(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: -)
فقه قراءة القرآن   (سعيد عبد الجليل يوسف صخر)

القسم: علوم القرآن وأصول التفسير


الكتاب: فقه قراءة القرآن الكريم

المؤلف: أبو خالد سعيد عبد الجليل يوسف صخر المصري

الناشر: مكتبة القدسى - القاهرة

الطبعة: الأولى، 1418 هـ - 1997 م

عدد الصفحات: 110

[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]

تاريخ النشر بالشاملة: 15 ربيع الأول 1433

ফিকহু কিরাতিল কুরআন   (সাঈদ আব্দুল জলীল ইউসুফ সাখর)

বিভাগ: উলূমুল কুরআন ও উসূলুত তাফসীর


বই: ফিকহু কিরাতিল কুরআনিল কারীম

লেখক: আবু খালিদ সাঈদ আব্দুল জলীল ইউসুফ সাখর আল-মিসরী

প্রকাশক: মাকতাবাতুল কুদসী - কায়রো

সংস্করণ: প্রথম, ১৪১৮ হিজরি - ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১০

[বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর মুদ্রণ কপির অনুরূপ]

শামেলায় প্রকাশের তারিখ: ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩

(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৩)
‌‌من القرآن والسنة

من القرآن الكريم: قال تعالى:

إِنَّ هذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْراً كَبِيراً (9)

(الإسراء: 9)

من السنة المطهرة: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:

«من قرأ حرفا من كتاب الله فله حسنة، والحسنة بعشر أمثالها لا أقول: الم حرف، ولكن ألف حرف ولام حرف وميم حرف».

أخرجه الترمذى والحاكم بسند صحيح من حديث ابن مسعود، انظر صحيح الجامع (ج 2 ص 1104) رقم (6469)
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে

আল-কুরআনুল কারীম থেকে: মহান আল্লাহ বলেন:

নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাপেক্ষা সরল এবং সেই মুমিনদের সুসংবাদ প্রদান করে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করে যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার (৯)

(আল-ইসরা: ৯)

পবিত্র সুন্নাহ থেকে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে; আর প্রতিটি নেকি তার দশ গুণ সওয়াবের সমান। আমি বলছি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর, বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর।”

তিরমিজি ও হাকেম এটি ইবনে মাসউদের হাদিস হতে সহিহ (صحيح) সনদে (سند) বর্ণনা করেছেন; দেখুন সহিহ আল-জামি (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১০৪) নম্বর (৬৪৬৯)
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৪)
‌‌مقدمة فضيلة الأستاذ الشيخ/ محمد الفقى

بسم الله والحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله الذى أنزل عليه كتاب لا يخلق من كثرة الرد ولا يزيد القارئ له إلا إجلالا وإعظاما. وبعد …

فقد أتاح لى الأخ الكريم أبو خالد- سعيد عبد الجليل يوسف الاطلاع على ما قام به من جهد مشكور وبحث طيب فى «فقه قراءة القرآن الكريم» سبقه إلى القول فيه علماء أجلاء أفنوا زهرة عمر هم فى خدمة كتاب الله إلا أن آراءهم والمسائل التي أثاروها جاءت متفرقة في ثنايا موسوعاتهم مما كان يكلف الطالب لشىء منها مشقة، فجاء أخونا- نفعه الله بما قدم- يجمع هذه المتفرقات من مصادرها ونظمها فى سلك من التبويب والمعالجة السهلة الميسرة للمسائل التى سبق بها أو مسائل ذات صلة بعلوم القرآن أو أخرى رآها مطروحة على الساحة وكان عليه أن يناقشها بما تيسر له من أدوات البحث والاجتهاد والاستنباط الأمر الذى جعل من إصداره هذا مرجعا سهلا ميسرا، وفقها طيبا لقارئ القرآن وسامعه وغنية يكتفى بها فى حدود رغبته فى الوقوف على الجواب الشافى دون حاجة إلى إطالة أو إملال. كما يتيح لمن يقتنى هذا البحث أن يضعه فى مكتبته وأن يحتل منها مكانا بارزا يسهل له الرجوع إليه متى أراد ..

لقد جاء جهده المشكور انطلاقا من دعوته الجميع بضرورة العناية أولا بكتاب الله حفظا وفهما ومدارسة باعتباره المصدر الأول، وإنى إذ أحيى دعوته صادقا فإننى كذلك أعلن اعتزازى بالجهود المخلصة الأخرى التى تهتم بالسنة النبوية رواية ودراية، ولعل هذين الاتجاهين المتآزرين ينفعان شباب الإسلام فى أيامنا هذه ويخدمان القرآن والسنة مصداقا لقول رسول الله صلى الله عليه وسلم: «تركت فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا أبدا كتاب الله وسنتى».

هذا والله من وراء القصد وهو حسبنا ونعم الوكيل

كتبه أبو أنس/ محمد الفقى
মরহুম প্রফেসর শাইখ মুহাম্মদ আল-ফিকী-এর ভূমিকা

আল্লাহর নামে শুরু করছি, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর, যাঁর ওপর এমন এক কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে যা বারবার পাঠেও পুরাতন হয় না এবং পাঠকারীর নিকট এর মর্যাদা ও মহিমা কেবল বৃদ্ধিই পায়। অতঃপর …

শ্রদ্ধেয় ভাই আবু খালিদ—সাঈদ আব্দুল জলিল ইউসুফ তাঁর প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা এবং ‘কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের ফিকহ (فقه)’ বিষয়ক চমৎকার গবেষণাকর্মটি আমাকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর পূর্বে অনেক মহান আলেম আল্লাহর কিতাবের খিদমতে তাঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত করে এই বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন। তবে তাঁদের মতামত ও উত্থাপিত মাসআলাসমূহ তাঁদের বিশাল বিশ্বকোষগুলোর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, যার ফলে কোনো বিষয়ের শিক্ষার্থীকে তা খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট করতে হতো। এমতাবস্থায় আমাদের এই ভাই—আল্লাহ তাকে এই মহৎ কর্মের মাধ্যমে উপকৃত করুন—সেসব বিক্ষিপ্ত বিষয়গুলো মূল উৎস থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল পদ্ধতিতে অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস ও বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি এতে এমন সব মাসআলা আলোচনা করেছেন যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে অথবা কুরআনুল কারীমের উলুম (علوم)-এর সাথে সম্পর্কিত কিংবা সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আলোচিত অন্য যেসব বিষয় তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেছেন। তিনি গবেষণার যথাযথ হাতিয়ার, ইজতিহাদ (اجتهاد) এবং মাসআলা উদ্ভাবন (استنباط)-এর মাধ্যমে বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। তাঁর এই প্রকাশনাটি কুরআন পাঠক ও শ্রোতাদের জন্য একটি সহজ রেফারেন্স এবং চমৎকার ফিকহ (فقه) হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা অতিরিক্ত দীর্ঘসূত্রিতা বা একঘেয়েমি ছাড়াই একজন জিজ্ঞাসুর কাঙ্ক্ষিত ও তৃপ্তিদায়ক সমাধান প্রদান করতে সক্ষম। এছাড়া এই গবেষণাটি যারা সংগ্রহ করবেন, তারা তাদের লাইব্রেরিতে একে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাখতে পারবেন, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো সময় সহজেই এর শরণাপন্ন হওয়া যায়।

তাঁর এই প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা মূলত সকলের প্রতি এই দাওয়াতেরই বহিঃপ্রকাশ যে, প্রথম উৎস হিসেবে আল্লাহর কিতাব হিফজ করা, অনুধাবন করা এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে এর প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া আবশ্যক। আমি তাঁর এই দাওয়াতকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই, সেই সাথে সুন্নাহর বর্ণনা (رواية) এবং সুন্নাহর অনুধাবন (دراية) সংক্রান্ত অন্যান্য নিষ্ঠাবান প্রচেষ্টাসমূহকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। সম্ভবত এই পরস্পর সহযোগী ধারাদ্বয় বর্তমান সময়ে মুসলিম যুবকদের উপকারে আসবে এবং কুরআন ও সুন্নাহর খিদমত করবে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীরই প্রতিফলন: “আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ (سنة)।”

আল্লাহই একমাত্র লক্ষ্য এবং তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট ও সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।

লিখেছেন আবু আনাস/ মুহাম্মদ আল-ফিকী
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৫)
بسم الله الرحمن الرحيم

 

‌‌مقدمة المؤلف

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وأصحابه ومن اهتدى بهداه، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده ورسوله.

أما بعد: فإن أصدق الحديث كتاب الله تعالى وخير الهدى هدى محمد صلى الله عليه وسلم وشر الأمور محدثاتها وكل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة وكل ضلالة فى النار وبعد.

فلمّا كان القرآن الكريم هو المنهج الذى ارتضاه الله سبحانه وتعالى لعباده دستورا لحياتهم فى جميع شئون الحياة لذا ضمنه سبحانه وتعالى مقومات الحياة كلها على أكمل وأحسن وجه وأودع فيه علم كل شىء بحيث يفى بمطالب هذه البشرية فى حياتها الفردية والجماعية ويهديها إلى طريق الكمال فى الحياة الدنيا بقدر ما تطيق ثم إلى الحياة الأخرى فى نهاية المطاف.

فلمّا غفل المسلمون عن هذا المنهج واتخذوا القرآن كتاب متاع للثقافة وكتاب تعبد للتلاوة فحسب لا منهج تربية للتوجيه والتكيّف ومنهج حياة للعمل والتنفيذ لم ينتفعوا من القرآن بشيء لأنهم خرجوا عن منهجه الذى رسمه العليم الخبير.

والقرآن بخصائصه الموضوعية والتعبيرية، بهذا الكمال فى تناسقه وبهذا الكمال فى العقيدة التى جاء بها، وبهذا المنهج المبرأ من القصور والنقص ومن آثار الجهل والعجز كان الحجة التى أظهرها الله سبحانه وتعالى على يد نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وجعله تصديقا لما بين يديه من الكتب المتقدمة- فى أصل العقيدة والدعوة إلى الخير ومهيمنا عليها ومبينا لما وقع فيها من التحريف والتأويل والتبديل، وتحدى الناس جميعا أن يأتوا بمثله أو أن يأتوا بعشر سور من مثله أو بسورة من مثله أو بحديث مثله فما استطاعوا ولن يستطيعوا، ولا يزال التحدى قائما حتى يرث الله الأرض ومن عليها.
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

 

‌‌লেখকের ভূমিকা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবীগণ এবং যারা তাঁর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হয়েছেন তাদের ওপর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।

অতঃপর: নিশ্চয়ই সবচেয়ে সত্য বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম বিষয় হলো (দ্বীনের মধ্যে) নবউদ্ভুদ বিষয়সমূহ (محدثات) এবং প্রতিটি নবউদ্ভুদ বিষয়ই হলো বিদআত (بدعة), আর প্রতিটি বিদআত (بدعة) হলো ভ্রষ্টতা (ضلالة), এবং প্রতিটি ভ্রষ্টতা (ضلالة) জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। অতঃপর—

যেহেতু পবিত্র কুরআন হলো সেই জীবনপদ্ধতি যা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করেছেন, তাই তিনি এতে জীবনের সকল উপাদান অত্যন্ত নিখুঁত ও উত্তমভাবে সন্নিবেশিত করেছেন এবং এতে সবকিছুর জ্ঞান গচ্ছিত রেখেছেন; যা মানবজাতির ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সকল চাহিদা পূরণ করে এবং দুনিয়াবী জীবনে তাদের সাধ্যানুযায়ী পূর্ণতার পথে ও পরিশেষে পরকালীন জীবনের দিকে পরিচালিত করে।

কিন্তু যখন মুসলিমগণ এই জীবনপদ্ধতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ল এবং কুরআনকে কেবল সংস্কৃতির উপকরণ এবং শুধুমাত্র তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইবাদতের কিতাব হিসেবে গ্রহণ করল, কিন্তু একে দিকনির্দেশনা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষাপদ্ধতি এবং আমল ও বাস্তবায়নের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করল না, তখন তারা কুরআন থেকে কোনো উপকার লাভ করতে পারল না। কারণ তারা সেই মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত সত্তার অঙ্কিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল।

কুরআন তার বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বৈশিষ্ট্য, এর সামঞ্জস্যপূর্ণ পূর্ণতা এবং এর আনীত আকিদার (عقيدة) পূর্ণতাসহ, আর সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি, মূর্খতা ও অক্ষমতার প্রভাবমুক্ত এই জীবনপদ্ধতির মাধ্যমে সেই অকাট্য প্রমাণ (حجة) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তিনি একে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী—আকিদার (عقيدة) মূলভিত্তি ও কল্যাণের দাওয়াতের ক্ষেত্রে—এবং সেগুলোর সংরক্ষণকারী ও তদারককারী (مهيمن) এবং সেইসব কিতাবে ঘটা বিকৃতি (تحريف), অপব্যাখ্যা (تأويل) ও পরিবর্তনের (تبديل) বর্ণনাকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি সমস্ত মানুষকে এর মতো কিছু আনতে অথবা এর মতো দশটি সূরা বা একটি সূরা অথবা এর মতো কোনো হাদিস আনতে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু তারা তা পারেনি এবং কখনও পারবেও না। এই চ্যালেঞ্জ কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ এই পৃথিবী ও এর ওপর যা কিছু আছে তার উত্তরাধিকারী হন।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৬)
قال تعالى: قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً (1).

وفى هذا بيان لإعجاز القرآن وأنه لا يستطيع أحد أن يأتى بشيء من جنسه لأنه بفصاحته وبلاغته ووجازته وحلاوته واشتماله على المعانى النافعة فى الدنيا والآخرة لا يكون إلا من عند الله الذى لا يشبهه شىء فى ذاته ولا فى صفاته ولا فى أفعاله وأقواله، فكلامه لا يشبه كلام المخلوقين فهذا القرآن لا يكون إلا من عند الله.

قال تعالى: وَلَوْ كانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلافاً كَثِيراً (2).

وكان القرآن ينزل على النبى صلى الله عليه وسلم منجما بعضه فى إثر بعض والنبى صلى الله عليه وسلم يتلقاه بروحه وجوارحه معا، فكان قرآنا يمشى على الأرض وكان خلقه القرآن، وكذا تلقاه الجيل الأول من أصحاب النبى صلى الله عليه وسلم ورضى الله عنهم ف (كان الرجل منهم إذا تعلم عشر آيات من كتاب الله لا يجاوزهنّ حتى يعرف معانيهنّ والعمل بهنّ) (3).

وقد ثبت أن «عبد الله بن عمر رضى الله عنهما أخذ فى تحصيل سورة البقرة ثمانى سنين يتعلمها بأحكامها ومعانيها وأخبارها فكذلك طال مكثه فيها» (4).

ففتح الله لهم آفاقا من الفهم والمعرفة لم تكن لتفتح لهم لو أنهم قصدوا إلى كتاب الله بقصد القراءة أو الحفظ فحسب فهذا القرآن لا يمنح كنوزه ودرره إلا لمن يقبل عليه بهذا الشعور وبهذه الروح شعور التلقى للتنفيذ وروح المعرفة المنشئة للعمل (5).

وكان لهذا المنهج- منهج التلقى والتعليم للتنفيذ والعمل- أكبر الأثر فى فهم هذا

--------------------------------------------

(1) الإسراء: 88.

(2) النساء: 82.

(3) ذكره ابن كثير (بسنده) عن ابن مسعود (ج 1 ص 4).

(4) رواه مالك فى الموطأ (ج 1 ص 205) وذكره ابن عبد البر فى الاستذكار (ج 8 ص 91)، وفى الطبقات لابن سعد عن ميمون أن ابن عمر تعلم سورة البقرة فى أربع سنين.

(5) من كتاب معالم فى الطريق بتصرف.
মহান আল্লাহ বলেন: "বলুন, যদি মানুষ ও জিন এই কুরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না; যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।" (১)।

এতে কুরআনের অলৌকিকত্বের বর্ণনা রয়েছে এবং এ কথা স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এর সমজাতীয় কোনো কিছু নিয়ে আসা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ এর শব্দশৈলী, অলঙ্কারশাস্ত্র, সংক্ষিপ্ততা ও মাধুর্য এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর অর্থসমূহের সমাহার কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই হওয়া সম্ভব; যাঁর সত্তা, গুণাবলি, কর্ম ও বাণীর সাথে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। সুতরাং তাঁর বাণী সৃষ্টিজগত বা মাখলুকের বাণীর সদৃশ নয়, আর এই কুরআন কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ।

মহান আল্লাহ বলেন: "যদি এটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।" (২)।

কুরআন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হতো এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তাঁর রূহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উভয়টি দিয়ে গ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন জমিনে বিচরণকারী কুরআন এবং তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) প্রথম প্রজন্মও একইভাবে কুরআন গ্রহণ করেছিলেন। অবস্থা এমন ছিল যে, "তাঁদের কেউ যখন আল্লাহর কিতাব থেকে দশটি আয়াত শিখতেন, তখন এর অর্থ অনুধাবন এবং সে অনুযায়ী আমল না করা পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতে যেতেন না।" (৩)।

আর এটি প্রমাণিত হয়েছে (ثبت) যে, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূরা আল-বাকারাহর জ্ঞান অর্জনে আট বছর ব্যয় করেছিলেন; তিনি এর বিধানাবলি, অর্থ এবং ঘটনাবলি শিখতেন, এ কারণেই এতে তাঁর দীর্ঘ সময় লেগেছিল।" (৪)।

আল্লাহ তাঁদের জন্য বুঝ ও জ্ঞানের এমন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছিলেন যা কেবল তিলাওয়াত বা মুখস্থ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর কিতাবের প্রতি মনোনিবেশ করলে সম্ভব হতো না। এই কুরআন তার গুপ্তধন ও মণি-মুক্তা কেবল তাকেই দান করে, যে এর প্রতি এমন অনুভূতি ও চেতনার সাথে মনোনিবেশ করে—যা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করার অনুভূতি এবং আমল সৃষ্টিকারী জ্ঞানের চেতনা। (৫)।

আর এই কর্মপদ্ধতি—অর্থাৎ বাস্তবায়ন ও আমলের উদ্দেশ্যে গ্রহণ ও শিক্ষার পদ্ধতি—এর উপলব্ধিতে সবচাইতে বড় প্রভাব ফেলেছিল...

