القسم: التراجم والطبقات
الكتاب: أسد الغابة في معرفة الصحابة
المؤلف: عز الدين أبو الحسن علي بن محمد بن عبد الكريم الجزري المعروف بابن الأثير (ت 630 هـ)
الناشر: جمعية المعارف المصرية
طبع في: المطبعة الوهبية بالقاهرة، 1285 - 1286 هـ
ثم صَوّرتْه بالأوفست: (بعد 92 عامًا) المكتبة الإسلامية بطهران
تنبيه: هذه الطبعة هي التي يعزو إليها د «بشار عواد معروف» في تحقيق تهذيب الكمال
عدد الأجزاء: 5
[ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
تاريخ النشر بالشاملة: 2 ذو القعدة 1445
বিভাগ: জীবনী ও স্তরসমূহ
কিতাব: উসুদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ
লেখক: ইযযুদ্দীন আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম আল-জাযারি, যিনি ইবনুল আসীর নামে পরিচিত (মৃত্যু ৬৩০ হিজরী)
প্রকাশক: জমিয়াতুল মাআরিফ আল-মিসরিয়্যাহ
মুদ্রিত হয়েছে: আল-মাতবাআতুল ওয়াহাবিয়্যাহ, কায়রো, ১২৮৫ - ১২৮৬ হিজরী
পরবর্তীতে অফসেটে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে: (৯২ বছর পর) আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, তেহরান
সতর্কবার্তা: এই সংস্করণটিই ডক্টর «বাশার আওয়াদ মারুফ» তাহযীবুল কামালের তাহকীকে ব্যবহার করেছেন
খণ্ড সংখ্যা: ৫
[কিতাবটির সংখ্যায়ন মূল মুদ্রিত কপির অনুরূপ]
শামেলায় প্রকাশের তারিখ: ২ যুল-ক্বাদাহ ১৪৪৫
যায়েদ বনী আদী ইবনে নাজ্জার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আব্দুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র জুবাইর ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে মদীনায় তাঁর ভাই আব্দুল্লাহর নিকট পাঠিয়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেন এবং তাঁকে দারুন নাবিখায় দাফন করা হয়। আব্দুল্লাহ, জুবাইর এবং আবু তালিব ছিলেন সহোদর ভাই (একই পিতা-মাতার সন্তান); তাঁদের মা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আমর ইবনে আইজ ইবনে ইমরান ইবনে মাখযুম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে উম্মে আয়মান, পাঁচটি উট, এক পাল ছাগল, 'মাছুর' নামক একটি তরবারি এবং কিছু রৌপ্য মুদ্রা লাভ করেন। উম্মে আয়মান তাঁকে লালন-পালন করতেন। ইবনে ইসহাক বলেন, মুত্তালিব ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কাইস তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা কাইস ইবনে মাখরামা থেকে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছি এবং আমরা সমবয়সী ছিলাম। বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ছিল হাতির বছরের রবিউল আউয়াল মাসের দশ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর সোমবার দিনে। আবার বলা হয় যে, মাসের দুই দিন অতিবাহিত হওয়ার পর এবং কেউ বলেন আট দিন অতিবাহিত হওয়ার পর। এটি ছিল কিসরা আনুশিরওয়ান ইবনে কুবাজের রাজত্বের চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সময়। আনুশিরওয়ানের রাজত্বকাল ছিল সাতচল্লিশ বছর আট মাস। যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সপ্তম দিনে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর খতনা করান। আবার বলা হয় যে, তিনি জন্মগতভাবে খতনাকৃত ও নাভি কাটা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। আমরা তাঁর পিতৃপুরুষগণের নাম ও অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ 'আল-কামিল ফিত তারিখ' গ্রন্থে সবিস্তারে উল্লেখ করেছি, তাই এখানে তাঁর দীর্ঘ বর্ণনা দেব না; কারণ আমাদের উদ্দেশ্য হলো সারসংক্ষেপ উল্লেখ করা, বিস্তারিত নয়। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করলেন, তখন তাঁরা তাঁর জন্য দুগ্ধদানকারী ধাত্রী অনুসন্ধান করলেন। ফলে বনী সা’দ ইবনে বকর ইবনে হাওয়াজিন ইবনে মনসুর গোত্রের এক মহিলাকে তাঁর দুগ্ধপানের জন্য নিযুক্ত করা হলো, যাঁকে হালিমা বিনতে আবি জুয়াইব বলা হতো এবং তাঁর পিতার নাম ছিল হারিস। তাঁর এবং তাঁর দুধ-বোন শায়মার সংবাদ তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত থেকে জেনে নেওয়া উচিত, আমরা তাঁদের কথা সেখানে উল্লেখ করেছি। ইবনে ইসহাক বলেন, হালিমা বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উসিলায় আল্লাহ আমাদের ক্রমাগত বরকত দেখাতে থাকলেন এবং আমরা তা উপলব্ধি করতে পারলাম, এমনকি তিনি দুই বছরে পদার্পণ করলেন। অতঃপর আমরা তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে আসলাম, অথচ আমরা তাঁর মধ্যে বরকত প্রত্যক্ষ করার কারণে তাঁকে আমাদের কাছে রাখার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলাম। যখন তাঁর মা তাঁকে দেখলেন, আমরা তাঁকে বললাম: "আমাদেরকে তাঁকে আরও এক বছরের জন্য ফিরিয়ে নিয়ে যেতে দিন, কারণ আমরা তাঁর ব্যাপারে মক্কার মহামারীর আশঙ্কা করছি।" অতঃপর তিনি তাঁকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন এবং আমরা তাঁকে নিয়ে দুই বা তিন মাস অবস্থান করলাম। এমতাবস্থায় যে তিনি আমাদের ঘরের পেছনে তাঁর এক ভাইয়ের সাথে ছিলেন, হঠাৎ তাঁর ভাই দৌড়ে আসল এবং বলল: "আমার কুরাইশ ভাইয়ের কাছে দুইজন লোক এসেছে, তারা তাঁকে শুইয়ে দিয়েছে এবং তাঁর পেট চিরে ফেলেছে।" তখন আমি এবং তাঁর পিতা তাঁর দিকে দ্রুত গেলাম এবং তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পেলাম, তবে তাঁর চেহারার রং বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পিতা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন: "হে বৎস, তোমার কী হয়েছে?" তিনি বললেন: "সাদা পোশাক পরিহিত দুইজন লোক আমার কাছে এসেছে, তারা আমার পেট চিরে ফেলেছে এবং সেখান থেকে কিছু একটা বের করে নিয়েছে, তারপর তা আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছে।" তখন তাঁর পিতা বললেন: "আমি আশঙ্কা করছি যে তাঁর কোনো ক্ষতি হয়েছে, সুতরাং আমরা যার আশঙ্কা করছি তা প্রকাশ পাওয়ার আগেই তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিই।" হালিমা বলেন: অতঃপর আমরা তাঁকে বহন করে নিয়ে আসলাম। তাঁর মা বললেন: "তোমরা কেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে আসলে, অথচ তোমরা তো তাঁকে সাথে রাখার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলে?" আমরা বললাম: "আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন এবং আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি, আর আমরা তাঁর ব্যাপারে অশুভ ঘটনার আশঙ্কা করছি।" তিনি বললেন: "আমাকে সত্য করে বলো তোমাদের আসল বিষয়টি কী?" তখন আমরা তাঁকে তাঁর সংবাদটি জানালাম। তিনি বললেন: "তোমরা কি তাঁর ব্যাপারে শয়তানের ভয় পাচ্ছ? কখনোই না, আল্লাহর শপথ! আমি যখন গর্ভবতী হয়েছিলাম তখন দেখেছিলাম যে আমার থেকে এমন এক নূর নির্গত হয়েছে যাতে সিরিয়ার (শাম) রাজপ্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাঁর চিন্তা ছেড়ে দাও।" আর আবু লাহাবের মুক্তদাসী সুওয়াইবিয়াও তাঁকে কিছুদিন দুধ পান করিয়েছেন।
বলা হয়েছে যে, তিনি তিন বছর তাঁর বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন এবং গোপনে দাওয়াত দিচ্ছিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: "এবং আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।" তখন তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রচার শুরু করেন। আবু উমর বলেন, আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তাঁকে হস্তীবর্ষের একচল্লিশতম বছরের রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখে সোমবার নবি হিসেবে প্রেরণ করেন। আবু জাফর উবায়দুল্লাহ বিন আহমদ তাঁর সনদে ইউনুস থেকে, তিনি ইবনে ইসহাক থেকে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: আব্দুল মালিক বিন আব্দুল্লাহ বিন আবু সুফিয়ান বিন জারিয়া আস-সাকাফি—যিনি একজন প্রখর স্মৃতিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন—তিনি জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তির সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহর সম্মান বৃদ্ধি এবং নবুওয়াতের মাধ্যমে তাঁর সূচনা করতে চাইলেন, তখন তিনি কোনো পাথর বা গাছের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেটি তাঁকে সালাম দিত এবং তিনি তা শুনতে পেতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পিছনে, ডানে ও বামে