বলে? আমি বললাম, আপনারা আমার তাফসির 'রুহুল মাআনি' দেখে নিন। কারণ, আমি আলূসী হলেও পথের ক্লান্তিতে পরিশ্রান্ত। অতঃপর আমি তাদের সামনে তাফসিরটি পেশ করলাম, যদিও আমি তাতে আগে থেকে কোনো কিছু প্রস্তুত করে রাখিনি। তারা তাতে বিস্ময়কর বিষয়াবলি দেখতে পেল এবং বলল, 'আমরা এই কিতাব ছাড়া অন্য কোথাও এমন তথ্য পাইনি।' আপনি যদি চান সেই বিষয়টি আপনার জানা থাকুক, তবে আমি যা তিলাওয়াত করছি তা শ্রবণ করুন। আমি এই আয়াতের তাফসিরে যা উল্লেখ করার করেছি এবং যা সংকলন করার করেছি, তারপর বলেছি: আমার জীবনের কসম! এটি এমন এক আলোচনা যা রাফেজিদের গুই সাপের গর্তে অথবা জনমানবহীন মরুভূমিতে নিক্ষেপ করবে। কেননা এই আয়াতটি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত সকল মুমিনদের প্রতি তিরস্কারস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে আসাকির সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মহান আল্লাহ তাঁর নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়ে আবু বকর ব্যতীত সকল মুসলিমকে তিরস্কার করেছেন। আবু বকর এই তিরস্কার থেকে মুক্ত। অতঃপর তিনি 'যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো'—আয়াতটি পাঠ করেন। হাকিম তিরমিজি হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা আবু বকর ব্যতীত পৃথিবীর সকল অধিবাসীকে তিরস্কার করেছেন এবং বলেছেন, 'যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো'—শেষ পর্যন্ত। ইবনে আসাকির আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু থেকে বর্ণনা করেছেন এই শব্দে যে: আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে নিন্দা করেছেন এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন'—ইত্যাদি। এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর (আবু বকর) সাহচর্য বা সাথী হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট দলিল রয়েছে, যা অন্য কোনো সাহাবীর জন্য এমনভাবে সাব্যস্ত হয়নি। এখানে 'সাথী' বলতে যে তাঁকেই বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ঠিক যেমন 'সুবহানাল্লাজি আসরা বি-আবদিহি' আয়াতে 'বান্দা' বলতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বোঝানোর ওপর ইজমা হয়েছে। এই কারণেই উলামাগণ বলেছেন, তাঁর সাহচর্য অস্বীকার করা কুফরি। এর সাথে আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে তাঁকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে যে, 'চিন্তা করো না'। এর কারণ হিসেবে আল্লাহর বিশেষ সঙ্গকে উল্লেখ করা হয়েছে এই বলে যে, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন'। অন্য কারো ক্ষেত্রে এমনটি সাব্যস্ত হয়নি। এমনকি কোনো নবীর সাথে তাঁর কোনো সাথীর ক্ষেত্রেও আল্লাহর এমন সঙ্গ সাব্যস্ত হয়নি। সম্ভবত এতে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তাঁদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিকের সমতুল্য আর কেউ নেই। আবার তাঁর ওপর 'সাকিনা' বা প্রশান্তি নাযিল হওয়ার বিষয়টি—যদি জমির বা সর্বনাম তাঁর দিকে ফেরে—তা থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনিই সেই মহান ব্যক্তিত্ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু), আর যে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে তার ওপর অভিশাপ। একইভাবে যদি প্রশান্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল হওয়া ধরা হয়—অথচ অস্থির ছিলেন তাঁর সাথী—তবে এটি ইনসাফপন্থীদের জন্য এই দিশা দেয় যে, তাঁরা উভয়ে যেন একই সত্তা। এর মাধ্যমে এই ইঙ্গিতও প্রকাশ পায় যে, সেই দুশ্চিন্তা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে যা বর্ণিত হয়েছে তা এর সপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু রাফেজিরা সিদ্দিকের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মর্যাদার ক্ষেত্রে এই আয়াতের প্রমাণ্যতা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, যদি 'দুইজনের দ্বিতীয়' কথাটি মর্যাদার দলিল হয়, তবে এতে আবু বকর কেবল সংখ্যা পূর্ণকারী ছাড়া আর কিছু নন। আর যদি 'যখন তারা উভয়ে গুহায় ছিল'—এটি দলিল হয়, তবে এটি এক স্থানে দুইজন ব্যক্তির একত্র হওয়া ছাড়া অন্য কিছু বোঝায় না; অথচ এক স্থানে নেককার ও বদকার উভয়ই একত্রিত হতে পারে। আর যদি 'তার সাথীর প্রতি'—এটি দলিল হয়, তবে সাথী হওয়া তো মুমিন ও কাফিরের মধ্যেও হতে পারে, যেমন মহান আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: 'তার সাথী তাকে কথোপকথন অবস্থায় বলল, তুমি কি সেই সত্তাকে অস্বীকার করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন?' এবং আল্লাহর বাণী: 'তোমাদের সাথী (নবী) পাগল নন' এবং 'হে কারাগারের দুই সাথী'। বরং সাথী হওয়া বিবেকসম্পন্ন সত্তা এবং বিবেকহীন সত্তার মধ্যেও হতে পারে, যেমন কবি বলেছেন:
নিশ্চয়ই গাধা অন্যান্য গাধাদের সাথে একটি বাহন মাত্র... আর যদি তুমি তার সাথে একাকী থাকো তবে সে এক নিকৃষ্ট সাথী।আর যদি (চিন্তিত হইও না) বলা হয়, তবে উত্তর হলো—দুশ্চিন্তা বা দুঃখ প্রকাশ করা ইবাদত হবে অথবা পাপাচার হবে; এই দুই অবস্থার বাইরে কিছু হওয়া সম্ভব নয়। এটি ইবাদত হওয়া বৈধ নয়, অন্যথায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে নিষেধ করতেন না। সুতরাং নিষেধের কারণে এটি পাপাচার হওয়া নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর এটি আপনাদের উদ্দেশ্যের বিপরীত বিষয়কেই সাব্যস্ত করে। উপরন্তু এতে ভীরুতার যে প্রমাণ রয়েছে তা তো বলাই বাহুল্য।
আর যদি (নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন) বাক্যটি সম্পর্কে বলা হয়, তবে সম্ভাবনা আছে যে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ সান্নিধ্য কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যই সাব্যস্ত করা। কিন্তু মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য ‘আমাদের’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর উদাহরণ হলো আল্লাহ তাআলার বাণী: (আর হয় আমরা অথবা তোমরা অবশ্যই হেদায়েতের ওপর আছি অথবা সুস্পষ্ট গোমরাহিতে)।আর যদি (অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রশান্তি তাঁর ওপর নাজিল করলেন) বাক্যটি সম্পর্কে বলা হয়, তবে এখানে সর্বনামটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরবে যাতে সর্বনামগুলোর ভিন্নতা না ঘটে। এমতাবস্থায় এখানে কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রশান্তিকে নির্দিষ্ট করা—যেখানে আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে কোনো বিশেষায়ন নেই যে, (অতঃপর তিনি তাঁর রাসুল এবং মুমিনদের ওপর তাঁর প্রশান্তি নাজিল করলেন)—তা আপনাদের দাবির বিপরীত বিষয়ের দিকে ইশারা করে।
আর যদি আয়াতটি সেই সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর বের হওয়ার ওপর প্রমাণ বহন করে, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন কেবল মক্কায় মুশরিকদের সাথে থেকে গেলে তাঁর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায়। আর এই সফরে উট ক্রয় করে তাদের সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী আলী (আল্লাহ তাঁর চেহারাকে মর্যাদাবান করুন) হওয়ার মাঝেও এরই ইঙ্গিত রয়েছে। আর যদি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকে তবে তা বর্ণনা করুন যেন আমরা সে বিষয়ে আলোচনা করতে পারি—তাদের বক্তব্য এখানেই শেষ।আমার জীবনের কসম! এটি জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রলাপ কিংবা মাতালের মাতলামির সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যদি তাঁর মহান কিতাবে ইয়াহুদি ও নাসারাদের থেকে এই জাতীয় বিষয় বর্ণনা না করতেন এবং দুর্বল ঈমানদারদের প্রতি দয়া স্বরূপ তার খণ্ডন না করতেন, তবে আমরা এর প্রতিবাদে মুখ খুলতাম না এবং এর অসারতা প্রমাণের ময়দানে কলম ধরতাম না।