--------------------------------------------

(১) আল-ইসরা: ৮৮।

(২) আন-নিসা: ৮২।

(৩) ইবনে কাসির এটি ইবনে মাসউদ থেকে তাঁর সনদসহ (بسند) উল্লেখ করেছেন (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪)।

(৪) মালেক এটি মুয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন (رواه) (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৫) এবং ইবনে আবদিল বার এটি আল-ইস্তিজকার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১); আর ইবনে সা'দের আল-তাবাকাত গ্রন্থে মাইমুন থেকে বর্ণিত আছে যে, ইবনে উমর সূরা আল-বাকারাহ চার বছরে শিখেছিলেন।

(৫) মাআলিম ফিত ত্বরিক কিতাব থেকে কিছুটা পরিমার্জিত।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৭)
الدين ثم تمكّنه وتملّكه من قلوبهم فضربوا بذلك أروع الأمثلة لجيل لم يشهد له التاريخ مثيلا، فتح الله بهم مشارق الأرض ومغاربها فرضى الله عنهم ورضوا عنه.

لكن الناظر فى حال أمة القرآن فى هذه الأزمنة يجدها بعيدة كل البعد عن هدى نبينا محمد صلى الله عليه وسلم وأصحابه فقد هجر القرآن أنواعا شتى من الهجر، بداية من هجر قراءته وسماعه، مرورا بهجر تدبره وتفهمه والعمل به والوقوف عند حلاله وحرامه وانتهاء بهجر تحكيمه والتحاكم إليه، وقد جاء ليكون منهاج حياة ليقود الأمة إلى طريق أقوم، لذا فإن أعظم جريمة على وجه هذه الأرض وأكبر كبيرة على ظهر هذه الأرض أن ينحّى كتاب الله.

قال تعالى: وَقالَ الرَّسُولُ يا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هذَا الْقُرْآنَ مَهْجُوراً (1) فلا صلاح لهذه الأرض ولا راحة لهذه البشرية، ولا طمأنينة لهذا الإنسان، ولا تناسق مع سنن الكون إلا بالرجوع إلى كتاب الله ولن يصلح حال آخر هذه الأمة إلا بما صلح به عليه أولها، ولقد كان صلاح حال أول هذه الأمة هو التزامهم كتاب الله- عز وجل وتمسكهم به تلاوة وفهما وعملا.

لذا كان هذا الكتاب- فقه قراءة القرآن الكريم- والذى آمل أن يفتح الله به آفاقا واسعة لفهم كتاب الله وماذا أراد الله به منا.

ولقد اشتمل هذا السّفر على أبواب ثلاثة، عرضت فى الباب الأول منها لأمور مهمة يحتاج كل مسلم إلى معرفتها عن القرآن الكريم ليكون عند قراءته لهذا الكتاب العزيز على علم به، وفهم له. تبعه الباب الثانى والذى نظمت فيه هدى رسول الله صلى الله عليه وسلم فى قراءة القرآن وعند استماعه وتوابع ذلك ليكون هديه صلى الله عليه وسلم نموذجا يقتدى به المسلم ويستعين به على فهم كتاب الله، وتلاوته حق التلاوة، تلاوة ينعكس أثرها فى العمل والسلوك. أخيرا الباب الثالث والذى أشرت فيه لطرف من فضائل القرآن وفضائل أهله العاملين به المتمسكين بأمره المجتنبين لنهيه فكانت

--------------------------------------------

(1) الفرقان: 30.
দ্বীন, তারপর তাদের অন্তরে এর সুদৃঢ় অবস্থান ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা এমন এক প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পেশ করেছিলেন যার সমতুল্য ইতিহাস আর দেখেনি। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত জয় করেছেন। ফলে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।

কিন্তু বর্তমান সময়ে কুরআনধারী উম্মাহর অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তারা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবীদের হিদায়াত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। কুরআন বিভিন্নভাবে পরিত্যক্ত হয়েছে; যার শুরু হয়েছে এর তিলাওয়াত ও শ্রবণ পরিত্যাগ করার মাধ্যমে, তারপর এর গভীর চিন্তা (تدبر), উপলব্ধি, আমল এবং এর হালাল ও হারামের সীমারেখায় অবস্থান করা পরিত্যাগ করা হয়েছে, আর শেষ হয়েছে এর শাসন ও বিচার ফয়সালা থেকে বিমুখ হওয়ার মাধ্যমে। অথচ এটি এসেছিল জীবনবিধান হিসেবে উম্মাহকে এক সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করতে। তাই এই জমিনের বুকে সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হলো আল্লাহর কিতাবকে সরিয়ে রাখা।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর রাসূল বললেন, হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার জাতি এই কুরআনকে পরিত্যক্ত (مهجوراً) হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (১) সুতরাং এই পৃথিবীর সংশোধন, মানবজাতির শান্তি, মানুষের প্রশান্তি এবং মহাজাগতিক নিয়মের (سنن الكون) সাথে সামঞ্জস্য বিধান আল্লাহর কিতাবের দিকে ফিরে আসা ছাড়া সম্ভব নয়। আর এই উম্মতের শেষভাগের লোকেদের অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত সংশোধিত হবে না, যতক্ষণ না তারা সেই পথ গ্রহণ করবে যার মাধ্যমে তাদের প্রথমভাগের লোকেরা সংশোধিত হয়েছিল। নিশ্চয়ই এই উম্মতের প্রথমভাগের লোকেদের সংশোধনের মূলে ছিল মহান আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং তিলাওয়াত, অনুধাবন ও আমলের মাধ্যমে একে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।

তাই এই গ্রন্থটি—‘ফিকহু কিরাআতিল কুরআন আল-কারীম’—যার মাধ্যমে আমি আশা করি আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব বোঝার এবং আল্লাহ আমাদের নিকট থেকে কী চেয়েছেন তা অনুধাবনের প্রশস্ত দিগন্ত উন্মোচন করে দেবেন।

এই গ্রন্থটি তিনটি অধ্যায় সম্বলিত। প্রথম অধ্যায়ে আমি আল-কুরআন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছি যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা প্রয়োজন, যাতে এই মহান কিতাব তিলাওয়াতের সময় সে এ সম্পর্কে জ্ঞান ও উপলব্ধি রাখতে পারে। এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়, যেখানে আমি কুরআন তিলাওয়াত, শ্রবণ এবং এর আনুসাঙ্গিক বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হিদায়াত বা সুন্নাহ সংকলন করেছি, যাতে তাঁর আদর্শ একজন মুসলিমের জন্য অনুসরণীয় মডেল হয় এবং আল্লাহর কিতাব বোঝা ও যথাযথভাবে তিলাওয়াত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়—এমন তিলাওয়াত যার প্রভাব কর্ম ও আচরণে প্রতিফলিত হয়। পরিশেষে তৃতীয় অধ্যায়, যেখানে আমি কুরআনের ফজিলত (فضائل) এবং যারা কুরআনের ধারক-বাহক, আমলকারী, এর আদেশ পালনকারী ও নিষেধ বর্জনকারী তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কিছু দিক উল্লেখ করেছি, যা হলো—

--------------------------------------------

(1) আল-ফুরকান: ৩০।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৮)
هذه الأبواب الثلاثة بمجموعها إرشادا للسالك إلى أقرب وأوضح المسالك لتلقى كتاب الله وفهمه والعمل به كما تلقاه الرعيل الأول من صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم، فالعامل بما فيه عامل- إن شاء الله- بهدى رسول الله صلى الله عليه وسلم وصحابته رضى الله عنهم.

وكما هو دأبى فقد التزمت فيما أوردته بين دفتى هذا السّفر كتاب الله تعالى وسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم الصحيحة مع إثبات مواضع الآيات من السور، ومواضع الأحاديث من كتب السنة والتحقق من صحة سندها عن رسول الله صلى الله عليه وسلم وإتماما للفائدة قمت بفهرست الآيات والأحاديث والآثار مرتبة حسب ورودها فى الكتاب مع اعتبار السور فى ترتيب الآيات وأحرف الهجاء فى ترتيب الأحاديث والآثار.

أما بالنسبة للمسائل الفقهية فإننى لم آل جهدا فى تحرى الأصوب واختيار الأصح وعدم التقيد بمذهب إمام خاص بل اعتماد الرأى الذى تقوم به الأدلة مع عزو القول الراجع إلى قائله والإرشاد إلى موضعه من كتب الفقه، مثل ذلك فعلت فيما له علاقة بالأصول أو القراءات أو التفسير كلّ ذلك مع التزام السهولة فى الأسلوب ومحاولة تجنب مواضع الخلاف قدر المستطاع.

فعلى كل راع من أب وأم وزوج أن يتقى الله فى نفسه وفى أولاده وبناته وزوجته ويعلمهم كتاب الله ففيه العقائد والمفاهيم والقيم والموازين والعبادات والشعائر والأخلاق والآداب فى أسلوب رائع معجز هو نور من الكلام أو كلام من النور.

كما أننى أهيب بمشايخنا الفضلاء وبإخوانى طلبة العلم المشتغلين بتعلم المصطلح والحديث عن تعلم كتاب الله المنشغلين بحفظ المتون والمنظومات عن حفظ كتاب الله أن يهتموا أولا بكتاب الله تعالى فالقرآن القرآن يا طالب العلم ولست أقرر جديدا فى هذا الميدان حين أدعو وأؤكد على ضرورة العناية بالقرآن الكريم أولا، فإن الغفلة عن القرآن الكريم والقصور فى إدراك معانيه نقص لا يجبره القراءة فى كتب الحديث فإن السنة تجىء بعد القرآن وحسن فقهها يجيء من حسن الفقه من الكتاب نفسه، فكل ما قاله أو حكم به الرسول صلى الله عليه وسلم فهو مما فهمه من القرآن
এই তিনটি অধ্যায় একত্রে আল্লাহর কিতাব গ্রহণ, অনুধাবন এবং সে অনুযায়ী আমল করার জন্য একজন পথচারীর প্রতি সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং স্পষ্ট পথের দিকনির্দেশনা স্বরূপ; যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের প্রথম প্রজন্ম তা গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং এর মধ্যকার বিষয়বস্তু অনুযায়ী আমলকারী ব্যক্তি—ইনশাআল্লাহ—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) হেদায়াতের ওপর আমলকারী হিসেবে গণ্য হবেন।

আর এটিই আমার চিরাচরিত পদ্ধতি যে, এই গ্রন্থের ভেতরে আমি যা কিছু উল্লেখ করেছি তাতে মহান আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঠিক (صحيح) সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরেছি। সেই সঙ্গে সূরাসমূহ থেকে আয়াতগুলোর অবস্থান এবং সুন্নাহর গ্রন্থসমূহ থেকে হাদিসগুলোর অবস্থান উল্লেখ করেছি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সেগুলোর সনদ (سند)-এর বিশুদ্ধতা যাচাই করেছি। উপযোগিতা পূর্ণ করার লক্ষ্যে আমি আয়াত, হাদিস ও আসর (أثر)-সমূহের একটি নির্ঘণ্ট তৈরি করেছি, যা গ্রন্থে তাদের আগমনের ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে; যেখানে আয়াত বিন্যাসে সূরার ক্রম এবং হাদিস ও আসর (أثر) বিন্যাসে বর্ণমালার ক্রম বিবেচনা করা হয়েছে।

ফিকহি মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে সঠিকটি অনুসন্ধান করতে এবং বিশুদ্ধতম (أصح) মতটি বেছে নিতে কোনো ত্রুটি করিনি। কোনো বিশেষ ইমামের মাযহাবের প্রতি সীমাবদ্ধ না থেকে বরং দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মতামতের ওপর নির্ভর করেছি। সেই সাথে অগ্রগণ্য মতটিকে তার প্রবক্তার দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছি এবং ফিকহ শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ থেকে তার মূল উৎসের নির্দেশনা প্রদান করেছি। উসুল (أصول), কিরাত বা তাফসির সংক্রান্ত বিষয়গুলোতেও আমি একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছি; এসবই করা হয়েছে সহজ সাবলীল শৈলী বজায় রেখে এবং সাধ্যমতো মতপার্থক্যের স্থানগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।

অতএব, পিতা, মাতা এবং স্বামী—প্রত্যেক দায়িত্বশীলের উচিত নিজের ব্যাপারে এবং নিজ সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং তাদেরকে আল্লাহর কিতাব শিক্ষা দেওয়া। কেননা এতে আকিদাহ, সঠিক ধারণা, মূল্যবোধ, মানদণ্ড, ইবাদত, নিদর্শনাবলি, আখলাক ও আদবসমূহ এক চমৎকার ও অলৌকিক শৈলীতে বিদ্যমান, যা বাণীরূপী এক নূর অথবা নূর থেকে নির্গত বাণী।

সেই সাথে আমি আমাদের শ্রদ্ধেয় শায়খ এবং ইলম অন্বেষী ভাইদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, যারা আল্লাহর কিতাব শেখার পরিবর্তে পরিভাষা (مصطلح) ও হাদিস চর্চায় এবং আল্লাহর কিতাব হিফজ করার পরিবর্তে মূলপাঠ (متن) ও পদ্যসংগ্রহ (منظومة) মুখস্থ করতে লিপ্ত রয়েছেন—তারা যেন সর্বপ্রথম আল্লাহর কিতাবের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। হে ইলম অন্বেষী! কোরআন, কোরআনই প্রধান। এই ময়দানে আমি নতুন কোনো কথা বলছি না যখন আমি সর্বপ্রথম আল-কোরআনের প্রতি যত্নবান হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি ও আহ্বান জানাচ্ছি। কেননা আল-কোরআন থেকে বিমুখতা এবং এর অর্থ অনুধাবনে সীমাবদ্ধতা এমন এক ঘাটতি, যা হাদিসের কিতাবসমূহ পাঠ করে পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ সুন্নাহর অবস্থান কোরআনের পরে, আর সুন্নাহর সঠিক বোধগম্যতা আসে স্বয়ং আল্লাহর কিতাব সঠিকভাবে অনুধাবন করার মধ্য দিয়ে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু বলেছেন বা যে বিধান দিয়েছেন, তা তিনি কোরআন থেকেই অনুধাবন করেছিলেন।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৯)
فكيف يفقه الفرع من جهل الأصل؟ (1).

فيا طالب العلم- بارك الله فيك وفى علمك- كن سلفيا على جادة السلف الصالح من صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم والتابعين من بعدهم.

ولتعلم أن النبع الذى استقى منه ذلك الجيل الذى رباه النبى صلى الله عليه وسلم هو نبع القرآن نعم .. القرآن وحده، فما كان حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا أثرا من آثار ذلك النبع، وما سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا ترجمة لما فهمه النبى صلى الله عليه وسلم من القرآن الكريم وعلمه ربه إياه فلنصحّح الترتيب فالقرآن أولا والسّنة الصحيحة مفسرة له ومبينة وموضحة أى تابعة له والمقصود الأعظم كتاب الله تعالى قال تعالى: ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنا مِنْ عِبادِنا (2) ومن يفعل ذلك فقد ألهم رشده.

وأنا أعلم يقينا أن مثلى ربّما لا يعطى هذا الموضوع حقه نظرا لقلة البضاعة وسعة الموضوع- ورحم الله امرأ عرف قدر نفسه- ولكننى بذلت جهد المقل فإن أصبت فذاك ما أردت والفضل لله أولا وآخرا.

وإن كانت الأخرى فأستغفر الله لذنبى، ويسعدنى أن أتلقى أى تنبيه أو نصيحة أو تصحيح خطا من مشايخنا وعلمائنا- حفظهم الله- أو من إخوانى طلبة العلم.

ورحم الله امرأ أهدى إلىّ عيوبى.

وأخيرا أتقدم بخالص الشكر والتقدير لكل من أسهم بجهد أو أعان على إتمام هذا العمل وتنقيحه ونشره بين المسلمين أخص بالذكر الوالد الفاضل الأستاذ: محمد الفقى- حفظه الله- لما أسداه إلىّ من نصح وتوجيه وإرشاد وتنبيه سائلا الله العلى القدير أن يجزل له الأجر والمثوبة.

والله الكريم أسأل أن يجعل عملى صوابا خالصا لوجهه الكريم وسببا للفوز

--------------------------------------------

(1) أقول هذا الكلام وأنا أعلم أنه قد لا يرضى بعض إخواننا … لكن ليلتمس لى العذر من يعلم أن هناك من طلبة العلم من لا يحسن قراءة القرآن الكريم فضلا عن العلم به والفهم له، والله حسبى ونعم الوكيل.

