القسم: الفرائض والوصايا
الكتاب: منة الجليل لبيان إسقاط ما على الذمة من كثير وقليل
(مطبوع ضمن مجموع رسائل ابن عابدين)
المؤلف: نجل ابن عابدين، محمد علاء الدين [ت 1306]
(ألفها ذيلا على رسالة والده «ابن عابدين» المسماة «شفاء العليل وبل الغليل في حكم الوصية بالختمات والتهاليل»)
الناشر: در سعادت، إسطنبول، 1325 هـ - 1907 م
وصوّر «مجموع الرسائل»: عالم الكتب، وعدة دور نشر أخرى
عدد الصفحات: 24
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 9 ذو القعدة 1445
বিভাগ: উত্তরাধিকার ও অসিয়তনামা
গ্রন্থ: অল্প ও অধিক যিম্মাদারি হতে অব্যাহতির বর্ণনায় সুমহান অনুগ্রহ
(মাজমুউ রাসায়িলে ইবনে আবিদীনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে মুদ্রিত)
লেখক: ইবনে আবিদীনের পুত্র, মুহাম্মদ আলাউদ্দীন [মৃত্যু ১৩০৬ হিজরী]
(তিনি এটি তাঁর পিতা «ইবনে আবিদীন»-এর «শিফাউল আলীল ওয়া বাল্লুল গালীল ফি হুকমিল ওয়াসিয়্যাতি বিল খাতমাতি ওয়াত তাহালীল» নামক রিসালার পরিশিষ্ট হিসেবে রচনা করেছেন)
প্রকাশক: দারুস সাআদাত, ইস্তাম্বুল, ১৩২৫ হিজরী - ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ
«মাজমুউ রাসায়িল»-এর প্রতিচ্ছবি বা সংস্করণ: আলমুল কুতুব এবং আরও কয়েকটি প্রকাশনী
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৪
[গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা মূল মুদ্রণের অনুরূপ]
শামেলায় প্রকাশের তারিখ: ৯ যুলকাদা ১৪৪৫ হিজরী
(আর এটাই) মা'বুদ বাদশাহর সাহায্যে উদ্দিষ্ট বিষয়টি শুরু করার সময়। আমি বলছি, শাইখায়ন (বুখারি ও মুসলিম) এবং আব্দ ইবনে হুমাইদ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, (কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য এমন তিনটি রাত অতিবাহিত হওয়া উচিত নয় যার কাছে তার অসিয়তনামা নেই।) ইবনে উমর (রা.) বলেন, এরপর থেকে আমার ওপর এমন কোনো তিনটি রাত অতিবাহিত হয়নি যার কাছে আমার অসিয়তনামা ছিল না। আল্লামা তাহতাবি তাঁর 'মারাকিল ফালাহ'-এর হাশিয়াতে (টীকায়) বলেছেন, জেনে রাখুন যে, রোজার ক্ষেত্রে ফিদিয়ার মাধ্যমে তা মওকুফ হওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট দলিল (নস) বর্ণিত হয়েছে। আর মাশায়েখগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, ইস্তিহসানের (উদ্দেশ্যমূলক যুক্তি) ভিত্তিতে সালাতও রোজার মতো, কারণ সালাত রোজার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁদের মধ্যে মতভেদ কেবল এ বিষয়ে যে, একদিনের সালাত কি একদিনের রোজার মতো, নাকি প্রতিটি ফরজ (ওয়াক্ত) সালাত একদিনের রোজার মতো? আর এটাই (পরেরটিই) নির্ভরযোগ্য মত। আপনি যখন এটি জানলেন, তখন আপনি সেই ব্যক্তির অজ্ঞতা বুঝতে পারবেন যে বলে সালাত মওকুফের কোনো ভিত্তি নেই। কেননা এটি মাযহাবের অনুসারীদের ঐক্যমত্যপূর্ণ বিষয়কে বাতিল করার শামিল। আর এখানে রোজা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রমজানের রোজা, শপথের কাফফারার রোজা, হত্যার (কাফফারার) রোজা, যিহারের রোজা, ইহরাম অবস্থায় কোনো অপরাধের রোজা, মুহরিম অবস্থায় শিকার হত্যার রোজা এবং মানতের রোজা। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
(আমি বলছি) তাঁর কথা "ইস্তিহসানান" (ইস্তিহসানের ভিত্তিতে) দ্বারা মাশায়েখদের ইস্তিহসান উদ্দেশ্য। এর প্রমাণ হলো তাঁর কথা "মাশায়েখগণ একমত হয়েছেন..." এবং সামনে আগত 'আল-মুস্তাসফা'-এর বক্তব্য; এটি সেই 'মুতলাক ইস্তিহসান' নয় যা কিয়াসে জালীর (সুস্পষ্ট অনুমানের) বিপরীত। কারণ এখানে বিষয়টি তেমন নয়, বরং প্রথমটিই (মাশায়েখদের ইস্তিহসান) উদ্দেশ্য। আর তাঁর কথা "এর কোনো ভিত্তি নেই", অর্থাৎ তা যদি শর্তহীনভাবে বলা হয়—চাই মাশায়েখদের ইস্তিহসানের ক্ষেত্রে এর ভিত্তি থাকুক কিংবা নস ও দলিলের ক্ষেত্রে—তবে আপনি যা জেনেছেন তার আলোকে এটি একটি অজ্ঞতা। কিন্তু যদি দ্বিতীয়টি (অর্থাৎ দলিল ও নস না থাকা) উদ্দেশ্য হয়, তবে এটি জ্ঞান, অজ্ঞতা নয়। সালাত মওকুফের কোনো ভিত্তি নেই—যারা এ কথা বলেন তাদের কথাকে প্রথম অর্থেই গ্রহণ করা হবে। কারণ সালাতের বদলে খাদ্য দান করার কোনো ভিত্তি কিতাব (কুরআন), সুন্নাহ, ইজমা কিংবা কিয়াসে নেই। বরং এটি মাশায়েখদের ইস্তিহসানের ভিত্তিতে একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, যেমনটি আপনি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য উসুল (মূলনীতি) এবং ফুরু (শাখা) মাসআলাগুলোর কিতাবে জেনেছেন। এর পাঠ্য সামনে আসবে, এমনকি 'আল-মাবসুত' থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, "আর সালাতের ব্যাপারে কোনো কিতাবেই এর পরিবর্তে ফিদিয়া দেওয়ার বিষয়ে নিঃশর্ত উত্তর দেওয়া হয়নি।" এর দ্বারা আপনি বুঝতে পারলেন যে, আল্লামা তাহতাবি-এর কথাটি সেই নিরঙ্কুশ অবস্থার ওপর প্রযোজ্য যা আমরা বর্ণনা করেছি, যাতে এই বক্তার অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করুন।
ইমাম ফখরুল ইসলাম আল-বাজদাভী তাঁর 'উসুল' গ্রন্থের কাজা (ছুটে যাওয়া ইবাদত আদায়) অধ্যায়ে বলেছেন, "এরপর আমরা সালাতের ক্ষেত্রে ফিদিয়া জায়িয হওয়ার বিষয়ে এমন চূড়ান্ত ফয়সালা দেইনি যেমনটি রোজার ক্ষেত্রে দিয়েছি। কারণ রোজার ক্ষেত্রে আমরা এটি অকাট্যভাবে (জায়িয হওয়ার) ফয়সালা দিয়েছি, আর সালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ কবুল হওয়ার আশা পোষণ করেছি।" ইমাম মুহাম্মদ (রাহিমাহুল্লাহু তা'আলা) 'আয-যিয়াদাত' গ্রন্থে সালাতের ফিদিয়ার ব্যাপারে বলেছেন, "আল্লাহ চাইলে এটি তার জন্য যথেষ্ট হবে, যেমনটি ওয়ারিস যদি রোজার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় তা আদায় করে।" (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
ইমাম জালালুদ্দিন আল-খাব্বাজি আল-খুজান্দি তাঁর উসুলুল ফিকহ-এর কিতাব 'আল-মুগনি'-তে বলেছেন, "অযৌক্তিক সাদৃশ্যের (মিসলে গায়র মাকুল) মাধ্যমে কাজা সম্পন্ন করা, যেমন রোজার ফিদিয়া এবং হজের খরচ, যা অযৌক্তিক নস (সুস্পষ্ট দলিল) দ্বারা প্রমাণিত। আর সালাতের ক্ষেত্রে ফিদিয়ার নির্দেশটি কারণের সম্ভাবনা এবং এটি রোজার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে দেওয়া হয়েছে। আমরা এর বৈধতার ব্যাপারে অকাট্য ফয়সালা দেইনি যেমনটি রোজার ক্ষেত্রে দিয়েছি।" ইমাম মুহাম্মদ (রাহিমাহুল্লাহু তা'আলা) বলেছেন, "আল্লাহ চাইলে এটি তার জন্য যথেষ্ট হবে, যেমন ওয়ারিস যদি রোজার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় তা প্রদান করে।" (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
এর ব্যাখ্যাকার আবু মনসুর আল-ফাগানি কিছু আলোচনার পর বলেছেন, "এই কারণেই আমরা সালাতের ফিদিয়ার ক্ষেত্রে বলি না যে এটি অকাট্যভাবে জায়িয, যেমনটি আমরা রোজার ক্ষেত্রে ফয়সালা দিয়েছি যদি ব্যক্তি নিজে তা আদায় করে থাকে। তবে আমরা আশা করি..."আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল হওয়া তাঁর অনুগ্রহ মাত্র। ইমাম মুহাম্মদ 'জিয়াদাত' গ্রন্থে বলেছেন: নামাযের ফিদয়া প্রদান করা ইনশাআল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবে; যেমনটি তিনি উত্তরাধিকারী কর্তৃক মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার নির্দেশ ব্যতিরেকে রোযার ফিদয়া আদায়ের ক্ষেত্রে বলেছেন যে, তা ইনশাআল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবে। যদি এটি কিয়াসের (যৌক্তিক অনুমান) মাধ্যমে প্রমাণিত হতো, তবে অন্যান্য কিয়াসী বিধানের মতো এতে 'ইনশাআল্লাহ' শর্ত যুক্ত করার প্রয়োজন হতো না। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)। অনুরূপ বক্তব্য আলায়ী রচিত 'শারহুল মানার'-এর ওপর আমার শ্রদ্ধেয় পিতার হাশিয়াতেও রয়েছে। তবে এই বিষয়ে 'জিয়াদাত'-এর তিনটি পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং গভীর অনুসন্ধান ও তদন্তের পর তাতে ইমাম মুহাম্মদের প্রতি নিসবত করা নামাযের ফিদয়া সংক্রান্ত সেই বক্তব্যটি পাওয়া যায়নি। বরং এটি মাশায়েখদের 'ইসতিহসান' (শরয়ী পছন্দ) এর ভিত্তিতে সাব্যস্ত হয়েছে, যেমনটি আপনি অবগত হয়েছেন এবং সামনে আলোচিত হবে। অন্যান্য নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলোও পুনরায় দেখা উচিত, কারণ ইসলামের সাহায্যকারী এমন বিশ্বস্ত ও প্রখ্যাত ইমামগণ কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়া আমাদের নিকট কোনো কিছু বর্ণনা করবেন—এমনটি তাঁদের শানে কল্পনাও করা যায় না। কেননা তাঁরা পবিত্র ও বিশুদ্ধ শরীয়তের আমানতদার। বিশেষ করে তাঁরা তো মুহাক্কিকগণের ধারার সমাপ্তিকারী, আর তাঁদের প্রধান হলেন ইবনুল হুমাম, যিনি মুজতাহিদের স্তরে উপনীত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের রূহসমূহের ওপর রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁদের সমাধি ও শয্যাস্থলগুলোকে নূরান্বিত করুন। আমীন।
(অতঃপর) আমি বলছি: ইসকাত (দায়মুক্তি), কাফফারা ও ফিদয়ার বিবরণ এবং ব্যক্তির ওসিয়তের মাধ্যমে এটি সম্পাদিত হওয়া তার উত্তরাধিকারীর স্বেচ্ছায় আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর এটি নামাযের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নামাযের ফিদয়ার ওয়াজিব পরিমাণ হলো: প্রতিটি ফরয নামাযের পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে আধা সা গম, অথবা গমের আটা, অথবা ছাতু প্রদান করা; অথবা এক সা খেজুর, কিসমিস, যব বা যবের আটা প্রদান করা—ইত্যাদি যা সদকায়ে ফিতরের অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
অতঃপর জেনে রাখুন যে, শরয়ী দিরহাম হলো চৌদ্দ কিরাত। আর বর্তমানে প্রচলিত দিরহাম হলো ষোল কিরাত। শরয়ী কিরাত হলো পাঁচটি যব অথবা চারটি গমের ওজনের সমান। সুতরাং শরয়ী দিরহাম সত্তরটি যবের ওজনের সমান এবং মিসকাল হলো একশটি যবের সমান। অতএব, মিসকাল হলো এক দিরহাম এবং এক দিরহামের সাত ভাগের তিন ভাগ। আমাদের বর্তমান প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী কিরাত, যা শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা হলো খারনুব ফলের বীজ। আমাদের নিকট শরয়ী এবং প্রচলিত দিরহামের মধ্যে পার্থক্য হলো দুই কিরাত। আর শরয়ী ও প্রচলিত মিসকালের মধ্যে পার্থক্য চার কিরাত। ওজনের দিক থেকে পাঁচটি যব ও চারটি গমের ওজন সমান। আর রূপার প্রতি দশ দিরহামের ওজন হলো স্বর্ণের সাত মিসকালের সমান।
যদি এক সা এক হাজার চল্লিশ শরয়ী দিরহাম হয়, তবে প্রচলিত দিরহামের হিসেবে তা হবে নয়শ দশ দিরহাম। ১২৯৬ হিজরী সনে আধা সা-এর পরিমাণ যাচাই করা হয়েছে এবং তাতে স্তূপ করা ছাড়া তা প্রায় এক 'সুমনিয়্যাহ' পরিমাণ পাওয়া গিয়েছে। ফকীহগণ সা-এর যে পরিমাপ উল্লেখ করেছেন, এটি তার পরিপন্থী নয়; কারণ আমাদের বর্তমান সময়ের 'মুদ' পূর্ববর্তী সময়ের 'মুদ'-এর চেয়ে বড়। মুদ হলো আটটি অংশ, যার প্রতিটি অংশকে 'সুমনিয়্যাহ' বলা হয়। সুতরাং সুমনিয়্যাহ হলো দামেশকী মুদ-এর আট ভাগের এক ভাগ। আর মুদ হলো অর্ধেক 'জিফত', যা ইস্তাম্বুলি 'কাইলা' থেকে আনুমানিক দুই অঞ্জলি পরিমাণ বেশি। অনুরূপভাবে আমাদের বর্তমান সময়ের 'রতল' হলো আটশ দিরহামের সমান। এই পুরো হিসাবটি সা-কে মাশ কলাই বা মসুর ডালের মাধ্যমে পরিমাপ করার ওপর ভিত্তি করে। তবে যদি গম বা যবের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়—যা অধিকতর সতর্কতামূলক—তবে আধা সা-এর পরিমাণ তার চেয়েও বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং সতর্কতা হলো স্তূপীকৃত ও ঝাড়া-বাছাইকৃত উন্নত মানের গমের পূর্ণ এক দামেশকী সুমনিয়্যাহ প্রদান করা, অথবা তার বাজারমূল্য বিবেচনা করা; কারণ গমে সাধারণত কিছু পাথর ও ধুলাবালি মিশ্রিত থাকে।