কিন্তু আমি সেই কারণেই বলছি যে, এটি গোপন নয় যে ‘দুইজনের দ্বিতীয় জন’ এবং অনুরূপভাবে ‘যখন তারা দুইজন গুহার মধ্যে ছিল’—এগুলো প্রসঙ্গের আনুকূল্যে সিদ্দীক (রা.)-এর মর্যাদার ওপরই প্রমাণ বহন করে। আমরা এগুলোকে নিরঙ্কুশ প্রমাণ হিসেবে দাবি করছি না, তবে প্রসঙ্গের আনুকূল্য এখানে পাহাড়ের চূড়ায় প্রজ্বলিত আগুনের চেয়েও স্পষ্ট। কোনো বিবেকবান মানুষের কাছে এটি অস্পষ্ট থাকার কথা নয় যে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অন্য একজনের দ্বিতীয় জন হবে না এবং কোনো স্থানে তার সাথে থাকবে না যখন কোনো শত্রু বিদ্যমান থাকে, যতক্ষণ না সে তার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং তার সত্যবাদিতা তার কাছে সুনিশ্চিত হয়। বিশেষ করে যখন অন্য ব্যক্তিটি তার কারণে এমন এক ভূমি ত্যাগ করেছেন যেখানে তাঁর নাড়ি কাটা হয়েছিল এবং যেখানে তাঁর গলার কবচ খোলা হয়েছিল, স্বজনদের ত্যাগ করেছেন, বন্ধুদের থেকে বিমুখ হয়েছেন এবং এমন দুর্গম মরুভূমি পাড়ি দিয়েছেন যেখানে চাতক পাখিও পথ হারায় এবং কদমগুলো থমকে যায়।আর সেই দ্বিত্বের মর্যাদার ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীও প্রমাণ বহন করে যা তিনি আবু বকরের অন্তরকে শান্ত করার জন্য বলেছিলেন: ‘সেই দুইজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কী যাদের তৃতীয় জন হলেন আল্লাহ?’ আর ভাষাগত সাহচর্য যদিও নিজে থেকে দাবিকৃত বিষয়ের ওপর প্রমাণ দেয় না, কিন্তু প্রসঙ্গের আনুকূল্যে তাও এর ওপর প্রমাণ বহন করে। সুতরাং ‘সাথী’ বা ‘বন্ধু’ শব্দটিকে সর্বনামের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা একটি বিশেষ সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে; অর্থাৎ তাঁর সেই সাথী যিনি তাঁর সাথে এমন এক সময়ে ছিলেন যখন প্রিয় বন্ধু তার বন্ধুকে ত্যাগ করে এবং সেই সফরসঙ্গী যিনি তাঁর সঙ্গ দেওয়ার জন্য নিজের পরিবার ও গোত্রকে ত্যাগ করেছেন।
আর (চিন্তিত হইও না) বাক্যটির উদ্দেশ্য প্রকৃত অর্থে দুঃখ প্রকাশ থেকে নিষেধ করা নয়, কেননা এটি এমন বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত যা শরিয়তের আদেশের আওতাভুক্ত নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো সিদ্দীক (রা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়া বা অনুরূপ কিছু।আর তারা যে দ্বিধাবিভক্ত যুক্তির অবতারণা করেছে, তার অনুরূপ যুক্তি আল্লাহ তাআলার এই বাণীতেও চলতে পারে যেখানে তিনি মুসা ও হারুন (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছেন: (তোমরা ভয় পেয়ো না, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি)। অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার এই বাণীতেও: (তাদের কথা যেন তোমাকে চিন্তিত না করে, নিশ্চয়ই সকল সম্মান আল্লাহরই)। এছাড়াও অন্যান্য আয়াতেও এমন রয়েছে। আপনি কি তবে মনে করেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো আনুগত্যের কাজ থেকে নিষেধ করেছেন অথবা ঐসব নিষ্পাপ ব্যক্তিবর্গের কেউ কোনো পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিলেন? আপনি অতি পবিত্র, এটি তো এক মহা অপবাদ! আর