(2) فاطر: 32.
মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি কীভাবে শাখা-প্রশাখা অনুধাবন করবে? (১)।

হে ইলম অন্বেষণকারী—আল্লাহ আপনার ওপর এবং আপনার ইলমের ওপর বরকত দান করুন—আপনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবী এবং তাদের পরবর্তী তাবেয়ীদের অন্তর্ভুক্ত সালাফে সালেহীনের আদর্শের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত একজন সালাফী হোন।

জেনে রাখুন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে প্রজন্মকে গড়ে তুলেছিলেন, তারা যে উৎস থেকে পান করেছিলেন তা হলো কুরআনের ঝরনাধারা। হ্যাঁ.. কেবল কুরআনই। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদিস সেই ঝরনাধারারই একটি প্রভাব মাত্র। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ হচ্ছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র কুরআন থেকে যা বুঝেছেন এবং তাঁর প্রতিপালক তাঁকে যা শিখিয়েছেন তারই অনুবাদ। সুতরাং আমাদের বিন্যাস সঠিক করতে হবে: প্রথমে কুরআন, আর বিশুদ্ধ (صحيح) সুন্নাহ তার ব্যাখ্যাকারী, বিশদ বর্ণনাকারী ও স্পষ্টকারী অর্থাৎ তার অনুগামী। আর মূল লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর কিতাব। মহান আল্লাহ বলেন: "অতঃপর আমি কিতাবটির উত্তরাধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাদের আমি মনোনীত করেছি" (২)। যে ব্যক্তি এটি করবে, তাকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া হয়েছে।

আমি নিশ্চিতভাবেই জানি যে, আমার মতো একজন হয়তো এই বিষয়ের যথাযথ হক আদায় করতে পারবে না, কারণ এর ব্যাপ্তি বিশাল এবং আমার পুঁজি সামান্য—আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন যে নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে অবগত—তবে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। যদি আমি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হই, তবে তা-ই আমার লক্ষ্য ছিল এবং এর সকল শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশংসা শুরু ও শেষে কেবল আল্লাহরই জন্য।

আর যদি অন্যথা হয়, তবে আমি আমার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমাদের শায়খ ও ওলামায়ে কেরাম—আল্লাহ তাদের হিফাযত করুন—অথবা আমার ইলম অন্বেষণকারী ভাইদের পক্ষ থেকে যেকোনো সতর্কতা, উপদেশ বা ভুল সংশোধন পেতে পারলে আমি আনন্দিত হবো।

আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে আমাকে আমার ত্রুটিগুলো উপহার দেয় (ধরিয়ে দেয়)।

পরিশেষে, যারা এই কাজটির সমাপ্তি, পরিমার্জন এবং মুসলিমদের মাঝে প্রচারের ক্ষেত্রে শ্রম দিয়ে বা সাহায্য করে অবদান রেখেছেন, তাদের সকলকে আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় পিতা সমতুল্য উস্তায মুহাম্মাদ আল-ফিকী—আল্লাহ তাকে হিফাযত করুন—যিনি আমাকে উপদেশ, দিকনির্দেশনা এবং সতর্কতা প্রদানের মাধ্যমে ধন্য করেছেন। আমি মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন তাকে উত্তম প্রতিদান ও সওয়াব দান করেন।

আমি দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমার এই কাজকে সঠিক এবং কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই একনিষ্ঠ করেন এবং এটি যেন সফলতার মাধ্যম হয়।

--------------------------------------------

(১) আমি এই কথাটি বলছি অথচ আমি জানি যে এটি হয়তো আমাদের কিছু ভাইদের সন্তুষ্ট করবে না... তবে তারা যেন আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন যারা জানেন যে এমন কিছু ইলম অন্বেষণকারী রয়েছেন যারা পবিত্র কুরআন সঠিকভাবে পড়তেও জানেন না, অথচ তা নিয়ে জ্ঞান অর্জন ও তা বোঝার বিষয়টি তো অনেক পরের কথা। আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।

(২) ফাতির: ৩২।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১০)
بجنات النعيم، وأن يتم النعمة بقبوله وينفع به النفع العميم إخوانى وأحبائى وعموم المسلمين. وأن يهب لىّ نصيبا موفورا من التوفيق والاسترشاد بهديه كما خصّنا بتعليم القرآن العظيم، وبالله تعالى التوفيق وهو المستعان سبحانه ولا حول ولا قوة إلا بالله العلى العظيم.

كتبه أبو خالد/ سعيد عبد الجليل يوسف صخر ج. م. ع الغربية- سمنود
নেয়ামতে ভরপুর জান্নাতে; এবং তিনি যেন এটি কবুল করার মাধ্যমে তাঁর নেয়ামতকে পূর্ণতা দান করেন এবং এর দ্বারা আমার ভ্রাতৃবৃন্দ, প্রিয়জন ও সকল মুসলিমদের ব্যাপক কল্যাণ দান করেন। আর তিনি যেন আমাকে পর্যাপ্ত তাওফিক ও তাঁর হেদায়াত অনুযায়ী চলার দিশা দান করেন, যেমনিভাবে তিনি আমাদেরকে মহান কুরআন শিক্ষার মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাওফিক অর্জিত হয় এবং তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী, তিনি অতি পবিত্র; আর মহান ও সুউচ্চ আল্লাহ ব্যতীত কোনো ক্ষমতা ও শক্তি নেই।

লিখেছেন: আবু খালিদ/ সাঈদ আব্দুল জলীল ইউসুফ সাখর, আরব প্রজাতন্ত্র মিসর, আল-গারবিয়্যাহ—সামানুদ।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১১)
‌‌الباب الأول فى ظلال القرآن

فها أنا ذا أستلم قلمي لأقيد الباب الأول من معالم هذا الكتاب المبارك (1) فاتل ما أرقم لك زادك الله رشدا، وأنعم بك عينا. وإن أول ما سأسوقه بين يدى هذا الباب هو بعض التعاريف والمصطلحات ومعانى الكلمات التى ذكرت بين ثنايا هذا الكتاب مع إلقاء الضوء حول بعض أسماء وأوصاف القرآن العظيم وأقسام سوره، ثم أعرض بعض ما تميز به القرآن الكريم من خصائص، وأختم هذا الباب بلمحة تاريخية عن جمع القرآن ومنشأ القراءات، وكيف وصلنا المصحف الإمام. فأقول وبالله التوفيق.

 

‌‌فصل فى بعض التعاريف والمصطلحات الهامة

الفقه: لغة: العلم بالشىء والفهم له، ولكن استعماله فى القرآن الكريم يرشد إلى أن المراد منه ليس مطلق العلم، بل دقة الفهم، ولطف الإدراك، ومعرفة غرض المتكلم.

اصطلاحا: العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسبة من أدلتها التفصيلية (2).

* الباب: لغة: ما يتوصّل منه إلى غيره، اصطلاحا: اسم الجملة مختصة من الكتاب مشتملة على فصول غالبا.

--------------------------------------------

(1) بركته تأتى من أن كل ما فيه هو قال الله تعالى أو قال الرسول صلى الله عليه وسلم.

(2) من كتاب الوجيز فى أصول الفقه. د/ عبد الكريم زيدان (ص 8) بتصرف.
‌‌প্রথম অধ্যায়: কুরআনের ছায়াতলে

এই তো আমি আমার কলম তুলে নিচ্ছি এই বরকতময় (المبارك) কিতাবের দিকচিহ্নগুলোর প্রথম অধ্যায়টি লিপিবদ্ধ করার জন্য (১)। সুতরাং আমি আপনার জন্য যা লিখছি তা পাঠ করুন, আল্লাহ আপনার সঠিক পথপ্রাপ্তি (رشد) বৃদ্ধি করুন এবং আপনাকে প্রশান্তি দান করুন। এই অধ্যায়ের প্রারম্ভে আমি যা উপস্থাপন করব তা হলো কিতাবটির বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত কিছু সংজ্ঞা, পরিভাষা (المصطلحات) এবং শব্দের অর্থসমূহ; সাথে মহান কুরআনের কিছু নাম ও গুণাবলী এবং এর সূরাগুলোর শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে আলোকপাত করব। অতঃপর আমি আল-কুরআনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص) বর্ণনা করব এবং কুরআন সংকলন, কিরাতসমূহের (القراءات) উদ্ভব এবং কীভাবে 'মুসহাফে ইমাম' আমাদের কাছে পৌঁছেছে সে সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে এই অধ্যায়টি সমাপ্ত করব। আমি আল্লাহর নিকট তাওফিক (التوفيق) প্রার্থনা করে শুরু করছি।

 

‌‌পরিচ্ছেদ: কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা ও পরিভাষা

ফিকহ (الفقه): শাব্দিক অর্থ (لغة): কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা এবং তা অনুধাবন করা। তবে পবিত্র কুরআনে এর ব্যবহার নির্দেশ করে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল সাধারণ জ্ঞান নয়, বরং সূক্ষ্ম অনুধাবন (دقة الفهم), গভীর প্রজ্ঞা (لطف الإدراك) এবং বক্তার উদ্দেশ্য অবগত হওয়া।

পারিভাষিক অর্থ (اصطلاحا): বিস্তারিত দলিল-প্রমাণাদি থেকে আহরিত আমলযোগ্য শরয়ী বিধানাবলির (الأحكام الشرعية) জ্ঞান (২)।

* অধ্যায় (الباب): শাব্দিক অর্থ (لغة): যা দ্বারা অন্য কোনো স্থানে পৌঁছানো যায়। পারিভাষিক অর্থ (اصطلاحا): কিতাবের এমন একটি বিশেষ অংশের নাম যা সাধারণত একাধিক পরিচ্ছেদ (فصول) অন্তর্ভুক্ত করে।

--------------------------------------------

(১) এর বরকত এই কারণে যে, এতে যা কিছু রয়েছে তা হয় মহান আল্লাহর বাণী অথবা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণী।

(২) ড. আব্দুল কারিম জায়দান রচিত আল-ওয়াজিজ ফি উসুলিল ফিকহ কিতাব থেকে (পৃষ্ঠা ৮), পরিমার্জিত।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১২)
الفصل: لغة: الحاجز بين الشيئين، واصطلاحا: اسم لجملة مختصة من الباب مشتملة على فروع ومسائل غالبا (1).

* القرآن: لغة مصدر «قرأ» وتأتى بمعنى الجمع والضم ومنه سمى القرآن لأنه يجمع السور ويضمها.

واصطلاحا: هو كلام الله المعجز المنزل على محمد صلى الله عليه وسلم المكتوب بالمصاحف المنقول بالتواتر المتعبد بتلاوته (2).

أسماء القرآن:

وقد سمّاه الله بأسماء كثيرة: منها (القرآن) … وهو فى قوله تعالى: إِنَّ هذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ (3) وفيه إشارة إلى جمعه وحفظه فى الصدور.

و (الكتاب) … وهو فى قوله تعالى: لَقَدْ أَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ كِتاباً فِيهِ ذِكْرُكُمْ (4) وفيه إشارة إلى كتابته فى السطور.

و (الفرقان) … وهو فى قوله تعالى: تَبارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقانَ عَلى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعالَمِينَ نَذِيراً (5) وذلك لكونه فرق بين الحق والباطل.

و (الذكر) … وهو فى قوله تعالى: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحافِظُونَ (6) وذلك لاشتماله على المواعظ وأخبار الأمم الماضية.

(التنزيل) … وهو فى قوله تعالى: وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعالَمِينَ (7) إلى غير ذلك مما ورد فى القرآن من أسماء.

--------------------------------------------

(1) تقريب فتح القريب المجيب لابن القاسم (ص 11).

(2) هناك تعاريف ومصطلحات أخرى سوف أشير إليها فى موضعها.

(3) الإسراء: 9.

(4) الأنبياء: 10.

(5) الفرقان: 1.

(6) الحجر: 9.

(7) الشعراء: 192.
পরিচ্ছেদ: আভিধানিকভাবে: দুটি বিষয়ের মধ্যবর্তী অন্তরায়; এবং পারিভাষিকভাবে: এটি কোনো অধ্যায়ের এমন একটি বিশেষ অংশের নাম যা সাধারণত বিভিন্ন শাখা ও মাসআলা সংবলিত হয় (১)।

* কুরআন: আভিধানিকভাবে এটি ‘ক্বারাআ’ এর মাসদার (ক্রিয়ামূল), যা একত্র করা এবং মেলানো অর্থে ব্যবহৃত হয়। এখান থেকেই এর নাম ‘কুরআন’ রাখা হয়েছে, কারণ এটি বিভিন্ন সূরাকে একত্রিত করে ও মেলায়।

এবং পারিভাষিকভাবে: এটি আল্লাহর মুজেযাসম্পন্ন কালাম, যা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ, মাসহাফসমূহে লিখিত, অবিচ্ছিন্ন গণবর্ণনা (التواتر) পদ্ধতিতে বর্ণিত এবং যার তিলাওয়াত ইবাদত হিসেবে গণ্য (২)।

কুরআনের নামসমূহ:

আল্লাহ একে অনেকগুলো নামে অভিহিত করেছেন: তার মধ্যে রয়েছে (আল-কুরআন) … যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে: “নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথপ্রদর্শন করে যা অত্যন্ত সুদৃঢ়” (৩)। এতে এটি অন্তরে একত্রিত করা এবং মুখস্থ রাখার ইঙ্গিত রয়েছে।

এবং (আল-কিতাব) … যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে: “আমি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি এক কিতাব, যাতে রয়েছে তোমাদের আলোচনা” (৪)। এতে এটি ছত্রে ছত্রে লিখে রাখার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।

এবং (আল-ফুরকান) … যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে: “পরম কল্যাণময় তিনি, যিনি তাঁর দাসের ওপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে” (৫)। আর এটি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী হওয়ার কারণে এই নামকরণ করা হয়েছে।

এবং (আয-যিকর) … যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে: “নিশ্চয় আমি যিকর অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমি এর সংরক্ষক” (৬)। আর এটি উপদেশ এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের সংবাদ সংবলিত হওয়ার কারণে এই নামকরণ।

(আত-তানযীল) … যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে: “নিশ্চয় এটি বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ” (৭)। এছাড়া কুরআনে আরও অনেক নাম বর্ণিত হয়েছে।

--------------------------------------------

(১) ইবনুল কাসিমের তাকরীবু ফাতহিল কারীবিল মুজীব (পৃষ্ঠা ১১)।

(২) সেখানে আরও কিছু সংজ্ঞা ও পরিভাষা রয়েছে যা আমি যথাস্থানে উল্লেখ করব।

(৩) আল-ইসরা: ৯।

(৪) আল-আম্বিয়া: ১০।

(৫) আল-ফুরকান: ১।

(৬) আল-হিজর: ৯।

(৭) আশ-শুআরা: ১৯২।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৩)
* أوصاف القرآن:

وقد وصفه الله بأوصاف كثيرة: منها أنه (نور) … وهو فى قوله تعالى: قَدْ جاءَكُمْ بُرْهانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ نُوراً مُبِيناً (1). وذلك لأنه يدرك به غوامض الحلال والحرام.

وأنه (مبين) … وهو فى قوله تعالى: قَدْ جاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتابٌ مُبِينٌ (2) وذلك لأنه أبان أى أظهر الحق من الباطل.

وأنه (شفاء) … وهو فى قوله تعالى: وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ ما هُوَ شِفاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (3).

وأما الشفاء فلأنه يشفى من جميع الأدواء القلبية والبدنية فإذا أحسن العليل التداوى به لم يقاومه الداء أبدا.

وأنه (هدى) … وهو فى قوله تعالى: ذلِكَ الْكِتابُ لا رَيْبَ فِيهِ هُدىً لِلْمُتَّقِينَ (4) وأما الهدى فلأن فيه الدلالة على الحق.

وأنه (روح) … وهو فى قوله تعالى: وَكَذلِكَ أَوْحَيْنا إِلَيْكَ رُوحاً مِنْ أَمْرِنا (5) وأما الروح فلأنه تحيا به القلوب والأنفس، وكل تسمية أو وصف فهو باعتبار معنى من معانى القرآن (6).

* أقسام القرآن:

بداية فإن الحكمة من تسوير القرآن سورا تحقيق كون السورة بمفردها معجزة وآية من آيات الله، ومنها أن القارئ لكتاب الله إذا ختم سورة يشعر أنه قد أخذ من

--------------------------------------------

(1) النساء: 174.

(2) المائدة: 15.

(3) الإسراء: 82.

(4) البقرة: 2.

(5) الشورى: 52.

(6) الأتقان فى علوم القرآن (ج 1 ص 67) بتصرف.
* কুরআনের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

আল্লাহ তাআলা একে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছেন: তার মধ্যে একটি হলো এটি (নূর) … আর এটি মহান আল্লাহর এই বাণীতে বর্ণিত হয়েছে: “হে মানুষ! তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক অকাট্য প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের নিকট এক উজ্জ্বল নূর অবতীর্ণ করেছি।” (১)। আর এটি এজন্য যে, এর মাধ্যমে হালাল ও হারামের নিগূঢ় বিষয়াবলি অনুধাবন করা যায়।

এবং এটি (মুবীন বা সুস্পষ্ট) … এটি মহান আল্লাহর এই বাণীতে রয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে একটি নূর ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে।” (২)। এর কারণ হলো এটি ‘অবান’ অর্থাৎ সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করে সুস্পষ্ট করেছে।

এবং এটি (শিফা বা আরোগ্য) … এটি মহান আল্লাহর এই বাণীতে রয়েছে: “আমি কুরআন থেকে এমন কিছু অবতীর্ণ করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।” (৩)।

আর আরোগ্যের বিষয়টি এজন্য যে, এটি অন্তরের ও শরীরের যাবতীয় ব্যাধি থেকে মুক্তি দেয়; সুতরাং কোনো রুগ্ন ব্যক্তি যদি এর মাধ্যমে উত্তমরূপে চিকিৎসা গ্রহণ করে, তবে ব্যাধি কখনই তার সামনে টিকতে পারে না।

এবং এটি (হেদায়াত) … এটি মহান আল্লাহর এই বাণীতে রয়েছে: “এটি সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক।” (৪)। আর হেদায়াত হওয়ার কারণ হলো এতে সত্যের প্রতি দিকনির্দেশনা রয়েছে।

এবং এটি (রূহ) … এটি মহান আল্লাহর এই বাণীতে রয়েছে: “আর এভাবেই আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রূহ অবতীর্ণ করেছি।” (৫)। আর রূহ হওয়ার কারণ হলো এর মাধ্যমে অন্তর ও আত্মা সজীব হয়। প্রতিটি নামকরণ বা বৈশিষ্ট্য কুরআনের অর্থের কোনো না কোনো একটি প্রেক্ষিত বিবেচনা করে প্রদান করা হয়েছে (৬)।

* কুরআনের পরিচ্ছেদসমূহ:

প্রারম্ভিক কথা হলো, কুরআনকে বিভিন্ন সূরায় বিন্যস্ত করার অন্তর্নিহিত হিকমত হলো এটি নিশ্চিত করা যে, প্রতিটি সূরা স্বতন্ত্রভাবে একটি মুজিজা এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এর আরেকটি কারণ হলো, আল্লাহর কিতাবের পাঠক যখন একটি সূরা সমাপ্ত করেন, তখন তিনি অনুভব করেন যে তিনি অর্জন করেছেন...