প্রবল ধারণার ভিত্তিতে, যদি নিশ্চিত সংখ্যা জানা না যায় তবে আধিক্যের সংকল্প করতে হবে, কারণ তা অধিকতর সতর্কতামূলক। অতঃপর ব্যক্তির বয়সের অনুমানের পর, পুরুষ ও মহিলার জন্য উল্লিখিত (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বের) সময়টুকু বাদ দিতে হবে এবং অবশিষ্ট সময়ের কাফফারা আদায় করতে হবে। কেননা পুরুষের ক্ষেত্রে বালেগ হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স বারো বছর এবং নারীর জন্য নয় বছর; এভাবেই করা উচিত। এমনকি যদি ব্যক্তি তার নামাযের ব্যাপারে যত্নশীলও হয়ে থাকেন, তবুও কোনো ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে—যা তিনি অনুভব করেননি—এমন আশঙ্কায় সতর্কতাস্বরূপ তা করা শ্রেয়। (মানুষের মাঝে যা প্রচলিত) এবং মাযহাবের ইমামগণ যা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন তা হলো—ওয়াজিবের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, তবে তারা টাকা-পয়সা বা অন্য কিছু যেমন জহরত, অলঙ্কার বা ঘড়ি সম্বলিত একটি থলে আবর্তন করাবে এবং এর মূল্যমানের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি নির্ধারণ করবে। * আর থলে আবর্তনের (দাওর) বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে, যার মধ্যে উত্তম হলো—অছি (প্রতিনিধি) সেই থলেটি একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের নামাযের ফিদিয়া হিসেবে প্রদান করবে এবং তাকে বলবে: "অমুকের পুত্র অমুকের পক্ষ থেকে এক বছর বা দশ বছরের নামাযের ফিদিয়া হিসেবে এই থলেটি গ্রহণ করো।" অথবা "অমুকের পক্ষ থেকে এক বছরের নামাযের ফিদিয়া হিসেবে আমি তোমাকে এর মালিক বানিয়ে দিলাম" ইত্যাদি। দরিদ্র ব্যক্তি তা কবুল করবে এবং হস্তগত করবে এবং জানবে যে সে এটার মালিক হয়েছে। দরিদ্র ব্যক্তি বলবে: "আমি এটি কবুল করলাম এবং আপনার নিকট থেকে এর মালিকানা লাভ করলাম।" অতঃপর দরিদ্র ব্যক্তি তা দান (হেবা) স্বরূপ অছি-কে ফেরত দেবে এবং অছি তা গ্রহণ করবে। পুনরায় অছি তা অন্য একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে দেবে এবং পূর্বের ন্যায় তার থেকে গ্রহণ করবে। অছি এভাবে করতে থাকবে যতক্ষণ না দরিদ্রদের মাঝে তা পূর্ণভাবে বণ্টিত হয় এবং মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থাকা নামাযের পরিমাণের সমান না হয়। অতঃপর রোজা এবং আমাদের উল্লিখিত রোজা ও কুরবানি—সবকিছুর ক্ষেত্রেই এরূপ করবে। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, সেই সম্পদ থেকে কিছু অংশ অথবা মৃত ব্যক্তি যা অসিয়ত করে গেছে তা দরিদ্রদের মাঝে সদকা করা উচিত। মূল পাঠ (মতন), ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শরহ) এবং টীকাগুলোতে (হাশিয়া) যা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে তা হলো—যে ব্যক্তি এই দায়িত্ব পালন করবে সে হলো অলি (অভিভাবক)। আর অলি বলতে তাকেই বোঝানো হয়েছে যার অসিয়ত বা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ ব্যবহারের কর্তৃত্ব রয়েছে। মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সম্পদ না থাকে, তবে ওয়ারিশ চাইলে নিজের সম্পদ থেকে তা করবে। ওয়ারিশের যদি সম্পদ না থাকে, তবে সে অন্যের নিকট থেকে দান হিসেবে গ্রহণ করবে অথবা ঋণ করবে যেন তা দরিদ্রকে দিতে পারে, অতঃপর দরিদ্রের নিকট থেকে তা দান হিসেবে ফেরত নেবে। এভাবে উদ্দেশ্য সফল হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। * আর 'আদ-দুর' এবং আমার শ্রদ্ধেয় পিতার (আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর রহম করুন) টীকায় উল্লিখিত আছে যে—মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার সেই অলি ফিদিয়া আদায় করবে, যে অসিয়ত বা উত্তরাধিকার সূত্রে তার সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রাখে। এটি মৃত ব্যক্তির সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে আদায় করা হবে—যদি সে সফর বা অসুস্থতার কারণে ছুটে যাওয়া রোজার জন্য অসিয়ত করে থাকে এবং সে তা কাজা করার মতো সময় পাওয়া সত্ত্বেও কাজা করেনি। আর যদি সে অসিয়ত না করে থাকে এবং অলি স্বেচ্ছায় তার পক্ষ থেকে তা প্রদান করে, তবে ইনশাআল্লাহ তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে জায়েয হবে। যদি উত্তরাধিকারীরা স্বেচ্ছায় তা না দেয়, তবে তাদের ওপর খাবার খাওয়ানো ওয়াজিব নয়। কারণ এটি একটি ইবাদত, তাই মৃত ব্যক্তির নির্দেশ ব্যতীত তা আদায় হয় না। তবে তারা যদি তা করে, তবে তা জায়েয হবে এবং তিনি এর সওয়াব পাবেন, যেমনটি 'আল-ইখতিয়ার'-এ বর্ণিত হয়েছে। আর যদি অলি তার পক্ষ থেকে রোজা রাখে বা নামায পড়ে, তবে তা মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থাকা কাজার পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে না; বরং সেগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করলে তা জায়েয হবে। * এই ভিত্তিতে, অছি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রতিদিনের রোজার জন্য যা ফিদিয়া হিসেবে দিবে, তা পরিমাণ ও প্রকারের দিক থেকে সাদকাতুল ফিতরের ন্যায় হবে। কাজা করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মৃত্যু পর্যন্ত তা অনাদায়ী থাকলে এর মূল্য আদায় করা জায়েয। চাই তা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করা হোক বা এর মূল্য দেওয়া হোক, এমনকি পুরোটা একজন দরিদ্রকে দিলেও তা জায়েয হবে। এক্ষেত্রে দরিদ্রের সংখ্যা বা পরিমাণ শর্ত নয়। তবে ফতোয়া অনুযায়ী—যদি দরিদ্র ব্যক্তিকে অর্ধ সা' গমের কম বা তার কম মূল্য দেওয়া হয়, তবে তা গণ্য হবে না। যদিও একটি মত অনুযায়ী সাদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। * একইভাবে জায়েয হবে যদি কেউ তার পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় তা দান স্বরূপ আদায় করে দেয়।
তার অভিভাবক পোশাক এবং আহার প্রদানের মাধ্যমে শপথের কাফফারা আদায় করবে, তবে দাসমুক্তির ক্ষেত্রে নয়। এবং হত্যার কাফফারাতেও নয়। যদি তিনি ফিদইয়ার জন্য অসিয়ত করে যান, তবে শপথ এবং হত্যার ক্ষেত্রে তা সহিহ হবে। যদি উত্তরাধিকারী তার পক্ষ থেকে জাকাত, হজ এবং কাফফারা স্বেচ্ছায় প্রদান করে, তবে তা সর্বসম্মতিক্রমে তার জন্য যথেষ্ট হবে। আর যিহার এবং রোজা ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে, যদি তিনি দারিদ্র্যের কারণে দাসমুক্ত করতে এবং বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হন, তবে তিনি ষাটজন মিসকিনকে আহার করাবেন। ফিদইয়ার ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ানো (ইবাহাত) যথেষ্ট হওয়াটাই প্রসিদ্ধ মত। আর যদি তার ওয়ারিশগণ তার নির্দেশে তার নামাজ কাজা আদায় করে, তবে তা জায়েজ হবে না; রোজার ক্ষেত্রেও একই হুকুম, তবে হজের বিষয়টি ভিন্ন। হ্যাঁ, যদি কেউ রোজা রাখে বা নামাজ পড়ে এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করে, তবে তা সহিহ হবে, এমনকি যদি সে অপরিচিত কেউ হয় তবুও। কারণ নাসায়ি শরিফের হাদিসে এসেছে, কেউ কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখবে না এবং কেউ কারও পক্ষ থেকে নামাজ পড়বে না, বরং তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে আহার প্রদান করবে। তবে এটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর ওপর মওকুফ। আর সহিহাইন (বুখারি ও মুসলিম)-এ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেই যা বর্ণিত হয়েছে যে, জনৈক ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, আমার মা ইন্তেকাল করেছেন এবং তার এক মাসের রোজা বাকি রয়েছে, আমি কি তার পক্ষ থেকে তা কাজা করব? তিনি বললেন, যদি তোমার মায়ের ওপর কোনো ঋণ থাকত, তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করা অধিকতর হকদার।—এই বর্ণনাটি মানসুখ বা রহিত। কেননা রাবির ফতোয়া যখন তার বর্ণিত হাদিসের বিপরীতে হয়, তখন তা নাসিখ বা রহিতকারী বর্ণনার স্থলাভিষিক্ত হয়। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি মদিনার সাহাবি বা তাবেয়িদের কারও কাছ থেকে শুনিনি যে, তাদের কেউ অন্য কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখতে বা নামাজ পড়তে কাউকে আদেশ করেছেন। এটি উক্ত হুকুম রহিত হওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করে এবং এটিই শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত। এর পূর্ণ বিবরণ ফাতহুল কাদির এবং শারহুন নিকায়াহ-তে রয়েছে। এবং তার উক্তি ‘ইনশাআল্লাহ’ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এই ইনশাআল্লাহ বলাটি বৈধতার দিকে নয় বরং কবুল হওয়ার দিকে ফিরেছে, যেমনটি অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। ইমাম মুহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহ অতি বৃদ্ধ ব্যক্তির ফিদইয়ার বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলেছেন, তবে যারা এর অন্তর্ভুক্ত—যেমন ওজর বা অন্য কোনো কারণে রোজা ভঙ্গ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে—তাদের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহর ওপর ঝুলন্ত রেখেছেন। তদ্রূপ ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও যিনি ইন্তেকাল করেছেন এবং তার জিম্মায় রমজানের কাজা বাকি ছিল, অথচ তিনি ওজরের কারণে রোজা ভেঙেছিলেন কিন্তু কাজা আদায়ে অবহেলা করেছেন। মূলত এখানে ইনশাআল্লাহ বলার কারণ হলো, এ বিষয়ে কোনো অকাট্য নস বা দলিল বর্ণিত হয়নি, যেমনটি আল-ইতকানি বলেছেন। নামাজের ফিদইয়ার ক্ষেত্রেও একই কারণে ইনশাআল্লাহর ওপর স্থগিত রাখা হয়েছে। ফাতহুল কাদির গ্রন্থে বলা হয়েছে, মাশায়েখদের ইস্তিহসান বা সূক্ষ্ম কিয়াস অনুযায়ী নামাজও রোজার মতো। এর কারণ হলো, শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা এবং আহার করানোর মধ্যে সাদৃশ্য প্রমাণিত। আবার নামাজ ও রোজার মধ্যেও সাদৃশ্য বিদ্যমান। আর কোনো বস্তুর সাদৃশ্যের সাদৃশ্য সেই বস্তুরই সাদৃশ্য হিসেবে গণ্য হওয়া জায়েজ। আর এই অনুমানের ভিত্তিতে আহার করানো ওয়াজিব হয়, আর যদি সাদৃশ্য না থাকে তবে ওয়াজিব হয় না। তাই ওয়াজিব হওয়ার পক্ষ অবলম্বন করাই সতর্কতামূলক। যদি বাস্তবে সাদৃশ্য প্রমাণিত থাকে, তবে উদ্দেশ্য অর্জিত হলো—অর্থাৎ জিম্মা থেকে দায় মুক্তি ঘটল। আর যদি তা না হয়, তবে এটি একটি নফল নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে যা গুনাহ মিটিয়ে দেওয়ার উপযোগী। এই কারণেই ইমাম মুহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো প্রকার দৃঢ়তা প্রকাশ না করে বলেছেন: ‘ইনশাআল্লাহ এটি তার জন্য যথেষ্ট হবে’, যেমনটি তিনি উত্তরাধিকারীর পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় আহার করানোর ক্ষেত্রে বলেছেন। পক্ষান্তরে রোজার পক্ষ থেকে ফিদইয়ার অসিয়ত করার বিষয়টি ভিন্ন, কারণ সে ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত মত দিয়েছেন। সমাপ্ত। আর তার উক্তি ‘জায়েজ’—এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে এটি একটি সদকা যা তার যথা স্থানে পৌঁছেছে, তবে তা উত্তম। কিন্তু যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় যে, অবহেলার ওপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করা সত্ত্বেও মৃত ব্যক্তির ওপর থেকে অসিয়ত করার ওয়াজিব জিম্মাদারি রহিত হয়ে যাবে, তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। এ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসগুলো তাবিল বা ব্যাখ্যাযোগ্য। মুজতবা-এর সূত্রে ইসমাইল থেকে বর্ণিত। (আমি বলি) এর দ্বারা আখেরাতে মৃত ব্যক্তির নিকট থেকে রোজার দাবি রহিত হওয়া উদ্দেশ্য হতে কোনো বাধা নেই, যদিও তা অবশিষ্ট থাকে।