দুঃখ বা চিন্তা নিজ সত্তার বিচারে শরিয়তের আদেশের আওতাভুক্ত না হওয়ার সাথে এর প্রশংসা বা নিন্দার ক্ষেত্র হওয়া সাংঘাশিক নয়। যেমন কোনো ইবাদত ছুটে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হওয়া প্রশংসনীয় এবং কোনো পাপাচার করার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় দুঃখিত হওয়া নিন্দনীয়। কেননা তা অন্য একটি দিক বিবেচনা করে হয়ে থাকে, যা অস্পষ্ট নয়। আর এর সাথে অতিরিক্ত হিসেবে যা উল্লেখ করা হয়েছে যে, এতে ভীরুতার যে প্রমাণ রয়েছে—তা বাতিল বিষয় গ্রহণ করার নামান্তর।
কেননা আমরা এটি মেনে নেই না যে, ভয় পাওয়া ভীরুতার প্রমাণ বহন করে। অন্যথায় মুসা এবং তাঁর ভাই হারুন (আ.)-এর ক্ষেত্রেও ভীরুতা অনিবার্য হয়ে পড়বে। সুতরাং দুঃখ বা চিন্তার বিষয়ে আপনার ধারণা কী হতে পারে? আর সিদ্দীক (রা.)-এর দুঃখ প্রকাশ করা গুহায় আত্মগোপন করার চেয়ে বড় কিছু ছিল না। কোনো মুসলমানই এমন ধারণা করে না যে, সেটি ভীরুতার কারণে ছিল। কিংবা সৃষ্টির মাঝে নিরঙ্কুশভাবে সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কি ভীরুতার গুণে গুণান্বিত করা যাবে? আর যে ব্যক্তি ন্যায়নিষ্ঠার সাথে বিচার করবেন তিনি দেখবেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আবু বকরকে (চিন্তিত হইও না) বলে সান্ত্বনা দেওয়া ঠিক তেমনি যেমন আল্লাহ তাঁকে (তাদের কথা যেন তোমাকে চিন্তিত না করে) বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এটি একথার দিকে ইশারা করে যে, সিদ্দীক (রা.) তাঁর নিকট ঠিক সেই অবস্থানে ছিলেন যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সুমহান রবের নিকট ছিলেন। সুতরাং তিনি আল্লাহ তাআলার প্রিয়ভাজন। এমনকি যদি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া এই জাতীয় সান্ত্বনার বিষয়টি বিবেচনা না-ও করা হয়, তবে কেবল ‘চিন্তিত হইও না’ সম্বোধনটিই একথার প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে, সিদ্দীক (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ভাজন ছিলেন। অন্যথায় প্রিয়জনদের মাঝে কথোপকথন আর কেমন হয়? আর এটি শত্রুরা ছাড়া সবার কাছেই স্পষ্ট। আর এই যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশেষ সান্নিধ্য কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ছিল এবং ‘আমাদের’ শব্দটি আনা হয়েছিল কেবল মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য—তা নিতান্তই হঠকারিতা। যেমনটি ইতিপূর্বে বর্ণিত হাদিসটি প্রমাণ করে। উপরন্তু যদি এটি তাঁর প্রতি দয়া ও করুণার কারণে হয়ে থাকে...রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ নন; অতএব তাঁর বাণী "চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার সাথে আছেন"-এর মধ্যে বিমর্ষ হওয়ার কী আছে? যদি এটি রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর নিজের (আবূ বকর) প্রতি অনুকম্পা হিসেবে হয়ে থাকে—রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু—তবে কারণ দর্শানোটি যথোপযুক্ত হতো না, অথচ বাক্যটি তাঁর উদ্দেশ্যেই বলা হয়েছে।
আর যদি আমরা মেনে নেই (প্রথম মতানুসারে এটি বিমর্ষতা এবং দ্বিতীয় মতানুসারে কারণ দর্শানোর যথার্থতা), তবে সেই বিষাদ সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর প্রশংসারই এক সুস্পষ্ট দলিল হবে। আর যদি তা নিজের জীবনের আশঙ্কায় হয়ে থাকে—যেমনটি কোনো কলুষিত অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি দাবি করে থাকে—তবে সেই কারণ দর্শানোর কোনো অর্থই থাকে না। তোমার এই কথার কী অর্থ হতে পারে যে, "তুমি নিজের জন্য বিষাদ করো না, কারণ আল্লাহ আমার সাথে আছেন, তোমার সাথে নন"?