তাকাতেন কিন্তু গাছ এবং চারপাশের পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না, আর সেগুলো বলত: "আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক হে আল্লাহর রাসূল!" এবং একাধিক বর্ণনাকারী তাঁদের সনদে মুহাম্মদ বিন ইসমাইল থেকে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: ইয়াহইয়া বিন বুকাইর আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: লাইস আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন উকাইল থেকে, তিনি ইবনে শিহাব থেকে, তিনি উরওয়া বিন যুবাইর থেকে, তিনি আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ওহীর সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি এমন কোনো স্বপ্ন দেখতেন না যা সুবহে সাদিকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে ধরা দিত না। অতঃপর নির্জনতা তাঁর নিকট প্রিয় করে দেওয়া হলো। তিনি হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন এবং সেখানে "তাহান্নুস" অর্থাৎ বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন, যতক্ষণ না তাঁর নিকট সত্য (ওহী) আসলো। তিনি তখন হেরা গুহায় ছিলেন। অতঃপর ফেরেশতা তাঁর নিকট আসলেন এবং বললেন, "পড়ুন।" তিনি বললেন, "আমি তো পাঠকারী নই।" তিনি (রাসূলুল্লাহ) বলেন: "অতঃপর তিনি আমাকে ধরে সজোরে জাপটে ধরলেন, এমনকি আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পাঠকারী নই।" তিনি বলেন: "অতঃপর তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে ধরে সজোরে জাপটে ধরলেন, এমনকি আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পাঠকারী নই।" অতঃপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে সজোরে জাপটে ধরলেন, তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন: "পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক (জমাট রক্তপিণ্ড) থেকে। পড়ুন, আর আপনার রব মহিমান্বিত।" অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কম্পিত হৃদয়ে তা নিয়ে ফিরে আসলেন এবং খাদিজার নিকট প্রবেশ করলেন। এরপর তাঁর ওরাকা বিন নওফালের নিকট যাওয়ার ঘটনাটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। জাবির থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, কুরআনের সর্বপ্রথম যা অবতীর্ণ হয়েছে তা হলো "হে চাদরাবৃত!"। আবু জাফর তাঁর সনদে ইউনুস থেকে, তিনি ইবনে ইসহাক থেকে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: রমজান মাসের এক জুমুআর দিনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ওহী অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয় আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা-এর এই বাণীর মাধ্যমে: "রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে"—আয়াতের শেষ পর্যন্ত। এবং আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যা আমি আমার বান্দার ওপর ফয়সালার দিনে অবতীর্ণ করেছি, যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল।" আর তা ছিল বদরের দিনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মুশরিকদের মুখোমুখি হওয়ার দিন, রমজানের সতেরো তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পর জুমুআর সকালে। ইউনুস বিশর বিন আবু হাফস আল-কিন্দি আদ-দিমাশকি থেকে বর্ণনা করেন: মাকহুল আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলালকে বলেছিলেন: "সোমবারের রোজা যেন তোমাকে ছেড়ে না যায়, কারণ আমি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছি, সোমবার আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে এবং সোমবার আমি হিজরত করেছি।" অতঃপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অজু এবং দুই রাকাত সালাত শিক্ষা দিলেন, তারপর তিনি খাদিজার নিকট আসলেন।