তার ওপর বিলম্ব করার গুনাহ বর্তাবে, যেমনটি কোনো বান্দার ঋণের ক্ষেত্রে হয়; যদি সে তা পরিশোধে গড়িমসি করে এবং মৃত্যু পর্যন্ত বিলম্বিত করে, অতঃপর তার অসি (নির্বাহক) বা অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেয়। বৈধতাকে আল্লাহর ইচ্ছার (মাশিয়াহ) ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া এই মতকেই সমর্থন করে, যেমনটি আগে সাব্যস্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে গ্রন্থকারের (অর্থাৎ তুমুরতাশি) বক্তব্যও অন্যদের মতো; অর্থাৎ যদি কেউ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখে বা সালাত আদায় করে, তবে তা আদায় হবে না। এর অর্থ হলো, মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থাকা আমল কাজা হিসেবে আদায় করা জায়েজ নয়। অন্যথায়, যদি আমলের সওয়াব তাকে পৌঁছানো উদ্দেশ্য হয়, তবে তা জায়েজ, যা আমরা সামনে উল্লেখ করব। সুতরাং জানা গেল যে, তাঁর 'জায়েজ' বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাজা হওয়া, যাতে বৈপরীত্যের সমন্বয় সুন্দর হয়।
'আল-বাহর' গ্রন্থে রয়েছে: যদি অসিয়ত করে যায়, তবে তাদের অলি (অভিভাবক) প্রতি দিনের বিনিময়ে সদকায়ে ফিতরের মতো খাবার দান করবে। অর্থাৎ, অসুস্থ ও মুসাফির ব্যক্তি যে কয়টি দিন (সুস্থ বা মুকিম অবস্থায়) পেয়েছিল, সেগুলোর বিনিময়ে তাদের অভিভাবক খাবার খাওয়াবে, যদি তারা অসিয়ত করে যায়। কারণ, যখন তারা তাদের জিম্মায় থাকা রোজা পালনে অক্ষম হয়ে পড়ল, তখন তারা 'দালালাত' বা ইশারার ভিত্তিতে 'শায়খে ফানি'র (অত্যন্ত বৃদ্ধ ব্যক্তি) অন্তর্ভুক্ত হলো, কিয়াসের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং তাদের ওপর আবশ্যিক হলো সেই পরিমাণ অসিয়ত করা, যে পরিমাণ দিন তারা কাজা করার সুযোগ পেয়েছিল, যেমনটি 'আল-হিদায়া' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
যদি তিনি বলতেন—'যার মৃত্যু হয়েছে এবং যার ওপর রমজানের কাজা বাকি ছিল, তার অভিভাবক খাবার খাওয়াবে'—তবে তা অধিক ব্যাপক ও অর্থবহ হতো। কারণ এই বিধান কেবল অসুস্থ বা মুসাফিরের জন্য নির্দিষ্ট নয়, কিংবা যারা ওজরের কারণে রোজা ভেঙেছে তাদের জন্যও নয়; বরং এর অন্তর্ভুক্ত সেই ব্যক্তিও যে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ছেড়েছে এবং যার ওপর কাজা ওয়াজিব হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এখানে 'অলি' (অভিভাবক) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যার তার মৃত্যুর পর তার সম্পদে ব্যয় বা তদারকি করার অধিকার রয়েছে; ফলে এতে তাদের 'অসি'ও (নির্বাহক) অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর সদকায়ে ফিতরের সাথে তুলনা করা দ্বারা কাফফারার মতো পরিমাণের দিক থেকে তুলনা করা উদ্দেশ্য; অর্থাৎ প্রতি দিনের রোজার বিনিময়ে আধা সা' গম খাওয়ানো। এটি ঢালাওভাবে সদৃশ হওয়া বোঝায় না। কারণ এখানে কেবল খাওয়ার অনুমতি দেওয়া (ইবাহাত) যথেষ্ট। এজন্যই তিনি খাবার দেওয়ার (ইতা) পরিবর্তে খাওয়ানো (ইত'আম) শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা সদকায়ে ফিতরের বিপরীত; কারণ সদকায়ে ফিতরের রুকন হলো মালিক বানিয়ে দেওয়া (তামলিক), সেখানে কেবল খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়।
অসিয়তের শর্তারোপ করা হয়েছে কারণ যদি সে নির্দেশ না দেয়, তবে উত্তরাধিকারীদের ওপর কোনো কিছু আবশ্যক হয় না, যেমন জাকাত। কেননা এগুলো আল্লাহর হক এবং এতে অসিয়ত থাকা আবশ্যক যাতে স্বেচ্ছায় পালনের বিষয়টি সাব্যস্ত হয়। তবে ওশর আদায়ের আগে যদি কেউ মারা যায়, তবে অসিয়ত ছাড়াই তার ত্যাজ্য সম্পদ থেকে তা নেওয়া হবে; কারণ ওশর সরাসরি ফসলের সাথে সম্পৃক্ত, যেমনটি 'আল-বাদায়ি' গ্রন্থে রয়েছে। তা সত্ত্বেও যদি উত্তরাধিকারীরা স্বেচ্ছায় দান করে, তবে ইনশাআল্লাহ তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে।
অনুরূপভাবে শপথের কাফফারা এবং হত্যার কাফফারার ক্ষেত্রে যদি উত্তরাধিকারী স্বেচ্ছায় খাবার দান ও কাপড় প্রদান করে তবে তা জায়েজ। কিন্তু দাসমুক্তির মাধ্যমে স্বেচ্ছায় তা করা জায়েজ নয়, কারণ এতে মৃত ব্যক্তির ওপর তার সম্মতি ছাড়া 'ওয়ালা' (আনুগত্যের সম্পর্ক) আবশ্যক হয়ে পড়ে। অসিয়ত করার ইঙ্গিত দ্বারা এটিও বুঝিয়েছেন যে, এটি সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (সুলুস) থেকে ধর্তব্য হবে। আরও ইঙ্গিত করেছেন যে, সালাত হলো রোজার মতো; উভয়েই আল্লাহর হকের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে। বরং সালাতের বিষয়টি আরও অগ্রগণ্য কারণ তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও ইঙ্গিত করেছেন যে, আল্লাহর অন্যান্য সকল হকও একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত—তা আর্থিক হোক বা শারীরিক, নিছক ইবাদত হোক কিংবা যাতে ব্যয়ের অর্থ নিহিত থাকে যেমন সদকায়ে ফিতর, অথবা এর বিপরীত যেমন ওশর, কিংবা নিছক ব্যয় যেমন ভরণপোষণ, অথবা যাতে শাস্তির অর্থ নিহিত থাকে যেমন কাফফারা। আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অভিভাবক মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখবে না এবং সালাতও আদায় করবে না।
আমরা শর্ত দিয়েছি যে, তারা যেন কাজা করার মতো দিন পায়; কেননা যদি তারা অবকাশ পাওয়ার আগেই মারা যায় তবে তাদের ওপর অসিয়ত করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু যদি তারা অসিয়ত করে যায় তবে তাদের অসিয়ত সহিহ হবে, কারণ অসিয়ত সহিহ হওয়ার জন্য তা ওয়াজিব হওয়া শর্ত নয়। তিনি আরও ইঙ্গিত করেছেন যে, যদি কেউ নিজের ওপর ইতিকাফ ওয়াজিব করে নেয় অতঃপর মারা যায়, তবে তার পক্ষ থেকে প্রতিদিনের বিনিময়ে আধা সা' গম খাওয়ানো হবে। কারণ তা পালনের ব্যাপারে চূড়ান্ত অক্ষমতা তৈরি হওয়ার ফলে খাবারের মাধ্যমে কাজা সাব্যস্ত হয়েছে, যেমন সালাত ও রোজার ক্ষেত্রে হয়। সারকথা হলো, যা শারীরিক ইবাদত, অসি (নির্বাহক) তার মৃত্যুর পর প্রতিটি ওয়াজিবের বিনিময়ে সদকায়ে ফিতরের মতো খাবার খাওয়াবে, আর যা আর্থিক ইবাদত যেমন জাকাত...
কোনো একদিন বুঝে নিন। আমি বলি, জীবিতাবস্থায় এবং মৃত্যুর পরবর্তী ফিদয়ার মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে নাসাফী রচিত 'আল-কাফী' গ্রন্থের দলীল অনুযায়ী। সেখানে বলা হয়েছে: কসমের কাফফারা বা হত্যার কাফফারায় লিপ্ত কোনো অসচ্ছল ব্যক্তি যদি রোজা রাখতে অক্ষম হয়, তবে তার জন্য ফিদয়া জায়েজ হবে না; যেমন হজের দমে (রক্ত প্রবাহিত করা) এবং রোজায় অক্ষম মুতামাত্তি ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফিদয়া জায়েজ হয় না। কারণ এখানে রোজা হলো একটি বিকল্প (বাদাল), আর বিকল্পের কোনো বিকল্প হয় না। তবে সেই ব্যক্তি যদি মারা যায় এবং কাফফারা আদায়ের অসিয়ত করে যায়, তবে তার ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ থেকে তা সহীহ হবে। একইভাবে পোশাক প্রদান এবং খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দান (তাবররু) করাও সহীহ। কারণ অসিয়ত ছাড়া দাসমুক্ত করার অর্থ হলো মৃত ব্যক্তির ওপর 'ওয়ালা' (দাসমুক্তির আইনি সম্পর্ক) এর বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া, অথচ পোশাক ও খাবার প্রদানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। - উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
অতএব, তাঁর কথা—'যদি সে মারা যায় এবং কাফফারার অসিয়ত করে তবে তা সহীহ হবে'—এটি উক্ত পার্থক্যের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। এর মাধ্যমেই পরবর্তী সেই কথাটি সুনির্দিষ্ট হয় যে, যা অন্য কিছুর বিকল্প হিসেবে রোজা রাখা হয়, তার ফিদয়া সহীহ নয়। এরপর তাঁর বক্তব্য—'কাফফারার অসিয়ত করা'—এটি কসম এবং হত্যার কাফফারা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে; কারণ দাসমুক্তির অসিয়ত করা সহীহ, যদিও তা স্বেচ্ছায় দান হিসেবে সহীহ নয়। এই কারণেই তিনি পোশাক ও খাবার প্রদানের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দান সহীহ হওয়ার বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করেছেন এবং সেখানে দাসমুক্তির বিষয়টি সহীহ না হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এটি একটি স্পষ্ট আলামত যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কেবল কসমের কাফফারায় স্বেচ্ছায় দান করা, কারণ হত্যার কাফফারায় পোশাক বা খাবার প্রদানের কোনো বিধান নেই।
সুতরাং 'আল-কাফী'র আলোচনা থেকে সারসংক্ষেপ এই দাঁড়াল যে: যে রোজা অন্য কিছুর বিকল্প (যেমন কসম ও হত্যার কাফফারা), সেই রোজায় অক্ষম ব্যক্তি যদি নিজের জীবনদ্দশায় নিজের পক্ষ থেকে ফিদয়া দেয়—উদাহরণস্বরূপ সে অতিবৃদ্ধ হয়ে যায়—তবে উভয় কাফফারার ক্ষেত্রেই তা সহীহ হবে না। কিন্তু সে যদি ফিদয়ার অসিয়ত করে যায়, তবে উভয় ক্ষেত্রেই তা সহীহ হবে। আর যদি তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক (ওয়ালী) স্বেচ্ছায় দান করে, তবে হত্যার কাফফারায় তা সহীহ হবে না; কারণ সেখানে দাসমুক্ত করা ওয়াজিব, আর তা স্বেচ্ছায় দান হিসেবে সহীহ হয় না। তবে কসমের কাফফারার ক্ষেত্রে তা সহীহ হবে, কিন্তু কেবল পোশাক ও খাবারের ক্ষেত্রে, দাসমুক্তির ক্ষেত্রে নয়; যে কারণ আমরা উল্লেখ করেছি। এই مقام বা বিষয়টি এভাবেই বোঝা উচিত।
অতএব এটিকে গনীমত মনে করুন, কেননা এই বিষয়ে অনেকেরই বোঝার পদস্খলন ঘটেছে। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা এভাবেই এটি ব্যক্ত করেছেন, তাঁর ওপর মালিকুস সালামের রহমত বর্ষিত হোক। (আমি বলছি) কিন্তু আল্লামা শেখ ইসমাইল কর্তৃক 'আদ-দুরার' এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে যা উল্লেখ আছে তা নিম্নরূপ: আমি বলি, আল্লাহর তাওফীকে বলছি যে, 'আল-আযমিয়্যাহ' এর লেখকের এখানে ভুল হয়েছে। কারণ হত্যার কাফফারাতেও খাবার খাওয়ানোর বিষয়টি পাওয়া যায় যখন তা অভিভাবকের পক্ষ থেকে হয়, যেমন এই সূরত বা অবস্থায়। কেননা এটি যদিও দাসমুক্তি বা টানা দুই মাস রোজা রাখা, কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি অসিয়ত না করে মারা যায় এবং তার অভিভাবক স্বেচ্ছায় খাবার খাওয়ায়, তবে তা জায়েজ হবে। এমতাবস্থায় খাবার খাওয়ানোই নির্ধারিত হয়ে যায়, কারণ দাসমুক্ত করা তখন সম্ভব নয়; যেহেতু এতে মৃত ব্যক্তির ওপর 'ওয়ালা' এর সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। - উদ্ধৃতি সমাপ্ত। এ বিষয়ে চিন্তা করুন।
'আদ-দুর' গ্রন্থ এবং আমার শ্রদ্ধেয় পিতার (রহমতুল্লাহি আলাইহি) হাশিয়াতে রয়েছে: অতিবৃদ্ধ ব্যক্তি যে রোজা রাখতে অক্ষম, সে রোজা ভঙ্গ করবে এবং ওয়াজিব হিসেবে ফিদয়া দিবে; এমনকি মাসের শুরুতেই যদি সে ফিদয়া দেয় তবে তা হবে। সচ্ছল হলে সদকায়ে ফিতরের মতো প্রতি রোজার বদলে একজন মিসকিনকে দিবে, অন্যথায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এটি তখন হবে যখন রোজাটি মূল ইবাদত হিসেবে তার ওপর অর্পিত হয় এবং সে তা পালনে আদিষ্ট হয়। এমনকি যদি কসম বা হত্যার কাফফারার কারণে তার ওপর রোজা রাখা আবশ্যক হয় এবং সে অক্ষম হয়ে পড়ে, তবে ফিদয়া জায়েজ হবে না; কারণ এখানে রোজা হলো অন্য কিছুর বিকল্প। আর যদি কোনো ব্যক্তি মুসাফির অবস্থায় থাকে এবং স্থায়ী হওয়ার (ইকামত) আগেই মারা যায়, তবে তার ওপর অসিয়ত করা ওয়াজিব হবে না। আর যখনই সে সক্ষম হবে, কাজা আদায় করে নিবে; কারণ অক্ষমতা নিরবচ্ছিন্ন থাকাই হলো বিকল্প (ফিদয়া) গ্রহণের শর্ত।
ফিদয়ার ক্ষেত্রে কি কেবল খাবার খাওয়ানোর অনুমতি দেওয়াই যথেষ্ট? এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে, যার মধ্যে প্রসিদ্ধটি হলো—হ্যাঁ, যথেষ্ট; এবং ইমাম কামাল ইবনুল হুমাম একেই নির্ভরযোগ্য বলেছেন। তাঁর বক্তব্য—'ওয়াজিব হিসেবে ফিদয়া দিবে'—এর কারণ হলো, তার এই ওজর বা অক্ষমতা দূর হওয়ার মতো নয় যে সে পরে কাজা করবে, তাই ফিদয়া ওয়াজিব হয়েছে (নাহর)। (অতঃপর 'আল-কানয' এর ইবারত হলো 'সে ফিদয়া দিবে') এটি এই দিকে ইঙ্গিত করে যে, অন্য কারো ওপর ফিদয়া নেই। কারণ অসুস্থতা বা সফরের মতো ওজরগুলো দূর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই কাজা করা ওয়াজিব হয়।
কাজা করা এবং মৃত্যুর কারণে অক্ষমতার ক্ষেত্রে ফিদইয়ার অসিয়ত করা ওয়াজিব।