তদুপরি, সেই রাফেযীকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে যে, সিদ্দীক কি এই আয়াত থেকে সেই বিশেষত্বই বুঝেছিলেন যা তুমি বুঝেছ? অর্থাৎ "না" (আমাদের) শব্দটি কি কেবল বিমর্ষতার পথ রুদ্ধ করার জন্যই ব্যবহার করা হয়েছিল নাকি অন্য কিছু? যদি প্রথমটি হয়, তবে বিমর্ষতা তো অবশ্যই ঘটবে, ফলে আমরা যা থেকে পলায়ন করতে চেয়েছিলাম তাতেই নিপতিত হলাম। আর যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে তুমি নিজের জন্য এমন এক মর্তবা দাবি করলে যা তুমি কখনোই অর্জন করতে পারবে না, এমনকি তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও। আর যদি তুমি মহিমান্বিত কুরআনের ভাষ্য ও ইঙ্গিতসমূহ বোঝার ক্ষেত্রে ওহীর প্রত্যক্ষদর্শী সেই বিশুদ্ধভাষী আরবদের সমকক্ষতা দাবি করো, তবে তোমার সেই দাবি গৃহীত হবে না যতক্ষণ না তুমি মৃত্যুবরণ করো। তবে সিদ্দীকের ওপর তোমার শ্রেষ্ঠত্ব কীভাবে স্বীকৃত হতে পারে? অথচ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঙ্গিতসমূহ থেকে "পছন্দ করে নেওয়ার হাদীস" (হাদীসুত তাখয়ীর) সম্পর্কে এমন কিছু বুঝেছিলেন যা অন্যান্য সকল সাহাবীর কাছে অস্পষ্ট ছিল, এমনকি আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর কাছেও। তাই সেদিন তাঁর কান্নায় তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
আর আয়াতে যে সাদৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, তা সেই 'তাকিয়া'র দিকেই ইঙ্গিত করে যাকে রাফেযীরা দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং এর জন্য তারা শব্দসমূহকে তাদের স্বস্থান থেকে বিচ্যুত করেছে। আমরা ইতিপূর্বে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করেছি, অতএব তা স্মরণ করো। আর 'সাকীনাহ' (প্রশান্তি) সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার উত্তর আমাদের পূর্বোক্ত আলোচনা থেকেই জানা যাবে। আর এই বিশেষত্ব দ্বারা সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে মুমিনদের জামাত থেকে বের করে দেওয়ার যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে—যেমনটি আল্লাহর ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রু সেই কুত্তাটি ইশারা করেছে—তা যদি ওহীর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে গোপন না থাকত (যাদের মধ্যে আমির আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুও ছিলেন), তবে তারা কীভাবে তাঁকে সেই খিলাফতের দায়িত্বে অভিষিক্ত করলেন যা শিয়াদের মতে নবুওয়াতেরই সহোদর? অথচ তাঁরা আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করতেন না। আর সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে গোমরাহির ওপর ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন এবং আমির আলী তাঁদের মাঝে দুর্বল অবস্থায় ছিলেন কিংবা চুপ থাকার ও তলোয়ার কোষবদ্ধ রাখার জন্য আদিষ্ট ছিলেন—যেমনটি বিরোধীরা দাবি করে—তবে সেই দাবির অসারতা ইতিপূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে এবং তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। অতএব, এই দাবিদারদের মুখ চুন করার জন্য কলমকে কষ্ট দেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই।