--------------------------------------------

(১) আন-নিসা: ১৭৪।

(২) আল-মায়িদা: ১৫।

(৩) আল-ইসরা: ৮২।

(৪) আল-বাকারা: ২।

(৫) আশ-শূরা: ৫২।

(৬) আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন (১ম খণ্ড, পৃ. ৬৭), পরিমার্জিত।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৪)
كتاب الله طائفة مستقلة بنفسها فيعظم عنده ما حفظه ولا يخفى ما فى ذلك من التيسير ومن الحمل على التعليم.

وسور القرآن باعتبار ما سبق وأن أشرت إليه أربعة أقسام لكل قسم منها اسم وسوف أوجز أرجح الأقوال فيها (1).

 

‌‌1 - السبع الطوال:

وهى البقرة وآل عمران والنساء والمائدة والأنعام والأعراف، والسابعة قيل الأنفال وبراءة معا لعدم الفصل بينهما بالبسملة، وقيل هى يونس.

 

‌‌2 - المئون:

وهى التى تليها، وسميت بذلك لأن كل سورة تزيد على مائة آية أو ما يقاربها.

 

‌‌3 - المثانى:

وهى التى آياتها أقل من مائة آية، وسميت بذلك لأنها تثنى فى القراءة وتكرر أكثر من الطوال والمئين.

 

‌‌4 - المفصّل: «ويسمى أيضا بالمحكم» (2).

وقيل بأن بدايته من سورة «ق» وقيل من بداية «الحجرات» ووجه تسميته بالمفصل لكثرة الفصل بين سوره بالبسملة.

والمفصّل ثلاثة أقسام: طوالة- أوساطه- قصاره.

--------------------------------------------

(1) ورد فى ذكر أقسام القرآن حديث واثلة بن الأسقع وفيه سعد بن أبى بشير وفيه لين، انظر ابن كثير (ج 1 ص 35).

(2) حديث تسمية المفصل بالمحكم فى صحيح البخارى (ج 9 ص 83) مع الفتح. من حديث سعيد بن جبير عن ابن عباس رضى الله عنهما قال: (جمعت المحكم فى عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت له وما المحكم؟، قال: المفصل).
আল্লাহর কিতাব একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তাই যার কাছে যা মুখস্থ আছে তার গুরুত্ব তার নিকট বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে যে সহজসাধ্যতা এবং শিক্ষার প্রতি অনুপ্রেরণা রয়েছে তা অস্পষ্ট নয়।

আর কুরআনের সূরাসমূহ পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে এবং আমি যার প্রতি ইঙ্গিত করেছি সেই বিবেচনায় চারটি ভাগে বিভক্ত, যার প্রত্যেকটির আলাদা নাম রয়েছে। আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য (أرجح) মতগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরব (১)।

 

‌‌১ - আস-সাবউত তিওয়াল (সাতটি দীর্ঘ সূরা):

এগুলো হলো আল-বাকারাহ, আল-ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়িদাহ, আল-আনআম এবং আল-আরাফ। সপ্তম সূরার বিষয়ে বলা হয়েছে যে, এটি হলো আল-আনফাল ও বারাআত (আত-তাওবাহ) একত্রে, কারণ এ দুটির মাঝে বিসমিল্লাহর মাধ্যমে কোনো পার্থক্য করা হয়নি; আবার কেউ বলেছেন এটি হলো ইউনুস।

 

‌‌২ - আল-মিউন:

এগুলো এর পরবর্তী সূরাসমূহ। এগুলোকে এই নামকরণ করা হয়েছে কারণ প্রতিটি সূরা একশ বা তার কাছাকাছি সংখ্যক আয়াতের চেয়ে বেশি।

 

‌‌৩ - আল-মাসানি:

এগুলো যার আয়াত সংখ্যা একশর চেয়ে কম। এই নামকরণ করা হয়েছে কারণ এগুলো কিরাআতে বারবার পাঠ করা হয় এবং ‘তিওয়াল’ ও ‘মিউন’ এর চেয়ে বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়।

 

‌‌৪ - আল-মুফাসসাল: «একে মুহকামও বলা হয়» (২)।

বলা হয়ে থাকে যে, এর শুরু সূরা ‘ক্বাফ’ থেকে, আবার কেউ বলেছেন ‘আল-হুজুরাত’ এর শুরু থেকে। একে মুফাসসাল নামকরণের কারণ হলো এর সূরাগুলোর মাঝে বিসমিল্লাহর মাধ্যমে অধিক মাত্রায় বিচ্ছেদ থাকা।

মুফাসসাল তিন ভাগে বিভক্ত: দীর্ঘ, মধ্যম এবং সংক্ষিপ্ত।

--------------------------------------------

(১) কুরআনের প্রকারভেদ সম্পর্কে ওয়াসিলা ইবনে আল-আসকা’র একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যার সনদে সা’দ ইবনে আবি বশির রয়েছেন এবং তার মধ্যে শিথিলতা (لين) রয়েছে। দেখুন: ইবনে কাসির (১ম খণ্ড, ৩৫ পৃষ্ঠা)।

(২) মুফাসসালকে ‘মুহকাম’ নামকরণের হাদিসটি ফাতহুল বারীসহ সহিহ বুখারি-তে (৯ম খণ্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা) বর্ণিত হয়েছে। সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমি ‘মুহকাম’ অংশটি সংগ্রহ করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মুহকাম কী? তিনি বললেন: আল-মুফাসসাল)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৫)
فطواله إلى «عم»، وأوساطه إلى «الضحى»، ومنها إلى آخر القرآن قصاره، وهذا أقرب ما قيل فيه.

 

‌‌فائدة فى تقسيم المصحف وتجزئته:

قامت طائفة من العلماء فقسمت القرآن ثلاثين قسما وأطلقوا على كل قسم منها اسم الجزء، ثم قسموا الجزء إلى حزبين وقسموا الحزب إلى أربعة أقسام، كل قسم منها يسمى ربعا وجرى العمل على هذه الأقسام.

ولا شك أن هذا العمل فيه من التشويق والترغيب للقارئ ما يدفعه للاستزادة فى القراءة كلما علم أنه ختم ربعا دفعه إلى قراءة الربع الثانى حتى يتم جزءا، وهكذا.

وأما تعداد سور القرآن فإنه مائة وأربع عشرة سورة بإجماع من يعتد بهم، وقيل ثلاث عشرة بجعل الأنفال وبراءة سورة واحدة، وثمّ أقوال أخر لا تعويل عليها.

وأما تعداد الآيات: فقد أفرده جماعة من القراء بالتصنيف وعدد الآيات توقيفى لا مجال للقياس فيه.

وعدد آيات القرآن ستة آلاف ومائتا آية وست وثلاثون (1) وأطول آية فى القرآن هى آية الدّين وأطول سورة هى البقرة.

* فائدة: يترتب على معرفة الآى وعدها وفواصلها أحكام فقهية منها:

1 - اعتبارها فيمن جهل الفاتحة فإنه يجب عليه بدلها سبع آيات فمن لم يستطع لعجز فى طبعه أو سوء فى فهمه فعليه التسبيح والتحميد والتهليل والتكبير ثم يركع (2).

--------------------------------------------

(1) اتبعت فى عد آياته طريقة الكوفيين، راجع (ناظمة الزهر) للإمام الشاطبى.

(2) فقه السنة (ج 1 ص 203).
দীর্ঘ সূরাগুলো (طوال) 'আন-নাবা' (عم) পর্যন্ত, মধ্যম সূরাগুলো (أوساط) 'আদ-দুহা' (الضحى) পর্যন্ত, এবং সেখান থেকে কুরআনের শেষ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত সূরাগুলো (قصار)। এটিই এ বিষয়ে বর্ণিত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অভিমত।

 

‌মুসহাফের বিভাজন ও অংশ নির্ধারণ বিষয়ক একটি টীকা:

একদল আলেম কুরআনকে ত্রিশটি ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং প্রতিটি ভাগের নাম দিয়েছেন পারা (الجزء)। অতঃপর তারা প্রতিটি পারাকে দুই হিযবে (الحزب) এবং প্রতিটি হিযবকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন, যার প্রতিটি ভাগকে রুবু (الربع) বলা হয়। বর্তমানে এই পদ্ধতি অনুসারেই কাজ পরিচালিত হচ্ছে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই পদ্ধতিতে পাঠকের জন্য এমন উৎসাহ ও উদ্দীপনা রয়েছে যা তাকে তিলাওয়াত বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করে। যখনই সে জানতে পারে যে সে এক রুবু (الربع) শেষ করেছে, তখন সেটি তাকে দ্বিতীয় রুবু (الربع) পাঠ করতে অনুপ্রাণিত করে যতক্ষণ না সে একটি পারা (الجزء) সম্পন্ন করে, এবং এভাবেই চলতে থাকে।

আর কুরআনের সূরার সংখ্যার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য আলেমগণের ঐকমত্য (إجماع) অনুযায়ী এটি ১১৪টি। কেউ কেউ বলেছেন ১১৩টি; তারা সূরা আনফাল ও সূরা বারাআতকে একটি সূরা গণ্য করেছেন। এছাড়া আরও কিছু মতামত রয়েছে যা নির্ভরযোগ্য নয়।

আর আয়াতের সংখ্যার ব্যাপারে একদল ক্বারী স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। আয়াতের সংখ্যা শারী‘আতের প্রবর্তক কর্তৃক নির্ধারিত (توقيفي), এতে অনুমান (القياس) বা যুক্তির কোনো অবকাশ নেই।

কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ছয় হাজার দুইশ ছত্রিশটি (১)। কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত হলো 'ঋণ সংক্রান্ত আয়াত' (আয়াতুদ দাইন) এবং দীর্ঘতম সূরা হলো সূরা আল-বাকারাহ।

* টীকা: আয়াতের পরিচয়, তাদের গণনা এবং এর সমাপ্তি চিহ্ন (ফাওয়াসিল) জানার ওপর কিছু ফিকহী বিধান (أحكام فقهية) নির্ভরশীল, যার মধ্যে রয়েছে:

১ - যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা জানে না, তার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব; কেননা তার ওপর এর পরিবর্তে সাতটি আয়াত পাঠ করা ওয়াজিব (واجب)। যদি কেউ তার স্বভাবগত অক্ষমতা বা বুঝের স্বল্পতার কারণে তা করতে না পারে, তবে সে তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করবে এবং এরপর রুকুতে যাবে (২)।

--------------------------------------------

(১) আয়াত গণনার ক্ষেত্রে কুফীবাসীদের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। দেখুন ইমাম শাতীবীর নাযিমাতুয যুহর।

(২) ফিকহুস সুন্নাহ (১ম খণ্ড, ২০৩ পৃষ্ঠা)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৬)
2 - اعتبارها فى الخطبة عند من قال بوجوب قراءة آية كاملة فيها كالإمام الشافعى- رحمه الله وذهب الجمهور إلى عدم الوجوب وهو الحق (1).

3 - اعتبارها فى السورة التى تقرأ فى الصلاة وفى قيام الليل.

4 - اعتبارها فى الوقف كما سيأتى بيانه فى موضعه، والله الموفق للصواب.

--------------------------------------------

(1) نيل الأوطار (ج 3 ص 226).
২ - খুতবায় একে গণ্য করা তাদের নিকট যারা খুতবায় একটি পূর্ণ আয়াত পাঠ করাকে আবশ্যক (وجوب) মনে করেন, যেমন ইমাম শাফিঈ (আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন)। তবে অধিকাংশ (جمهور) আলিম এটি আবশ্যক না হওয়ার মত পোষণ করেছেন এবং এটিই সঠিক (১)।

৩ - সালাতে এবং কিয়ামুল লাইলে পঠিত সূরার ক্ষেত্রে একে গণ্য করা।

৪ - বিরতি (وقف) প্রদানের ক্ষেত্রে একে গণ্য করা, যেমনটি সামনে যথাস্থানে বিস্তারিত বর্ণিত হবে। আল্লাহই সঠিক বিষয়ের তাওফিকদাতা।

--------------------------------------------

(১) নাইলুল আওতার (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৬)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৭)
‌‌فصل فى بعض خصائص القرآن الكريم

إنه ما من نبى من الأنبياء إلا وأعطى ما مثله آمن عليه البشر من كلام الله الخاص وآياته المعجزات إلى من اصطفى من رسله غير أن آيات الأنبياء السابقين ومعجزاتهم كانت حسية وقتية يؤمن بها من عاصرها وشاهدها دون من نأى بهم المكان أو تأخر بهم الزمان، وكان التشريع فيها خاصا بفئة معينة وموقوتة بزمن معين، وقد ذكر القرآن الكريم من الكتب السابقة صحف إبراهيم وصحف موسى، وثلاثة كتب هى توراة موسى وزبور داود، وإنجيل عيسى.

وهذه الصحف والكتب السابقة جميعا قد داخلها التحريف والتبديل وليس فيها ما يجزم بصحة نسبته إلى الله تعالى وممّا لا شك فيه أن للقرآن الكريم المنزلة العلية الرفيعة بين سائر الكتب التى تقدمته فى النزول، وتتجلى هذه المنزلة له بكونه شاملا لأصول الهداية البشرية مع احتوائه على أعظم منهج ربانى محقق لسعادة الإنسان فى الدنيا والآخرة، منهج حياة كامل ملحوظ فيه نواميس الفطرة التى تصرف النفس البشرية فى كل جوانب حياتها، وإعجازه أبعد مدى من كونه إعجازا فى النظم أو المعانى بل إعجاز عن إبداع منهج كمنهجه يحيط بما يحيط به.

ولم لا. وهو يحمل رسالة الرشد البشرى الذى يخاطب مدارك الإنسان جيلا بعد جيل، ولله درّ من قال.

لا تذكر الكتب السوالف عنده … طلع النهار فأطفئ القنديلا

والقرآن بهذه الطبيعة المنهجية صنع الأمة المسلمة أول مرة وبها يصنع الأمة المسلمة فى كل مرة يراد فيها أن يعاد إخراج الأمة المسلمة للوجود بعد أن واراها ركام الجاهلية بما فيها من تصورات أوضاع وقوانين وأنظمة لا صلة لها بالإسلام (1).

--------------------------------------------

(1) من كتاب معالم فى الطريق بتصرف.
কুরআনে কারীমের কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর একটি পরিচ্ছেদ

নিশ্চয়ই এমন কোনো নবী নেই যাকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর মনোনীত রাসূলগণের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কালাম ও অলৌকিক নিদর্শনসমূহ থেকে এমন কিছু প্রদান করা হয়নি, যার দৃষ্টান্ত দেখে মানুষ ঈমান এনেছে। তবে পূর্ববর্তী নবীগণের নিদর্শন ও অলৌকিকত্ব ছিল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও সাময়িক, যা কেবল তাঁদের সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শীরাই বিশ্বাস করতে পারত; কিন্তু যারা স্থান বা কালের দিক থেকে দূরে ছিল তাদের জন্য তা প্রযোজ্য ছিল না। আর তাঁদের শরীয়ত ছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ। পবিত্র কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মধ্য হতে ইব্রাহিম ও মুসার সহীফার কথা উল্লেখ করেছে এবং তিনটি প্রধান কিতাবের কথা উল্লেখ করেছে, সেগুলো হলো— মুসার তাওরাত, দাউদের যাবুর এবং ঈসার ইঞ্জিল।

এই সকল পূর্ববর্তী সহীফা ও কিতাবসমূহের সবকটিতেই বিকৃতি ও পরিবর্তন অনুপ্রবেশ করেছে এবং এগুলোর কোনোটিই মহান আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত হওয়ার বিশুদ্ধতা (صحة) নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নাজিল হওয়ার ক্রমে পূর্ববর্তী সকল কিতাবের মাঝে কুরআনে কারীমের মর্যাদা অত্যন্ত সুউচ্চ। এই মর্যাদা এ কারণেই স্পষ্ট হয় যে, এটি মানবীয় হেদায়েতের মূলনীতিসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং এতে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য নিশ্চিত করার জন্য মহান রব্বানী জীবনবিধান বিদ্যমান। এটি এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান যেখানে স্বভাবজাত নিয়মাবলী লক্ষ্য রাখা হয়েছে যা মানবসত্তাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিচালিত করে। আর এর অলৌকিকত্ব কেবল রচনাশৈলী বা অর্থগত মাধুর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এমন এক অনন্য জীবনবিধানের উদ্ভাবন যা এর প্রতিটি বিষয়কে বেষ্টন করে থাকে।

আর কেনই বা হবে না, অথচ এটি সেই মানবীয় সুপথের বার্তা বহন করে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের বোধশক্তিকে সম্বোধন করে। জনৈক কবির এই উক্তিটি কতই না চমৎকার!