তাঁর কথা ‘মাসের শুরুতেই হলেও’: অর্থাৎ এটি আদায় করার ক্ষেত্রে মাসের শুরুতে বা শেষে করার মধ্যে ইখতিয়ার বা পছন্দ করার সুযোগ রয়েছে, যেমনটি ‘আল-বাহর’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কথা ‘ফকিরের সংখ্যা একাধিক হওয়া ব্যতীত’: অর্থাৎ শপথের কাফফারার বিপরীত, কারণ তাতে সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে অকাট্য দলিল (নস) রয়েছে। সুতরাং এখানে যদি কেউ একজন মিসকিনকে দুই দিনের জন্য এক সা’ প্রদান করে তবে তা জায়েজ হবে। তবে ‘আল-বাহর’ গ্রন্থে ‘আল-কুনিয়া’ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে যে, ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) থেকে এ বিষয়ে দুটি বর্ণনা রয়েছে এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এটি জায়েজ হবে না, যেমনটি শপথের কাফফারার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আর ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, যদি একদিনের জন্য আধা সা’ গম একাধিক মিসকিনকে দেওয়া হয় তবে তা জায়েজ হবে। ইমাম হাসান বলেছেন: আমরা এটিই গ্রহণ করি। সমাপ্ত। ‘আল-কোহিস্তানি’ গ্রন্থেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কথা ‘যদি সচ্ছল হয়’: এটি ‘ওয়াজিব হিসেবে ফিদইয়া দেবে’—এই কথার জন্য একটি শর্ত। তাঁর কথা ‘অন্যথায় সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে’: এটি ‘আল-ফাতহ’ এবং ‘আল-বাহর’ গ্রন্থে ‘আজীবন রোজা রাখার মানত’ সংক্রান্ত মাসআলার পরে উল্লেখ করা হয়েছে যখন কেউ জীবিকার কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে রোজা রাখতে পারে না। সুতরাং স্পষ্টত এটি সেই মাসআলার দিকেই ফিরে যায়, এর আগের ‘শায়খে ফানি’ (অতি বৃদ্ধ) সংক্রান্ত মাসআলার দিকে নয়। কারণ শায়খে ফানির পক্ষ থেকে কোনোভাবেই কোনো ত্রুটি বা অবহেলা হয় না। মানতকারীর বিষয়টি ভিন্ন, কারণ সে রোজার পরিবর্তে জীবিকার কাজে লিপ্ত হওয়ায় সম্ভবত তার পক্ষ থেকে এক ধরণের ত্রুটি ঘটে থাকে, যদিও তার জন্য জীবিকা নির্বাহে লিপ্ত হওয়া ওয়াজিব; কেননা এতে নিজের নফসের অংশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিষয়টি অনুধাবনযোগ্য। তাঁর কথা ‘এটি’: অর্থাৎ শায়খে ফানি এবং অনুরূপ ব্যক্তিদের ওপর ফিদইয়া ওয়াজিব হওয়া। তাঁর কথা ‘মূলত নিজে থেকেই’: যেমন রমজান, তার কাজা এবং মানত, যেমনিভাবে আজীবন রোজা মানতকারীর ক্ষেত্রে অতিক্রান্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে যদি কেউ নির্দিষ্ট রোজার মানত করে কিন্তু সে রোজা না রাখা অবস্থায় অতি বৃদ্ধ হয়ে যায়, তবে তার জন্য ফিদইয়া দেওয়া জায়েজ হবে। (বাহর)। তাঁর কথা ‘এমনকি যদি তার ওপর রোজা আবশ্যক হয়...’ ইত্যাদি: এটি পূর্বোক্ত ধারণার (মাফহুম) একটি উপ-শাখা। তাঁর কথা ‘মূলত নিজে থেকেই’: এখানে শপথের কাফফারা এবং হত্যার কাফফারার শর্তারোপ করা হয়েছে ‘জিহার’ এবং ‘ইফতার’ (রোজা ভঙ্গ)-এর কাফফারা থেকে বাঁচার জন্য, যখন কেউ দারিদ্র্যের কারণে গোলাম আজাদ করতে এবং বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হয়; তখন সে ষাট জন মিসকিনকে খাওয়াবে। কারণ এটি নস (অকাট্য দলিল) দ্বারা রোজার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। অথচ শপথের কাফফারার ক্ষেত্রে খাদ্য দান করা রোজার স্থলাভিষিক্ত নয়, বরং রোজাই হলো খাদ্যের স্থলাভিষিক্ত। (সিরাজ)। তাঁর কথা ‘ফিদইয়া জায়েজ হবে না’: অর্থাৎ তার জীবদ্দশায়; তবে যদি সে অসিয়ত করে যায় তবে তা ভিন্ন কথা, যেমনটি পূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁর কথা ‘আর যদি সে হয়’: অর্থাৎ রোজা রাখতে অক্ষম ব্যক্তি। এটি ‘এবং তাকে তা আদায়ের সম্বোধন করা হয়েছে’—এই কথার মাফহুম বা অন্তর্নিহিত অর্থের একটি শাখা। তাঁর কথা ‘অসিয়ত করা ওয়াজিব নয়’: ব্যাখ্যাকারগণ একে ‘বলা হয়েছে যে ওয়াজিব নয়’ বলে ব্যক্ত করেছেন। কারণ শায়খে ফানি বা অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি সহজীকরণের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে ভিন্ন, কঠোরতার ক্ষেত্রে নয়। ‘আল-বাহর’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ বিষয়ে দৃঢ় মত পোষণ করাই উত্তম; কারণ এটি ফকিহগণের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, মুসাফির যদি কাজা আদায়ের সময় না পায় এবং মারা যায় তবে তার ওপর কিছুই বর্তাবে না। সম্ভবত মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্যে এটি স্পষ্টভাবে নেই বলে তারা এ বিষয়ে দৃঢ়তা প্রকাশ করেননি। সমাপ্ত। তাঁর কথা ‘আর যখন সে সামর্থ্যবান হবে’: অর্থাৎ অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি রোজা ভঙ্গ করবে এবং ফিদইয়া দেবে। তাঁর কথা ‘স্থলাভিষিক্ত হওয়ার শর্ত’: অর্থাৎ রোজার ক্ষেত্রে; যার অর্থ হলো ফিদইয়া রোজার স্থলাভিষিক্ত হওয়া। ‘আল-বাহর’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: আমরা ‘রোজা’র শর্তারোপ করেছি তায়াম্মুমকারীকে পৃথক করার জন্য। কেননা তায়াম্মুমকারী যদি পানি ব্যবহারে সক্ষম হয়, তবে তায়াম্মুমের মাধ্যমে আদায়কৃত নামাজ বাতিল হয়ে যায় না। কারণ তায়াম্মুম স্থলাভিষিক্ত হওয়ার শর্ত হলো কেবল পানির অনুপস্থিতি, পানির অনুপস্থিতি স্থায়ী হওয়া শর্ত নয়। তদ্রূপ ইদ্দতের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মাস গণনার শর্ত হলো বার্ধক্যের কারণে রক্ত বন্ধ হওয়া, এটি স্থায়ী হওয়া শর্ত নয়; যাতে করে পুনরায় রক্ত দেখা দিলে পূর্বের সম্পাদিত নিকাহগুলো বাতিল না হয়ে যায়, যেমনিভাবে আমরা ‘হায়েজ’ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। তাঁর কথা ‘প্রসিদ্ধ মত হলো হ্যাঁ’: কারণ যা ‘খাওয়ানো’ (ইত-আম) শব্দে বর্ণিত হয়েছে, তাতে খাবার খাওয়ানো এবং মালিকানা প্রদান—উভয়ই জায়েজ। পক্ষান্তরে যা ‘আদায়’ বা ‘প্রদান’ (ইতা) শব্দে বর্ণিত হয়েছে, তা কেবল মালিকানা প্রদানের জন্যই নির্দিষ্ট।যেমনটি আল-মুদমারাত এবং অন্যান্য কিতাবে উল্লেখ আছে—কূহিস্তানি। আদ-দুররুল মুখতার এবং আমার শ্রদ্ধেয় পিতার হাশিয়াতে যা রয়েছে তা এখানেই সমাপ্ত।
এই কিতাবদ্বয়ে বর্ণিত হয়েছে যে, অসুস্থ অবস্থায় কেউ যদি তার সালাতের ফিদয়া প্রদান করে, তবে তা সহীহ হবে না; যা সাওমের (রোযার) ক্ষেত্রে ভিন্ন। আন-নাতারাখানিয়া কিতাবে আত-তাতিম্মা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় সালাতের ফিদয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, "না, তা বৈধ নয়।" এবং আবু ইউসুফ (র.)-কে অতি বৃদ্ধ (শায়খে ফানি) ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, জীবিত অবস্থায় তার ওপর কি সাওমের মতো সালাতের ফিদয়াও ওয়াজিব হবে? তিনি উত্তরে বললেন, "না"। আল-কুনিয়া কিতাবে বলা হয়েছে: জীবিত থাকা অবস্থায় সালাতের কোনো ফিদয়া নেই, সাওমের বিষয়টি এর ব্যতিক্রম।
আমি (গ্রন্থকার) বলছি, এর কারণ হলো যে দলীলটি (নস) বর্ণিত হয়েছে তা কেবল অতি বৃদ্ধ ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে তার জীবদ্দশায় রোযা ভঙ্গ করবে এবং ফিদয়া দিবে। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তি বা মুসাফির যদি রোযা ভঙ্গ করে, তবে পরবর্তীতে সময় পেলে তার ওপর কাযা করা আবশ্যক হবে; অন্যথায় তার ওপর কিছুই বর্তাবে না। কিন্তু যদি সে সুস্থ সময় পায় এবং রোযা না রাখে, তবে যতটুকু সময় সে সক্ষম ছিল সেই পরিমাণ ফিদয়া প্রদানের অসিয়ত করা তার ওপর আবশ্যক হবে—এটিই ফকীহগণ বলেছেন।
এর মর্মার্থ হলো, অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো জন্য তার জীবদ্দশায় সাওমের ফিদয়া দেওয়ার অবকাশ নেই, কারণ এ বিষয়ে কোনো দলীল নেই; আর সালাতের বিধানও অনুরূপ। সম্ভবত এর কারণ হলো, সামর্থ্য থাকলে তার ওপর কাযা করা আবশ্যক, আর মৃত্যুর মাধ্যমে অক্ষমতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর কোনো ফিদয়া নেই, এমতাবস্থায় সে অসিয়ত করে যাবে। এটি অতি বৃদ্ধ ব্যক্তির বিপরীত, কারণ তার ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগেই সাওম পালন ও তা কাযা করার অক্ষমতা সাব্যস্ত হয়ে যায়, তাই সে জীবদ্দশায় ফিদয়া দেয়। কিন্তু সালাতের ক্ষেত্রে অক্ষমতা সাব্যস্ত হয় না, কারণ সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সালাত আদায় করবে, এমনকি যদি তা কেবল ইশারার (মাথা নেড়ে) মাধ্যমেও হয়। যদি সে তা করতেও অক্ষম হয় এবং সালাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ছয় বা ততোধিক হয়ে যায়, তবে তা তার ওপর থেকে রহিত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সক্ষম হলেও তার কাযা করা আবশ্যক হয় না।
আমরা যা আলোচনা করলাম তা থেকে স্পষ্ট হলো যে, ব্যাখ্যাকারের উক্তি "সাওমের ক্ষেত্রে ভিন্ন"—অর্থাৎ জীবদ্দশায় তার ফিদয়া দেওয়ার সুযোগ থাকা—এটি কেবল অতি বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথেই নির্দিষ্ট। বিষয়টি অনুধাবন করুন।
আত-তানভীর এবং আদ-দুররুল মুখতার কিতাবে রয়েছে: যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে এবং তার জিম্মায় অনাদায়ি সালাত থেকে যায় এবং সে এর কাফফারা আদায়ের অসিয়ত করে যায়, তবে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের জন্য সাদাকায়ে ফিতরের ন্যায় আধা সা' গম প্রদান করতে হবে। বিতর সালাত এবং সাওমের হুকুমও অনুরূপ। আর এই ফিদয়া কেবল তার ত্যাজ্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে প্রদান করা হবে। যদি সে কোনো সম্পদ রেখে না যায়, তবে তার ওয়ারিশ উদাহরণস্বরূপ আধা সা' গম ঋণ নিবে এবং তা কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করবে, অতঃপর দরিদ্র ব্যক্তি তা পুনরায় ওয়ারিশকে দান করবে; এভাবে পর্যায়ক্রমে আবর্তনের মাধ্যমে কাফফারা পূর্ণ করবে। যদি ওয়ারিশরা মৃত ব্যক্তির নির্দেশে তার পক্ষ থেকে কাযা সালাত আদায় করে দেয়, তবে তা জায়েয হবে না; কারণ এটি একটি শারীরিক ইবাদত। হজ্জের বিষয়টি এর ভিন্ন, কারণ তাতে অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করার (নিয়াবাত) অবকাশ রয়েছে। যদি দরিদ্র ব্যক্তিকে আধা সা' এর কম দেওয়া হয় তবে তা জায়েয হবে না, কিন্তু যদি তাকে সম্পূর্ণ অংশ দিয়ে দেওয়া হয় তবে তা জায়েয হবে। অর্থাৎ কসমের কাফফারা, যিহার এবং রোযা ভঙ্গের কাফফারার বিষয়টি এর ভিন্ন।
মুলতাকাল আবহুর-এর মূল পাঠ এবং শাইখিজাদাহ কৃত তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ মাজমাউল আনহুর-এ বলা হয়েছে: (ওয়াজিব হবে) কাযা করা (ততটুকু পরিমাণ যা তাদের থেকে ছুটে গেছে যদি সুস্থ হয়) অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হলে, চাই তা অল্প সময়ের জন্যই হোক। যদি বলা হতো 'সামর্থ্য থাকলে' তবে তা উত্তম হতো, কেননা শর্ত হলো সক্ষমতা, সুস্থতা নয়; আর সক্ষমতা সুস্থতাকে অপরিহার্য করে না, যেমনটি আল-ইসলাহ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। (অথবা মুকিম হলে) অর্থাৎ মুসাফির ব্যক্তি (তার সমপরিমাণ সময়) যা তার থেকে ছুটে গেছে, কারণ তখন অন্যান্য দিনসমূহের সংখ্যা পূর্ণ করার সুযোগ বিদ্যমান থাকে। (অন্যথায়) অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি যদি সক্ষম না হয় এবং মুসাফির যদি তার ছুটে যাওয়া রোযার সমপরিমাণ সময় মুকিম না থাকতে পারে—বরং তারা অসুস্থতা বা সফরের মেয়াদের চেয়ে কম সময় সক্ষমতা পেল বা মুকিম থাকল এবং এরপর মৃত্যুবরণ করল—(তবে সুস্থতা ও মুকিম থাকার সময় অনুযায়ী) কাযা করতে হবে। আর এই পরিমাণ সময়ের কাযা ওয়াজিব হওয়ার ফায়দা হলো ওই পরিমাণ সময়ের ফিদয়া ওয়াজিব হওয়া। এরই ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী বিধান হিসেবে বলা হয়েছে: (তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক খাদ্য দান করবে)। এখানে অভিভাবক বলতে তাকেই বোঝানো হয়েছে যার মৃত ব্যক্তির সম্পদের ওপর হস্তক্ষেপের অধিকার রয়েছে, ফলে এটি অসিয়ত বাস্তবায়নকারীকেও অন্তর্ভুক্ত করে। (প্রতিদিনের জন্য সাদাকায়ে ফিতরের ন্যায়) অর্থাৎ ওয়ালীর ওপর ওয়াজিব হলো তাদের থেকে ছুটে যাওয়া রোযার দিনগুলোর ফিদয়া হিসেবে সাদাকায়ে ফিতরের সমপরিমাণ খাদ্য বা তার মূল্য আদায় করা। যদি ছুটে যায়...