আর এই যে দাবি করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ষড়যন্ত্রের ভয়েই তাঁকে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন—এর উত্তরে বলা যায় যে, আয়াতে তাঁকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারে সামান্যতম কোনো ইঙ্গিতও নেই, ষড়যন্ত্রের ভয়ে হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তদুপরি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকাকালীন যদি তিনি ষড়যন্ত্রই করতে চাইতেন, তবে গুহার মুখে যখন কাফিররা তল্লাশি করতে এল, সেই সুযোগের চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে? যদি আবূ বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর মধ্যে—তাঁর মর্যাদা এসব থেকে অনেক ঊর্ধ্বে—ন্যূনতম কোনো কুমন্ত্রণা থাকত, তবে তিনি বলতেন: "এদিকে এসো, শিকার এখানেই।" এ কথা বলা যাবে না যে তিনি নিজের জীবনের ভয়ও পাচ্ছিলেন, কারণ তিনি বিভিন্নভাবে নিজেকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন; অন্তত এটুকু বলতে পারতেন যে, "আমি এই ষড়যন্ত্রের জন্যই বেরিয়েছি।"
এছাড়াও সিদ্দীক যদি তেমন হতেন যেমনটি সেই যিন্দীক দাবি করে, তবে তাঁর পুত্র আবদুর রহমান, কন্যা আসমা বা তাঁর মুক্তদাস আমির বিন ফুহাইরাকে খবর দিতে কে বাধা দিয়েছিল? তাঁরা তো গুহায় যাতায়াত করতেন, যেমনটি ইবনে মারদুওয়াইহ আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাদের কেউ কাফেরদের খবর দিয়ে দিতে পারত। অথচ এই দাবির বিপরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদীসটি আসে যা তাঁর বিশেষ মর্যাদার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ যে তিনি আসলে কে ছিলেন। তদুপরি, যদি এই প্রলাপ বকার দুয়ার খুলে দেওয়া হয়, তবে কোনো নাসিবী (আলী বিদ্বেষী) আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু সম্পর্কে—আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই—এ কথা বলতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের রাতে তাঁকে তাঁর পবিত্র বিছানায় শুয়ে থাকার আদেশ দিয়েছিলেন কেবল এ জন্যই যাতে মুশরিকরা তাঁকে নবী মনে করে হত্যা করে এবং তিনি তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পান! এই কথাটি শিয়াদের সেই কথার চেয়ে মোটেও বেশি আশ্চর্যজনক বা বাতিল নয় যে, সিদ্দীককে সাথে নেওয়া হয়েছিল তাঁর অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য।
অতএব বুদ্ধিমানদের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য এই দুয়ার যে উন্মোচন করেছে, সে যেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে ভয় করে। আর ইমাম আলী কাররামাল্লাহু তা'আলা ওয়াজহাহু উট ক্রয়ের মাধ্যমে তাঁদের সফরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন—এই দাবির মধ্যে উক্ত বিষয়ের কোনো ইঙ্গিত নেই। এটি কোনোভাবেই সেদিকে ইশারা করে না। তাছাড়া আমরা ইতিপূর্বে যা উল্লেখ করেছি যে, এটি ইবনে আব্বাসের কিছু বর্ণনায় এসেছে, কিন্তু মুহাদ্দিসগণের নিকট নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অন্যটি। উপকারের পূর্ণতা এবং সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর শ্রেষ্ঠত্বের আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তা উল্লেখ করতে কোনো বাধা নেই। আমরা বলছি:
(আব্দুর রাজ্জাক, আহমাদ, আবদ বিন হুমাইদ, বুখারী, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবী হাতিম যুহরীর সূত্রে উরওয়া থেকে এবং তিনি আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি আমার পিতামাতাকে সর্বদা এই দ্বীন পালনরত অবস্থাতেই দেখেছি। এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনের দুই প্রান্তে অর্থাৎ সকাল ও সন্ধ্যায় আমাদের নিকট আসতেন না।)
যখন মুসলিমরা বিপদে পড়লেন, তখন আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিজরতের উদ্দেশ্যে হাবশার দিকে বেরিয়ে পড়লেন। যখন তিনি বারকুল গিমাদ নামক স্থানে পৌঁছালেন, তখন ইবনুদ দাগিনাহর সাথে তাঁর দেখা হলো, যিনি কারাহ গোত্রের সর্দার ছিলেন। ইবনুদ দাগিনাহ জিজ্ঞেস করলেন: হে আবূ বকর, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তখন আবূ বকর বললেন...