আমাদের নিকট ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ বর্ণনা করেছেন, যিনি আলী ইবনে আবি তালিবের বংশধরদের একজন ছিলেন, তিনি বলেন: আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখনই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দৈহিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন: তিনি অত্যধিক দীর্ঘদেহী ছিলেন না এবং অতিশয় খাটোও ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন লোকদের মধ্যে মধ্যমাকৃতির। তাঁর চুল অত্যধিক কোঁকড়ানো ছিল না এবং একেবারে সোজাও ছিল না, বরং তা ছিল মধ্যম ধরনের কুঞ্চিত। তিনি অত্যন্ত স্থূলকায় ছিলেন না এবং তাঁর চেহারা একেবারে গোল ছিল না, বরং তাতে কিছুটা গোলাকৃতি ভাব ছিল। তাঁর গায়ের রঙ ছিল লালাভ সাদা। তাঁর চোখ দুটি ছিল ঘন কালো এবং চোখের পাপড়ি ছিল দীর্ঘ। তাঁর হাড়ের জোড়সমূহ এবং কাঁধের হাড় ছিল বড়। তাঁর শরীর (অতিরিক্ত) লোমযুক্ত ছিল না, তবে বুক থেকে নাভি পর্যন্ত একটি চিকন লোমশ রেখা ছিল। তাঁর হাতের তালু এবং পায়ের পাতা ছিল মাংসল। তিনি যখন হাঁটতেন, তখন পা সজোরে উঠিয়ে হাঁটতেন যেন তিনি কোনো ঢালু জায়গা দিয়ে নিচের দিকে নামছেন। তিনি যখন কারো দিকে মনোযোগ দিতেন, তখন পূর্ণাঙ্গভাবে শরীর ঘুরিয়ে মনোযোগ দিতেন। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের মোহর ছিল এবং তিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী। তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী, সবচেয়ে সত্যবাদী, সবচেয়ে কোমল স্বভাবের এবং মেলামেশার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সম্মানজনক। যে ব্যক্তি তাঁকে হঠাৎ দেখত, সে তাঁকে ভয় পেত; আর যে ব্যক্তি পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর সাথে মেলামেশা করত, সে তাঁকে ভালোবেসে ফেলত। তাঁর গুণাবলী বর্ণনাকারী বলতেন: 'আমি তাঁর আগে ও পরে তাঁর মতো আর কাউকে দেখিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।' আমাদের সংবাদ দিয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনে মাহমুদ ইবনে সাদ আল-আসবাহানি, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আবু আল-তৈয়্যব তালহা ইবনে আবি মনসুর আল-হুসাইন ইবনে আবি যর আস-সালিহানি, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আমার দাদা আবু যর মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম সিবত আস-সালিহানি আল-ওয়ায়েজ, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে জাফর আবু আশ-শাইখ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে আল-আব্বাস ইবনে আইয়ুব, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন উবাইদ ইবনে ইসমাইল আল-হাব্বারি তাঁর কিতাব থেকে (হ), এবং আবু আশ-শাইখ বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন ইসহাক ইবনে জামিল, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান ইবনে ওয়াকি, তাঁরা উভয়েই বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন জুমি' ইবনে উমর আল-ইজলি, তিনি বলেন: বনু তামিমে বংশোদ্ভূত খাদিজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর স্বামী আবি হালার এক বংশধর আমার নিকট বর্ণনা করেছেন ইবনে আবি হালা থেকে, তিনি হাসান ইবনে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন, হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি আমার মামার নিকট নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ঘরে প্রবেশের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বললেন: তাঁর ঘরে প্রবেশ করা ছিল তাঁর নিজের প্রয়োজনে এবং এর অনুমতি তাঁর ছিল। তিনি যখন তাঁর ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন তাঁর অবস্থানকে তিন ভাগে ভাগ করতেন: এক ভাগ মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য, এক ভাগ তাঁর পরিবারের জন্য এবং এক ভাগ নিজের জন্য। অতঃপর তিনি নিজের ভাগের অংশটুকু তাঁর ও মানুষের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। অর্থাৎ তিনি বিশিষ্ট সাহাবীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ফায়দা পৌঁছে দিতেন এবং তাঁদের থেকে কোনো কিছু গোপন রাখতেন না। উম্মতের কল্যাণে বরাদ্দকৃত অংশে তাঁর রীতি ছিল যে, তিনি দ্বীনের মর্যাদার ভিত্তিতে মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন এক হাজতধারী, কেউ দুই হাজতধারী এবং কেউ বা অনেক হাজতধারী। তিনি তাঁদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং তাঁদের কল্যাণে এবং উম্মতের কল্যাণে তাঁদের এমন কাজে নিয়োজিত রাখতেন যা তাঁদের জন্য উপযুক্ত হয়। তিনি তাঁদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংবাদ দিতেন এবং বলতেন: 'উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে (জ্ঞান) পৌঁছে দেয়। আর তোমরা আমার কাছে ওই ব্যক্তির হাজত বা প্রয়োজনের কথা পৌঁছে দাও যে নিজে তা আমার কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম নয়। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো সামর্থ্যহীন ব্যক্তির প্রয়োজন শাসকের কাছে পৌঁছে দেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার পা দুটিকে অটল রাখবেন।' তাঁর মজলিসে কেবল এ জাতীয় কল্যাণকর বিষয়ই আলোচনা হতো এবং এ ছাড়া অন্য কিছু তিনি কারো কাছ থেকে গ্রহণ করতেন না। তাঁরা (সাহাবীরা) তাঁর কাছে জ্ঞান অন্বেষণকারী হিসেবে প্রবেশ করতেন এবং জ্ঞান আস্বাদন না করে বের হতেন না, আর তাঁরা হিদায়াতের পথপ্রদর্শক হয়ে বের হতেন। হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি তাঁকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাইরে বের হওয়ার সময়কার আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখতেন এবং কেবল এমন কথাই বলতেন যা মানুষের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি করে এবং তাদের দূরে সরিয়ে দেয় না। তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতেন এবং তাঁদেরই তাদের ওপর নেতা নিযুক্ত করতেন। তিনি মানুষকে (বিপথগামিতা থেকে) সতর্ক করতেন এবং তাঁদের থেকে নিজেও সতর্ক থাকতেন, তবে কারো প্রতি হাসিমুখে থাকতে বা সদাচরণ করতে কার্পণ্য করতেন না। তিনি তাঁর সাহাবীদের খোঁজখবর নিতেন এবং মানুষের মধ্যে কী ঘটছে তা নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি উত্তম কাজকে ভালো বলতেন এবং তার শক্তি বৃদ্ধি করতেন, আর মন্দ কাজকে নিকৃষ্ট বলতেন এবং তা পরিহার করতে বলতেন।
তিনি সকল বিষয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতেন, তাতে কোনো বৈপরীত্য ছিল না। অনুসারীদের গাফিলতি বা বিচ্যুতির আশঙ্কায় তিনি বিচ্যুত হতেন না। তিনি সত্য পালনে কোনো ত্রুটি করতেন না এবং সত্যের সীমা অতিক্রমও করতেন না। মানুষের মধ্যে তাঁর নিকটতম ব্যক্তিরাই ছিলেন সর্বোত্তম। তাঁর নিকট সেই ব্যক্তিই ছিলেন শ্রেষ্ঠতম মর্যাদাশালী, যাঁর নসিহত বা সদুপদেশ ছিল সর্বাধিক ব্যাপক। আর তাঁর নিকট সেই ব্যক্তির মর্যাদা ছিল সর্বাপেক্ষা মহান, যিনি মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অতঃপর আমি তাঁর মজলিস বা বৈঠক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর যিকির ব্যতিরেকে বসা বা দাঁড়ানো—উভয়ই পরিহার করতেন। তিনি নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে নিজের জন্য নির্ধারিত করতেন না এবং অন্যকে এরূপ করতেও নিষেধ করতেন। তিনি যখন কোনো সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছাতেন, মজলিস যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই বসে পড়তেন এবং অন্যদেরও অনুরূপ নির্দেশ দিতেন। তিনি তাঁর মজলিসের প্রত্যেক সঙ্গীকে তাঁর মনোযোগের প্রাপ্য অংশ প্রদান করতেন, ফলে তাঁর কোনো সঙ্গীই মনে করতেন না যে তাঁর নিকট অন্য কেউ তাঁর অপেক্ষা অধিক সম্মানিত। যে কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর সাথে বসত কিংবা তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে থাকত, তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজেই প্রস্থান করত। যে ব্যক্তিই তাঁর নিকট কোনো কিছু প্রার্থনা করত, তিনি তাকে তা প্রদান না করে অথবা নিদেনপক্ষে কোনো সহজ বা কোমল বচনে তাকে বিদায় না দিয়ে বিরত হতেন না। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য সকল মানুষের জন্য প্রশস্ত ছিল, ফলে তিনি তাঁদের জন্য পিতার ন্যায় অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন এবং সত্য ও ন্যায়ের বিচারে তাঁরা সকলেই তাঁর নিকট সমান ছিলেন। তাঁর মজলিস ছিল ধৈর্য, লজ্জা, স্থৈর্য, বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতার কেন্দ্রস্থল। সেখানে উচ্চবাচ্য করা হতো না, কারও মর্যাদাহানি করা হতো না এবং কারও কোনো স্খলন বা ত্রুটি বাইরে প্রচার করা হতো না। তাঁরা ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের ছিলেন, সেখানে একে অপরকে তাকওয়ার উপদেশ দিতেন। তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী; তাঁরা বড়দের সম্মান করতেন, ছোটদের স্নেহ করতেন, অভাবগ্রস্তকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং আগন্তুক বা মুসাফিরের দেখাশোনা করতেন।