অসুস্থতা বা সফরের কারণে যদি উদাহরণস্বরূপ পাঁচ দিনের রোজা বাদ যায় এবং এরপর তিনি কাজা করা ব্যতিরেকেই পাঁচ দিন জীবিত থাকেন, অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার ওপর পাঁচ দিনের ফিদইয়া প্রদান করা আবশ্যক। আর যদি পাঁচ দিন বাদ যায় এবং তিনি মাত্র তিন দিন জীবিত থাকেন, তবে কেবল তিন দিনের ফিদইয়া প্রদান করতে হবে। (এবং আবশ্যক) অর্থাৎ ওয়ারিশের জন্য খাবার খাওয়ানো ওয়াজিব (এক-তৃতীয়াংশ থেকে) যদি তার কোনো ওয়ারিশ থাকে, অন্যথায় সম্পূর্ণ সম্পদ থেকে; (যদি অসিয়ত করে) মৃত ব্যক্তি। আর এতে প্রতীয়মান হয় যে, যদি তার সম্পদ থাকে তবে অসিয়ত করা ওয়াজিব, যেমনটি 'মুনিয়া' গ্রন্থে রয়েছে। এটি কেবল অসুস্থ বা মুসাফিরের সাথে সুনির্দিষ্ট নয়, বরং এতে সেই ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত হবে যে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করেছে এবং তার ওপর কাজা ওয়াজিব হয়েছিল, অথবা কোনো ওজরের কারণে। অনুরূপভাবে প্রতিটি শারীরিক ইবাদতের ক্ষেত্রেও একই বিধান। (অন্যথায়) অর্থাৎ যদি অসিয়ত না করে থাকে, (তবে আবশ্যক নয়) আমাদের মতে ওয়ারিশদের জন্য; কারণ এটি একটি ইবাদত, তাই এতে মৃত ব্যক্তির নির্দেশের প্রয়োজন রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর মত এর ভিন্ন। (আর যদি স্বেচ্ছায় প্রদান করে) স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি (তা) অর্থাৎ অসিয়ত ছাড়াই খাবার খাওয়ানোর কাজ সম্পাদন করে, (তবে তা সহিহ হবে) এবং সে এর সওয়াব পাবে। জাকাতের ক্ষেত্রেও এই একই মতভেদ বিদ্যমান। (এবং সালাত) চাই তা ফরজ হোক বা ওয়াজিব—যেমন বিতর; এটি ইমাম আবু হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর অভিমত অনুযায়ী। আর সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর মতে বিতর সুন্নাতের ন্যায়, এর জন্য অসিয়ত করা ওয়াজিব নয়, যেমনটি 'জাওহারা' গ্রন্থে রয়েছে। (রোজার ন্যায় এবং প্রত্যেক সালাতের ফিদইয়া একদিনের রোজার ন্যায়) অর্থাৎ একদিনের রোজার ফিদইয়ার মতো, (এটিই সহিহ মত)। এটি সেই উক্তির খণ্ডন যাতে বলা হয়েছে যে, দিন ও রাতের সালাতের ফিদইয়া একদিনের রোজার সমান হবে যদি ব্যক্তি অভাবী হয়। মুহাম্মদ ইবনে মুকাতিল (রহমতুল্লাহি আলাইহি) প্রথমে অভাবী হওয়ার শর্ত ছাড়াই এই কথা বলেছিলেন, কিন্তু পরে তা থেকে ফিরে এসেছেন। আর কিয়াস হলো সালাতের পরিবর্তে ফিদইয়া জায়েজ না হওয়া, এবং বালখি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এই মতই গ্রহণ করেছেন। এতে এই দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যদি কেউ নফসের আনুগত্য ও শয়তানের প্রতারণায় পড়ে সালাত আদায়ে অবহেলা করে, অতঃপর জীবনের শেষ প্রান্তে লজ্জিত হয়ে ফিদইয়ার অসিয়ত করে, তবে তা যথেষ্ট হবে না। তবে 'মুসতাসফা' গ্রন্থে এর যথেষ্ট হওয়ার স্বপক্ষে দলিল রয়েছে। এবং এতে আরও ইঙ্গিত রয়েছে যে, যদি মৃত ব্যক্তি সালাত ও রোজার ফিদইয়ার অসিয়ত না করে যায় এবং তার ওয়ারিশ স্বেচ্ছায় তা প্রদান করে, তবে তা জায়েজ হবে। এতে কোনো দ্বিমত নেই যে এটি একটি উত্তম কাজ, যার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে। আর দাফনের পূর্বেই ফিদইয়া আদায় করা উচিত, যদিও দাফনের পরে আদায় করা জায়েজ; যেমনটি 'কুহিস্তানি' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। (এবং তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক রোজা রাখবে না এবং সালাতও পড়বে না) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীর কারণে—"কেউ যেন অন্য কারো পক্ষ থেকে রোজা না রাখে এবং কেউ যেন অন্য কারো পক্ষ থেকে সালাত আদায় না করে, বরং সে যেন খাবার খাওয়ায়"। ইমাম শাফেয়ি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর মত এর ভিন্ন। যখন আপনি বিষয়টি অবগত হলেন, তখন জেনে রাখুন যে, কোনো ভিনদেশি বা অপরিচিত ব্যক্তি যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় ফিদইয়া প্রদান করে, তবে তা যথেষ্ট হবে না; কারণ ফকিহগণের বক্তব্যে 'অভিভাবক' (ওয়ালি) শব্দটি নিঃশর্তভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর আপনি জেনেছেন যে, অভিভাবক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—যার অসিয়ত বা উত্তরাধিকারসূত্রে মৃত ব্যক্তির সম্পদ ব্যবহারের কর্তৃত্ব রয়েছে। তাদের বক্তব্য থেকে এটিই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, যেমনটি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা 'আদ-দুরর' এর টিকা এবং 'শিফাউল আলিল' গ্রন্থে সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন। আর আমি 'ফকিহে নফস' আল্লামা শুরুনবুলালি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ব্যতীত অন্য কাউকে কোনো অপরিচিত ব্যক্তির স্বেচ্ছায় ফিদইয়া প্রদানের বিষয়টিকে বৈধ বলতে দেখিনি। আল্লামা শেখ ইসমাইল (রহমতুল্লাহি আলাইহি) 'আদ-দুরার' এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের জানাজা অধ্যায়ে তার অনুসরণ করেছেন, যদিও তিনি এটি কারো উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করেননি। কিন্তু অন্যান্য সকল কিতাবের মূল পাঠ, ব্যাখ্যা এবং টীকাসমূহে স্পষ্টভাবে 'অভিভাবক' শব্দের উল্লেখ রয়েছে, যা দৃশ্যত একটি সতর্কতামূলক শর্ত। এমনটি বলা যাবে না যে, এটি কেবল একটি প্রাসঙ্গিক বা اتفاقي (ইত্তিফাকি) শর্ত; কারণ এই জাতীয় বিষয়ে নিছক যুক্তিনির্ভর মতামত প্রদান করা হয় না। বিশেষত ইমাম মুহাম্মদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) সেই ব্যক্তির ব্যাপারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, যার ওপর রমজানের কাজা রয়েছে কিন্তু বার্ধক্যের কারণে সে সক্ষম নয়, তার পক্ষ থেকে অসিয়ত ছাড়াও ওয়ারিশদের জন্য খাবার খাওয়ানো জায়েজ হবে, যেমনটি অচিরেই তার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যে আসবে। যতক্ষণ না তাদের কোনো দলিল পাওয়া যাচ্ছে যারা বিষয়টি সাধারণভাবে বৈধ বলেছেন—যদিও তারা পরবর্তী যুগের নির্ভরযোগ্য আলেমদের অন্তর্ভুক্ত হন (আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন)—ততক্ষণ পর্যন্ত তা মাজহাবের কিতাবসমূহের প্রকাশ্য বক্তব্যের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষত যখন নস বা মূল পাঠে কেবল ওয়ারিশদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমনটি আপনি দেখেছেন ও শুনেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে সতর্কতা হলো—ফিদইয়া প্রদানের এই দায়িত্বটি যেন অভিভাবকই সরাসরি আঞ্জাম দেন।
দায়মুক্ত হওয়ার জন্য; যদি সে এটি ভালোভাবে করতে না পারে, তবে তার পাশে এমন কেউ বসবে যে এটি ভালো জানে এবং তাকে শিখিয়ে দেবে, যাতে অভিভাবকই সরাসরি কাজটি সম্পাদনকারী হন। আমাদের নেতা ইমাম মুহাম্মদ 'আল-জিয়াদাত' গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যার ওপর রমজানের কাজা রয়েছে, সে যদি বার্ধক্যের কারণে অক্ষম হয়, তবে তার জন্য ফিদিয়া দেওয়া জায়েজ। কারণ এটি নিজেই একটি মূল বিধান। যদি সে মারা যায় এবং তার পক্ষ থেকে অন্নদান করার অসিয়ত করে যায়, অথবা ওয়ারিশরা অসিয়ত ছাড়াই তার পক্ষ থেকে অন্নদান করে, তবে ইনশাআল্লাহ তা যথেষ্ট হবে। ইমাম আল-ইত্তাবি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, 'আল্লাহর ইচ্ছা' (ইনশাআল্লাহ) কথাটি উভয় বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এখানে যথেষ্ট হওয়াকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে কারণ এ বিষয়ে কোনো সরাসরি দলিল (নস) নেই। একইভাবে মাশায়েখগণ সালাতের ফিদিয়ার ক্ষেত্রেও একে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর স্থগিত রেখেছেন যখন ফিদিয়ার অসিয়ত করা হয়। কারণ তারা সতর্কতাবশত সালাতকে রোজার সাথে সংযুক্ত করেছেন, এই সম্ভাবনার ভিত্তিতে যে রোজার ক্ষেত্রে দলিলটি অক্ষমতার কারণে হতে পারে। ফলে সেই কারণটি সালাতকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। আর যদি এটি কারণযুক্ত না হয়, তবে ফিদিয়া হবে একটি প্রাথমিক নেক আমল যা গুনাহ মোচনে সহায়ক হতে পারে। ফলে এতে একটি অস্পষ্টতা থেকে যায়, যেমনটি রোজার ফিদিয়ার অসিয়ত না করলেও অভিভাবক তার পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় তা আদায় করতে পারেন বলে আমাদের ওলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করেছেন।
এটি আমার শ্রদ্ধেয় পিতার সেই উক্তিকেই সমর্থন করে যে, 'অভিভাবক' (ওয়ালি) দ্বারা সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এটি কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে শুদ্ধ হবে না। এর সদৃশ মাসয়ালা হলো ফরয হজের ক্ষেত্রে যা তারা বলেছেন: যদি কেউ ফরয হজের অসিয়ত করে এবং ওয়ারিশ তার পক্ষ থেকে হজের খরচ বহন করে, তবে তা জায়েজ হবে না। আর যদি অসিয়ত না করে এবং ওয়ারিশ নিজেই হজ করে বা অন্য কাউকে দিয়ে হজ করায়, তবে ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, ইনশাআল্লাহ তা যথেষ্ট হবে। এর ভিত্তি হলো খাসআমিয়া গোত্রের মহিলার বর্ণিত হাদিস, যেখানে হজকে মানুষের ঋণের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এতে আরও আছে যে, যদি ওয়ারিশ অসিয়ত ছাড়াই ঋণ পরিশোধ করে তবে তা যথেষ্ট হয়, এখানেও তেমনি হবে। 'আল-মাবসুত' গ্রন্থে আছে: ওয়ারিশদের আদায়ের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির ওপর থেকে ইসলামের হজ (ফরয হজ) রহিত হওয়ার বিষয়টি জ্ঞানের (ইলম) পথ নির্দেশ করে; কারণ এটি তার এবং তার প্রতিপালকের মধ্যকার একটি বিষয়। এজন্যই এর বৈধতাকে 'ব্যতিক্রম' (ইনশাআল্লাহ বলা) দ্বারা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এটি 'আল-বাহর' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রকাশ্য অর্থ হলো, যদি ওয়ারিশ ছাড়া অন্য কেউ স্বেচ্ছায় এটি করে, তবে তা যথেষ্ট হবে না, যদিও মৃত ব্যক্তি এর সওয়াব পাবেন। অনুরূপ কথা 'শিফাউল আলীল' গ্রন্থেও রয়েছে।
তাতে আরও আছে: যদি আপনি বলেন যে, হাদিসে ঋণের সাথে তুলনা করার অর্থ হলো 'ওয়ারিশ' হওয়া কোনো শর্ত নয়, কারণ অপরিচিত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করলেও তা আদায় হয়ে যায়। আমি বলব: আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো মূল বৈধতার ক্ষেত্রে তুলনা করা, সব দিক থেকে নয়। অন্যথায়, ঋণ তো পুরো সম্পদ থেকেই পরিশোধ করা ওয়াজিব, যদিও সে অসিয়ত না করে। কিন্তু আমাদের নিকট হজের বিধান তেমন নয়; কারণ অসিয়ত করা ছাড়া এটি ওয়াজিব হয় না এবং তা সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি থেকে আদায় করা হয় না। কেননা হজ একটি ইবাদত এবং এতে ইচ্ছার (নিয়তের) প্রয়োজন রয়েছে। পক্ষান্তরে বান্দার হকের ক্ষেত্রে পাওনাদারের কাছে সম্পদ পৌঁছানোই মূল উদ্দেশ্য, অন্য কিছু নয়। তাই সব দিক থেকে তুলনা করা ঠিক নয় এবং আপনার তোলা আপত্তিটি জরুরি নয়।
হ্যাঁ, পরবর্তীকালের কিছু আলেমের আলোচনায় আমাদের এই মাসয়ালায় 'ওয়ারিশ বা তার প্রতিনিধি' শব্দগুলো এসেছে। তবে আমরা পূর্বে যা আলোচনা করেছি তার দাবি হলো এটি শুদ্ধ হবে না। কারণ প্রতিনিধি যখন দরিদ্র ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ দান হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেটি প্রতিনিধির মালিকানাধীন হয়ে যায়, ওয়ারিশের নয়। ফলে পুনরায় দরিদ্রকে তা প্রদানের মাধ্যমে সে একজন অপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে নিজের সম্পদ থেকে দানকারী সাব্যস্ত হয়। তবে যদি তাকে প্রতিবারই দান করা এবং দান গ্রহণ করার জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়, তবে ভিন্ন কথা। আর তার এই কথা: "আমি তোমাকে আমার পিতার রোজা বা সালাতের ফিদিয়া আদায়ের জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম", এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে এটি যথেষ্ট। কারণ তার উদ্দেশ্য হলো দান করা এবং দান গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটি বারবার সম্পন্ন করা যতক্ষণ না তা পূর্ণ হয়। আবার এও বলা যেতে পারে যে, স্পষ্ট করে না বলা পর্যন্ত এটি যথেষ্ট নয়। কারণ সাধারণ ওয়ারিশরা জানে না যে এই সম্পদ তাদের নিজস্ব হওয়া আবশ্যক, যাতে তারা এটিও খেয়াল রাখে যে সে দান গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের প্রতিনিধি। এমনকি অনেক সাধারণ মানুষ জানেই না যে প্রতিনিধি আসলে কী করছে, বিশেষ করে মহিলারা। হ্যাঁ, যদি আমরা বলি যে অভিভাবকের শর্তটি অপরিহার্য নয়—যা তাদের বক্তব্যের প্রকাশ্য অর্থের পরিপন্থী—বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো কেবল ফিদিয়া আদায় সম্পন্ন হওয়া (তবে বিষয়টি ভিন্ন)।
(আমি বলছি) আর তার কথা "যদি তুমি বল..." ইত্যাদি প্রসঙ্গে বলব: ফকীহগণের ভাষ্যসমূহের সীমাবদ্ধতা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং 'ওয়ালী' বলতে যা প্রথমে বুঝে আসে—অর্থাৎ অসিয়ত বা উত্তরাধিকার সূত্রে যার কোনো কিছু পরিচালনা করার কর্তৃত্ব রয়েছে—তা অন্য সকলকে নাকচ করে দেয়। যারা এই দুই মহান ইমাম ব্যতীত অন্য ইমামগণের অনুসৃত মাযহাবের কিতাবসমূহ এবং তাহতাবীর হাশিয়া মনোযোগ দিয়ে গভীর অভিনিবেশ সহকারে অনুসন্ধান করবেন, তাদের নিকট এটি স্পষ্ট হবে। যদিও তারা যা উল্লেখ করেছেন সে বিষয়ে মাযহাবের কিতাবসমূহের কোনো উদ্ধৃতির ওপর নির্ভর করেননি। সম্ভবত এটি মাযহাবে অন্য কোনো মত বা বর্ণনা। অতএব কেউ যদি এ বিষয়ে অন্য কিছু দেখে থাকে তবে সে যেন তা প্রকাশ করে, তার জন্য মহাদানশীল বাদশাহর (আল্লাহর) নিকট সওয়াব রয়েছে।