বকর (বললেন), আমার কওম আমাকে বের করে দিয়েছে, তাই আমি পৃথিবীতে বিচরণ করতে চাই এবং আমার রবের ইবাদত করতে চাই। ইবনুদ দাগিনাহ বললেন, হে আবু বকর, আপনার মতো ব্যক্তি নিজে বের হয় না এবং তাকে বেরও করে দেওয়া হয় না। আপনি নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারি করেন এবং হকের পথে আপতিত বিপদে সাহায্য করেন। তাই আমি আপনার আশ্রয়দাতা; আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন। অতঃপর ইবনুদ দাগিনাহ রওনা হলেন। তিনি আবু বকরের সাথে ফিরে এলেন এবং কুরাইশ কাফেরদের মাঝে ঘুরে ঘুরে বললেন, আবু বকরের মতো ব্যক্তি নিজে বের হয় না এবং তাকে বেরও করা হয় না। আপনারা কি এমন এক ব্যক্তিকে বের করে দিচ্ছেন যিনি নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারি করেন এবং হকের পথে আপতিত বিপদে সাহায্য করেন? তখন কুরাইশরা ইবনুদ দাগিনাহর আশ্রয় কবুল করল এবং আবু বকরকে নিরাপত্তা দিল। তারা ইবনুদ দাগিনাহকে বলল, আবু বকরকে আদেশ দিন যেন তিনি তার ঘরেই তার রবের ইবাদত করেন এবং সেখানে যা ইচ্ছা সালাত আদায় করেন ও যা ইচ্ছা পাঠ করেন; তবে তিনি যেন আমাদের কষ্ট না দেন এবং ঘরের বাইরে উচ্চস্বরে সালাত ও তিলাওয়াত না করেন। তিনি তাই করলেন। অতঃপর (আবু বকরের মনে একটি চিন্তা উদয় হলো এবং) তিনি তার ঘরের আঙিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। সেখানে তিনি সালাত আদায় করতেন এবং তিলাওয়াত করতেন। মুশরিকদের নারীরা ও তাদের সন্তানরা তার চারপাশে ভিড় করত; তারা তার প্রতি আশ্চর্যান্বিত হতো এবং তার দিকে তাকিয়ে থাকত। তিনি ছিলেন একজন অতিশয় ক্রন্দনশীল ব্যক্তি, কুরআন তিলাওয়াতের সময় তিনি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারতেন না। এতে কুরাইশদের নেতারা ভীত হয়ে পড়ল এবং তারা ইবনুদ দাগিনাহর কাছে লোক পাঠাল। তিনি তাদের কাছে এলে তারা বলল, আমরা আবু বকরকে এই শর্তে আশ্রয় দিয়েছিলাম যে তিনি তার ঘরে রবের ইবাদত করবেন। কিন্তু তিনি তা লঙ্ঘন করে ঘরের আঙিনায় মসজিদ নির্মাণ করেছেন এবং প্রকাশ্যে সালাত ও তিলাওয়াত শুরু করেছেন। আমরা আশঙ্কা করছি যে তিনি আমাদের নারী ও সন্তানদের ফিতনায় ফেলবেন। যদি তিনি তার ঘরেই রবের ইবাদত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান তবে তা করতে পারেন, আর যদি তিনি তা প্রকাশ্যেই করতে চান তবে তাকে বলুন আপনার আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে দিতে। কারণ আমরা আপনাকে তুচ্ছজ্ঞান করা অপছন্দ করি, আবার আবু বকরের প্রকাশ্যে ইবাদত করাও আমরা মেনে নিতে পারছি না। ইবনুদ দাগিনাহ আবু বকরের কাছে এসে বললেন, হে আবু বকর, আপনি তো জানেন আপনার সাথে আমি কী চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম। হয় আপনাকে সেই সীমাবদ্ধতার ভেতর থাকতে হবে, না হয় আমার আশ্রয়ের দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ আমি চাই না আরবরা শুনুক যে আমি যার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম তার ব্যাপারে আমার চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে। আবু বকর বললেন, আমি আপনার আশ্রয় আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি এবং আমি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্রয়েই সন্তুষ্ট। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ছিলেন এবং তিনি মুসলিমদের বলেছিলেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে; আমাকে একটি লোনা ও খেজুর বাগান সমৃদ্ধ ভূমি দেখানো হয়েছে যা দুটি কৃষ্ণবর্ণ পাথুরে প্রান্তরের মাঝে অবস্থিত। অতঃপর যারা হিজরত করার তারা মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করলেন এবং মুসলিমদের মধ্যে যারা আবিসিনীয় (হাবশা) ভূমিতে ছিলেন তারা ফিরে এলেন। আবু বকরও হিজরতের প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, একটু অপেক্ষা করো, আমি আশা করি আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে। আবু বকর বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, আপনি কি তা আশা করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ফলে আবু বকর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়ার আশায় নিজেকে আটকে রাখলেন এবং তার কাছে থাকা দুটি উটকে চার মাস ধরে বাবলা পাতা খাইয়ে পুষ্ট করতে লাগলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, একদা দুপুরে আমরা যখন আমাদের ঘরে বসে ছিলাম, তখন একজন আবু বকরকে বলল, এই যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা ঢেকে এমন এক সময়ে আসছেন যে সময়ে তিনি সচরাচর আসতেন না। আবু বকর বললেন, আমার পিতা-মাতা তার জন্য উৎসর্গ হোন, এই অসময়ে তিনি অবশ্যই কোনো বিশেষ প্রয়োজনে এসেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে অনুমতি চাইলেন। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখানে শুধু আপনার পরিবারের লোকেরাই আছে, আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, আমি কি আপনার সাথী হতে পারি? রাসূলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, এই দুটি উটের একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মূল্যের বিনিময়ে। আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা তাদের সফরের সরঞ্জাম অত্যন্ত দ্রুত প্রস্তুত করে দিলাম এবং একটি চামড়ার থলিতে তাদের জন্য পাথেয় তৈরি করে দিলাম। আবু বকরের কন্যা আসমা তার কোমরের বন্ধনী ছিঁড়ে তা দিয়ে থলির মুখ বেঁধে দিলেন, এ কারণেই তাকে 'যাতুন নিতাক' (বন্ধনী বিশিষ্ট) বলা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর 'সওর' নামক পাহাড়ের এক গুহায় গিয়ে পৌঁছালেন এবং সেখানে তিন রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর তাদের সাথে রাত কাটাতেন, যিনি ছিলেন একজন চতুর ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান যুবক। তিনি শেষ রাতে তাদের কাছ থেকে বের হয়ে ভোরে মক্কায় কুরাইশদের মাঝে এমনভাবে উপস্থিত হতেন যেন তিনি ওখানেই রাত কাটিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্তের কথা শুনলে তিনি তা মনে রাখতেন এবং অন্ধকার ঘনিয়ে এলে তাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিতেন। আবু বকরের মুক্তদাস আমির বিন ফুহাইরা তাদের জন্য দুধের বকরি চরাতেন এবং রাতের কিছু অংশ পার হলে তাদের কাছে নিয়ে আসতেন। তারা দুধে তৃপ্ত হয়ে রাত কাটাতেন যতক্ষণ না আমির শেষ রাতে বকরিগুলো নিয়ে ফিরে যেতেন। তিন রাত পর্যন্ত তিনি প্রতি রাতেই এমনটি করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'দিল' গোত্রের বনু আবদ ইবনে আদি শাখার এক ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত করেছিলেন, যিনি পথ চেনায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি আস ইবনে ওয়ায়েলের পরিবারের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন এবং কুরাইশ কাফেরদের ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। তারা তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের উট দুটি তাকে সঁপে দিলেন এবং তিন রাত পর সাওর গুহায় আসার প্রতিশ্রুতি নিলেন। তিন রাত পর ভোরে তিনি উট দুটি নিয়ে তাদের কাছে এলেন। তিনি তাদের নিয়ে উপকূলীয় পথ ধরে অগ্রসর হলেন এবং এভাবেই দীর্ঘ হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। এতে সিদ্দীকে আকবরের মর্যাদার ওপর অনেক প্রমাণ রয়েছে এবং এটি একটি স্পষ্ট দলিল যে তাদের সফরের প্রস্তুতি আবু বকরের ঘরেই হয়েছিল এবং উট দুটি তারই ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উট দুটি মূল্যের বিনিময়ে গ্রহণ করেছিলেন, তা রাফেযিদের সেই অপবাদের খণ্ডন করে যা তারা এই হাদিসের ব্যাপারে সিদ্দীকা (আয়েশা)-এর প্রতি আরোপ করে; আল্লাহ তাকে তা থেকে পবিত্র রাখুন। এই স্থানে আমরা যা উল্লেখ করেছি তার আদ্যোপান্ত যারা অবগত হবে, তারা বুঝতে পারবে যে—"যদি এর বাইরে অন্য কিছু থাকে তবে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট করুন যেন আমরা সে বিষয়ে কথা বলতে পারি"—এই উক্তিটি নিছক অজ্ঞতা অথবা হঠকারিতা থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক নেই।