(আমি বললাম) সঙ্গীদের মাঝে তাঁর আচরণ কেমন ছিল? তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা প্রফুল্লচিত্ত ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন, উন্নত চরিত্রের অধিকারী এবং অত্যন্ত কোমল স্বভাবের ছিলেন। তিনি রূঢ় বা কঠোর মেজাজের ছিলেন না, জনপদে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকারকারী ছিলেন না, কটুভাষী ছিলেন না, দোষ অন্বেষণকারী ছিলেন না এবং অতিশয় প্রশংসাকারীও ছিলেন না। যা তিনি অপছন্দ করতেন সে ব্যাপারে তিনি বিমুখতা অবলম্বন করতেন, ফলে সে বিষয়ে কেউ নিরাশ হতো না, আবার তিনি তাতে অনাগ্রহও দেখাতেন না। তিনি তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছিলেন: বিবাদ-তর্ক, বাকবাহুল্য এবং অনর্থক বিষয়। আর মানুষের ক্ষেত্রেও তিনি তিনটি বিষয় পরিহার করতেন: তিনি কারও নিন্দা করতেন না, কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন না এবং কারও দোষ অন্বেষণ করতেন না। তিনি কেবল সেই কথাই বলতেন যাতে তিনি সওয়াব ও প্রতিদানের আশা রাখতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তাঁর উপস্থিত সঙ্গীরা এমনভাবে মাথা অবনত করতেন যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে আছে। তিনি নীরব হলে কেবল তখনই তাঁরা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তাঁরা কথোপকথনে কোনো বিবাদে লিপ্ত হতেন না। কেউ কথা বললে তাঁরা তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন। তাঁর নিকট শেষ ব্যক্তির বক্তব্য প্রথম ব্যক্তির বক্তব্যের ন্যায়ই গুরুত্ববহ ছিল। তাঁরা যে বিষয়ে হাসতেন, তিনিও তাতে হাস্য করতেন এবং তাঁরা যাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন। মুসাফির বা আগন্তুকের রূঢ় আচরণ ও প্রশ্নের ক্ষেত্রে তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন, এমনকি তাঁর সাহাবীগণ তাঁদেরকে ডেকে নিয়ে আসতেন। তিনি বলতেন, যখন তোমরা কোনো অভাবী মানুষকে সাহায্য প্রার্থনা করতে দেখবে, তখন তাকে সাহায্য করবে। তিনি কেবল উপযুক্ত প্রশংসাকারীর নিকট থেকেই প্রশংসা গ্রহণ করতেন। তিনি কারও কথা মাঝপথে ছিন্ন করতেন না যতক্ষণ না সে সীমা অতিক্রম করত; সীমা অতিক্রম করলে তিনি নিষেধ করার মাধ্যমে অথবা মজলিস থেকে উঠে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তা থামিয়ে দিতেন।
(বর্ণনাকারী বলেন) অতঃপর আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাঁর নীরবতা কেমন ছিল? তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নীরবতা ছিল চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে: সহনশীলতা, সতর্কতা, পরিমিতিবোধ ও গভীর চিন্তা। তাঁর পরিমিতিবোধ প্রকাশ পেত সকল মানুষের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি ও মনোযোগ প্রদানের মাধ্যমে। আর তাঁর চিন্তা নিহিত ছিল যা অবশিষ্ট থাকবে এবং যা অবিনাশী তার বর্ণনায়। তাঁর মাঝে ধৈর্য ও সহনশীলতার পূর্ণতা ছিল, কোনো কিছুই তাঁকে রাগান্বিত কিংবা বিচলিত করত না। তাঁর সতর্কতা নিহিত ছিল চারটি বিষয়ে: উত্তম কাজ গ্রহণ করা যাতে অন্যেরা তা অনুসরণ করে, মন্দ কাজ বর্জন করা যাতে মানুষ তা থেকে বিরত থাকে, স্বীয় উম্মতের সংশোধনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সচেষ্ট থাকা এবং এমন কাজ সম্পাদন করা যাতে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিহিত থাকে।
(কঠিন শব্দের ব্যাখ্যা): 'তিনি ছিলেন ফখমুন মুফাখখাম' অর্থাৎ তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর, মর্যাদাবান ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।