আর তার কথা "হ্যাঁ, আমাদের মাসআলায় কোনো কোনো পরবর্তী যুগের আলিমের বক্তব্যে 'ওয়ারিশ বা তার উকিল' শব্দদ্বয় এসেছে"—তাদের বক্তব্যের বাহ্যিক দাবি হলো যে, এটি সহীহ নয়। অর্থাৎ দাওরের (আবর্তন) দ্বিতীয় পর্যায়ে, যখন সে তার হাতে থাকা সম্পদ প্রদান করল এবং পুনরায় তা দান হিসেবে চেয়ে নিল, তখন ওকালাত (প্রতিনিধিত্ব) শেষ হয়ে গেল এবং সে অপসারিত হয়ে গেল। কারণ যে কাজের জন্য তাকে উকিল বানানো হয়েছিল তা সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে ওকালাত সমাপ্ত হয়েছে, তার হাত থেকে সম্পদ নিঃশেষ হয়েছে এবং সে এখন একজন ভিনদেশি বা সম্পর্কহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় দরিদ্র ব্যক্তির কাছ থেকে সে যা পুনরায় দান হিসেবে গ্রহণ করেছে তা তার নিজের সম্পদে পরিণত হয়েছে। তবে শর্ত হলো, যদি সে তাকে 'দাওরিয়া' ওকালাত (চক্রাকার প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করে যে, যখনই সে অপসারিত হবে তখনই সে দাওর এবং ইসকাতের ক্ষেত্রে উকিল হিসেবে গণ্য হবে—কিন্তু তা পুনরায় দান চাওয়ার ক্ষেত্রে নয়, যা আপনার সামনে আলোচিত হবে।আর তার কথা "তবে যদি সে তাকে দান করার (দরিদ্রকে প্রদান) এবং পুনরায় দান চাওয়ার (দরিদ্রের নিকট থেকে নিয়োগদাতার জন্য) উকিল নিযুক্ত করে"—তবে পুনরায় দান চাওয়ার ক্ষেত্রে উকিল নিযুক্ত করার বিষয়ে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা (আল্লাহ তার ওপর রহম করুন) 'রদ্দুল মুহতার'-এ সুদের অধ্যায়ের ঠিক আগে 'আদ-দুর' এর ভাষ্যের নিকট যা বর্ণনা করেছেন তার সারমর্ম হলো: ঋণ গ্রহণের জন্য উকিল নিযুক্ত করা সহীহ নয়। 'কুনিয়া'র বক্তব্য: "ঋণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে"—এটি স্পষ্টভাবে বর্ণিত। 'জামেউল ফুসুলাইন'-এ রয়েছে: কেউ একজনকে তার জন্য ঋণ গ্রহণ করতে পাঠাল, সে তাকে ঋণ দিল এবং তা তার হাতে থাকাবস্থায় নষ্ট হয়ে গেল। এখন যদি সে বলে যে, "প্রেরণকারীর জন্য ঋণ দাও", তবে প্রেরণকারী দায়ী হবে। আর যদি সে বলে যে, "প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে আমাকে ঋণ দাও", তবে প্রেরিত ব্যক্তি নিজে দায়ী হবে। মূলকথা হলো, ঋণ প্রদানের জন্য উকিল নিযুক্ত করা জায়েজ, কিন্তু ঋণ গ্রহণের জন্য নয়। তবে ঋণ গ্রহণের জন্য কাউকে সংবাদবাহক বানানো জায়েজ। যদি ঋণ গ্রহণের উকিল তার বক্তব্যকে 'সংবাদ' হিসেবে পেশ করে, তবে ঋণ আদেশদাতার জন্য গণ্য হবে। আর যদি ওকালাতের ঢঙে নিজের দিকে সম্বন্ধ করে পেশ করে, তবে তা উকিলের জন্য গণ্য হবে এবং উকিলের জন্য তা তার আদেশদাতাকে দিতে অস্বীকার করার অধিকার থাকবে। —সমাপ্ত।
আমি বলি: পার্থক্য হলো, যখন সে চুক্তিকে নিয়োগদাতার দিকে সম্বন্ধ করবে এই বলে যে, "অমুক ব্যক্তি আপনার কাছে আবেদন করছে যেন আপনি তাকে এত পরিমাণ ঋণ দেন" অথবা বলল "অমুকের জন্য আমাকে এত পরিমাণ ঋণ দিন", তবে তা নিজের জন্য হবে এবং তার "অমুকের জন্য" কথাটি "তার স্বার্থে" অর্থে গণ্য হবে। আলিমগণ বলেছেন, ঋণ গ্রহণের জন্য উকিল নিযুক্ত করা সহীহ নয় কারণ এটি এক প্রকার ভিক্ষাবৃত্তির জন্য উকিল নিযুক্ত করা, যা সহীহ নয়।
আমি বলি: এর কারণ হলো ঋণ প্রাথমিকভাবে একটি অনুদান ও সৌজন্যমূলক কাজ, তাই তা সরাসরি ঋণ গ্রহণকারীর জন্যই সাব্যস্ত হবে। কেননা এতে প্রতিনিধিত্ব সহীহ নয়। এটি এক প্রকারের ভিক্ষাবৃত্তি বা অভাব প্রকাশের মতো। এটিই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। —সমাপ্ত।
আর আমি 'কুররাতু উয়ুনিল আখইয়ার' (রদ্দুল মুহতারের পরিশিষ্ট) গ্রন্থে আমার শ্রদ্ধেয় পিতার আলোচনা হতে যা উল্লেখ করেছি তার সারমর্ম হলো: যে বিষয়গুলো 'ইসকাত' বা কোনো দায় মুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট, সেখানে উকিল তা নিজের দিকে সম্বন্ধ করবে এবং সাথে নিয়োগদাতার নামও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবে। যেমন সে বলবে: "আমি অমুককে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম" অথবা "অমুকের বিরুদ্ধে তোমার যে দাবি ছিল সে বিষয়ে আমি তোমার সাথে সন্ধি করলাম"।
সম্পদ বা রক্তের ক্ষেত্রে, তবে যে বিষয়গুলোতে কোনো বস্তু বা উপযোগের মালিকানা প্রদান অথবা কোনো কিছু সংরক্ষণ করা উদ্দেশ্য, সেখানে প্রতিনিধি বিষয়টিকে নিজের দিকে সম্পর্কিত করবে না, বরং মুয়াক্কিল (মক্কেল)-এর দিকে সম্পর্কিত করবে। যেমন তার এই কথা বলা: "অমুককে এতটুকু দান করো" বা "তার নিকট এতটুকু আমানত রাখো" বা "তাকে এতটুকু ঋণ দাও"। এক্ষেত্রে তার বক্তব্যকে বার্তার (রিসালাত) আঙ্গিকে পেশ করা আবশ্যক। সুতরাং "আমাকে এতটুকু দান করো" বলা সহিহ হবে না, যেমনটি ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে "অমুকের জন্য আমাকে দান করো" বা "অমুকের পক্ষ হতে আমার নিকট আমানত রাখো" বলাও শুদ্ধ নয়।
* আর এরই ভিত্তিতে ফকিহগণের বক্তব্য হলো—ঋণ গ্রহণের প্রতিনিধি নিয়োগ বাতিল; এর অর্থ হলো এটি প্রকৃতপক্ষে একটি বার্তা বহন (রিসালাত), প্রতিনিধিত্ব (ওকালাত) নয়। সুতরাং সে যদি কথাটিকে প্রতিনিধিত্বের আঙ্গিকে ব্যক্ত করে তবে তা সহিহ হবে না; বরং আমরা যেমন বলেছি, এটিকে বার্তার আঙ্গিকে ব্যক্ত করা আবশ্যক।
* এর দ্বারা অবগত হওয়া গেল যে, বিষয়টি কেবল ঋণ গ্রহণের সাথে খাস নয়; বরং প্রত্যেক সেই বিষয় যা মালিকানা প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্ট, যেখানে প্রতিনিধি মালিকানা অর্জন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির পক্ষ হতে নিযুক্ত হয়, মালিকানা প্রদানকারীর পক্ষ হতে নয়। সুতরাং ঋণ দেওয়া এবং ধারে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ সহিহ, কিন্তু ঋণ গ্রহণ এবং ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ সহিহ নয়; বরং তা বার্তা বহন। আমার নিকট বিষয়টি এভাবেই প্রতিভাত হয়েছে, অতএব এটি গভীরভাবে চিন্তা করো। সমাপ্ত।
* যখন আপনি এটি জানলেন, তখন আপনার নিকট স্পষ্ট হলো যে, দান প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ সহিহ নয়। দান প্রার্থনার প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে তিনি যা উল্লেখ করেছেন, তা বার্তা বহনের ওপর নির্ভরশীল, অথবা প্রতিনিধি তার বক্তব্যকে বার্তার আঙ্গিকে পেশ করবে। যদি সে কথাটিকে বার্তার আঙ্গিকে পেশ না করে, তবে সে নিজেই এর মালিক হয়ে যাবে। আর যখন সে নিজেই মালিক হয়ে গেল এবং তা কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে প্রদান করল, তখন সেটি মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে কোনো অসম্পর্কিত ব্যক্তির পক্ষ হতে প্রদান বলে গণ্য হবে। ফলে আমরা সেই বিষয়েই নিপতিত হব যা থেকে আমরা সতর্ক করেছিলাম।
* আর তার বক্তব্য: "আমি তোমাকে আমার পিতার সিয়াম বা নামাজের ফিদিয়া আদায়ের জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম" ইত্যাদি—এর উত্তরে আমি বলব: প্রতিনিধি নিয়োগের এই পদ্ধতির পরিবর্তে আমরা ইতিপূর্বে যে বৃত্তাকার প্রতিনিধিত্ব উল্লেখ করেছি, তা যথেষ্ট হবে।
* আর তার বক্তব্য দান প্রার্থনা সম্পর্কে; আপনি জেনেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিনিধি তার বক্তব্যকে বার্তার আঙ্গিকে পেশ করা যেন তা সহিহ হয়, অথবা তাকে একজন বার্তাবাহক হিসেবে গণ্য করা; আর এটিই এর ব্যাখ্যা।
* আর তার এই বক্তব্য যে, "বলা হয় এটি যথেষ্ট নয়" ইত্যাদি—এর অর্থ হলো এটিই অধিকতর সতর্কতামূলক, বিশেষ করে এ জাতীয় বিষয়ে। বিশেষত তার এই বক্তব্য শোনার পর যে: "অধিকতর সতর্কতামূলক হলো অভিভাবক নিজেই তা সম্পাদন করবেন", যদিও সাধারণ প্রতিনিধিত্বও যথেষ্ট হতে পারে। এটি এভাবে যে, অভিভাবক তাকে মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থাকা আল্লাহর সমস্ত হক এবং বান্দার সেইসব হক—যার পাওনাদার অজ্ঞাত—তা আদায়ের জন্য সেই মালের মাধ্যমে বৃত্তাকার প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবে যা সে তাকে দিয়েছে, এবং তাকে তার পক্ষ হতে দান গ্রহণের ক্ষেত্রে বার্তাবাহক নিযুক্ত করবে।
* হ্যাঁ, অভিভাবক যদি অজ্ঞ হন, তবে সে অবস্থায় ইলম ও নেককার ব্যক্তিদের মধ্য হতে এমন কাউকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করা আবশ্যক যিনি আমাদের উল্লিখিত এবং সামনে উল্লেখ করা পদ্ধতির আলোকে এই সমস্ত বিষয় উপলব্ধি করতে সক্ষম। বরং মৃত ব্যক্তির জিম্মা থেকে দায়মুক্ত করতে এবং জবাবদিহিতা হতে নিষ্কৃতি পেতে এ জাতীয় প্রতিনিধি নির্দিষ্ট করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, ইনশাআল্লাহ।
* আর তার এই বক্তব্য: "হ্যাঁ, যদি আমরা বলি যে অভিভাবকের সাথে সীমাবদ্ধ করা আবশ্যক নয়"—তবে এটি প্রতিপক্ষের সাথে একমত হওয়ার খাতিরে বলা হয়েছে, যদি তার দাবির সপক্ষে কোনো বর্ণনা থাকত। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তার নিজের সম্পদ থেকে বা তার অনুমতিক্রমে অন্যের সম্পদ থেকে আদায় সম্পন্ন হওয়া। তবে অভিভাবকের সাথে সীমাবদ্ধ করা আবশ্যক নয়—এমন অনুমিত শর্তে উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনোটিই আবশ্যক হবে না। অন্যথায় যেহেতু এটি সাধারণ বোধগম্য বিষয়ের বিপরীত এবং ফকিহগণের বক্তব্যের সুস্পষ্ট ভাষ্যের পরিপন্থী, তাই বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে।
* আর তার এই বক্তব্য: "আমাদের বর্তমান সময়ের জনৈক শাইখ থেকে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি এটিকে আবশ্যক বলতেন"—এটিই সেই বিষয় যা মাড়ির দাঁত দিয়ে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা উচিত এবং একেই নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
* আর তার এই কথা যে "তাদের কেউ কেউ এর ওপর আপত্তি করেছেন"—এর দ্বারা বাহ্যত প্রতীয়মান হয় যে, সেই ব্যক্তি আল্লামা শুরুনবুলালি থেকে বর্ণিত মতের প্রতি লক্ষ্য করেছেন। আর তার এই বক্তব্য এর প্রমাণ বহন করে যে, "মনে হচ্ছে প্রত্যেকেই আমাদের অতিক্রান্ত আলোচনার কোনো একটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করেছেন এবং লুবাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মোল্লা আলী কারী যে সাধারণ অর্থ গ্রহণ করেছেন তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন; যেখানে মূল লেখক উত্তরাধিকারীর সাথে সীমাবদ্ধ করার পর মোল্লা আলী কারী তার ব্যাখ্যায় এটিকে ব্যাপক করে বলেছেন: উত্তরাধিকারী এবং উত্তরাধিকারী ছাড়া অন্য ব্যক্তি।"
এতে রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানি) ওয়াজিব, তবে তা তার নির্ধারিত সময়ের জন্য, যা হলো নাহরের (কুরবানির) দিনসমূহ এবং তা অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর সজদাহ তিলাওয়াতের জন্য সতর্কতাস্বরূপ সদকাতুল ফিতরের ন্যায় অর্ধেক সা' গম প্রদান করবে, যদিও সঠিক মত হলো এটি ওয়াজিব নয়, যেমনটি তাতারখানিয়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর উশরি (দশমাংশীয়) ভূমির ক্ষেত্রে উশর এবং খরাজি (খাজনাভুক্ত) ভূমির ক্ষেত্রে খরাজ প্রদান করবে, যেমনটি নিজ স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আর হারাম ও ইহরামের বিরুদ্ধাচরণের অপরাধের (জিনায়াত) জন্য যা রক্ত (কুরবানি) বা সদকা ওয়াজিব করে, তার পরিবর্তে অর্ধেক সা' বা তার কম প্রদান করবে। এক্ষেত্রে তা আদায় করার সময় উল্লেখ করা আবশ্যক, যেমন বলা হবে যে, "হারাম বা ইহরামের অপরাধের বিনিময়ে এটি গ্রহণ করুন।" আর এমন হক বা অধিকারসমূহের জন্য প্রদান করবে যার পাওনাদার অজ্ঞাত, কারণ সেই পরিমাণ অর্থ সদকা করা ওয়াজিব। এরপর অবশিষ্ট সমস্ত আর্থিক অধিকারের পক্ষ থেকে তা আদায় করবে, অতঃপর সমস্ত শারীরিক অধিকারের পক্ষ থেকে আদায় করবে। তারপর নফল ইবাদত অধিক পরিমাণে করবে যাতে নেক আমল বৃদ্ধি পায়, যার মাধ্যমে (কিয়ামতের দিন) বিপক্ষীয়রা সন্তুষ্ট হবে। এরপর সেই সম্পদ থেকে কিছু অংশ প্রদান করবে যাতে প্রত্যেক দরিদ্র ব্যক্তি সন্তুষ্ট হয়, অর্থাৎ তাকে এমন কিছু দেবে যাতে তার মন খুশি হয়; আর এটি দরিদ্রদের মর্যাদা এবং যাদের জন্য ইসকাত (দায়মুক্তি) করা হচ্ছে তাদের মর্যাদার ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়। আর এটি জানা কথা যে, যার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী আছে তার ওসিয়ত কার্যকর হওয়া কেবল এক-তৃতীয়াংশ (সম্পদ) থেকে হয়ে থাকে। ফকীহগণ বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তির নামাজের সমস্ত কাফফারা একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে প্রদান করা হয় তবে তা জায়েজ হবে; আর এই কাফফারাটিই 'ইসকাতে সালাত' (নামাজের দায়মুক্তি) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই সবকিছু ছিল নামাজের ক্ষেত্রে; রোজার বিধানও পূর্বোক্ত আলোচনার অনুরূপ, তবে পার্থক্য এই যে, একদিনের রোজা একটি ফরজ নামাজের সমতুল্য। সুতরাং প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে অর্ধেক সা' গম, অথবা গমের আটা বা ছাতু, অথবা এক সা' যব, খেজুর বা কিশমিশ প্রদান করা হবে। আর এর ফলে রোজার কাফফারা নামাজের কাফফারার তুলনায় অনেক কম হয়ে থাকে। সেখানে আরও একটি পার্থক্য রয়েছে, আর তা হলো—ব্যক্তি নিজে নিজের নামাজের কাফফারা আদায় করতে পারবে না যেমনটি পূর্বে গত হয়েছে; বরং এটি কেবল তার মৃত্যুর পর ওসিয়তের মাধ্যমেই সহীহ হবে। রোজার বিষয়টি এর বিপরীত; কেননা ব্যক্তি নিজেই নিজের রোজার কাফফারা আদায় করতে পারে যদি সে এমন অসুস্থ হয় যার সুস্থতার ব্যাপারে নিরাশ হওয়া গেছে, যদিও সে অতি বৃদ্ধ (ফানি) না হয়; অথবা যদি সে চিরকাল রোজা রাখার মানত করে কিন্তু তা পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফকীহগণ বলেছেন, এর মূল ভিত্তি হলো অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি (শায়খে ফানি), তার জন্য প্রতি বছর ফিদিয়া প্রদান করা জায়েজ; তবে যদি সে পরবর্তীতে রোজা রাখতে সক্ষম হয়, তবে তার আদায়কৃত ফিদিয়া বাতিল হয়ে যাবে। রোজা ও নামাজের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়গুলোর মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত নয় যা আল-মুসতাসফা গ্রন্থের লেখক ও অন্যান্যরা উল্লেখ করেছেন যে, ওজর বা ওজুহাত ছাড়াই রোজা ভঙ্গ করলেও সে ওসিয়ত করবে এবং ফিদিয়া আদায়ের মাধ্যমে তার ক্ষমার আশা করা যাবে; কেননা নামাজের ক্ষেত্রেও জাহিরি বা প্রকাশ্য মত অনুযায়ী একই বিধান। ফকীহগণ বলেছেন, কাফফারা ও ফিদিয়ার ক্ষেত্রে পেট পুরে খাওয়ানোর শর্তে 'ইবাহাত' (খাওয়ানোর অনুমতি প্রদান) সহীহ হবে, যেমন কসমের কাফফারা, রোজার ফিদিয়া এবং হজের জিনায়াত বা অপরাধের ক্ষেত্রে। আর ইবাহাত (খাওয়ানো) এবং তামলিক (মালিকানা প্রদান)—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ জায়েজ, তবে জাকাত, ফিতরা এবং উশরের বিষয়টি এর ভিন্ন। সুতরাং এই নিয়মানুযায়ী, যদি কেউ খাবার তৈরি করে এবং দরিদ্রদের দাওয়াত দেয় যাতে সেটিকে কসমের কাফফারা, রোজার ফিদিয়া কিংবা কোনো অপরাধের দণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে তা সহীহ হবে। আর এক্ষেত্রে তামলিক বা মালিকানা প্রদান করা শর্ত নয়; তামলিক হলো—মালিক বানিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরিদ্র ব্যক্তির হাতে কোনো কিছু প্রদান করা। হ্যাঁ, প্রত্যেক দরিদ্র ব্যক্তির জন্য দুই বেলা পেট পুরে খাওয়ানো শর্ত। আর কসমের অধ্যায় ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে একজন দরিদ্র ব্যক্তিই যথেষ্ট; কেননা নস বা অকাট্য দলীল অনুযায়ী কসমের কাফফারা দশজন মিসকিনের জন্য হওয়া আবশ্যক, অথবা একই ব্যক্তিকে দশ দিন তা প্রদান করতে হবে। আর একটি বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত যে, সারাজীবনের শপথ বা কসমগুলো আধিক্যের কারণে গণনা করা সম্ভব হয় না। তাই ব্যক্তির কর্তব্য হলো—এর কাফফারা আদায়ের সময় অনেক বেশি পরিমাণে আদায় করা, অতঃপর ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর 'তাদাখুল' (একটির ভেতরে অন্যটি প্রবেশ করা) সংক্রান্ত মতানুসারে সারাজীবনের অবশিষ্ট কসমগুলোর পক্ষ থেকে একটি কাফফারা আদায় করা, যেমনটি আমার সাইয়্যেদ বর্ণনা করেছেন।