এর (কুরআনের) উপস্থিতিতে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের আলোচনা করো না... দিন যখন উদিত হয়, তখন প্রদীপ নিভিয়ে দাও।

কুরআন তার এই পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে প্রথমবার মুসলিম উম্মাহ গঠন করেছিল এবং এর মাধ্যমেই প্রতিবার মুসলিম উম্মাহ গঠন করবে যখনই উম্মাহর অস্তিত্বকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হবে— জাহেলিয়াতের আবর্জনা তাদের ঢেকে দেওয়ার পর, যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন সব ধ্যান-ধারণা, পরিস্থিতি, আইন ও ব্যবস্থা যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই (১)।

--------------------------------------------

(১) মাআলিম ফিত ত্বরীক কিতাব হতে সংক্ষেপিত।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৮)
ولقد خص الله سبحانه وتعالى القرآن الكريم بخصائص كثيرة ينبغى لمن أراد أن يفهم القرآن أن يعيها ويدركها بعقله وبقلبه.

وإن أول هذه الخصائص أنه- أى القرآن الكريم- كلام الله الخالص غير مخلوق ولا مفترى، غير مشوب بأوهام البشر ولا بأهواء البشر، فكله من الله من ألفه إلى يائه.

ليس لجبريل منه إلا النزول به، ولا لمحمد صلى الله عليه وسلم إلا التلقى والتبليغ قال تعالى:

وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعالَمِينَ (192) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) عَلى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ (1).

إذن فلا غرو أن تتصف أخبار هذا الكتاب بالصدق الكامل وأحكامه بالعدل المطلق. فكل ما فى القرآن من أخبار، ومواعظ وأوامر، ونواه، وتوجيهات، وتشريعات يتجلى فيها الحق كله، والخير كله والجمال كله والحكمة كلها والمصلحة كلها لأنها كلها صادرة من لدن حكيم خبير.

والخصيصة الثانية للقرآن هى التيسير فهو كتاب يسره منزله، يسر تلاوته ويسر فهمه ويسر العمل به لمن أراد، لا يكلف الإنسان شططا ولا يرهقه من أمره عسرا.

قال تعالى: وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ (2).

فيستطيع كل إنسان سليم الفطرة. يقرأ القرآن أو يسمعه- أن يفهم منه ويتأثر ويستقى من منهله بقدر ما يتسع واديه.

ومن خصائص القرآن: أنه كتاب معجز على مر الأيام وتعاقب الأزمان فهو آية محمد صلى الله عليه وسلم العظمى ومعجزته الخالدة، وللإعجاز القرآنى أوجه وجوانب عديدة فهو معجز فى لفظه وأسلوبه ونظمه وعباراته وألفاظه معجز فى موضوعه

--------------------------------------------

(1) الشعراء: 192، 193، 194.

(2) القمر: 17.
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আল-কুরআনুল কারীমকে এমন অনেক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন, যা কুরআনের মর্ম উপলব্ধি করতে ইচ্ছুক প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য স্বীয় প্রজ্ঞা ও হৃদয়ের মাধ্যমে অনুধাবন করা বাঞ্ছনীয়।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো এটি—অর্থাৎ আল-কুরআনুল কারীম—আল্লাহর বিশুদ্ধ বাণী, যা সৃষ্টি নয় (غير مخلوق) এবং কোনো অলীক বা উদ্ভাবিত বিষয় নয়। এটি মানুষের কল্পনাপ্রসূত ধারণা কিংবা প্রবৃত্তি দ্বারা কলুষিত নয়; বরং এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আদ্যোপান্ত সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

এতে জিবরাঈল (আ.)-এর ভূমিকা কেবল তা নিয়ে অবতরণ করা, আর মুহাম্মদ (সা.)-এর দায়িত্ব ছিল কেবল তা গ্রহণ করা এবং পৌঁছিয়ে দেওয়া (التبليغ)। মহান আল্লাহ বলেন:

আর নিশ্চয়ই এটি বিশ্বজাহানের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তা নিয়ে অবতরণ করেছেন নির্ভরযোগ্য আত্মা (الروح الأمين)। আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন (১)।

অতএব, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, এই কিতাবের সংবাদসমূহ (أخبار) পূর্ণ সত্যতায় (الصدق) এবং এর বিধানসমূহ নিরঙ্কুশ ন্যায়বিচারে গুণান্বিত হবে। সুতরাং কুরআনের সমস্ত সংবাদ (أخبار), উপদেশ, আদেশ, নিষেধ, দিকনির্দেশনা ও বিধিবিধানের মধ্যে পূর্ণ সত্য, কল্যাণ, সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা এবং জনহিতকর উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে; কেননা এই সবকিছুই প্রজ্ঞাবান ও সর্বজ্ঞাত সত্তার পক্ষ থেকে উৎসারিত।

কুরআনের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো সহজসাধ্যতা (التيسير)। এটি এমন এক কিতাব যা এর অবতীর্ণকারী স্বয়ং সহজ করে দিয়েছেন। যারা একে গ্রহণ করতে চায় তাদের জন্য এর তিলাওয়াত, এর অনুধাবন এবং এর ওপর আমল করাকে তিনি সহজ করে দিয়েছেন। এটি মানুষের ওপর সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেয় না এবং তার কাজকে দুঃসাধ্য করে তোলে না।

মহান আল্লাহ বলেন: আর আমি অবশ্যই কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি, সুতরাং উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (২)।

ফলে সুস্থ স্বভাবের (سليم الفطرة) অধিকারী প্রত্যেক মানুষ—সে কুরআন পাঠ করুক কিংবা শ্রবণ করুক—তা থেকে অনুধাবন করতে, প্রভাবিত হতে এবং এর প্রস্রবণ থেকে নিজ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী জ্ঞান আহরণ করতে সক্ষম।

কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: এটি কালপরিক্রমায় এক অলৌকিক (معجز) কিতাব। এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন ও চিরন্তন মুজিজা। কুরআনের এই অলৌকিকত্বের (إعجاز) অনেকগুলো দিক ও পর্যায় রয়েছে। এটি এর শব্দচয়নে, শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গিতে, বিন্যাসে, বাক্যাংশ ও শব্দাবলির গাঁথুনিতে অলৌকিক (معجز); এমনকি এর আলোচ্য বিষয়েও এটি অলৌকিক (معجز)।

--------------------------------------------

(১) আশ-শুআরা: ১৯২, ১৯৩, ১৯৪।

(২) আল-কামার: ১৭।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ১৯)
ومنهجه وتشريعه معجز فيما أرشد إليه من حقائق علمية كشف وما زال يكشف عنها العلم الحديث يوما بعد يوم إلى غير ذلك من وجوه الإعجاز.

قال تعالى: سَنُرِيهِمْ آياتِنا فِي الْآفاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ (1).

ومن خصائص القرآن: أنه كتاب الخلود وليس كتاب جيل ما ولا كتاب عصر ما بل هو كتاب الزمن كله قيض له الله رجالا أمناء حفظوه فى صدورهم وسطورهم، فلن تقوى عليه يد الزمان، ومن دلائل ذلك أن أكثر من أربعة عشر قرنا من الزمن مرت على نزول هذا القرآن ولم يزل كما أنزله الله وكما بلغه محمد صلى الله عليه وسلم وكما تلقاه الصحابة ومن بعدهم جيلا إثر جيل محفوظا فى الصدور، متلوا بالألسنة مكتوبا بالمصاحف يستظهره مئات الآلاف من أبناء المسلمين حتى الصبيان منهم، بل حتى الأعاجم الذين لا يعرفون لغته.

قال تعالى: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحافِظُونَ (2).

ومن خصائص كتاب الله العزيز الشمول فهو كتاب الحياة كلها وكتاب الإنسانية كلها فليس هو لجنس دون جنس، ولا لوطن دون وطن، ولا لطائفة دون طائفة، إنه كتاب الجميع ودستور الجميع فى نسق فريد ونظم بديع، ومن شمول القرآن: أن طالب الحقيقة العقلية يجد فى القرآن ما يرضى منطقه ويأخذ بلبه، والباحث عن الحقيقة الروحية يجد فى القرآن ما يرضى ذوقه ويغذى وجدانه، والحريص على القيم الأخلاقية يجد فى القرآن ضالته وطلبه.

وعاشق القيم الجمالية يجد فى القرآن ما ينمى حاسته الجمالية ويغذى شعوره، ومن شمول القرآن: أنه لا يخاطب العقل وحده ولا القلب وحده، بل يخاطب الكيان الإنسانى كله فيقنع العقل ويحرك القلب فى وقت واحد كذلك.

--------------------------------------------

(1) فصلت: 53.

(2) الحجر: 9.
এর কর্মপদ্ধতি ও শরয়ি বিধান সেইসব বৈজ্ঞানিক সত্যের দিক থেকে অলৌকিক, যার দিকে এটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে এবং আধুনিক বিজ্ঞান দিন দিন যা উন্মোচন করে চলেছে; এছাড়াও অলৌকিকত্বের আরও অনেক দিক রয়েছে।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি অচিরেই তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দিগন্তবলয়ে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে দেখাব, যতক্ষণ না তাদের কাছে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তা সত্য।" (১)।

কুরআনের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো: এটি একটি চিরন্তন কিতাব। এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্ম বা কোনো নির্দিষ্ট যুগের কিতাব নয়, বরং এটি সর্বকালের কিতাব। আল্লাহ তাআলা এর জন্য কিছু বিশ্বস্ত (أمناء) ব্যক্তিকে মনোনীত করেছেন যারা একে তাঁদের হৃদয়ে এবং লেখনীতে সংরক্ষণ করেছেন। ফলে সময়ের আবর্তন এর ওপর জয়ী হতে পারবে না। এর অন্যতম প্রমাণ হলো যে, এই কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ এটি এখনও ঠিক তেমনই আছে যেমনটি আল্লাহ অবতীর্ণ করেছিলেন, যেমনটি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং যেমনটি সাহাবীগণ ও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মসমূহ যুগ যুগ ধরে গ্রহণ করেছিলেন। এটি হৃদয়ে সংরক্ষিত (محفوظ), জিহ্বায় পঠিত এবং মাসহাফসমূহে লিখিত অবস্থায় রয়েছে। মুসলিমদের লক্ষ লক্ষ সন্তান, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত এটি মুখস্থ রাখে; এমনকি সেই অনারবরাও যারা এর ভাষা জানে না।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয় আমিই এই উপদেশবাণী নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমি এর সংরক্ষক।" (২)।

আল্লাহর এই মহাগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপকতা; এটি সমগ্র জীবনের কিতাব এবং সমগ্র মানবতার কিতাব। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, দেশ বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি এক অনন্য বিন্যাস ও চমৎকার শৈলীতে সবার কিতাব এবং সবার জীবনবিধান। কুরআনের ব্যাপকতার একটি দিক হলো: বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যের অন্বেষণকারী কুরআনের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পায় যা তার যুক্তিকে সন্তুষ্ট করে এবং তার মেধাকে জয় করে নেয়। আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধানী কুরআনের মাঝে এমন কিছু পায় যা তার রুচিকে তৃপ্ত করে এবং তার সত্তাকে পুষ্ট করে। আর নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তি কুরআনের মাঝে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুঁজে পায়।

সৌন্দর্যবোধের অনুরাগী ব্যক্তি কুরআনের মাঝে এমন কিছু পায় যা তার নান্দনিক বোধকে বিকশিত করে এবং তার অনুভূতিকে সজীব রাখে। কুরআনের ব্যাপকতার আরেকটি দিক হলো: এটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিকে সম্বোধন করে না, কেবল হৃদয়কেও নয়; বরং এটি সমগ্র মানবসত্তাকে সম্বোধন করে। ফলে এটি একই সাথে বুদ্ধিকে তুষ্ট করে এবং হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

--------------------------------------------

(১) ফুসসিলাত: ৫৩।

(২) আল-হিজর: ৯।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২০)
فالقرآن دستور شامل وصفه منزّله بأنه تبيان لكل شىء.

قال تعالى: وَنَزَّلْنا عَلَيْكَ الْكِتابَ تِبْياناً لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدىً وَرَحْمَةً وَبُشْرى لِلْمُسْلِمِينَ (1).

ولله الحمد والمنة وبه التوفيق والعصمة (2)

…

--------------------------------------------

(1) النحل: 89.

(2) من كتاب ثقافة الداعية د/ يوسف القرضاوى بتصرف.
সুতরাং কুরআন হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যার অবতীর্ণকারী একে প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন: "আর আমি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি যা প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদ স্বরূপ (১)।"

সকল প্রশংসা ও অনুগ্রহ একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং সকল তাওফিক ও সুরক্ষা তাঁরই পক্ষ থেকে (২)

…

--------------------------------------------

(১) আন-নাহল: ৮৯।

(২) ড. ইউসুফ আল-কারজাভি রচিত 'সাকাফাতুদ দাঈয়াহ' গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২১)
‌‌فصل فى جمع القرآن ومنشأ القراءات

نزل القرآن الكريم جملة واحدة فى ليلة القدر من اللوح المحفوظ إلى السماء الدنيا فكان نزوله حدثا جليلا أشعر العالم العلوى من ملائكة الله بشرف الأمة المحمدية التى أكرمها الله بهذه الرسالة لتكون خير أمة أخرجت للناس، ثم بدأ ينزل منجما أى مفرقا فى ثلاث وعشرين سنة: منها ثلاث عشرة بمكة- على الرأى الراجح (1) - وعشر بالمدينة، فكان ينزل بحسب الحاجة خمس آيات وعشر آيات وأكثر وأقل من ذلك لحكم بليغة منها تثبيت فؤاد رسول الله صلى الله عليه وسلم، وتيسير وتسهيل حفظه وفهمه، والتدرّج فى التشريع، وغير ذلك …

وكان نزول القرآن آنذاك على سبعة أحرف لتيسير قراءته وحفظه على قوم أميين لكل قبيل منهم لهجة ولسان، ولا عهد لهم بحفظ الشرائع، وتحقيقا لقوله تعالى: وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ (2).

والأحاديث فى هذا المعنى كثيرة حتى تواتر عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أن القرآن أنزل على سبعة أحرف أذكر منها ما صح من حديث عبد الله بن عباس رضى الله عنهما أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: «أقرأنى جبريل عليه السلام على حرف فراجعته فلم أزل أستزيده ويزيدنى حتى انتهى إلى سبعة أحرف» (3).

وقد اختلف أهل العلم فى معنى هذه السبعة أحرف على أقوال كثيرة، أورد منها الإمام ابن كثير فى ذيل تفسيره خمسة أقوال (4) أرجحها وهو قول أكثر أهل

--------------------------------------------

(1) الراجح: (الأصح): يقصد به المعتمد، وعكسه المرجوح يعنى غير المعتمد، وقيل يعنى أن ما بعدها ضعيف.

(2) القمر: 17.

(3) صحيح البخارى (ج 9 ص 23) مع الفتح، صحيح مسلم (ج 6 ص 101) بشرح النووى.

(4) تفسير ابن كثير (ج 4 ص 598).
কুরআন সংকলন এবং কিরাতসমূহের উৎপত্তি বিষয়ক পরিচ্ছেদ

পবিত্র কুরআন লাইলাতুল কদরে লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আসমানে একযোগে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁর এই অবতরণ ছিল একটি মহান ঘটনা, যা আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্য থেকে ঊর্ধ্বজগতকে উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত করেছিল, যাদেরকে আল্লাহ এই রিসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন যাতে তারা মানুষের কল্যাণে প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হতে পারে। এরপর তা তেইশ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে (منجماً) অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অবতীর্ণ হতে শুরু করে: যার মধ্যে তের বছর মক্কায় - অগ্রগণ্য (الراجح) মত অনুযায়ী (১) - এবং দশ বছর মদীনায়। এটি প্রয়োজন অনুযায়ী পাঁচ আয়াত, দশ আয়াত বা তার কম-বেশি অবতীর্ণ হতো। এর পেছনে অনেক গভীর প্রজ্ঞা নিহিত ছিল, যার মধ্যে রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয়কে সুদৃঢ় করা, তাঁর জন্য তা মুখস্থ করা ও অনুধাবন করা সহজতর করা, পর্যায়ক্রমে বিধান প্রবর্তন করা এবং আরও অন্যান্য বিষয় …

সে সময় নিরক্ষর কওমের জন্য পাঠ করা এবং মুখস্থ করা সহজ করার লক্ষ্যে কুরআন সাত হরফে (سبعة أحرف) অবতীর্ণ হয়েছিল, কেননা তাদের প্রতিটি গোত্রের নিজস্বচনভঙ্গি ও ভাষা ছিল এবং শারঈ বিধান সংরক্ষণে তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। আর এটি মহান আল্লাহর এই বাণীরই প্রতিফলন: "আর আমি কুরআনকে নসীহতের জন্য সহজ করে দিয়েছি, সুতরাং কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?" (২)।

এ বিষয়ে হাদিসসমূহ প্রচুর, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এটি মুতাওয়াতির (تواتر) ভাবে বর্ণিত যে, কুরআন সাত হরফে (سبعة أحرف) অবতীর্ণ হয়েছে। আমি এ সম্পর্কিত বর্ণিত হাদিসগুলোর মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত সহিহ (صح) হাদিসটি উল্লেখ করছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: «জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আমাকে এক পদ্ধতিতে কুরআন পাঠ করাতেন, এরপর আমি তাঁকে বারবার অনুরোধ করি এবং ক্রমাগত বৃদ্ধির আবেদন করতে থাকি, আর তিনিও বাড়িয়ে দিতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত তা সাত হরফে (سبعة أحرف) গিয়ে শেষ হয়» (৩)।

আলেমগণ এই সাত হরফের (سبعة أحرف) অর্থের ব্যাপারে অনেক মতে বিভক্ত হয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরের শেষে এ বিষয়ে পাঁচটি মত উল্লেখ করেছেন (৪), যার মধ্যে অধিক অগ্রগণ্য (أرجحها) হলো অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মত

--------------------------------------------

(১) অগ্রগণ্য (الراجح): (অধিক বিশুদ্ধ [الأصح]): এর দ্বারা নির্ভরযোগ্য (المعتمد) বিষয়টি উদ্দেশ্য করা হয়, আর এর বিপরীত হলো অনগ্রগণ্য (المرجوح) অর্থাৎ যা নির্ভরযোগ্য (غير المعتمد) নয়। আবার বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বোঝানো হয় যে এর পরবর্তী মতটি দুর্বল (ضعيف)।

(২) আল-কামার: ১৭।

(৩) সহিহ বুখারি (৯ম খণ্ড, ২৩ পৃষ্ঠা) ফাতহুল বারীসহ, সহিহ মুসলিম (৬ষ্ঠ খণ্ড, ১০১ পৃষ্ঠা) নববীর ব্যাখ্যাসহ।

(৪) তাফসিরে ইবনে কাসির (৪র্থ খণ্ড, ৫৯৮ পৃষ্ঠা)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২২)
العلم كسفيان بن عيينة وابن وهب وابن جرير والطحاوى أن المراد بالأحرف السبعة سبعة أوجه من المعانى المتقاربة بألفاظ مختلفة نحو (أقبل، تعال، هلم) ونحو (أقوم، أصوب، أهيأ) فهى ألفاظ مختلفة بمعنى واحد أو متقارب.

وكان لرسول الله صلى الله عليه وسلم كتّاب للوحى من أجلاء الصحابة كعلى بن أبى طالب، وأبى بن كعب، وزيد بن ثابت وغيرهم. تنزل الآية فيأمرهم بكتابتها ويرشدهم إلى موضوعها من سورتها، فيقول لهم: ضعوا هذه الآية فى الموضع المعين بين آية كذا وآية كذا، وضعوا هذه السورة بجانب تلك السورة وكانوا يكتبونه فى العسب- وهو جريد النخل، واللخاف- وهى الحجارة الرقاق- والرقاع من جلد أو ورق، وكان ذلك موزعا فى بيوت الصحابة لم يجمع فى مكان واحد، هذا من جهة، ومن جهة أخرى كان محفوظا فى صدور الصحابة رضى الله عنهم أجمعين.

وكان جبريل عليه السلام يعارض رسول الله صلى الله عليه وسلم القرآن حين يلقاه فى كل ليلة فى شهر رمضان، والمراد من معارضته له بالقرآن كل سنة مقابلته على ما أوحاه إليه عن الله تعالى ليبقى ما بقى ويذهب ما نسخ توكيدا واستثباتا وحفظا، ولهذا عرضه فى السنة الأخيرة من عمره صلى الله عليه وسلم على جبريل مرتين. وعارضه جبريل كذلك، وكان الصحابة يعرضون على رسول الله صلى الله عليه وسلم ما لديهم من القرآن حفظا وكتابة كذلك.

وجمع القرآن كله بهذه الصورة على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وإنما لم يجمع القرآن فى مصحف واحد فى عهده صلى الله عليه وسلم لما كان يترقبه من ورود ناسخ لبعض أحكامه أو تلاوته كما أن ترتيب الآيات لم يكن بترتيب النزول، بل تكتب الآية بعد نزولها على حسب ما يرشد صلى الله عليه وسلم إلى موضع كتابتها بين آية كذا وآية كذا فى سورة كذا.

فتم كتابة القرآن فى السطور وجمعه فى الصدور ويسمى هذا الجمع فى عهد النبى صلى الله عليه وسلم حفظا وكتابة (الجمع الأول).

فلمّا كمل القرآن وانتهى نزوله بوفاته صلى الله عليه وسلم ألهم الله الخلفاء الراشدين جمع كتابه
সুফিয়ান ইবন উয়ায়না, ইবন ওয়াহাব, ইবন জারীর এবং তাহাবীর মতো বিজ্ঞ আলেমদের মতে, সাত হরফ (الأحرف السبعة) বলতে সাতটি এমন সমার্থক অর্থকে বোঝায় যা ভিন্ন ভিন্ন শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যেমন- (আকবিল, তা'আলা, হালুম্মা) এবং (আক্বউমু, আসওয়াবু, আহইয়াউ)। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন শব্দ হলেও এদের অর্থ এক বা অভিন্ন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওহী লেখক হিসেবে অনেক প্রথিতযশা সাহাবী ছিলেন, যেমন আলী ইবন আবি তালিব, উবাই ইবন কাব, যায়েদ ইবন সাবিত ও অন্যান্যরা। যখন কোনো আয়াত নাজিল হতো, তিনি তাঁদের তা লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন এবং সূরার ভেতরে এর সঠিক অবস্থান দেখিয়ে দিতেন। তিনি তাঁদের বলতেন: "এই আয়াতটি অমুক আয়াত ও অমুক আয়াতের মাঝখানে নির্দিষ্ট স্থানে বসাও" এবং "এই সূরাটি ওই সূরার পাশে রাখো।" তাঁরা ওহী লিখে রাখতেন খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর এবং চামড়া বা কাগজের টুকরোতে। এগুলো বিভিন্ন সাহাবীর ঘরে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল, কোনো এক স্থানে একত্রিত ছিল না। এটি ছিল এক দিক, আর অন্য দিকে তা সাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর অন্তরে সংরক্ষিত ছিল।

জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) রমজান মাসের প্রতি রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করে কুরআন তিলাওয়াত পর্যালোচনা করতেন। প্রতি বছর কুরআনের এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা ওহী হয়েছে তা মিলিয়ে দেখা, যাতে যা অবশিষ্ট থাকার তা থেকে যায় এবং যা রহিত (نسخ) হওয়ার তা অপসারিত হয়; এটি ছিল দৃঢ়তা, নিশ্চয়তা এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ বছরে জিবরাঈলের কাছে দুইবার কুরআন পেশ করেন। জিবরাঈলও একইভাবে তাঁর কাছে পেশ করেন। সাহাবায়ে কিরামও একইভাবে মুখস্থ এবং লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কুরআন পেশ করতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে কুরআন এই পদ্ধতিতেই সংরক্ষিত হয়েছিল। তবে তাঁর জীবদ্দশায় কুরআন একটি একক গ্রন্থে সংকলিত হয়নি, কারণ তখনও কোনো বিধান বা তিলাওয়াত রহিতকারী (ناسخ) অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া আয়াতের বিন্যাস নাজিল হওয়ার ক্রম অনুসারে ছিল না, বরং আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সূরার অমুক ও অমুক আয়াতের মাঝখানে তা লেখা হতো।

এভাবে লিপি আকারে এবং অন্তরে হিফজের মাধ্যমে কুরআনের লিখন ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুখস্থ ও লিখিত এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে 'প্রথম সংকলন' বলা হয়।

যখন কুরআনের অবতরণ পূর্ণ হলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের মাধ্যমে ওহীর ধারা সমাপ্ত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা খুলাফায়ে রাশিদীনকে তাঁর কিতাব সংকলন করার প্রেরণা দান করলেন।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৩)
وفاء بوعده الصادق بضمان حفظه على هذه الأمة فكان ابتداء ذلك على يد الصديق بمشورة عمر رضى الله عنهما.

روى الإمام البخارى بسنده أن زيد بن ثابت قال: أرسل إلىّ أبو بكر مقتل أهل اليمامة، فإذا عمر بن الخطاب عنده فقال أبو بكر: إن عمر بن الخطاب أتانى، فقال: إن القتل قد استحر (1) بقراء القرآن، وإنى أخشى أن يستحرّ القتل بالقراء فى الموطن، فيذهب كثير من القرآن، وإنى أرى أن تأمر بجمع القرآن، فقلت لعمر:

كيف نفعل شيئا لم يفعله رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ قال عمر: هذا والله خير، فلم يزل عمر يراجعنى حتى شرح الله صدرى لذلك، ورأيت فى ذلك الذى رأى عمر، قال زيد:

قال أبو بكر: إنك رجل شاب لا نتهمك، وقد كنت تكتب الوحى لرسول الله صلى الله عليه وسلم فتتبع القرآن فاجمعه، فو الله لو كلفونى نقل جبل من الجبال ما كان علىّ أثقل مما أمرنى به من جمع القرآن، قلت: كيف تفعلون شيئا لم يفعله رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ قال هو والله خير. فلم يزل أبو بكر يراجعنى حتى شرح الله صدرى للذى شرح له صدر أبى بكر وعمر رضى الله عنهما فتتبعت القرآن أجمعه من العسب واللخاف وصدور الرجال، ووجدت آخر سورة التوبة مع أبى خزيمة الأنصارى لم أجدها مع غيره (3) لَقَدْ جاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ حتى خاتمة براءة (2).

وهذا الجمع هو المسمى (بالجمع الثانى)، فكانت تلك الصحف عند أبى بكر حتى توفاه الله، ثم عند عمر حياته ثم عند حفصة بنت عمر رضى الله عنهم أجمعين.

فلمّا كانت خلافة عثمان بن عفان رضى الله عنه والذى اتسعت الفتوحات الإسلامية فى عهده وتفرق القراء فى الأمصار، وأخذ أهل كل مصر عمّن وفد

--------------------------------------------

(1) استحر: أى اشتد القتل وكثر فى قراء القرآن يوم اليمامة يعنى يوم قتال مسليمة الكذاب وأصحابه بنى حنيفة بأرض اليمامة فى حديقة الموت.

(3) يعنى أنه لم يجدها مكتوبة عند غيره، لا أنه لم يكن يحفظها غيره.

(2) فتح البارى بشرح صحيح البخارى (ج 9 ص 10).
আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য পবিত্র কুরআন সংরক্ষণের যে সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণকল্পে এর সূচনা হয়েছিল সিদ্দীকে আকবর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে এবং ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পরামর্শে।

ইমাম বুখারি তাঁর সনদ (سند)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, যায়িদ ইবনে সাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: ইয়ামামার যুদ্ধে সাহাবীদের শাহাদাতের ঘটনার পর আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গিয়ে দেখি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর কাছে উপস্থিত। আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: ওমর আমার নিকট এসে বলেছে যে, ইয়ামামার যুদ্ধে কুরআন পাঠকদের (কুররা) শাহাদাত বরণ অত্যন্ত প্রকট (১) আকার ধারণ করেছে। আমি আশঙ্কা করছি যে, বিভিন্ন রণক্ষেত্রে কুরআন পাঠকদের শাহাদাত বরণ এভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি যে, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ প্রদান করুন। আমি ওমরকে বললাম:

আমরা কীভাবে এমন একটি কাজ করব যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) করেননি? ওমর বললেন: আল্লাহর কসম, এটি একটি কল্যাণকর কাজ। এরপর ওমর বারবার বিষয়টি আমাকে বুঝাতে থাকেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিলেন এবং ওমরের অভিমতটিই আমার নিকট সঠিক বলে প্রতীয়মান হলো। যায়িদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:

আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: আপনি একজন বুদ্ধিমান যুবক, আপনার ব্যাপারে আমাদের কোনো সংশয় নেই। আপনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওহি লিখতেন। সুতরাং আপনি কুরআন অনুসন্ধান করুন এবং তা একত্রিত করুন। যায়িদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তরের দায়িত্ব দিতেন, তবে কুরআন সংগ্রহের যে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন তা আমার কাছে তার চেয়ে বেশি ভারী মনে হতো না। আমি বললাম: আপনারা কীভাবে এমন একটি কাজ করবেন যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) করেননি? তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, এটি কল্যাণকর কাজ। আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বারবার আমাকে বুঝাতে থাকলেন, অবশেষে আল্লাহ আমার বক্ষকেও সেই বিষয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন যার জন্য আবু বকর ও ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর বক্ষ উন্মুক্ত করেছিলেন। এরপর আমি খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর এবং মানুষের স্মৃতি থেকে কুরআন অনুসন্ধান করে তা সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। আমি সূরা আত-তাওবার শেষ অংশ আবু খুযায়মা আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে পেলাম, যা তিনি ছাড়া আর কারো কাছে (লিখিত অবস্থায়) পাইনি (৩)। তা হলো: "নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে একজন রাসূল এসেছেন..." সূরার শেষ পর্যন্ত (২)।

এই সংকলনটিই 'দ্বিতীয় সংকলন' নামে অভিহিত। এই পাণ্ডুলিপিগুলো আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট তাঁর ওফাত পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল। এরপর ওমরের জীবদ্দশায় তাঁর নিকট এবং পরবর্তীতে হাফসা বিনতে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর নিকট সংরক্ষিত ছিল।

অতঃপর যখন উসমান ইবনে আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকাল এল, যাঁর যুগে ইসলামী বিজয় বিস্তৃত হয়েছিল এবং বিভিন্ন শহরে কুরআন পাঠকারীগণ ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তখন প্রতিটি শহরের অধিবাসীগণ তাদের নিকট আগত পাঠকদের নিকট থেকে কিরাত শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করলেন...

--------------------------------------------

(১) ইস্তাহারা: অর্থাৎ ইয়ামামার যুদ্ধের দিন কুরআন পাঠকদের শাহাদাত তীব্র ও ব্যাপক হওয়া। অর্থাৎ ইয়ামামার ভূখণ্ডে 'মৃত্যু উদ্যানে' মুসাইলিমা মিথ্যাবাদী (كذاب) এবং তার অনুসারী বনু হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধের দিন।

(৩) এর অর্থ হলো তিনি এটি লিখিত অবস্থায় অন্য কারো কাছে পাননি, বিষয়টি এমন নয় যে এটি অন্য কেউ মুখস্থ জানতেন না।

(২) ফাতহুল বারী বিশারহি সহীহ বুখারি (৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৪)
إليهم قراءته وكانت وجوه القراءة مختلفة باختلاف الأحرف التى أنزل عليها، فكانوا إذا ضمهم موطن من مواطن الغزو ظهر الاختلاف فى وجوه القراءة مع إلف كل لقراءته ووقوفه عندها حتى خطأ بعضهم بعضا، وكان هذا باب لفتنة لا بدّ لها من علاج.

روى الإمام البخارى- رحمه الله بسنده أن حذيفة بن اليمان قدم على عثمان ابن عفان رضى الله عنهما، وكان يغازى أهل الشام فى فتح أرمينية وأذربيجان مع أهل العراق. فأفزع حذيفة اختلافهم فى القراءة، فقال حذيفة لعثمان: يا أمير المؤمنين أدرك هذه الأمة قبل أن يختلفوا فى الكتاب اختلاف اليهود والنصارى.

فأرسل عثمان إلى حفصة: أن أرسلى إلينا بالصحف فننسخها ثم نردها إليك، فأرسلت بها حفصة إلى عثمان، فأمر زيد بن ثابت، وعبد الله بن الزبير، وسعيد ابن العاص، وعبد الرحمن بن الحارث بن هشام فنسخوها فى المصاحف. وقال عثمان للرهط القرشيين الثلاثة: إذا اختلفتم أنتم وزيد بن ثابت فى شىء من القرآن (1). فاكتبوه بلسان قريش فإنما أنزل بلسانهم، ففعلوا، حتى إذا نسخوا الصحف فى المصاحف، رد عثمان الصحف إلى حفصة، وأرسل إلى كل أفق بمصحف مما نسخوا، وأمر بما سواه من القرآن فى كل صحيفة أو مصحف أن يحرق (4) (2).

وجمع عثمان للقرآن هو المسمى (بالجمع الثالث) وكان سنة (25 هـ).

…

--------------------------------------------

(1) أى اختلافهم فى رسم كتابته.

(4) حكمة ذلك الخوف من أن يكون فى بعضها غلط أو تكون سببا للكذب والاختلاف.