পিতা (বর্ণনা করেছেন) মাকদিসী থেকে, তিনি বুগইয়াহ থেকে, তিনি শিহাবুল আইম্মাহ থেকে। 'আসলের' (আল-আসল) লেখক বলেছেন, এটিই পছন্দনীয় মত, এবং আমার নিকটও (এটিই পছন্দনীয়)। এর অনুরূপ বর্ণনা কুহিস্তানি গ্রন্থে 'মানিয়াহ' থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর এটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মাযহাব। * আর অসিয়্যতের পদ্ধতি এবং এর মধ্যে কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তা আমার শ্রদ্ধেয় পিতা 'শিফাউল আলীল' গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। আর যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত তা হলো দাতার পক্ষ থেকে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা। সুতরাং অসিয়্যত সম্পাদনকারী (ওসী) অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে বলবে না যে, "আমি কি অমুকের নামাজের কাফফারা হিসেবে এটি গ্রহণ করলাম?" কারণ এটি হামজা (প্রশ্নবোধক বর্ণ) অথবা 'হাল' (কি) উহ্য থাকার সম্ভাবনা রাখে; কেননা এই বক্তব্যটি ইতিবাচক সত্যায়নের অন্তর্ভুক্ত, আর প্রশ্নবোধক শব্দ ইতিবাচক বার্তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্য রয়েছে। বরং ওসী অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে বলবে, "অমুকের পুত্র অমুকের নামাজের কাফফারা হিসেবে এটি গ্রহণ করুন" অথবা বলবে, "এটি অমুকের পুত্র অমুকের নামাজের কাফফারা।" * একইভাবে প্রস্তাব (ঈজাব) পূর্ণ হওয়ার আগে গ্রহণের (কবুল) ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। সুতরাং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি ওসীর কথা শেষ হওয়ার আগে "কবুল করলাম" বলবে না, এবং ওসীও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির কথা শেষ হওয়ার আগে "কবুল করলাম" বলবে না; এটি উসূল শাস্ত্রে বর্ণিত একটি প্রসঙ্গের কারণে। * আর টাকার থলি অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি বা ওসীর হাতে থেকে যাওয়া থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক। বরং প্রতিবারই উভয়ের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ নিশ্চিত হতে হবে, যাতে প্রতিবারই দখল ও হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রদান ও দান সম্পন্ন হয়। * নাবালক, নির্বোধ, দাস বা মুদাব্বারকে উপস্থিত করা থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক। কারণ ওসী যদি তাদের কাউকে কিছু দেয়, তবে তার মালিকানা প্রদান ও দান সঠিক হবে না। সুতরাং কোনো নাবালক, বিবেকহীন বা দাসের নামে টাকার থলি দেওয়া যাবে না। * ধনী বা কাফেরকে উপস্থিত করা থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক। * টাকার থলি একত্রিত করা এবং এর প্রকৃত মালিক ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে বা অংশীদারদের একজনের অনুমতি ছাড়া অন্যজনের কাছ থেকে তা দান হিসেবে চাওয়া বা ঋণ নেওয়া থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক। * এটি ঋণ নেওয়া বা দান চাওয়ার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক, তবে বার্তার (রেসালাত) মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় আপনি যেমন জানেন, এটি মূল ব্যক্তি (আসালত) দ্বারাই হতে হবে। * কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এটি পরিচালনা করা থেকেও বেঁচে থাকা আবশ্যক, তবে আমাদের উল্লিখিত প্রতিনিধিত্ত্বের মাধ্যমে হলে বা সে যদি ওসী অথবা ওয়ারিশ হয়, যা আপনি জানেন। * অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে টাকার থলি দেওয়ার সময় ওসীর পক্ষ থেকে উপহাস বা হিলা-কৌশলের মানসিকতা থাকা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। বরং তাকে প্রকৃত মালিক বানানোর সংকল্প নিয়ে তা প্রদান করতে হবে, কোনো কৌশল হিসেবে নয়; এটি মনে রাখতে হবে যে, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যদি ওসীকে তা পুনরায় দান করতে অস্বীকার করে, তবে তার সেই অধিকার থাকবে এবং তাকে দান করতে বাধ্য করা যাবে না। * এরপর অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির মনে কষ্ট দেওয়া থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। বরং আমরা পূর্বে যেমন বলেছি, তাকে এমন কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে যা তার মনকে প্রফুল্ল করে। আরও কিছু বর্জনীয় বিষয় বাকি রয়েছে যা আমার শ্রদ্ধেয় পিতা 'শিফাউল আলীল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আপনার উচিত সেটি দেখা, কারণ তাতে অনেক মূল্যবান ও সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে যা অধিকাংশ দীর্ঘ কিতাবে পাওয়া যায় না। আমি সেখানে পর্যাপ্ত আলোচনা থাকায় এখানে তা উল্লেখ করিনি। * আর মানুষের মাঝে পরিচিত 'আতাকাহ' (মুক্তি) সম্পর্কেও মানুষের গাফেল হওয়া উচিত নয়, আর তা হলো 'কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ' (সুরা ইখলাস) পাঠ করা। এ বিষয়ে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে মুয়াজ বিন আনাস আল-জুহানি (আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোন) থেকে নবী (আল্লাহর শান্তি ও রহমত তাঁর ওপর বর্ষিত হোক) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি এগারোবার 'কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ' পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।" তখন ওমর (আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোন) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে তো আমরা অনেক বেশি (ঘর) লাভ করব।" তখন আল্লাহর রাসুল (আল্লাহর শান্তি ও রহমত তাঁর ওপর বর্ষিত হোক) বললেন...
আল্লাহর সালাম সর্বাধিক মহান ও উত্তম। এর অন্তর্ভুক্ত হলো যা তাবারানি ফিরোজ আদ-দাইলামি (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সালাতে বা সালাতের বাইরে একশ বার 'কুল হুয়াল্লাহু আহাদ' (সুরা ইখলাস) পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরোয়ানা লিখে দেবেন।" এই হাদিসের স্বপক্ষে অন্য বর্ণনাও রয়েছে।
এবং আল-বাযযার আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে মারফূ সূত্রে বর্ণনা করেছেন: "যে ব্যক্তি এক লক্ষ বার 'কুল হুয়াল্লাহু আহাদ' পাঠ করবে, সে আল্লাহর কাছ থেকে নিজেকে ক্রয় করে নিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর আসমান ও যমীনে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন: সাবধান! অমুক ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত। সুতরাং যার নিকট তার কোনো পাওনা বা অধিকার রয়েছে, সে যেন তা মহান আল্লাহর কাছ থেকে গ্রহণ করে।"এটি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যে তার সারা জীবনে এই সংখ্যাটি পাঠ করতে সক্ষম হয়েছে অথবা তার পক্ষ থেকে একনিষ্ঠ নিয়তে পাঠ করা হয়েছে। শরীয়তবিদ ও সূফীগণের অভিমত হলো, এই জাতীয় হাদিসগুলোর উদ্দেশ্য হলো আমলটি নিজে করা এবং অন্যের মাধ্যমে করানো—উভয়কেই শামিল করে। ইস্তিখারার হাদিসের ওপর এই উভয় দলের আমল থেকে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি।
একইভাবে সত্তর হাজার বার 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করার ওপর মানুষের আমল রয়েছে এবং উলামাগণ এটিকে উত্তম মনে করেছেন। শায়খ ইয়াফেয়ী ও সেনুসী যা উল্লেখ করেছেন তা বিষয়টিকে আরও শক্তিশালী করে। কুরআনের ফযিলত উল্লেখ করার অপেক্ষা রাখে না। এর বাইরে অন্যান্য নেক আমলের বিষয়টিও সুবিদিত।যখন এই নেক আমলগুলো এর উপযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর ন্যস্ত করা হয় না, তখন ত্রুটির আশঙ্কা থেকে মুক্ত হওয়া যায় না—যদি তা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ এবং রিয়া (লোকদেখানো), পারিশ্রমিক ও মূল্য (এমনকি এক লোকমা খাবারের বিনিময়) থেকেও মুক্ত না হয়। কারণ, পবিত্র সত্তা পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না এবং তিনি সকল অংশীদারের চেয়ে অমুখাপেক্ষী। মহান আল্লাহ কেবল সেটিই কবুল করেন যা তাঁর জন্য একনিষ্ঠ হয়।
ইবাদত যেমন—কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, তাহলীল, তাসবীহ, সালাত, সিয়াম ইত্যাদির ওপর পারিশ্রমিক গ্রহণের হারাস হওয়ার দলীলসমূহের বর্ণনা; এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আমল করলে তার সওয়াব এমনকি পাঠকারীর কাছেও না পৌঁছানোর বর্ণনা। আর পারিশ্রমিক বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, তা কেবল রুকয়া বা ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্য কিছুর ক্ষেত্রে নয়।এবং পরবর্তী যুগের আলিমগণ যে বিষয়গুলোকে ব্যতিক্রম গণ্য করেছেন—যেমন শিক্ষাদান, আযান ও ইমামতি—তার বর্ণনা। এছাড়া কোনো ব্যক্তি তার আমলের সওয়াব অন্যকে প্রদান করতে পারে এবং ইখলাস বা একনিষ্ঠতা ছাড়া কোনো সওয়াব নেই—এই মর্মে 'শিফাউল আলীল ওয়া বাল্লুল গালীল' কিতাবের দলীলসমূহের বর্ণনা। সুতরাং আপনার প্রতি এটি বাধ্যতামূলক, কারণ এটি এই বিষয়ে এক অনন্য কিতাব এবং জ্ঞানপিপাসুদের জন্য যথেষ্ট।
বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম এর প্রশংসা ও মূল্যায়ন করেছেন, যেমন কায়রোর মুফতি সাইয়্যেদ তাহতাবি এবং স্বীয় মাযহাব ও অন্যান্য মাযহাবের প্রখ্যাত গ্রন্থকারগণ। এখন আমরা যিকির ও যিকিরকারীদের ফযিলত এবং বিশেষভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ফযিলত সম্পর্কে কিছু বর্ণনা উল্লেখ করব।মহান আল্লাহ বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো।" আল্লাহ আরও বলেন: "...এবং অধিক যিকিরকারী নারীগণ, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।" আল্লাহ আরও বলেন: "এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" আল্লাহ আরও বলেন: "যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে।"
সহীহাইন (বুখারি ও মুসলিম)-এ বর্ণিত আছে: "নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান এবং যিকিরকারীদের সন্ধান করেন। যখন তারা এমন একদল লোককে পান যারা আল্লাহর যিকির করছে, তখন তারা একে অপরকে ডেকে বলেন, 'তোমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দিকে এসো'।" রাসূল (সা.) বলেন, "অতঃপর তারা দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত তাদের ডানা দিয়ে যিকিরকারীদের পরিবেষ্টন করে রাখেন।" (হাদিসটি দীর্ঘ)। এর শেষে রয়েছে: "আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের বলবেন, 'আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।' তখন ফেরেশতাদের মধ্যে একজন বলবেন, 'তাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি রয়েছে...'"...তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন, বরং তিনি কেবল একটি প্রয়োজনে এসেছেন। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের সঙ্গী কখনও দুর্ভাগা হয় না। হাকিম সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একদল লোকের মাঝে ছিলেন যারা মহান আল্লাহর জিকির করছিল। তখন তাদের পাশ দিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিক্রম করলেন এবং বললেন: তোমরা কী বলছিলে? আমি দেখছিলাম তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হচ্ছে, তাই আমি তাতে শরিক হতে দ্রুত চলে এলাম। বাযযার বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর এমন কিছু পরিভ্রমণকারী ফেরেশতা রয়েছেন যারা জিকিরের মজলিসসমূহ খুঁজে বেড়ান। যখন তারা সেই মজলিসগুলোর সন্ধান পান, তখন তারা সেগুলোকে ঘিরে ফেলেন (দীর্ঘ হাদিস)। সেখানে তারা বলেন: হে আমাদের রব, আমরা আপনার বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু বান্দার কাছে এসেছি যারা আপনার নেয়ামতসমূহের মহিমা বর্ণনা করছে, আপনার কিতাব তিলাওয়াত করছে, আপনার নবীর ওপর দরুদ পাঠ করছে এবং আপনার কাছে তাদের পরকাল ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করছে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন: তোমরা তাদের আমার রহমত দ্বারা আবৃত করে দাও। তারা বলে: তাদের মধ্যে তো অমুক পাপিষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছে। তখন মহান আল্লাহ বলেন: তোমরা তাদের আমার রহমত দ্বারা আবৃত করে দাও। তিরমিজি বর্ণনা করেছেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট কোন বান্দারা শ্রেষ্ঠ হবে? তিনি বললেন: যারা অধিক হারে আল্লাহকে স্মরণকারী। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর পথে জিহাদকারীর চেয়েও কি তারা শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন: যদি কোনো ব্যক্তি কাফের ও মুশরিকদের ওপর তলোয়ার চালিয়ে তা ভেঙেও ফেলে এবং রক্তে রঞ্জিত হয়, তবুও যারা আল্লাহর জিকির করে তারাই শ্রেষ্ঠ হবে। তাবারানি বর্ণনা করেছেন: যদি কোনো ব্যক্তি তার কক্ষে দিরহাম (মুদ্রা) বণ্টন করতে থাকে আর অন্যজন মহান আল্লাহর জিকির করে, তবে জিকিরকারীই শ্রেষ্ঠ হবে। নাসায়ি বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হানিকে লক্ষ্য করে বলেছেন: তুমি একশ বার সুবহানাল্লাহ পাঠ করো, কেননা তা ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশধরদের মধ্য থেকে একশ জন দাস মুক্ত করার সমতুল্য। তুমি একশ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করো, কেননা তা জীন ও লাগাম লাগানো একশটি ঘোড়ার সমতুল্য যাতে আরোহণ করে তুমি আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। তুমি একশ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করো, যা কবুলকৃত ও গলায় মালা পরানো একশটি কোরবানির উটের সমতুল্য। তুমি একশ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করো—বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছেন—এটি আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেয়। তোমার আমলের মতো আর কারো আমল উপরে উঠানো হবে না, যদি না সে তোমার মতো আমল করে। আহমদ ও তিরমিজি বর্ণনা করেছেন: আমি কি তোমাদের সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে সংবাদ দেব না, যা তোমাদের মালিকের নিকট সর্বাধিক পবিত্র, তোমাদের মর্যাদায় সুউচ্চ এবং যা তোমাদের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করার চেয়েও উত্তম? এমনকি তা শত্রুর মোকাবিলা করে তাদের গর্দান উড়ানো এবং তারা তোমাদের গর্দান উড়ানোর চেয়েও কি উত্তম নয়? সাহাবীরা বললেন: অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: তা হলো মহান আল্লাহর জিকির। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা বলেন: আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে আমি তেমনই। যখন সে আমাকে স্মরণ করে আমি তার সাথে থাকি। যদি সে আমাকে নিজের মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে আমার নিজ সত্তায় স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোনো সমাবেশে স্মরণ করে, তবে আমি তাকে তাদের চেয়েও উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি। হাদিসে আরও এসেছে: হে লোকসকল, তোমরা জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করো। জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, জান্নাতের বাগিচা কী? তিনি বললেন: জিকিরের মজলিসসমূহ। খবরে এসেছে: একটি নেক মজলিস মুমিনের দশ লক্ষ মন্দ মজলিসের ক্ষতি দূর করে দেয়। জনৈক বুজুর্গ বলেছেন: আল্লাহ যখন তাঁর কোনো বান্দাকে ওলি বানাতে চান, তখন তার জন্য জিকিরের দরজা খুলে দেন। যখন সে জিকিরের আশ্রয় নেয়, তখন আল্লাহ তার জন্য নৈকট্যের দরজা খুলে দেন। অতঃপর তাকে মহব্বতের মজলিসে উন্নীত করেন এবং তাওহিদের কুরসিতে বসান। এরপর তার থেকে সকল পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে নৈকট্যের ঘরে প্রবেশ করান এবং তার সামনে তাঁর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব উন্মোচন করেন। তখন সে ইলমের মাকাম লাভ করে। জনৈক শায়খ বলেছেন: যখন কোনো মজলিসে নেককার লোকদের আলোচনা করা হয়, তখন সেখানে রহমত বর্ষিত হয় এবং আল্লাহ তাআলা সেই রহমত থেকে এমন এক মেঘমালা তৈরি করেন যা কেবল কাফেরদের ভূমিতেই বর্ষিত হয় এবং যে ব্যক্তি সেই পানি পান করে...
মারূফ আল-কারখী (রহ.) প্রায়শই বলতেন, "নেককারদের স্মরণের সময় রহমত নাজিল হয়।" জনৈক মুরিদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আমার নেতা, আল্লাহ তাআলার স্মরণের সময় কী নাজিল হয়?" তখন তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। এরপর সংজ্ঞা ফিরে পেলে বললেন, "আল্লাহ তাআলার স্মরণের সময় প্রশান্তি নাজিল হয়।" আল্লাহ তাআলা বলেন, "জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।" এটি আল্লাহর জিকিরের সাধারণ ফযীলত সংক্রান্ত।
আর বিশেষভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "সুতরাং জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।" আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, "সুতরাং যে ব্যক্তি দান করল এবং তাকওয়া অবলম্বন করল, আর উত্তম বিষয়কে (অর্থাৎ তাওহিদের কালিমাকে) সত্য বলে বিশ্বাস করল, আমি তার জন্য সহজ পথকে (অর্থাৎ জান্নাতকে) সহজ করে দেব। আর যে কৃপণতা করল এবং নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করল, আর উত্তম বিষয়কে (অর্থাৎ তাওহিদের কালিমাকে) অস্বীকার করল, আমি তার জন্য কঠিন পথকে (অর্থাৎ জাহান্নামকে) সহজ করে দেব।"
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নাবীগণ যা বলেছি, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।" তিরমিযী ও নাসাঈ বর্ণনা করেছেন যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "সর্বোত্তম জিকির হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এবং সর্বোত্তম দোয়া হলো 'আলহামদুলিল্লাহ'।"
নাসাঈ বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার রব! আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন যার মাধ্যমে আমি আপনাকে স্মরণ করব এবং আপনার নিকট প্রার্থনা করব। তিনি বললেন, হে মূসা! বলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার রব! আপনার সকল বান্দাই তো এটি বলে। আল্লাহ বললেন, তুমি বলো 'لا إله إلا الله'। মূসা বললেন, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি তো এমন কিছু চাচ্ছিলাম যা কেবল আমাকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দান করবেন। আল্লাহ বললেন, হে মূসা! যদি সাত আকাশ ও আমি ছাড়া এর সকল অধিবাসী এক পাল্লায় রাখা হয় এবং 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর পাল্লাই ভারী হবে।"
তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "তাসবিহ হলো ঈমানের অর্ধেক, 'আলহামদুলিল্লাহ' মিযান (আমলনামার পাল্লা) পূর্ণ করে দেয় এবং 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর জন্য আল্লাহর সামনে কোনো পর্দা থাকে না, যতক্ষণ না তা আল্লাহর নিকট সরাসরি পৌঁছে যায়।"
হাদিসে এসেছে, "আমার রবের পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক এসে আমাকে খবর দিলেন যে, যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই—সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" বর্ণনায় আছে, "কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভে সবচেয়ে ধন্য হবে সেই ব্যক্তি, যে নিজের অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে।"
হাদিসে এসেছে, "'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হলো জান্নাতের চাবিকাঠি।" বর্ণনায় আছে, "তোমরা তোমাদের মুমূর্ষু ব্যক্তিদের 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর তালকিন দাও, কেননা এটি গুনাহসমূহকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়।" সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! যদি কেউ জীবিত অবস্থায় এটি বলে? তিনি বললেন, "তা আরও বেশি ও প্রবলভাবে ধ্বংসকারী।" 'এহয়াউ উলুমিদ্দীন' গ্রন্থে আছে, "যদি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারী ব্যক্তি পৃথিবী সমপরিমাণ গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং সত্যনিষ্ঠার সাথে তা পাঠ করে থাকে, তবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।"
হাদিসে এসেছে, "'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারীদের জন্য তাদের কবরে বা পুনরুত্থানের ময়দানে কোনো আতঙ্ক থাকবে না। আমি যেন পুনরুত্থানের ডাক আসার সময় তাদের দেখতে পাচ্ছি যে, তারা তাদের মাথা থেকে মাটি ঝেড়ে ফেলছে এবং বলছে: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করেছেন। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী।"
হাদিসে আরও আছে, "তোমরা সকলেই অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কেবল সে ব্যক্তি ব্যতীত যে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ থেকে তেমনভাবে বিমুখ হয় যেমন উট তার মালিক থেকে পালিয়ে যায়।" জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কে সেই ব্যক্তি যে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, "যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেনি।"
আল্লাহ তাআলা বলেন, "উত্তম কাজের বিনিময় উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে?" কেউ কেউ বলেছেন, দুনিয়াতে 'ইহসান' (উত্তম কাজ) হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা এবং পরকালে এর বিনিময় হলো জান্নাত। একইভাবে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে: "যারা উত্তম কাজ করেছে তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার এবং অতিরিক্ত আরও কিছু।" বলা হয়েছে যে, এখানে 'অতিরিক্ত' বলতে জান্নাতে আল্লাহর মহান চেহারার দিকে দৃষ্টিপাত করাকে বোঝানো হয়েছে।
হাদিসে এসেছে, "যখন কোনো বান্দা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে, তখন তা তার আমলনামায় পৌঁছায় এবং কোনো গুনাহর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তা মুছে না ফেলে যায় না, যতক্ষণ না তা কোনো নেক আমলের দেখা পায় এবং তার পাশে অবস্থান নেয়।"
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর আরশের সামনে নূরের একটি স্তম্ভ রয়েছে। যখন কোনো বান্দা বলে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’, তখন সেই স্তম্ভটি কম্পিত হতে থাকে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা তাকে বলেন, ‘স্থির হও।’ স্তম্ভটি বলে, ‘আমি কীভাবে স্থির হব, অথচ আপনি এর পাঠকারীকে এখনো ক্ষমা করেননি?’ তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।’ তখন সেটি স্থির হয়।
কা’ব আল-আহবার (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহী পাঠালেন যে, যদি ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলার মতো কেউ না থাকত, তবে আমি দুনিয়াবাসীদের ওপর জাহান্নামকে চাপিয়ে দিতাম।
আবু ফজল থেকে বর্ণিত, জান্নাতবাসীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা সেখানকার গাছপালা, নদীনালা এবং যা কিছু আছে সব কিছুকে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলতে শুনবে। তখন তারা একে অপরকে বলবে, এটি এমন একটি বাণী যা থেকে আমরা দুনিয়ার জীবনে গাফেল ছিলাম।
বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলবে এবং সম্মানের সাথে তা দীর্ঘ করে পাঠ করবে, তার চার হাজার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। জিজ্ঞেস করা হলো, যদি তার নিজের এত গুনাহ না থাকে? তিনি বললেন, তবে তার পিতা-মাতা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ঘরে প্রবেশের সময় নিয়মিত এই জিকির করলে দারিদ্র্য দূর হয়।
বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি এটি সত্তর হাজার বার পাঠ করবে, তা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিপণ হবে।
শায়খ আবু মুহাম্মদ আল-ইয়াফিয়ি আল-ইয়ামানি আল-শাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ তাআলা) তাঁর ‘আল-ইরশাদ ওয়াত তাতরিজ ফী ফাদলি জিকরিল্লাহি তাআলা ওয়া তিলাওয়াতি কিতাবিহিল আজিজ’ গ্রন্থে মহান ইমাম শায়খ আবু যায়েদ আল-কুরতুবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আমি কিছু বর্ণনায় শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সত্তর হাজার বার ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ পাঠ করবে, তা তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তিপণ হবে। আমি এই প্রতিশ্রুতির বরকতের আশায় তা আমল করলাম এবং তা নিজের জন্য সঞ্চয় হিসেবে রাখলাম এবং আমার পরিবারের জন্যও কিছু আমল করলাম। সেই সময় এক যুবক আমাদের সাথে থাকত, যার সম্পর্কে বলা হতো যে মাঝে মাঝে তার কাছে জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয় উদ্ভাসিত হয়। তার ব্যাপারে আমার মনে কিছুটা সংশয় ছিল। একদা জনৈক ভাই আমাদের তাঁর বাড়িতে দাওয়াত করলেন। আমরা খাবার খাচ্ছিলাম এবং যুবকটিও আমাদের সাথে ছিল। হঠাৎ সে এক বিকট ও ভয়াবহ চিৎকার দিল এবং বলতে লাগল, ‘হে চাচা! এই তো আমার মা জাহান্নামে!’ যখন আমি তার এই অবস্থা দেখলাম, মনে মনে ভাবলাম যে আজ আমি এই যুবকের সত্যতা পরীক্ষা করব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমার মনে এই ইলহাম দান করলেন যে, আমি আমার ওই সত্তর হাজার বার পাঠ করা ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’-এর সওয়াব তার মায়ের জন্য দান করে দেব, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানত না। আমি মনে মনে বললাম, ‘হে আল্লাহ! যদি এই বর্ণনাটি সত্য হয় এবং যারা আমাদের কাছে এটি বর্ণনা করেছেন তারা যদি সত্যবাদী হন, তবে এই সত্তর হাজার বার পাঠের সওয়াব এই যুবকের মায়ের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তিপণ হিসেবে কবুল করুন।’ আমার মনে এই চিন্তা শেষ হতে না হতেই যুবকটি বলে উঠল, ‘হে চাচা! আমার মা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছেন সেই বরকতে যা আপনি তাঁর জন্য পাঠ করেছেন।’ আমি এতে আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং এর দ্বারা আমার দুটি উপকার হলো: প্রথমত বর্ণনার সত্যতার প্রতি আমার বিশ্বাস দৃঢ় হলো এবং দ্বিতীয়ত যুবকের প্রতি আমার সংশয় দূর হলো।
সাহল আত-তুস্তারি (রাহিমাহুল্লাহ তাআলা) বলেছেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’—এই বাণীর সওয়াব মহান আল্লাহর চেহারার দিকে তাকানো ছাড়া আর কিছু নয়, আর জান্নাত হলো আমলসমূহের প্রতিদান।
এক বর্ণনায় আছে যে, বান্দা যখন ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলে, তখন আল্লাহ তাকে প্রত্যেক কাফের নর ও নারীর সংখ্যার সমান সওয়াব দান করেন। এর কারণ হলো যখন সে এই বাণীটি উচ্চারণ করে, তখন সে যেন প্রত্যেক কাফেরের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, তাই তাদের সংখ্যার সমান সওয়াব পাওয়া তার প্রাপ্য।
আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে— {তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো, তিনি তোমাদের আমলসমূহ সংশোধন করে দেবেন}—এখানে ‘সঠিক কথা’ মানে হলো ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলা। সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত এই জিকির অধিক পরিমাণে করা।