(2) فتح البارى بشرح صحيح البخارى (ج 9 ص 11).
তাদের নিকট এর তিলাওয়াত পৌঁছেছিল এবং তিলাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ বিভিন্ন আক্ষরিক রূপের (الأحرف) পার্থক্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন ছিল, যেগুলোর ওপর এটি নাজিল হয়েছিল। যখন কোনো যুদ্ধের ময়দানে তারা সমবেত হতো, তখন তিলাওয়াতের এই ভিন্নতা প্রকাশ পেত। প্রত্যেকেই নিজ নিজ তিলাওয়াতের সাথে পরিচিত ছিল এবং তার ওপরই অটল থাকত, এমনকি তারা একে অপরকে ভুল সাব্যস্ত করত। এটি ছিল ফিতনার একটি দ্বার, যার প্রতিকার আবশ্যক ছিল।

ইমাম বুখারী—রহিমাহুল্লাহ—তাঁর সনদের (بسنده) মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নিকট আসলেন। তিনি ইরাকবাসীর সাথে সিরিয়াবাসীদের নিয়ে আরমেনিয়া ও আজারবাইজান বিজয়ের যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। কিরাআত বা তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের মতপার্থক্য হুজাইফাকে আতঙ্কিত করে তুলল। হুজাইফা উসমান (রা.)-কে বললেন: "হে আমিরুল মুমিনীন! এই উম্মতকে রক্ষা করুন, ইয়াহুদি ও নাসারাদের মতো কিতাব নিয়ে তারা মতভেদে লিপ্ত হওয়ার পূর্বেই।"

অতঃপর উসমান (রা.) হাফসা (রা.)-এর নিকট বার্তা পাঠালেন যে: "আপনার নিকট রক্ষিত সহিফাগুলো আমাদের নিকট পাঠিয়ে দিন যাতে আমরা সেগুলো মাসহাফসমূহে নকল করে নিতে পারি এবং পরবর্তীতে আপনার নিকট তা ফেরত দেব।" হাফসা (রা.) সেগুলো উসমান (রা.)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। তিনি জায়েদ ইবনে সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনুল জুবাইর, সাঈদ ইবনুল আস এবং আবদুর রহমান ইবনুল হারিস ইবনে হিশামকে নির্দেশ দিলেন এবং তাঁরা সেগুলো মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করলেন। উসমান (রা.) তিন কুরাইশীকে বললেন: "যদি আপনারা এবং জায়েদ ইবনে সাবিত কুরআনের কোনো বিষয়ে (১) মতভেদ করেন, তবে তা কুরাইশদের ভাষায় লিখবেন, কারণ তা তাদের ভাষাতেই নাজিল হয়েছে।" তাঁরা তাই করলেন। যখন তাঁরা সহিফাগুলো থেকে মাসহাফসমূহ তৈরি শেষ করলেন, উসমান (রা.) মূল সহিফাগুলো হাফসা (রা.)-এর নিকট ফিরিয়ে দিলেন এবং প্রতিলিপি করা মাসহাফগুলোর একটি করে কপি প্রতিটি অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। এ ছাড়া কুরআনের অন্য যা কিছু কোনো সহিফা বা মাসহাফে ছিল, তা পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন (৪) (২)।

কুরআনের ক্ষেত্রে উসমান (রা.)-এর এই সংকলন 'তৃতীয় সংকলন' (الجمع الثالث) নামে পরিচিত এবং এটি হিজরি ২৫ সনে সম্পন্ন হয়েছিল।

…

--------------------------------------------

(১) অর্থাৎ এর লিখন পদ্ধতির (رسم كتابته) ক্ষেত্রে মতভেদ।

(৪) এর হিকমত বা তাৎপর্য হলো এই আশঙ্কা যে, কোনো কপিতে ভুল থাকতে পারে অথবা তা মিথ্যা ও মতভেদের কারণ হতে পারে।

(২) ফাতহুল বারী শরহ সহিহ বুখারী (৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৫)
‌‌فائدة فى الفرق بين جمع أبى بكر وجمع عثمان

إن الفرق بين جمع أبى بكر وجمع عثمان، أن جمع أبى بكر كان لخشية أن يذهب من القرآن شىء بذهاب حملته، لأنه لم يكن مجموعا فى موضع واحد، فجمعه فى صحائف مرتبا لآيات سوره على ما وقفهم عليه النبى صلى الله عليه وسلم مشتملا علي الأحرف السبعة التى أنزل بها القرآن.

أما جمع عثمان، فكان لمّا كثر الاختلاف فى وجوه القراءة فجمع قراءات الناس على مصحف واحد، واقتصر فيه من سائر اللغات على حرف واحد وسمى ذلك (بالمصحف الإمام) وأجمع عليه سائر الصحابة، وتلقت الأمة ذلك بالقبول وتم إرسال المصحف الإمام إلى سائر الأقطار الإسلامية كمكة، والشام، واليمن، والكوفة وبقى واحد بالمدينة.

***
আবু বকর এবং উসমান (রা.)-এর সংকলনের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়ে একটি সারগর্ভ আলোচনা

নিশ্চয়ই আবু বকর এবং উসমান (রা.)-এর সংকলনের মধ্যে পার্থক্য হলো এই যে, আবু বকর (রা.)-এর সংকলন ছিল এই আশঙ্কায় যে, কুরআনের বাহকদের প্রয়াণের সাথে সাথে কুরআনের কোনো অংশ যেন বিলুপ্ত না হয়ে যায়; কারণ তখন পর্যন্ত তা এক স্থানে সংকলিত ছিল না। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী সূরাসমূহের আয়াতসমূহ বিন্যস্ত করে তা বিভিন্ন পত্রে সংকলন করেন, যা সেই সাতটি উপভাষা (الأحرف السبعة) সংবলিত ছিল—যেভাবে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল।

পক্ষান্তরে উসমান (রা.)-এর সংকলন ছিল যখন পঠনরীতি (القراءة)-র ক্ষেত্রে মতভেদ অনেক বৃদ্ধি পায়; ফলে তিনি মানুষের বিবিধ পঠনরীতিকে একটি মাত্র পাণ্ডুলিপি (مصحف)-তে সংকলন করেন। সেখানে তিনি অন্যান্য বিবিধ উপভাষার পরিবর্তে কেবল একটি উপভাষা (حرف واحد)-কে নির্দিষ্ট করেন এবং একে 'আল-মুসহাফ আল-ইমাম' হিসেবে নামকরণ করেন। সমস্ত সাহাবী এর ওপর ঐকমত্য (إجماع) পোষণ করেন এবং সমগ্র উম্মত একে গ্রহণ করে নেয়। অতঃপর 'আল-মুসহাফ আল-ইমাম'-এর অনুলিপিসমূহ মক্কা, শিম, ইয়ামেন এবং কুফাসহ বিভিন্ন ইসলামি ভূখণ্ডে প্রেরণ করা হয় এবং একটি কপি মদিনায় সংরক্ষিত থাকে।

(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৬)
‌‌فائدة حول منشأ القراءات وصلة القراءات السبع بالأحرف السبعة

لم يكتف أمير المؤمنين عثمان بن عفان بإرسال المصاحف وحدها إلى الأمصار وإنما أرسل معها جماعة من قراء الصحابة يعلمون الناس، ولمّا لم تكن المصاحف العثمانية ملزمة بقراءة معينة لخلوها من النقط والشكل، لذا فقد أقرأ كل صحابى أهل إقليمه بما سمعه تلقيا من رسول الله صلى الله عليه وسلم ما دامت هذه القراءة يحتملها المصحف العثمانى الذى أرسل منه نسخ إلى جميع الآفاق، فمثلا لفظ (فتبينوا) من قوله تعالى يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جاءَكُمْ فاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا (1) من غير نقط يحتمل قراءة (فتثبتوا) … ومن هنا كان منشأ القراءات.

وأما عن صلة القراءات السبع بالأحرف السبعة المذكورة فى الحديث، فليعلم أن الأحرف السبعة نزلت فى أول الأمر للتيسير على الأمة. فالعرب ألسنتهم مختلفة ولهجاتهم متباينة، ويتعذّر على الواحد منهم أن ينتقل من لهجته التى درج عليها، ثم نسخ منها الكثير بالعرضة الأخيرة، وليس الأمر كما توهمه بعض الناس من أن القراءات السبع هى الأحرف السبعة. والصواب أن قراءات الأئمة السبعة بل العشرة التى يقرأ بها الناس اليوم هى جزء من الأحرف السبعة التى نزل بها القرآن وهذه القراءات جميعها موافقة لخط المصاحف التى بعث بها الخليفة عثمان إلى الأمصار. وقد سوّغ كل واحد من القراء قراءة الآخر وأجازها وانعقد الإجماع على أن جميع القرآن الذى أنزله الله وأمر بإثبات رسمه ولم ينسخه، ولا رفع تلاوته، هو هذا الذى بين الدفتين الذى حواه المصحف العثمانى الإمام، وأنه لم ينقص منه

--------------------------------------------

(1) الحجرات: 6.
‌‌কিরাআতসমূহের (القراءات) উৎস এবং সাত হরফের (الأحرف السبعة) সাথে সাত কিরাআতের (القراءات السبع) সম্পর্ক বিষয়ক একটি বিশেষ আলোচনা

আমিরুল মুমিনিন উসমান ইবন আফফান কেবল মাসহাফসমূহ (المصاحف) বিভিন্ন জনপদে প্রেরণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং সেগুলোর সাথে একদল ক্বারী (قراء) সাহাবীকেও পাঠিয়েছিলেন যাতে তারা মানুষকে শিক্ষা দিতে পারেন। যেহেতু উসমানী মাসহাফসমূহ (المصاحف العثمانية) নুকতা (النقط) ও হরকত (الشكل) বিহীন হওয়ার কারণে কোনো নির্দিষ্ট কিরাআতের (قراءة) জন্য নির্ধারিত ছিল না, তাই প্রত্যেক সাহাবী নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণের (تلقيا) মাধ্যমে যা শিখেছিলেন, সে অনুযায়ী শিক্ষা দিতেন; যতক্ষণ পর্যন্ত সেই কিরাআত (القراءة) উসমানী মাসহাফের লিপিশৈলীর অনুকূলে থাকত, যার অনুলিপিগুলো সকল দিগন্তে প্রেরণ করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, মহান আল্লাহর বাণী: "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও (فتبينوا)" (১)—এখানে নুকতাহীন অবস্থায় ‘ফাতাবাইয়্যানু’ (فتبينوا) শব্দটি ‘ফাতাসাব্বাতু’ (فتثبتوا) হিসেবে পড়ার কিরাআতেরও (قراءة) সম্ভাবনা রাখে... আর এখান থেকেই কিরাআতসমূহের (القراءات) উৎপত্তি ঘটেছিল।

আর হাদিসে বর্ণিত সাত হরফের (الأحرف السبعة) সাথে সাত কিরাআতের (القراءات السبع) সম্পর্কের বিষয়ে জেনে রাখা উচিত যে, সাত হরফ (الأحرف السبعة) ইসলামের শুরুর দিকে উম্মতের জন্য সহজীকরণের লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল। কেননা আরবদের ভাষা ছিল বিভিন্ন প্রকারের এবং তাদের উপভাষাগুলো (لهجات) ছিল বৈচিত্র্যময়। তাদের কারো পক্ষে নিজের দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত উপভাষা (لهجة) থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল। পরবর্তীতে শেষবার পাঠের (العرضة الأخيرة) মাধ্যমে এর অনেকাংশই রহিত (نسخ) করে দেওয়া হয়। বিষয়টি এমন নয় যা কিছু মানুষ ভ্রান্ত ধারণাবশত মনে করে থাকে যে, সাত কিরাআত (القراءات السبع) হলো মূলত সাত হরফ (الأحرف السبعة)। বরং সঠিক কথা হলো, ইমামগণের সাত কিরাআত (قراءات), এমনকি দশ কিরাআত (العشرة), যার মাধ্যমে মানুষ বর্তমানে তিলাওয়াত (يقرأ) করে, তা সেই সাত হরফেরই (الأحرف السبعة) একটি অংশ যার মাধ্যমে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এই কিরাআতসমূহের (القراءات) সবকটিই খলিফা উসমান কর্তৃক জনপদগুলোতে প্রেরিত মাসহাফসমূহের (المصاحف) লিপিশৈলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্বারীগণের (القراء) প্রত্যেকেই অন্যের কিরাআতকে (قراءة) বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। আর এ বিষয়ে ঐক্যমত (الإجماع) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা যে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং যার লিখন পদ্ধতি (رسم) বলবৎ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ও যা রহিত (نسخ) করেননি কিংবা যার তিলাওয়াত (تلاوته) উঠিয়ে নেননি—তা মূলত দুই মলাটের মধ্যবর্তী এই সংকলনটিই, যা ইমাম উসমানী মাসহাফ (المصحف العثماني الإمام) ধারণ করে আছে এবং তা থেকে কোনো কিছুই হ্রাস করা হয়নি।

--------------------------------------------

(১) আল-হুজুরাত: ৬।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৭)
شىء، ولا زيد فيه شىء، وأن ترتيبه ونظمه ثابت على ما نظمه الله تعالى ورتبه عليه رسوله صلى الله عليه وسلم من آى السور، لم يقدم من ذلك مؤخر ولا أخر مقدم وهذا ما تيسر (1) من البيان والسلام.

…

--------------------------------------------

(1) ليس المقام هذا مقام إفاضة واستقصاء عن القراءات والقرّاء وإنما المقصود لمحة موجزة، ومن أراد المزيد فليرجع إلى كتب القراءات.
...কিছুই [বাদ পড়েনি], আর তাতে কোনো কিছুই বৃদ্ধি করা হয়নি। আর নিশ্চয়ই এর বিন্যাস ও শৃঙ্খলা মহান আল্লাহ যেভাবে নির্ধারণ করেছেন এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সূরার আয়াতসমূহের ক্ষেত্রে যেভাবে বিন্যস্ত করেছেন, সেভাবেই সুপ্রতিষ্ঠিত (ثابت) রয়েছে। এতে পরবর্তী কোনো বিষয়কে আগে আনা হয়নি এবং পূর্ববর্তী কোনো বিষয়কে পেছনে নেওয়া হয়নি। আর বর্ণনার ক্ষেত্রে এটুকুই সহজসাধ্য হয়েছে (১) এবং সমাপ্ত।

…

--------------------------------------------

(১) এই স্থানটি কিরাত (القراءات) এবং কারীগণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের জায়গা নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো একটি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত প্রদান করা। আর যিনি আরও বিস্তারিত জানতে চান, তিনি যেন কিরাত বিষয়ক গ্রন্থসমূহের শরণাপন্ন হন।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ২৯)
‌‌الباب الثانى هدى رسول الله صلى الله عليه وسلم فى قراءة القرآن وعند استماعه وتوابع ذلك

فى هذا الباب المهم من أبواب هذا الكتاب نعيش مع خير الهدى، وأطيبه وأنفعه هدى محمد صلى الله عليه وسلم نستقى من منهله (فقه قراءة القرآن الكريم) كما استقاه الجيل الأول من صحابته الكرام الذين تعلموا العلم والعمل معا.

فكان هذا الباب (هدى النبى صلى الله عليه وسلم فى قراءة القرآن وعند استماعه، وتوابع ذلك) هدى تنفتح معه أقفال القلوب لتقتبس من أنوار المعرفة وتجنى ثمار الفهم.

وفقنا الله لذلك، وبالله نستعين ومنه نستمد الحول والقوة فأقول وبالله تعالى التوفيق:

 

‌‌فصل فى هديه صلى الله عليه وسلم فى الاستعاذة

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا همّ بقراءة القرآن الكريم امتثل أمر ربه بالاستعاذة من الشيطان الرجيم.

قال تعالى: فَإِذا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطانِ الرَّجِيمِ (1) فكان صلى الله عليه وسلم يستعيذ عند بدئه للقراءة فيقول: «أعوذ بالله من الشيطان الرجيم».

--------------------------------------------

(1) النحل: 98.
‌দ্বিতীয় অধ্যায়: কুরআন তিলাওয়াত ও তা শ্রবণের ক্ষেত্রে এবং এর আনুষঙ্গিক বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ

এই কিতাবের অধ্যায়সমূহের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমরা সর্বোত্তম, অতি উত্তম এবং অত্যন্ত উপকারী আদর্শ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শের সান্নিধ্যে অবস্থান করব। আমরা তাঁর সুপেয় প্রস্রবণ হতে 'কুরআন তিলাওয়াতের গভীর জ্ঞান' আহরণ করব, যেমনটি আহরণ করেছিলেন তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণের (صحابة) প্রথম প্রজন্ম, যাঁরা জ্ঞান অর্জন ও আমল সম্পাদন উভয়টি একই সাথে শিখেছিলেন।

সুতরাং এই অধ্যায়টি (কুরআন তিলাওয়াত ও তা শ্রবণের ক্ষেত্রে এবং এর আনুষঙ্গিক বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ) এমন এক হিদায়াত যার মাধ্যমে অন্তরের রুদ্ধ কপাটসমূহ উন্মোচিত হয়, যেন তা মারেফাতের নূর আহরণ করতে পারে এবং উপলব্ধির ফল লাভ করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এ বিষয়ে তাওফীক দান করুন। আমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁরই নিকট শক্তি ও সামর্থ্য কামনা করছি। আমি আল্লাহর তাওফীক কামনা করে বলছি:

 

‌‌আশ্রয় প্রার্থনা সংক্রান্ত তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বিষয়ক পরিচ্ছেদ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কুরআন তিলাওয়াত করার সংকল্প করতেন, তখনই বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনার বিষয়ে তাঁর রবের নির্দেশ পালন করতেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: "সুতরাং যখন তুমি কুরআন পাঠ করবে, তখন আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো।" (১) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত শুরু করার সময় আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং বলতেন: "আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।"

--------------------------------------------

(১) আন-নাহল: ৯৮।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৩০)
ومعنى أعوذ بالله من الشيطان الرجيم: (أى أستنجد بجناب الله من الشيطان الرجيم أن يضرنى فى دينى أو دنياى، أو يصدنى عن فعل ما أمرت به، أو يحثنى على فعل ما نهيت عنه).

وإن المتأمل للقرآن والسنة يجد اعتناءهما بذكر التحذير من الشيطان وكيده والعمل على محاربته كثيرا وذلك لشدة الحاجة إلى التعوذ منه عند قراءة القرآن وغيره من سبل الخير التى يسلكها الإنسان، فالشيطان قعد لابن آدم بأطرقه كلها، فما من طريق خير إلا والشيطان قاعد عليه يقطعه على السالك ويثبطه عنه ويفسده عليه، وما من طريق سوء إلا والشيطان قاعد عليه يأمره به ويحثه عليه ويزينه فى عينه والمعصوم من عصمه الله تعالى.

وفى الاستعاذة قول كثير انتشرت فروعه فى علم أصول الفقه وأصول الحديث وأصول القراءات. فأما أصول الفقه فيبحث فيها عن التعوذ من حيث أن الأمر به فى الآية. هل هو للوجوب أم الندب؟ وهل الآية واضحة الدلالة فيتعين لفظها أم مجملة فيصلح كل لفظ يدلّ على التعوذ؟

وأما أصول الحديث فيبحث فيها عن درجة الأحاديث الدالة على التعوذ وعن سندها وحال رواتها.

وأما أصول القراءات فيبحث فيها عن التعوذ من حيث الجهر به والإخفاء ومن حيث الوقف عليه أو وصله بما بعده.

وفيما يلى أوجز أرجح الأقوال وعلى الله الاتكال:

أولا: فمن حيث التعوذ فى الآية، فقد ذهب جمهور العلماء إلى أنه أمر ندب- أى استحباب- وليس بواجب (1).

--------------------------------------------

(1) الواجب شرعا: هو طلب الشارع الفعل على سبيل الحتم والإلزام، بحيث يذم تاركه ومع الذم العقاب، ويمدح فاعله ومع المدح الثواب والواجب هو الفرض عند الجمهور.

الندب: هو طلب الشارع الفعل على سبيل الترجيح لا الإلزام بحيث يمدح فاعله ويثاب، ولا يذم تاركه ولا يعاقب. (انظر الوجيز فى أصول الفقه ص 29).
ومعنى أعوذ بالله من الشيطان الرجيم: (أى أستنجد بجناب الله من الشيطان الرجيم أن يضرنى فى دينى أو دنياى، أو يصدنى عن فعل ما أمرت به، أو يحثنى على فعل ما نهيت عنه).

আর 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' এর অর্থ হলো: (অর্থাৎ, আমি আল্লাহর মহান দরবারে বিতাড়িত শয়তান থেকে এই মর্মে সাহায্য প্রার্থনা করছি যেন সে আমার দ্বীন বা দুনিয়ার কোনো ক্ষতি করতে না পারে, অথবা আমাকে যা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা থেকে বিরত রাখতে না পারে, অথবা আমাকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছে তা করতে প্ররোচিত করতে না পারে)।

নিশ্চয়ই কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি অভিনিবেশকারী দেখতে পাবেন যে, শয়তান ও তার চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ব্যাপারে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এর কারণ হলো কুরআন তিলাওয়াত এবং মানুষের অনুসৃত অন্যান্য নেক আমলের পথে তার থেকে আশ্রয় চাওয়ার তীব্র প্রয়োজনীয়তা। কেননা শয়তান আদম সন্তানের সকল পথে ওত পেতে বসে থাকে। কল্যাণের এমন কোনো পথ নেই যেখানে শয়তান বসে থেকে পথচারীকে বাধা না দেয়, তাকে নিরুৎসাহিত না করে এবং তার আমলকে নষ্ট না করে। আবার মন্দের এমন কোনো পথ নেই যেখানে শয়তান বসে থেকে তাকে তা করতে নির্দেশ না দেয়, প্ররোচিত না করে এবং তার চোখে তা সুশোভিত করে না দেখায়। আর সংরক্ষিত (المعصوم) তো সেই ব্যক্তি যাকে মহান আল্লাহ রক্ষা করেন।

ইস্তিয়াজাহ (আশ্রয় প্রার্থনা) সম্পর্কে অনেক বক্তব্য রয়েছে যার শাখা-প্রশাখা উসুলুল ফিকহ (أصول الفقه), উসুলুল হাদিস (أصول الحديث) এবং ইলমুল কিরাআতের মূলনীতিসমূহ (أصول القراءات)-এর মধ্যে বিস্তৃত। উসুলুল ফিকহের ক্ষেত্রে আয়াতে বর্ণিত নির্দেশনার প্রেক্ষিতে আশ্রয় প্রার্থনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়—এটি কি ওয়াজিব বা আবশ্যকতা (وجوب) নাকি মুস্তাহাব বা পছন্দনীয়তা (ندب)? আর আয়াতের অর্থ কি সুস্পষ্ট নির্দেশক (واضحة الدلالة) যার ফলে নির্দিষ্ট শব্দই উচ্চারণ করতে হবে, নাকি এটি অস্পষ্ট বা সংক্ষিপ্ত (مجملة) যেখানে আশ্রয় প্রার্থনা বুঝায় এমন যেকোনো শব্দই সঠিক বলে গণ্য হবে?

আর উসুলুল হাদিসের ক্ষেত্রে আশ্রয় প্রার্থনা সংক্রান্ত হাদিসসমূহের মান (درجة الأحاديث), সেগুলোর সনদ (سند) এবং রাবি বা বর্ণনাকারীদের (رواة) অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

আর কিরাআতের মূলনীতির ক্ষেত্রে এটি উচ্চস্বরে পাঠ (الجهر) বা নিচু স্বরে পাঠ (الإخفاء) এবং এতে থামা (الوقف) বা পরবর্তী অংশের সাথে মিলিয়ে পড়া (وصل) সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

নিম্নে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতসমূহের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলো এবং আল্লাহর ওপরই ভরসা:

প্রথমত: আয়াতের ভিত্তিতে আশ্রয় প্রার্থনার বিধান হলো, জমহুর উলামা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণের (جمهور العلماء) মতে এটি একটি মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় (ندب) নির্দেশ—অর্থাৎ এটি মুস্তাহাব (استحباب) এবং এটি ওয়াজিব বা আবশ্যক (واجب) নয় (১)।

--------------------------------------------

(১) শরয়ি পরিভাষায় ওয়াজিব (الواجب شرعا) হলো: যা পালন করার জন্য শরিয়ত প্রণেতা অকাট্য ও বাধ্যতামূলকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, যার ফলে তা পরিত্যাগকারী নিন্দিত হবে এবং নিন্দার সাথে শাস্তির সম্মুখীন হবে, আর সম্পাদনকারী প্রশংসিত হবে এবং প্রশংসার সাথে সওয়াব লাভ করবে। জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণের (الجمهور) মতে ওয়াজিব (الواجب) হলো ফরজ (الفرض)-এর সমার্থক।

নাদব (الندب): এটি হলো শরিয়ত প্রণেতা কোনো কাজ করার জন্য গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু তা বাধ্যতামূলক করেননি; ফলে তা পালনকারী প্রশংসিত হবে এবং সওয়াব পাবে, কিন্তু পরিত্যাগকারী নিন্দিত হবে না এবং শাস্তিও পাবে না। (দেখুন: আল-ওয়াজিজ ফি উসুলিল ফিকহ, পৃষ্ঠা ২৯)।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৩১)
حكى الإجماع على ذلك أبو جعفر بن جرير وغيره من الأئمة. وذهب فريق آخر من العلماء إلى أنها واجبة عند ابتداء القراءة وحكى الرازى عن عطاء بن رباح ذلك، واحتج بظاهر الأمر فى الآية (1).

قلت: والصواب ما قاله الجمهور من أن الأمر بالتعوذ فى الآية أمر ندب وليس بواجب، والذى صرفه عن الوجوب- حيث أن كل أمر من الشارع يقع موقع الوجوب إلا إذا صرفه صارف- والصارف عن الوجوب هنا هو حديث أنس بن مالك رضى الله عنه قال: بينما رسول الله صلى الله عليه وسلم بين أظهرنا فى المسجد، إذا أغفى إغفاءة، ثم رفع رأسه مبتسما قلنا: ما أضحكك يا رسول الله. قال: «لقد أنزلت علىّ آنفا سورة فقرأ بسم الله الرحمن الرحيم: إِنَّا أَعْطَيْناكَ الْكَوْثَرَ (1) فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ (2) إِنَّ شانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ ثم قال: «أتدرون ما الكوثر … الحديث» (2).

والشاهد: أنه صلى الله عليه وسلم لم يستعذ ولو كانت الاستعاذة واجبة لما تركها.

وعن كون الاستعاذة هل هى قبل التلاوة أو بعدها؟ قالت طائفة من القراء وغيرهم، يتعوذ بعد القراءة واعتمدوا على ظاهر سياق الآية، والمشهور (4) الذى عليه الجمهور

أن الاستعاذة إنما تكون قبل التلاوة لدفع الموسوس عنها ومعنى الآية عندهم (فإذا قرأت القرآن فاستعذ بالله من الشّيطان الرّجيم) أى: إذا أردت القراءة كقوله تعالى: إِذا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ (3) أى إذا أردتم القيام. والدليل على ذلك الأحاديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم.

ذلك لأن المقصد من الاستعاذة عند ابتداء القراءة. لئلا يلبّس الشيطان على القارئ قراءته ويخلط عليه ويمنعه من التدبر والتفكر، كما أن فيها تمهيدا للجو

--------------------------------------------

(1) مقدمة ابن كثير (ج 1 ص 15).

(2) أخرجه أحمد فى مسنده (ج 3 ص 102)، مسلم بشرح النووى (ج 4 ص 113) واللفظ لمسلم.

(4) المشهور: أى المعروف والذائع.

(3) المائدة: 6.
আবু জাফর ইবনে জারীর এবং অন্যান্য ইমামগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য (إجماع) বর্ণনা করেছেন। আলেমদের অপর একটি দল মনে করেন যে, তিলাওয়াত শুরুর সময় এটি ওয়াজিব (واجب)। ইমাম রাযী আতা ইবনে রাবাহ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন এবং আয়াতের বাহ্যিক নির্দেশের মাধ্যমে দলিল পেশ করেছেন (১)।

আমি বলি: সঠিক মত হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ (جمهور) আলেমদের অভিমত যে, আয়াতে আউযুবিল্লাহ পড়ার নির্দেশটি পছন্দনীয় (ندب) হওয়ার জন্য, ওয়াজিব (واجب) হওয়ার জন্য নয়। আর যা একে ওয়াজিব (واجب) হওয়া থেকে সরিয়ে দেয়—যেহেতু শরীয়তদাতার প্রতিটি নির্দেশই ওয়াজিব (واجب) হওয়ার দাবি রাখে যতক্ষণ না অন্য কোনো প্রমাণ একে পরিবর্তন করে—আর এখানে ওয়াজিব (واجب) থেকে পরিবর্তনকারী প্রমাণটি হলো আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর হাদিস। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে আমাদের মাঝে ছিলেন, তখন তিনি কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। এরপর মুচকি হেসে মাথা তুললেন। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসির কারণ কী? তিনি বললেন: «এইমাত্র আমার নিকট একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তিনি পাঠ করলেন—বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম: ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি (১) অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন ও কোরবানি করুন (২) নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ (৩)’ এরপর তিনি বললেন: তোমরা কি জানো কাউসার কী … হাদিস» (২)।

আর এর সাক্ষ্য (شاهد) হলো: তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আউযুবিল্লাহ পাঠ করেননি; যদি আউযুবিল্লাহ পাঠ করা ওয়াজিব (واجب) হতো, তবে তিনি তা বর্জন করতেন না।

আর আউযুবিল্লাহ কি তিলাওয়াতের আগে নাকি পরে? কারীগণ এবং অন্যদের একটি দল বলেছেন যে, তিলাওয়াত শেষে আউযুবিল্লাহ পড়তে হয় এবং তারা আয়াতের শব্দের ক্রমানুসারের বাহ্যিক রূপের ওপর নির্ভর করেছেন। তবে সুপ্রসিদ্ধ (مشهور) অভিমত, যার ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ (جمهور) আলেমগণ রয়েছেন, তা হলো—

আউযুবিল্লাহ তিলাওয়াতের আগেই পড়তে হয় যাতে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করা যায়। তাদের নিকট আয়াতের অর্থ (যখন তুমি কুরআন তিলাওয়াত করবে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো) হলো: যখন তুমি তিলাওয়াত করার ইচ্ছা করবে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী: ‘যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত ধৌত করো’ (৩) অর্থাৎ যখন তোমরা দাঁড়ানোর ইচ্ছা করবে। এর ওপর প্রমাণ হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ।

এর কারণ হলো তিলাওয়াত শুরুর সময় আউযুবিল্লাহ পড়ার উদ্দেশ্য হলো—যাতে শয়তান পাঠকের তিলাওয়াতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, পাঠে গোলমাল না পাকায় এবং তাকে চিন্তা ও গবেষণা করা থেকে বিরত রাখতে না পারে, আর এর মাধ্যমে তিলাওয়াতের একটি অনুকূল পরিবেশও তৈরি হয়।

--------------------------------------------

(১) মুকাদ্দিমা ইবনে কাসীর (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫)।

(২) এটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ তার মুসনাদ গ্রন্থে (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০২) এবং মুসলিম শরহে নববীতে (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১১৩), আর শব্দবিন্যাস মুসলিম-এর।

(৪) সুপ্রসিদ্ধ (مشهور): অর্থাৎ যা পরিচিত ও সুবিদিত।

(৩) আল-মায়িদাহ: ৬।
(খণ্ড: ১) ফিকহু কিরাআতিল কুরআন (পৃষ্ঠা: ৩২)
الذى يتلى فيه كتاب الله وتطهيرا له من الوسوسة، واتجاها بالمشاعر إلى الله خالصة لا يشغلها شاغل من عالم الرجس، والشر الذى يمثله الشيطان (1).

وأما عن الصفة المختارة للاستعاذة فهى قول: (أعوذ بالله من الشيطان الرجيم) قاله النووى (2).

وقال صاحب النشر: هى الصفة المختارة لجميع القراء من حيث الرواية (3).

قلت: نعم وهى أقرب لمطابقة لفظ القرآن … لكن بغير تقييد القارئ بلفظها، بل يجوز له النقص عنه كأن يقول (أعوذ بالله من الشيطان) والزيادة عليه كأن يقول (أعوذ بالله السميع العليم من الشيطان الرجيم) فالآية مجملة. أى مطلقة- تحتمل أن يزاد عليها أو ينقص.

وبالبحث عن الأحاديث الدالة عن التعوذ وعن سندها وحال رواتها وفى ذلك تفصيل ملخصه:

أن الأحاديث الدالة على ترك الزيادة عن آية النحل ضعيفة معارضة بأصح منها سندا (4).

وفى الجهر بالاستعاذة أو إخفائها أقوال للعلماء، وفصل الخطاب فى هذه المسألة هو أن التعوذ يستحب إخفاؤه فى مواطن، والجهر به فى مواطن أخرى .. فمواطن الإخفاء.

1 - إذا كان القارئ يقرأ سرا، سواء كان منفردا أم فى مجلس.

2 - إذا كان خاليا- أى ليس معه أحد، سواء قرأ سرا أم جهرا.

--------------------------------------------

(1) فى ظلال القرآن (ج 4 ص 2194).

(2) الأتقان فى علوم القرآن (ج 1 ص 139).

(3) النفحات الإلهية فى شرح الشاطبية ص 54.

(4) ذكر هذه الأحاديث، وأقوال أهل العلم فيها طويل لا يناسبه هذا المقام، وفيما ذكر كفاية وإرشاد إلى ما ترك.
যেখানে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করা হয় এবং তাকে কুমন্ত্রণা থেকে পবিত্র করার জন্য, আর সকল অনুভূতিকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দিকে ধাবিত করার জন্য, যাতে অপবিত্র জগত এবং শয়তানের প্রতিনিধিত্বকারী অনিষ্টের কোনো ব্যস্ততা তাকে বিচ্যুত না করতে পারে (১)।

আর আশ্রয় প্রার্থনার (ইস্তিয়াজা) জন্য পছন্দনীয় পদ্ধতির ব্যাপারে বলা যায়, তা হলো: (বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। ইমাম নববী (২) এটি উল্লেখ করেছেন।

এবং আন-নাশর গ্রন্থের লেখক বলেছেন: এটিই বর্ণনা (رواية)-এর দিক থেকে সকল ক্বারীর নিকট পছন্দনীয় পদ্ধতি (৩)।

আমি বলি: হ্যাঁ, এটি কুরআনের শব্দের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ … তবে পাঠককে এই নির্দিষ্ট শব্দাবলীতে সীমাবদ্ধ করা ছাড়াই। বরং তার জন্য এতে শব্দ কমানো বৈধ, যেমন সে বলতে পারে (আমি শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি), আবার শব্দ বাড়ানোও বৈধ, যেমন সে বলতে পারে (আমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি)। কারণ আয়াতটি সংক্ষেপিত (مجمل), অর্থাৎ তা শর্তহীন (مطلق)—এতে শব্দ বৃদ্ধি বা হ্রাসের অবকাশ রয়েছে।

আশ্রয় প্রার্থনা সম্পর্কিত হাদিসসমূহ এবং সেগুলোর সনদ (سند) ও বর্ণনাকারীদের অবস্থা সম্পর্কে গবেষণার মাধ্যমে যে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, তার সারসংক্ষেপ হলো:

সূরা আন-নাহল-এর আয়াতের অতিরিক্ত শব্দ বর্জন করার স্বপক্ষে যে হাদিসগুলো রয়েছে, সেগুলো দুর্বল (ضعيف); যা সনদের (سند) দিক থেকে অধিক বিশুদ্ধ (صحيح) বর্ণনার বিপরীত (৪)।

আশ্রয় প্রার্থনা উচ্চস্বরে নাকি নিচুস্বরে পাঠ করা হবে সে বিষয়ে আলেমদের একাধিক মত রয়েছে। এই মাসআলায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, আশ্রয় প্রার্থনা কতিপয় ক্ষেত্রে নিচুস্বরে করা মুস্তাহাব এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে উচ্চস্বরে... নিচুস্বরে পাঠ করার ক্ষেত্রসমূহ হলো:

১ - যখন পাঠক নিচুস্বরে পাঠ করেন, তিনি একাকী হোন বা কোনো মজলিসে।

২ - যখন তিনি নির্জনে থাকেন—অর্থাৎ তার সাথে অন্য কেউ না থাকে, চাই তিনি নিচুস্বরে পাঠ করুন বা উচ্চস্বরে।

--------------------------------------------

(১) ফি জিলালিল কুরআন (৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২১৯৪)।

(২) আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন (১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৯)।

(৩) আন-নাফাহাতুল ইলাহিয়্যাহ ফি শারহিশ শাতিবিয়্যাহ, পৃ. ৫৪।

(৪) এই হাদিসসমূহের উল্লেখ এবং সে বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য অত্যন্ত দীর্ঘ যা এখানে আলোচনার উপযোগী নয়। যা উল্লেখ করা হয়েছে তা-ই যথেষ্ট এবং যা বর্জন করা হয়েছে তার জন্য দিকনির্দেশনা স্বরূপ।